এক মাসেই পুড়েছে সাড়ে ৬ হাজার, নষ্ট হচ্ছে ইলেকট্রনিক সামগ্রী
সম্প্রতি
রাজধানীর একটি বনেদি আবাসিক এলাকায় বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার হঠাৎ বিকট
শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ওই এলাকার বিদ্যুৎ চলে যায়।
ঘণ্টাখানেক পরে এলাকায় বিদ্যুৎ এলে দেখা যায় বেশ কয়েকটি বাসার বৈদ্যুতিক
সামগ্রী, যেমন_ ফ্রিজ, টেলিভিশন, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ভিটিআর নষ্ট হয়ে
গেছে। এ ঘটনা শুধু উত্তরায় নয়, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই আশঙ্কাজনকভাবে এ
ধরনের বিভ্রাটের ঘটনা বেড়ে গেছে। বাড়ছে গ্রাহক দুর্ভোগ। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী
সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করে তেমন প্রতিকারও পাওয়া যায় না
বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। গ্রাহকের এই যে বিপুল ক্ষতি, তা পূরণ করবে কে?
কেউ জানে না।
ট্রান্সফরমার পুড়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ার বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল কাফিকে চলতি বছরই একাধিকবার টেলিভিশন, বৈদ্যুতিক পাখাসহ বেশ কিছু যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করতে হয়েছে। নতুন কেনা ও মেরামত করতে ৬০ হাজার টাকার মতো আর্থিক লোকসান গুনতে হয়েছে তাকে। জানতে চাইলে একাধিক প্রকৌশলী সমকালকে জানান, বিদ্যুতের এই বিভ্রাটের মূল কারণ দুর্বল বিতরণ ব্যবস্থা।
একটি ট্রান্সফরমারের সক্ষমতা যাচাই-বাছাই না করে কোনো এলাকায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ফলে ট্রান্সফরমার ওভারলোড হয়ে পুড়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত জুন মাসেই সারাদেশে সাড়ে ছয় হাজার ট্রান্সফরমার পুড়ে গেছে। এ মাসে পাঁচ বিতরণ কোম্পানির সারাদেশে ২৪ হাজার ট্রান্সফরমার ওভারলোড ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ওভারলোড ট্রান্সফরমার পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি)। সংস্থাটির ২২ হাজার ৭৬৬টি ট্রান্সফরমার ওভারলোডেড। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক হাজার ৬০, ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) ২৫৫, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) ৯ ও ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) ১০টি ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার রয়েছে। ফলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বহু গ্রাহক। একই সঙ্গে বাসাবাড়ির ইলেকট্রনিক সামগ্রীও নষ্ট হচ্ছে।
প্রকৌশলীরা জানান, ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের অন্যতম কারণ_ এগুলো ওভারলোডেড। কোনো একটি ট্রান্সফরমারের বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণ করার নির্দিষ্ট ক্ষমতা থাকে। ওই এলাকায় যখন বিদ্যুতের চাহিদা ক্ষমতার চেয়ে বেড়ে যায়, তখনই বিপত্তি ঘটে। তবে যারা বিতরণের দায়িত্বে থাকেন, তাদের গাফিলতির কারণেও অনেক সময় বিপত্তি ঘটে। কারণ কন্ট্রোল রুমে বসে তারা জানতে পারেন, কোনো এলাকায় ট্রান্সফরমার ওভারলোড হচ্ছে কি-না। আরও একটি বড় কারণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অনেক সময় বজ্রপাত ও ঝড়-বৃষ্টিতে ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়।
প্রকৌশলীদের মতে, বাসাবাড়িতে ইলেকট্রনিক সামগ্রী নষ্ট হওয়ার বড় কারণ ভোল্টেজ সমস্যা। কোথাও লো ভোল্টেজ, আবার কোথাও হাই ভোল্টেজের কারণে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সামগ্রী নষ্ট হচ্ছে। একই কারণে শিল্পকারখানায়ও উৎপাদন ব্যাহত হয়।
বিদ্যুতের এ সমস্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের এক অতিরিক্ত সচিব জানান, ওভারলোডেড ট্রান্সফরমারের বিষয়ে সংস্থাগুলোর করণীয় সম্পর্কে ২০১৪ সালে একটি পরিপত্র জারি করা হয়। সংস্থাগুলো যাতে এই নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলে, তা প্রতি মাসেই মনিটর করা হয়। তিনি আরও জানান, ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওয়ার কারণ নির্ণয় ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণে বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিপিডিসি জানিয়েছে, তারা মাঠপর্যায়ে তিনটি কমিটি গঠন করেছে। তবে কমিটির প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি। আরইবি জানিয়েছে, তাদের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওয়ার কারণ খতিয়ে দেখছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সমকালকে বলেন, বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার পরিবর্তন করা হচ্ছে। আরইবি ৭০ হাজার ট্রান্সফরমার পরিবর্তনের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বিতরণ লাইনের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে গ্রাহকরা মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি।
ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার :বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ছে। নতুন সংযোগও দেওয়া হচ্ছে সমানে। পরিসংখ্যান বলছে, এক পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) প্রতি মাসে গড়ে তিন লাখ নতুন সংযোগ দিচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ওই এলাকায় ট্রান্সফরমারটির ক্ষমতা কতটুকু, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। আরইবির কর্মকর্তারা বলছেন, জনপ্রতিনিধিদের চাপে সংযোগ না দিয়েও তাদের উপায় নেই। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। এ ছাড়া দৈনন্দিন কাজে ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ব্যবহারও বাড়ছে। গ্রাহকদের মোবাইল চার্জ, যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ, রান্নাবান্না, গোসল, বিনোদন, অফিসের কাজেও বৈদ্যুতিক সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ছে।
পুড়ছে হাজারো ট্রান্সফরমার :গত মে মাসে সাত হাজার ১০৪টি ট্রান্সফরমার পুড়েছে। জুন মাসে পুড়েছে ছয় হাজার ৪৪৬টি। জুন মাসে আরইবির ছয় হাজার ৩১৬টি ট্রান্সফরমার পুড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট ট্রান্সফরমারের সংখ্যা সাত লাখ ৮৩ হাজার ৬৩৪টি। পিডিবির মোট ২১ হাজার ৭৪৩টি ট্রান্সফরমারের মধ্যে জুন মাসে পুড়েছে ২১টি। ডিপিডিসির ১০ হাজার ৮৮১টি ট্রান্সফরমারের মধ্যে জুন মাসে পুড়েছে ৬০টি। পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ওজোপাডিকোর মোট ট্রান্সফরমার ছয় হাজার ১৭৭টির মধ্যে জুন মাসে পুড়েছে ১৯টি। ডেসকোর ছয় হাজার ৩০৫টি ট্রান্সফরমারের মধ্যে জুনে পুড়েছে ৩০টি।
সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ট্রান্সফরমার পুড়ছে বেশি। ডিপিডিসির ঊর্ধ্বতন এক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, বজ্রপাতের কারণে ট্রান্সফরমার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা, অনেক সময় তাতে ত্রুটি থাকে। সবচেয়ে বেশি ট্রান্সফরমার ব্যবহারকারী আরইবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের সংস্থার অধিকাংশ ট্রান্সফরমার এখন দেশি কোম্পানি সরবরাহ করে। আগের চেয়ে এখন ট্রান্সফরমারের মান কম কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছেন। গত মাসে তারা ট্রান্সফরমার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
গ্রাহক ভোগান্তি :বাসাবাড়ি বা অফিস-আদালতে ব্যবহার্য ইলেকট্রনিক সামগ্রী নষ্ট হলে তার দায়দায়িত্ব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি নেয় না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহিদ সারওয়ার সমকালকে বলেন, কোনো ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা দ্রুত পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। এসব কারণে গ্রাহকের বৈদ্যুতিক সামগ্রী পুড়ে যাওয়ার কথা নয়। কারণ, ট্রান্সফরমার পরিবর্তনের সময় সবকিছু পরীক্ষা করেই সংযোগ চালু করা হয়। গ্রাহকের অভ্যন্তরীণ সংযোগ ত্রুটির কারণে এমন ক্ষতি হতে পারে। তবে একাধিক বিশেষজ্ঞ তার মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, এ ব্যাপারে গ্রাহকরা অবশ্যই ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন। উন্নত বিশ্বে এ ব্যবস্থাই রয়েছে। আরইবির একজন প্রকৌশলী সমকালকে জানিয়েছেন, ট্রান্সফরমার পরিবর্তনে অনেক সময় টেকনিশিয়ানদের ভুলে উচ্চক্ষমতার বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। এর ফলে গ্রাহকের বৈদ্যুতিক সামগ্রীর ক্ষতি হতে পারে।
ডিপিডিসি ও ডেসকোর গ্রাহক অভিযোগ কেন্দ্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে টেলিভিশন, ফ্রিজ পুড়ে গেছে বলে প্রায়ই গ্রাহকরা অভিযোগ করেন। কী পরিমাণ অভিযোগ আসে, তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ডিপিডিসির সূত্র জানিয়েছে, প্রতি মাসেই এ ধরনের ২০ থেকে ৩০টি অভিযোগ পাওয়া যায়।
গ্রাহক বেড়েছে, বিতরণ সক্ষমতা বাড়েনি :২০০৯ সালে দেশের ৪৭ শতাংশ জনগণ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় ছিল। বর্তমানে ৭৬ শতাংশ। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের সময় দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল ২৭টি, বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা শতাধিক। সে সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা (ক্যাপটিভসহ) ছিল চার হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট, বর্তমানে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। বেড়েছে আট হাজার ৯৪১ মেগাওয়াট। অন্যদিকে ২০০৯ সালে সঞ্চালন লাইন ছিল আট হাজার সার্কিট কিলোমিটার, এখন তা হয়েছে নয় হাজার ৭৮৯ সার্কিট কিলোমিটার। বিতরণ লাইন দুই লাখ ৬০ হাজার ৩০০ কিলোমিটার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৭২ হাজার কিলোমিটারে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন সেভাবে হয়নি। ফলে বিতরণ ব্যবস্থায় ট্রান্সফরমার ওভারলোডের সমস্যা ব্যাপক বেড়েছে।
ট্রান্সফরমার পুড়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ার বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল কাফিকে চলতি বছরই একাধিকবার টেলিভিশন, বৈদ্যুতিক পাখাসহ বেশ কিছু যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করতে হয়েছে। নতুন কেনা ও মেরামত করতে ৬০ হাজার টাকার মতো আর্থিক লোকসান গুনতে হয়েছে তাকে। জানতে চাইলে একাধিক প্রকৌশলী সমকালকে জানান, বিদ্যুতের এই বিভ্রাটের মূল কারণ দুর্বল বিতরণ ব্যবস্থা।
একটি ট্রান্সফরমারের সক্ষমতা যাচাই-বাছাই না করে কোনো এলাকায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ফলে ট্রান্সফরমার ওভারলোড হয়ে পুড়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত জুন মাসেই সারাদেশে সাড়ে ছয় হাজার ট্রান্সফরমার পুড়ে গেছে। এ মাসে পাঁচ বিতরণ কোম্পানির সারাদেশে ২৪ হাজার ট্রান্সফরমার ওভারলোড ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ওভারলোড ট্রান্সফরমার পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি)। সংস্থাটির ২২ হাজার ৭৬৬টি ট্রান্সফরমার ওভারলোডেড। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক হাজার ৬০, ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) ২৫৫, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) ৯ ও ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) ১০টি ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার রয়েছে। ফলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বহু গ্রাহক। একই সঙ্গে বাসাবাড়ির ইলেকট্রনিক সামগ্রীও নষ্ট হচ্ছে।
প্রকৌশলীরা জানান, ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের অন্যতম কারণ_ এগুলো ওভারলোডেড। কোনো একটি ট্রান্সফরমারের বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণ করার নির্দিষ্ট ক্ষমতা থাকে। ওই এলাকায় যখন বিদ্যুতের চাহিদা ক্ষমতার চেয়ে বেড়ে যায়, তখনই বিপত্তি ঘটে। তবে যারা বিতরণের দায়িত্বে থাকেন, তাদের গাফিলতির কারণেও অনেক সময় বিপত্তি ঘটে। কারণ কন্ট্রোল রুমে বসে তারা জানতে পারেন, কোনো এলাকায় ট্রান্সফরমার ওভারলোড হচ্ছে কি-না। আরও একটি বড় কারণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অনেক সময় বজ্রপাত ও ঝড়-বৃষ্টিতে ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়।
প্রকৌশলীদের মতে, বাসাবাড়িতে ইলেকট্রনিক সামগ্রী নষ্ট হওয়ার বড় কারণ ভোল্টেজ সমস্যা। কোথাও লো ভোল্টেজ, আবার কোথাও হাই ভোল্টেজের কারণে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সামগ্রী নষ্ট হচ্ছে। একই কারণে শিল্পকারখানায়ও উৎপাদন ব্যাহত হয়।
বিদ্যুতের এ সমস্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের এক অতিরিক্ত সচিব জানান, ওভারলোডেড ট্রান্সফরমারের বিষয়ে সংস্থাগুলোর করণীয় সম্পর্কে ২০১৪ সালে একটি পরিপত্র জারি করা হয়। সংস্থাগুলো যাতে এই নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলে, তা প্রতি মাসেই মনিটর করা হয়। তিনি আরও জানান, ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওয়ার কারণ নির্ণয় ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণে বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিপিডিসি জানিয়েছে, তারা মাঠপর্যায়ে তিনটি কমিটি গঠন করেছে। তবে কমিটির প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি। আরইবি জানিয়েছে, তাদের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওয়ার কারণ খতিয়ে দেখছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সমকালকে বলেন, বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার পরিবর্তন করা হচ্ছে। আরইবি ৭০ হাজার ট্রান্সফরমার পরিবর্তনের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বিতরণ লাইনের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে গ্রাহকরা মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি।
ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার :বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ছে। নতুন সংযোগও দেওয়া হচ্ছে সমানে। পরিসংখ্যান বলছে, এক পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) প্রতি মাসে গড়ে তিন লাখ নতুন সংযোগ দিচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ওই এলাকায় ট্রান্সফরমারটির ক্ষমতা কতটুকু, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। আরইবির কর্মকর্তারা বলছেন, জনপ্রতিনিধিদের চাপে সংযোগ না দিয়েও তাদের উপায় নেই। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। এ ছাড়া দৈনন্দিন কাজে ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ব্যবহারও বাড়ছে। গ্রাহকদের মোবাইল চার্জ, যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ, রান্নাবান্না, গোসল, বিনোদন, অফিসের কাজেও বৈদ্যুতিক সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ছে।
পুড়ছে হাজারো ট্রান্সফরমার :গত মে মাসে সাত হাজার ১০৪টি ট্রান্সফরমার পুড়েছে। জুন মাসে পুড়েছে ছয় হাজার ৪৪৬টি। জুন মাসে আরইবির ছয় হাজার ৩১৬টি ট্রান্সফরমার পুড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট ট্রান্সফরমারের সংখ্যা সাত লাখ ৮৩ হাজার ৬৩৪টি। পিডিবির মোট ২১ হাজার ৭৪৩টি ট্রান্সফরমারের মধ্যে জুন মাসে পুড়েছে ২১টি। ডিপিডিসির ১০ হাজার ৮৮১টি ট্রান্সফরমারের মধ্যে জুন মাসে পুড়েছে ৬০টি। পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ওজোপাডিকোর মোট ট্রান্সফরমার ছয় হাজার ১৭৭টির মধ্যে জুন মাসে পুড়েছে ১৯টি। ডেসকোর ছয় হাজার ৩০৫টি ট্রান্সফরমারের মধ্যে জুনে পুড়েছে ৩০টি।
সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ট্রান্সফরমার পুড়ছে বেশি। ডিপিডিসির ঊর্ধ্বতন এক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, বজ্রপাতের কারণে ট্রান্সফরমার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা, অনেক সময় তাতে ত্রুটি থাকে। সবচেয়ে বেশি ট্রান্সফরমার ব্যবহারকারী আরইবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের সংস্থার অধিকাংশ ট্রান্সফরমার এখন দেশি কোম্পানি সরবরাহ করে। আগের চেয়ে এখন ট্রান্সফরমারের মান কম কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছেন। গত মাসে তারা ট্রান্সফরমার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
গ্রাহক ভোগান্তি :বাসাবাড়ি বা অফিস-আদালতে ব্যবহার্য ইলেকট্রনিক সামগ্রী নষ্ট হলে তার দায়দায়িত্ব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি নেয় না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহিদ সারওয়ার সমকালকে বলেন, কোনো ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা দ্রুত পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। এসব কারণে গ্রাহকের বৈদ্যুতিক সামগ্রী পুড়ে যাওয়ার কথা নয়। কারণ, ট্রান্সফরমার পরিবর্তনের সময় সবকিছু পরীক্ষা করেই সংযোগ চালু করা হয়। গ্রাহকের অভ্যন্তরীণ সংযোগ ত্রুটির কারণে এমন ক্ষতি হতে পারে। তবে একাধিক বিশেষজ্ঞ তার মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, এ ব্যাপারে গ্রাহকরা অবশ্যই ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন। উন্নত বিশ্বে এ ব্যবস্থাই রয়েছে। আরইবির একজন প্রকৌশলী সমকালকে জানিয়েছেন, ট্রান্সফরমার পরিবর্তনে অনেক সময় টেকনিশিয়ানদের ভুলে উচ্চক্ষমতার বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। এর ফলে গ্রাহকের বৈদ্যুতিক সামগ্রীর ক্ষতি হতে পারে।
ডিপিডিসি ও ডেসকোর গ্রাহক অভিযোগ কেন্দ্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে টেলিভিশন, ফ্রিজ পুড়ে গেছে বলে প্রায়ই গ্রাহকরা অভিযোগ করেন। কী পরিমাণ অভিযোগ আসে, তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ডিপিডিসির সূত্র জানিয়েছে, প্রতি মাসেই এ ধরনের ২০ থেকে ৩০টি অভিযোগ পাওয়া যায়।
গ্রাহক বেড়েছে, বিতরণ সক্ষমতা বাড়েনি :২০০৯ সালে দেশের ৪৭ শতাংশ জনগণ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় ছিল। বর্তমানে ৭৬ শতাংশ। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের সময় দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল ২৭টি, বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা শতাধিক। সে সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা (ক্যাপটিভসহ) ছিল চার হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট, বর্তমানে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। বেড়েছে আট হাজার ৯৪১ মেগাওয়াট। অন্যদিকে ২০০৯ সালে সঞ্চালন লাইন ছিল আট হাজার সার্কিট কিলোমিটার, এখন তা হয়েছে নয় হাজার ৭৮৯ সার্কিট কিলোমিটার। বিতরণ লাইন দুই লাখ ৬০ হাজার ৩০০ কিলোমিটার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৭২ হাজার কিলোমিটারে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন সেভাবে হয়নি। ফলে বিতরণ ব্যবস্থায় ট্রান্সফরমার ওভারলোডের সমস্যা ব্যাপক বেড়েছে।
>>>সমকাল

No comments:
Post a Comment