সংখ্যাগত দিক থেকে খুব বেশি না হলেও
আমাদের দেশে প্রতি বছর রিপোর্টকৃত পটকা মাছ ভক্ষণজনিত বিষক্রিয়ায়
আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় গোটা পঞ্চাশেক। তবে এ ক্ষেত্রে অরিপোর্টকৃত
আক্রান্তের সংখ্যা আমাদের এ পটকা মাছ সমৃদ্ধ অঞ্চলে দুই থেকে চারগুণ বেশি
হবে বলে ধারণা করা হয়। মূলত পটকা মাছের দেহে থাকে মানব স্নায়ুতন্ত্রকে
আক্রান্তকারী ‘টেট্রোডটকি’ নামক এক ধরনের জৈব বিষাক্ত পদার্থ। এই মাছের
পুরো দেহে এর উপস্থিতি থাকলেও তা অধিক পরিমাণে উপস্থিত থাকে চামড়া, যকৃৎ ও
জননাঙ্গে। কাজেই পটকা মাছের দেহ থেকে এসব অঙ্গ বাদ দিয়ে সঠিকভাবে রান্না
করে খেলে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে। তবে
অসাবধানতাবশত পটকা মাছ খাওয়ার সময় উপরি উক্ত অতিরিক্ত বিষাক্ত পদার্থসমৃদ্ধ
অঙ্গগুলোর এক বা একাধিক অঙ্গ থেকে গেলে তা উপযুক্তভাবে রান্না করার পরও
মানুষ এর বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়। কারণ পটকা মাছের দেহের এই বিষাক্ত পদার্থ
উচ্চ তাপ সহ্য করতে পারে। রোগের লক্ষণ : সাধারণত ভুলভাবে
প্রক্রিয়াজাতকরণকৃত পটকা মাছ খাওয়ার ১৫ মিনিট থেকে ২০ ঘণ্টার মধ্যে এর
বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। প্রাথমিক
পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তি মুখে অতিরিক্ত লালাক্ষরিত হয়। দেখা দেয় বমি ভাব ও
বমি, পেটে ব্যথা এবং পাতলা পায়খানা। ঠোঁট ও জিহ্বার বোধশক্তি লোপ পেতে
পারে। অতঃপর তা হাত-পা ও মুখে বিস্তৃত হতে পারে। সম্পূর্ণ দেহ অসাড় ও
দুর্বল হয়ে পড়ে।
ক্রমান্বয়ে পা থেকে শুরু করে হাত, মুখ, গলা ও মানবশ্বসনে
সহায়ক পেশিগুলোর কর্মশক্তি লোপ পায়। শ্বাস-প্রশ্বাসের হার মন্থর হয়ে কথা
জড়িয়ে আসে। রোগের চরম পর্যায়ে মানবপেশি সঞ্চালনে সহায়ক প্রতিবর্তী
ক্রিয়াগুলো লুপ্ত হয়ে পড়ে। মন্থর হয়ে পড়ে হৃদস্পন্দনের হার। হৃৎপিণ্ডের
ছন্দময় গতিতে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। কমে যায় রক্তচাপ। খিঁচুনি দেখা দিতে
পারে। অকর্মক্ষম হয়ে পড়ে মানব কেন্দ্রীয় ও পার্শ্বীয় স্নায়ুতন্ত্র।
আক্রান্ত ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে পড়তে পারে। শ্বসনে সহায়ক পেশিগুলোর কর্মক্ষমতা
লোপ পাওয়ায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে স্বাভাবিক শ্বসনপ্রক্রিয়া। নীল হয়ে যায়
দেহ। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির সাধারণ শ্বসনপ্রক্রিয়া লুপ্ত হওয়ার কারণে
বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার চার থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে মারা যায়। এক সমীক্ষায়
দেখা যায়, উপযুক্ত চিকিৎসা নিলেও আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর
হার ৫০ শতাংশ। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে ন্যাসোগ্যাস্টিক বা ওরোগ্যাস্ট্রিক
লেভেজের মাধ্যমে পাকস্থলী থেকে বিষাক্ত খাবার বের করার মাধ্যমে ভালো ফল
পাওয়া যায়। এ ছাড়া রোগীর স্বাভাবিক শ্বসনপ্রক্রিয়া ব্যাহত হলে উপযুক্ত
অক্সিজেন সরবরাহের পাশাপাশি কৃত্রিম উপায়ে যন্ত্রের সাহায্যে শ্বসন
প্রক্রিয়া চালিয়ে নেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া হৃৎপিণ্ডের ছন্দময় গতি
মন্থর বা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়লে এর স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে নানা
প্রকার প্রেসার ও অ্যান্টি অ্যারিয়মিক জাতীয় ওষুধের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া
কর্মলুপ্ত স্নায়ুতন্ত্রের কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ‘নিওস্টিগমিন’ নামক
ওষুধের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। এ ছাড়া পটকা মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকা কিংবা
খেতে হলে সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করার পর খেলে এই পটকা মাছ ভক্ষণজনিত
বিষক্রিয়া অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
লেখক: অনারারি মেডিক্যাল অফিসার, মেডিসিন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments:
Post a Comment