সিলেটের
কলেজছাত্রী খাদিজার ওপর বর্বরোচিত হামলাকারীর সঙ্গে ছাত্রলীগের
সম্পর্কছেদের খবর বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। দৃশ্যত সরকারি দলের সঙ্গে সম্পর্ক
রেখে যঁারাই যেখানে অপরাধ করছেন, তঁাদের রুখে দিতে হলে সরকারি দলকে আগে
উচ্চপর্যায় থেকে কঠোর রাজনৈতিক বার্তা দিতে হবে। আর সেটা শুরু করতে হলে
টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলার
প্রধান আসামি সাংসদ আমানুর রহমান খান রানাকে শুধু দল থেকেই নয়, সংসদ থেকে
বহিষ্কার করা দরকার। ২২ মাস ‘পলাতক’ (পুলিশের খাতায়, সংসদের খাতায় দুদিন
হাজির) থেকে আত্মসমর্পণের পর এখন ওই সাংসদ জামিনের দিন গুনছেন। তাঁর
সম্পর্কে টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগদলীয় নেতা–কর্মীদের মনোভাব কী অবস্থায় আছে,
সেটা গত ২৬ সেপ্টেম্বর আদালতকক্ষে উচ্চারিত একটি উক্তি থেকে পরিষ্কার।
অতিরিক্ত পিপি বলেছেন, ‘তিনি আমাদের দলের সাংসদ। অথচ আমরা তাঁর জামিন চাই
না। কারণ তিনি অপরাধী। পরিহাস হলো, টাঙ্গাইলের বিএনপি ও জামায়াতি
আইনজীবীরা আওয়ামী লীগ সাংসদের পক্ষে জামিনের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। ওই সাংসদ
সম্প্রতি হাইকোর্টে জামিনের দরখাস্ত করেছেন। এর শুনানি হলে তিনি হয়তো
যুক্তি দেবেন যে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়া তাঁর বিশেষ অধিকার।
সাংসদদের সম্পর্কে একটি জনপ্রিয় অথচ ভুল ধারণা হলো যেহেতু তাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, তাই তাঁরা যদি কোনো গুরুতর অসদাচরণ বা অপরাধ করেন, তাহলে তাঁদের বরখাস্ত করা যায় না। চেয়ারম্যান, মেম্বার ও মেয়ররা বরখাস্ত বা অপসারিত হন। সাংসদদের যেন কিছুতেই কিছু হয় না। তাঁরা মোটামুটি ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাংসদ কর্তৃক কান ধরে ওঠবস করানো গোপালগঞ্জের শিক্ষক মানুষটি, যিনি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। তিনি যে ন্যায়বিচার পেলেন না, তা কি সংসদ দেখবে না? নির্বাচনী কর্মকর্তা পেটানো বাঁশখালীর সাংসদ মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হওয়াটাকে একটা প্রতিকার হিসেবে আমজনতাকে দেখানো হয়েছিল। ওটা আইওয়াশ ছিল। বরগুনার সাংসদ শওকত হাসানুর রহমানকে পৌর নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ‘নাটকীয়ভাবে পরিবর্তনের’ কাগজপত্র আরও নাটকীয়ভাবে হেলিকপ্টারে বহন করে আলোচিত হতে দেখেছিলাম। ইউপি নির্বাচনের টাকার খেলায় সেতুমন্ত্রী ২০-২২টি ঘটনার তদন্তের কথা বলেছিলেন, তার সঙ্গে কোনো কোনো সাংসদের সম্পৃক্ত থাকার সন্দেহ ছিল। কিন্তু তদন্তের ফলাফল জানা হলো না। হাউস অব কমন্সের অন্তত এক ডজন সাংসদ ঘুষ নেওয়ার কারণে অপসারিত হয়েছেন। তাই সংসদের বাইরে সাংসদদের আচরণ খতিয়ে দেখতে সব সময় থানা-পুলিশে নির্ভরতার লাগাম টানা দরকার।
বাংলাদেশ অন্তত অবয়বগত দিক থেকে ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণ করে আসছে। আর ইংল্যান্ডে এটাই স্বীকৃত যে কোনো অসদাচরণকারী সাংসদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায় সংসদের। হাউস অব কমন্সের এই ÿক্ষমতা নিরঙ্কুশ, যা আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য নয়। এটা হলো সেই বোঝাপড়ার ফসল, যখন ‘হাইকোর্ট অব পার্লামেন্ট’ তার দ্বৈত ভূমিকা ভাগাভাগি করে নিল। দুটি আলাদা স্তম্ভের জন্ম হলো। যদিও ব্রিটেনে পার্লামেন্টকে আজও একটি জ্যেষ্ঠ আদালত হিসেবে গণ্য করা হয়, আর সেটা এই অর্থে যে পার্লামেন্ট তার নিজের উচ্ছৃঙ্খল সদস্যকে শাস্তি দেবে। কনটেম্পট অব পার্লামেন্ট ধারণাটি শুধু নাগরিকের বাক্স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়। এটা মনে করিয়ে দেয় যে পার্লামেন্টকে তার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে। তদুপরি, পার্লামেন্টের সাজাই শেষ কথা নয়। পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধের পুলিশি তদন্ত এবং বিচারও হয়ে থাকে। আমি ভাবতেই পারি না, মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকারী হিসেবে সন্দেহভাজন একজন ব্যক্তিকে সংসদে বসতে দেওয়া নিয়ে আজকের বাংলাদেশে কোনো আওয়াজ উঠবে না। পুলিশ যে কারণে তার মালপত্র ক্রোক করেছে, সেই কারণে সংসদের কি কিছুই ক্রোক করার নেই? যদি থানা–পুলিশ এবং আদালতই সব সময় সবটা করে দেবেন, তাহলে সংসদীয় শাস্তির বিধান তো ব্রিটেনের অনুসরণ করার দরকার ছিল না।
যদিও বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ সময়ে সময়ে সাংসদদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি তুলে আসছে; কিন্তু সংসদ সেটা কখনো কার্যকরভাবে বিবেচনায় নেয়নি। লিখিত আচরণবিধি বা আইন না থাকলে সংসদ ব্যবস্থা নিতে পারবে না, সেটা যুক্তি নয়। বর্তমান সংসদ গঠনের পর কোনো কোনো সাংসদ এমন সব আচরণ করেছেন, যা ভালো সাংসদদের মনঃপীড়ার কারণ হয়েছে। সংসদই রাজনৈতিক নৈতিকতার উৎস। পরস্পরের দায় এড়ানোর যে চিত্র ওপরে এঁকেছি, সেটা কিছুটা বদলে যাওয়া শুরু হতে পারে যদি সংসদ হস্তক্ষেপ করে। তাই আমরা দাবি তুলি, সংসদের বাইরের অসদাচরণের দায়ে সংসদকে ব্যবস্থা নিতে হবে। নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় সংসদের সিদ্ধান্ত কী, সেটা জাতি শুনতে চায়। সংসদের বৈধতা কোনো একদিনের ভোটাভুটির বৈধতা নির্ভর নয়। এটি এমন একটি ধারণা, যার পরীক্ষা প্রতিনিয়ত ক্ষমতার মালিকদের সামনে পেশ করতে হয়। ১৬৯৫ সালে ব্রিটেনের স্পিকার স্যার জন ট্রেভর অবৈধভাবে একটি বিল পাসে সহায়তা দিয়ে এক হাজার পাউন্ড (বর্তমান বাজারদরে ২০ লাখ পাউন্ড) ঘুষ নিয়েছিলেন। তাঁকে স্পিকারের পদ থেকেই শুধু নয়, সংসদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছিল। এ ছাড়া জন অশবার্নহ্যাম এমপি এক ফরাসি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পাঁচ পাউন্ড ঘুষ নেন, ১৬৬৭ সালে তিনি সংসদের অবমাননার জন্য বহিষ্কৃত হন।
সাংসদদের সম্পর্কে একটি জনপ্রিয় অথচ ভুল ধারণা হলো যেহেতু তাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, তাই তাঁরা যদি কোনো গুরুতর অসদাচরণ বা অপরাধ করেন, তাহলে তাঁদের বরখাস্ত করা যায় না। চেয়ারম্যান, মেম্বার ও মেয়ররা বরখাস্ত বা অপসারিত হন। সাংসদদের যেন কিছুতেই কিছু হয় না। তাঁরা মোটামুটি ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাংসদ কর্তৃক কান ধরে ওঠবস করানো গোপালগঞ্জের শিক্ষক মানুষটি, যিনি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। তিনি যে ন্যায়বিচার পেলেন না, তা কি সংসদ দেখবে না? নির্বাচনী কর্মকর্তা পেটানো বাঁশখালীর সাংসদ মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হওয়াটাকে একটা প্রতিকার হিসেবে আমজনতাকে দেখানো হয়েছিল। ওটা আইওয়াশ ছিল। বরগুনার সাংসদ শওকত হাসানুর রহমানকে পৌর নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ‘নাটকীয়ভাবে পরিবর্তনের’ কাগজপত্র আরও নাটকীয়ভাবে হেলিকপ্টারে বহন করে আলোচিত হতে দেখেছিলাম। ইউপি নির্বাচনের টাকার খেলায় সেতুমন্ত্রী ২০-২২টি ঘটনার তদন্তের কথা বলেছিলেন, তার সঙ্গে কোনো কোনো সাংসদের সম্পৃক্ত থাকার সন্দেহ ছিল। কিন্তু তদন্তের ফলাফল জানা হলো না। হাউস অব কমন্সের অন্তত এক ডজন সাংসদ ঘুষ নেওয়ার কারণে অপসারিত হয়েছেন। তাই সংসদের বাইরে সাংসদদের আচরণ খতিয়ে দেখতে সব সময় থানা-পুলিশে নির্ভরতার লাগাম টানা দরকার।
বাংলাদেশ অন্তত অবয়বগত দিক থেকে ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণ করে আসছে। আর ইংল্যান্ডে এটাই স্বীকৃত যে কোনো অসদাচরণকারী সাংসদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায় সংসদের। হাউস অব কমন্সের এই ÿক্ষমতা নিরঙ্কুশ, যা আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য নয়। এটা হলো সেই বোঝাপড়ার ফসল, যখন ‘হাইকোর্ট অব পার্লামেন্ট’ তার দ্বৈত ভূমিকা ভাগাভাগি করে নিল। দুটি আলাদা স্তম্ভের জন্ম হলো। যদিও ব্রিটেনে পার্লামেন্টকে আজও একটি জ্যেষ্ঠ আদালত হিসেবে গণ্য করা হয়, আর সেটা এই অর্থে যে পার্লামেন্ট তার নিজের উচ্ছৃঙ্খল সদস্যকে শাস্তি দেবে। কনটেম্পট অব পার্লামেন্ট ধারণাটি শুধু নাগরিকের বাক্স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়। এটা মনে করিয়ে দেয় যে পার্লামেন্টকে তার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে। তদুপরি, পার্লামেন্টের সাজাই শেষ কথা নয়। পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধের পুলিশি তদন্ত এবং বিচারও হয়ে থাকে। আমি ভাবতেই পারি না, মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকারী হিসেবে সন্দেহভাজন একজন ব্যক্তিকে সংসদে বসতে দেওয়া নিয়ে আজকের বাংলাদেশে কোনো আওয়াজ উঠবে না। পুলিশ যে কারণে তার মালপত্র ক্রোক করেছে, সেই কারণে সংসদের কি কিছুই ক্রোক করার নেই? যদি থানা–পুলিশ এবং আদালতই সব সময় সবটা করে দেবেন, তাহলে সংসদীয় শাস্তির বিধান তো ব্রিটেনের অনুসরণ করার দরকার ছিল না।
যদিও বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ সময়ে সময়ে সাংসদদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি তুলে আসছে; কিন্তু সংসদ সেটা কখনো কার্যকরভাবে বিবেচনায় নেয়নি। লিখিত আচরণবিধি বা আইন না থাকলে সংসদ ব্যবস্থা নিতে পারবে না, সেটা যুক্তি নয়। বর্তমান সংসদ গঠনের পর কোনো কোনো সাংসদ এমন সব আচরণ করেছেন, যা ভালো সাংসদদের মনঃপীড়ার কারণ হয়েছে। সংসদই রাজনৈতিক নৈতিকতার উৎস। পরস্পরের দায় এড়ানোর যে চিত্র ওপরে এঁকেছি, সেটা কিছুটা বদলে যাওয়া শুরু হতে পারে যদি সংসদ হস্তক্ষেপ করে। তাই আমরা দাবি তুলি, সংসদের বাইরের অসদাচরণের দায়ে সংসদকে ব্যবস্থা নিতে হবে। নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় সংসদের সিদ্ধান্ত কী, সেটা জাতি শুনতে চায়। সংসদের বৈধতা কোনো একদিনের ভোটাভুটির বৈধতা নির্ভর নয়। এটি এমন একটি ধারণা, যার পরীক্ষা প্রতিনিয়ত ক্ষমতার মালিকদের সামনে পেশ করতে হয়। ১৬৯৫ সালে ব্রিটেনের স্পিকার স্যার জন ট্রেভর অবৈধভাবে একটি বিল পাসে সহায়তা দিয়ে এক হাজার পাউন্ড (বর্তমান বাজারদরে ২০ লাখ পাউন্ড) ঘুষ নিয়েছিলেন। তাঁকে স্পিকারের পদ থেকেই শুধু নয়, সংসদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছিল। এ ছাড়া জন অশবার্নহ্যাম এমপি এক ফরাসি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পাঁচ পাউন্ড ঘুষ নেন, ১৬৬৭ সালে তিনি সংসদের অবমাননার জন্য বহিষ্কৃত হন।
প্রাচীন
এই উদাহরণগুলো হরহামেশা হাজির করে ব্রিটিশ প্রেস। রক্ষণশীল সাংসদ জেকব
রিজ মগ ২০১৩ সালের ৪ জুন লন্ডনের টেলিগ্রাফ–এ লিখেছেন, ‘সাংসদকে শাস্তি
দিতে নতুন বিধান আনার দরকার কী। অপসারণ করার ÿক্ষমতা সন্দেহাতীতভাবে সংসদের
আছে।’ আমরাও তাই বলি, কোথাও লেখা না থাকলেও ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এবং
ভারতের লোকসভার মতো বাংলাদেশ সংসদেরও সেই ক্ষমতা আছে। ১৯২০ সালে হোম
বনাম বারবার মামলায় ব্রিটিশ হাইকোর্টের বিচারপতি ইসাক এক রায়ে বলেছেন,
প্রয়োজনে সাংসদকে নিন্দা, তিরস্কার বা অপসারণ করা যাবে। আমাদের যেসব এমপি
সংসদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন এবং যা সরকারি দলের শ্রদ্ধাভাজন নেতারাও
সময়ে সময়ে স্বীকার করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সংসদীয় শাস্তি দেখতে চাই। এর
অর্থ এই নয় যে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের প্রয়োগ স্থগিত করে এই অনুশীলন
সংসদকে করতে হবে। এমপি রানাকে কাশিমপুরে রেখেই সংসদ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
নিতে পারে। আর সেটা নিলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের সংকল্প
গ্রহণযোগ্যতা পাবে। হাউস অব লর্ডস সদস্যদের অবস্থান কমন্স সদস্যদের চেয়ে
কঠোরতর মনে করা হয়। কিন্তু যাঁরা লর্ডসভার আজীবন সদস্য (পিয়ার) তাঁদেরও
বরখাস্ত বা অপসারণের পথ খোলা রাখা হয়েছে। ব্রিটেন তার ইতিহাসে পিয়ারকেও
বরখাস্ত করার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। আমাদের একটি উদাহরণ দরকার। আর রানাই হতে
পারে তার প্রথম উদাহরণ। কারণ, টাঙ্গাইল এমন একটি অঞ্চল, যেখানে রানার
অনুসারীদের একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী ছাড়া আওয়ামী লীগের সব কটি সংগঠন প্রকাশ্যে
রানার শাস্তি চাইছে।
তাই আবারও বলি, করতে চাইলে নজিরের কোনো অভাব নেই। ব্রিেটনে যদিও গত ২০০ বছরে ‘এটেইন্ডার্স, বিল অব পেইনস অ্যান্ড পানিশমেন্টস’ প্রয়োগ করা হয়নি কিন্তু ব্রিটেন অসদাচরণকারী এমপিকে অপসারণ করতে থেমে নেই। তারা ১৬৬৭ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত ৬০ জন এমপিকে অপসারণ করেছে। এ-সংক্রান্ত পুরো একটি তালিকা আমি নিলাম ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ২০০৭ সালের রায় থেকে। তাই বলি, প্রশ্নটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার, আইনগত বাধা নেই। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পি ভি নরসীমা রাও বনাম রাষ্ট্র মামলায় ১৯৯৮ সালের ১৭ এপ্রিল বলেছেন, ‘কোনো অপরাধ সংঘটনের জন্য সংসদ শুধু যে সাংসদকে শাস্তি দিতে পারে তা-ই নয়, যারা তার সঙ্গে চক্রান্ত করেছে, তাদেরও শাস্তি দিতে পারে। তবে শর্ত হলো সাংসদকে সংসদীয় প্রিভিলেজ লঙ্ঘন কিংবা তার অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে। আর সংসদের শাস্তির পরেও ফৌজদারি আইনেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা হতে বাধা থাকবে না।’ সুতরাং সংসদ শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক। সেটাই আমাদের এ মুহূর্তের প্রত্যাশা। তাহলে দেশের মালিকেরা আশ্বস্ত হবেন যে যাঁরা তাঁদের প্রতিনিধি পরিচয়ে এখন দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁরা মালিকপক্ষকে একদম ভুলে যাননি।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০০৭ সালের ১০ জানুয়ারি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে ১০ এমপিকে বহিষ্কারের একটি সিদ্ধান্ত সমুন্নত রাখেন। সংসদ তার সদস্যকে বহিষ্কার করতে পারে কি পারে না, তা নিয়ে ভারতে বহু তর্ক হয়েছে। কিন্তু লোকসভার নিজের কমিটিও বলেছে, এই ক্ষমতা তার আছে। মধ্যপ্রদেশ বিধানসভায় দুজন সদস্যকে বহিষ্কারের পর তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল এই যুক্তি দেখিয়ে যে হাউস অব কমন্স তার সদস্যকে অসদাচরণের জন্য বহিষ্কার করতে পারে। কিন্তু সেই বিধান ভারতের সংবিধান গ্রহণ করেনি। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট সেই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আমরা ব্রিটেন ও ভারতের উদাহরণ দিতে ভালোবাসি। ১৯৫১ সালের ৮ জুন এইচ জি মুদগাল লোকসভা থেকে প্রথম বহিষ্কার হন। দ্বিতীয় ঘটনায় ১৯৭৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর মিসেস ইন্দিরা গান্ধীসহ আর কে ধাওয়ান ও ডি সেন। আর ১৯৭৬ সালের ১৫ নভেম্বর রাজ্যসভা থেকে সুব্রামনিয়াম স্বামী বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।
১৯৪৭ ও ১৯৫৪ সালে হাউস অব কমন্স দুজন এমপিকে বহিষ্কার করেছিল। সে কথা উল্লেখ করে ২০০৭ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, ‘ভারতের সংবিধানের ১০৫(৩) অনুচ্ছেদের আওতায় ধরে নিতে হবে যে বহিষ্কারের ক্ষমতা লোকসভার আছে। আর আমরা এটাও বলছি যে বহিষ্কারের ক্ষমতার প্রয়োগ সংবিধানের অন্য কোনো বিধানের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হবে না।’ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ওই ৬০ জন কমন্স এমপির বহিষ্কারের তালিকা দিয়ে বলেছেন, লোকসভার বহিষ্কারের ক্ষমতা বৈধ। আমরাও তা-ই বলব। বাংলাদেশ সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদের আওতায় এটা তার ‘ইনহেরেন্ট পাওয়ার।’ সুতরাং প্রাজ্ঞ সাংসদদের কাছে বিনীত নিবেদন রাখব যে, এই ক্ষমতা যে আমাদের হাউস অব দ্য নেশনের আছে, সেটা অন্তত আপনারা বিবেচনায় নিন।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সম্প্রতি আইন কমিশনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বলেছিলেন, ‘ন্যায়বিচার না দিতে পারলে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’ ন্যায়বিচার দেওয়া শুধু বিচার বিভাগের কাজ নয়। ফারুক হত্যা মামলায় যঁারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তঁারা উল্টো বলতে শুরু করেছেন। সন্দেহভাজন ঘাতকের অনুসারীদের শহরে ফিরতে দেখা যাচ্ছে। তাঁরা রানার জামিনের অপেক্ষায় আছেন। রানাকে এখনো দল থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রানার আত্মসমর্পণের দিন ফারুক আহমেদের স্ত্রী বলেছিলেন, ‘তোমাকে সন্তানের মতো স্নেহ করেছি, তুমি আমাকে বিধবা করলে।’ রানা মাথা নিচু করে ছিলেন। রানা সংসদে বসলে তঁার সেই নিচু মাথাটা আর নিচু থাকে না।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com
তাই আবারও বলি, করতে চাইলে নজিরের কোনো অভাব নেই। ব্রিেটনে যদিও গত ২০০ বছরে ‘এটেইন্ডার্স, বিল অব পেইনস অ্যান্ড পানিশমেন্টস’ প্রয়োগ করা হয়নি কিন্তু ব্রিটেন অসদাচরণকারী এমপিকে অপসারণ করতে থেমে নেই। তারা ১৬৬৭ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত ৬০ জন এমপিকে অপসারণ করেছে। এ-সংক্রান্ত পুরো একটি তালিকা আমি নিলাম ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ২০০৭ সালের রায় থেকে। তাই বলি, প্রশ্নটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার, আইনগত বাধা নেই। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পি ভি নরসীমা রাও বনাম রাষ্ট্র মামলায় ১৯৯৮ সালের ১৭ এপ্রিল বলেছেন, ‘কোনো অপরাধ সংঘটনের জন্য সংসদ শুধু যে সাংসদকে শাস্তি দিতে পারে তা-ই নয়, যারা তার সঙ্গে চক্রান্ত করেছে, তাদেরও শাস্তি দিতে পারে। তবে শর্ত হলো সাংসদকে সংসদীয় প্রিভিলেজ লঙ্ঘন কিংবা তার অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে। আর সংসদের শাস্তির পরেও ফৌজদারি আইনেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা হতে বাধা থাকবে না।’ সুতরাং সংসদ শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক। সেটাই আমাদের এ মুহূর্তের প্রত্যাশা। তাহলে দেশের মালিকেরা আশ্বস্ত হবেন যে যাঁরা তাঁদের প্রতিনিধি পরিচয়ে এখন দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁরা মালিকপক্ষকে একদম ভুলে যাননি।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০০৭ সালের ১০ জানুয়ারি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে ১০ এমপিকে বহিষ্কারের একটি সিদ্ধান্ত সমুন্নত রাখেন। সংসদ তার সদস্যকে বহিষ্কার করতে পারে কি পারে না, তা নিয়ে ভারতে বহু তর্ক হয়েছে। কিন্তু লোকসভার নিজের কমিটিও বলেছে, এই ক্ষমতা তার আছে। মধ্যপ্রদেশ বিধানসভায় দুজন সদস্যকে বহিষ্কারের পর তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল এই যুক্তি দেখিয়ে যে হাউস অব কমন্স তার সদস্যকে অসদাচরণের জন্য বহিষ্কার করতে পারে। কিন্তু সেই বিধান ভারতের সংবিধান গ্রহণ করেনি। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট সেই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আমরা ব্রিটেন ও ভারতের উদাহরণ দিতে ভালোবাসি। ১৯৫১ সালের ৮ জুন এইচ জি মুদগাল লোকসভা থেকে প্রথম বহিষ্কার হন। দ্বিতীয় ঘটনায় ১৯৭৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর মিসেস ইন্দিরা গান্ধীসহ আর কে ধাওয়ান ও ডি সেন। আর ১৯৭৬ সালের ১৫ নভেম্বর রাজ্যসভা থেকে সুব্রামনিয়াম স্বামী বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।
১৯৪৭ ও ১৯৫৪ সালে হাউস অব কমন্স দুজন এমপিকে বহিষ্কার করেছিল। সে কথা উল্লেখ করে ২০০৭ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, ‘ভারতের সংবিধানের ১০৫(৩) অনুচ্ছেদের আওতায় ধরে নিতে হবে যে বহিষ্কারের ক্ষমতা লোকসভার আছে। আর আমরা এটাও বলছি যে বহিষ্কারের ক্ষমতার প্রয়োগ সংবিধানের অন্য কোনো বিধানের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হবে না।’ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ওই ৬০ জন কমন্স এমপির বহিষ্কারের তালিকা দিয়ে বলেছেন, লোকসভার বহিষ্কারের ক্ষমতা বৈধ। আমরাও তা-ই বলব। বাংলাদেশ সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদের আওতায় এটা তার ‘ইনহেরেন্ট পাওয়ার।’ সুতরাং প্রাজ্ঞ সাংসদদের কাছে বিনীত নিবেদন রাখব যে, এই ক্ষমতা যে আমাদের হাউস অব দ্য নেশনের আছে, সেটা অন্তত আপনারা বিবেচনায় নিন।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সম্প্রতি আইন কমিশনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বলেছিলেন, ‘ন্যায়বিচার না দিতে পারলে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’ ন্যায়বিচার দেওয়া শুধু বিচার বিভাগের কাজ নয়। ফারুক হত্যা মামলায় যঁারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তঁারা উল্টো বলতে শুরু করেছেন। সন্দেহভাজন ঘাতকের অনুসারীদের শহরে ফিরতে দেখা যাচ্ছে। তাঁরা রানার জামিনের অপেক্ষায় আছেন। রানাকে এখনো দল থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রানার আত্মসমর্পণের দিন ফারুক আহমেদের স্ত্রী বলেছিলেন, ‘তোমাকে সন্তানের মতো স্নেহ করেছি, তুমি আমাকে বিধবা করলে।’ রানা মাথা নিচু করে ছিলেন। রানা সংসদে বসলে তঁার সেই নিচু মাথাটা আর নিচু থাকে না।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

No comments:
Post a Comment