Saturday, October 22, 2016

আ’লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন শুরু আজ

বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে শেখ হাসিনা
-ফাইল ছবি ও আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন
উপলক্ষে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রস্তুত মূলমঞ্চ।
শুক্রবারের ছবি -যুগান্তর
একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী কমিটি গঠনের লক্ষ্যে আজ শুরু হচ্ছে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন। রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সকাল ১০টায় শুরু হয়ে আগামীকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এ সম্মেলন চলবে। ভালো কাজ করে প্রশংসিত, ত্যাগী ও যোগ্য নেতা- যারা জনকল্যাণ ও দেশের উন্নয়নে কাজ করবেন তারাই এবারের কমিটিতে আসবেন বলে মনে করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচন মাথায় রেখে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন লক্ষ্য নিয়ে হচ্ছে এ সম্মেলন। আজ ২টি এবং আগামীকাল ২টি- মোট ৪টি সেশনে অনুষ্ঠিত হবে শাসক দলের সবচেয়ে বড় এ আয়োজন। এবারের সম্মেলনের স্লোগান হচ্ছে- শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছি দুর্বার, এখন সময় বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার। সম্মেলনের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। উৎসবমুখর পরিবেশে সব কার্যক্রম সম্পন্নের লক্ষ্যে নেয়া হয়েছে প্রস্তুতি। করা হয়েছে জমকালো আয়োজন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে। সম্মেলন নিয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম যুগান্তরকে বলেন, উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে এবারের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ সম্মেলন। জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে একমাত্র আওয়ামী লীগই কাজ করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে মানুষ কিছু পায়। তাই সারা দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে এ সম্মেলনের দিকে। সম্মেলনে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা তার উন্নয়নের গল্প শোনাবেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার ও সরকারের সাফল্য নেতাকর্মীদের জনগণের কাছে পৌঁছানোর বার্তা দেবেন। কেননা অল্প কিছুদিন পরেই নির্বাচন। সম্মেলনে দলীয় সভাপতি আবারও সভাপতির দায়িত্ব নেবেন- এমন আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের বিকল্প নেই। এ সম্মেলনের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও প্রতিশ্রুতিশীল কমিটি হবে উল্লেখ করে নাসিম বলেন, এ কমিটি জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করবে। যাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলবেন। দেশ হয়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। সম্মেলন কেন্দ্র করে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তৈরি করা হয়েছে নৌকাসদৃশ বিশাল মঞ্চ, যা সাজানো হয়েছে আধুনিকতা আর প্রযুক্তির মিশেলে। সমুদ্রে ভাসমান নৌকার মতো দেখতে এ মঞ্চ ভূমি থেকে প্রায় ২৫ ফুট উঁচুতে। মঞ্চের প্রথম সারিতে আছে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের আসন। দ্বিতীয় সারিতে বসবেন ৫৮ জন। মঞ্চের পেছনে ৩৫ ফুট উচ্চতার এলইডি পর্দা স্থাপন করা হয়েছে। মঞ্চের সামনের দিকে নির্মাণ করা হয়েছে স্বচ্ছ কাচের খুঁটিবিহীন একটি গ্যালারি। সেখানে ৭ হাজার অতিথির আসন থাকবে।
সম্মেলনে যাওয়ার পথে উদ্যানের রাস্তাগুলোয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি সংবলিত বিলবোর্ড ও ব্যানার লাগানো হয়েছে। এছাড়া রাজধানী ঢাকাকে বর্ণিল আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে। সাজানো হয়েছে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও। সন্ধ্যা হলেই শহর-বন্দরে জ্বলে উঠছে লাল-নীল আলো। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে সুদৃশ্য তোরণ। এবারের সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন ৬ হাজার ৭০০ জন কাউন্সিলর ও সমসংখ্যক ডেলিগেট। তাদের সবার কাছে এরই মধ্যে আমন্ত্রণপত্র এবং কাউন্সিলর-ডেলিগেট কার্ড পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সম্মেলনে আগামী নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য গঠন করা হয়েছে নির্বাচন কমিশন। ৩ সদস্যবিশিষ্ট এ কমিশনে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনকে চেয়ারম্যান এবং ড. মশিউর রহমান ও রাশিদুল আলমকে সদস্য করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নিজস্ব ফেসবুক পেজে এ সম্মেলন সরাসরি প্রচার করা হবে। সম্মেলনে প্রায় ১৫ হাজার কাউন্সিলর ও ডেলিগেট বসার ব্যবস্থা থাকবে। অতিথি ও নেতাকর্মীসহ সবমিলে ৫০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন প্যান্ডেলের কাজ বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। প্রত্যেক জেলার জন্য রয়েছে আলাদা স্থান। সবার সুবিধার্থে ১০টি ডিজিটাল পর্দায় সম্মেলন দেখানো হবে। এছাড়া টিএসসি,
শাহবাগসহ রাজধানীর উল্লেখযোগ্য মোড়গুলোয় ডিজিটাল পর্দায় সরাসরি সম্মেলন দেখার ব্যবস্থা থাকছে। এছাড়া সম্মেলনস্থল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৮ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে আগামীকাল রাত পর্যন্ত থাকছে ফ্রি ওয়াইফাই। সরকারের উন্নয়ন, অগ্রগতির চিত্রসহ ‘ভিশন ২০২১’ ও ‘রূপকল্প ২০৪১’ বাস্তবায়নে দলের ঘোষণাপত্রে থাকছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। এসব অন্তর্ভুক্ত করে হালনাগাদ ঘোষণাপত্র এরই মধ্যে দলের কার্যনির্বাহী সংসদের চূড়ান্ত সম্মতি পেয়েছে। সংশোধিত গঠনতন্ত্রেও চূড়ান্ত সম্মতি দিয়েছে কার্যনির্বাহী সংসদ। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, স্মরণকালের জাঁকজমকপূর্ণ হবে এ সম্মেলন। নেতাকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বোধনী অধিবেশনে ডিজিটাল ডিসপ্লেতে সরকারের সব উন্নয়ন কার্যক্রম দেখানো হবে। দল গঠন থেকে শুরু করে আন্দোলন-সংগ্রামের পথপরিক্রমাও তুলে ধরা হবে। বিদেশী অতিথিদের আপ্যায়নসহ রাজনৈতিক ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো পরিদর্শনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশপথে এবং সম্মেলনস্থলের চতুর্দিকে একাধিক মেডিকেল টিম ও অ্যাম্বুলেন্স থাকছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও এর আশপাশের এলাকায় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১০ হাজার সদস্য বৃহস্পতিবার রাত থেকেই মোতায়েন করা হয়েছে। নেয়া হয়েছে ৫ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামীকাল সম্মেলনস্থল ত্যাগ না করা পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)। এরপর আবার ডিএমপি নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে। এছাড়া পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী সোয়াত, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), র‌্যাবসহ ডগ স্কোয়াড থাকবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শাহবাগ ও এর আশপাশের এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সম্মেলনস্থলে প্রবেশের জন্য সাতটি প্রবেশমুখেই আর্চওয়ে স্থাপন করা হয়েছে। সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য দেশী-বিদেশী অতিথিরা এরই মধ্যে এসে পৌঁছেছেন। বিশ্বের ১২টি দেশের ৫৫টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। দেশে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিদেশী অতিথিদের বরণ করতে প্রস্তুত ২০ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি। সম্মেলনস্থলে ফুল দিয়ে বরণ করা হবে তাদের। এছাড়া থাকাছে আরও নানা চমক। অতিথিদের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে হোস্ট অফিসার, করা হয়েছে গেস্ট কার্ড। সম্মেলন উপলক্ষে ইংল্যান্ড, ইতালি, অস্ট্রিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতারাও দেশে এসেছেন। সম্মেলনের বিভিন্ন প্রকাশনা, সভাপতির ভাষণ, সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট, শোক প্রস্তাব ছাপানো শেষ। প্রচারণার জন্য তৈরি করা হয়েছে একাধিক সিডি। এতে তুলে ধরা হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড,
বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিটি খাতে তুলনামূলক পদক্ষেপের চিত্র এবং বিএনপি-জামায়াতের সহিংস আন্দোলনের চিত্র। কাউন্সিলর ও ডেলিগেটদের জন্য তৈরি করা হয়েছে ব্যাগ ও টুপি। সম্মেলনে আগতদের আপ্যায়নে খাদ্য উপকমিটি নিয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। থাকছে তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা। ৩টি ক্যাটারিং সার্ভিস খাবার সরবরাহ করবে। মোরগ পোলাও, কাচ্চি বিরিয়ানি, ফিরনি, কোমল পানীয় ও পান দিয়ে আপ্যায়ন করা হবে আগতদের। রাজধানীর প্রবেশপথগুলোয় তৈরি করা হয়েছে রিসিপশন গেট। সেখানে স্বেচ্ছাসেবকরা আগতদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেবে। প্রতিটি প্রবেশমুখে সাঁটানো হয়েছে আওয়ামী লীগের সম্মেলনের ইতিহাস। সম্মেলনস্থলে শৃংখলা রক্ষায় কাজ করবে এক হাজার স্বেচ্ছাসেবক। সম্মেলনস্থলের পাশাপাশি রাজধানীর বাসস্ট্যান্ড ও ট্রেন স্টেশনগুলোয়ও স্বাস্থ্য ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পে চিকিৎসকের পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে কাজে লাগে এমন সব ধরনের ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকছে। সম্মেলনস্থলে থাকবে একাধিক অ্যাম্বুলেন্স। পুরো সম্মেলন উপভোগ্য করে তোলার জন্য উদ্বোধনী অধিবেশন ও প্রথম দিন সন্ধ্যায় থাকছে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। জনপ্রিয় গায়ক বাপ্পা মজুমদার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থিম সং পরিবেশন করবেন। এছাড়া থাকবে দেশাত্মবোধক গান, নাচ, কবিতা আবৃত্তি, বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর নিজ নিজ সংস্কৃতির গান ও নাচ। রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ : আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সম্মেলনের অভ্যর্থনা উপকমিটির আহ্বায়ক ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে দলটির দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে এ আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। প্রতিনিধি দল এ সময় রাষ্ট্রপতিকে সম্মেলনের নানা বিষয়ে অবহিত করেন। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সম্মেলনের পূর্ণ সফলতা কমনা করেন।

No comments:

Post a Comment