![]() |
| হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দু'পা হারানো শাহনুর বিশ্বাস |
মেয়ের
উত্ত্যক্তের বিচার চাইতে গিয়ে দু’পা হারালেন বাবামেয়ের উত্ত্যক্তের বিচার
চাইতে গিয়ে স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর হামলায় দু’পা হারিয়েছেন ঝিনাইদহের
শাহনুর বিশ্বাস। ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে তার পাশে স্ত্রী ও মেয়ে
-যুগান্তর ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নলাভাঙ্গা গ্রামের কৃষক শাহনুর
বিশ্বাসের দু’পা নেই। হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত কেটে নেয় স্থানীয়
কামাল মেম্বার ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী। শাহনুরের অপরাধ, তার কলেজ পড়ুয়া
মেয়েকে উত্ত্যক্তকারীর বিচার চেয়েছিলেন। বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো
সন্ত্রাসী দিয়ে তার ওপর করা হল বর্বর হামলা। শাহনুর এখন ঢাকার জাতীয়
অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হামলাকারীরা এবার শাহনুরকে মেরে
ফেলারই হুমকি দিচ্ছে। রাতের আঁধারে ওরা যদি আবারও হামলা চালায় এমন শংকায়
চিকিৎসা শেষে নিজ গ্রামে ফিরতেও ভয় পাচ্ছেন তিনি। সন্ত্রাসী দলটির মাদক
ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় এক বছর আগে শাহনুরের ভাই
রবিউলকে গুলি করে হত্যা করেছে তারা। সোমবার পঙ্গু হাসপাতালে কথা হয়
শাহনুরের সঙ্গে।
এ সময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ভাই হত্যার বিচার
পাইনি, এবার মেয়ে উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় বিচার চাইতে গিয়ে দু’পা হারালাম।
কেমন সমাজে বাস করছি আমরা। পঙ্গু হাসপাতালের ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শাহনুর
নিজের ওপর নৃশংস হামলার বর্ণনা দেন। এ সময় পাশে বসে স্ত্রী আর্জিনা খাতুন ও
বড় মেয়ে শারমিন আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়েন। ১৬ অক্টোবর সকালে শাহনুর
বিশ্বাসের ওপর হামলা চালায় স্থানীয় প্রভাবশালী কামাল মেম্বার ও মাহবুবসহ ৭
যুবক। হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে শাহনুর বিশ্বাস যুগান্তরকে বলেন, কামাল
মেম্বার ও মাহবুবের ছেলে এবং তার বন্ধুরা আমার বড় মেয়েকে নানাভাবে
উত্ত্যক্ত করছে। মেয়ে লজ্জায় কখনও আমাকে জানায়নি। মেয়ের মা যখন আমাকে
বিষয়টি জানায়, তখন আমি আমার বড় চাচাতো ভাই মশিউরকে নিয়ে কামাল মেম্বারের
কাছে এর বিচার চাইতে যাই। বিচার না করে কামাল মেম্বার এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি
করতে নিষেধ করে। ঘটনার দিন সকালে বাড়ির কাজের জন্য পাশের গ্রামের
রাজমিস্ত্রি নাজমুলের বাড়িতে যাই। কথা শেষ করে বাড়িতে ফিরছিলাম। এমন সময়
কামাল মেম্বার ও মাহবুবের নির্দেশে সাত যুবক রড, শাবল ও চাপাতি নিয়ে পেছন
থেকে হামলা চালায়। কামাল মেম্বার প্রথমে আমার ডান পায়ে গুলি করে মেরে ফেলার
নির্দেশ দেয়। হামলাকারীরা রড দিয়ে দু’পায়ে পেটাতে থাকে, একপর্যায়ে তারা
শাবল ও চাপাতি দিয়ে হাঁটু থেকে পা আলাদা করে ফেলে। দীর্ঘশ্বাস নিতে নিতে
শাহনুর বলেন, এ ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে আমার
ভগ্নিপতি ইয়াকুব আলী বাদী হয়ে ঝিনাইদহ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে
সাতজনকে আসামি করে মামলা করেন। আমার বড় ভাই সামিউল বিশ্বাস বাদী হয়ে
কালীগঞ্জ থানায় পৃথক আরেকটি মামলা করেন। মামলা করায় বাদীকেও মেরে ফেলার
হুমকি দিচ্ছে হামলাকারীরা। শাহনুর সামান্য জমিতে চাষ করে যা আয় করতেন তা
দিয়েই চলত তার সংসার, দু’মেয়ে ও এক ছেলের পড়াশোনার খরচ। সুস্থ হয়ে উঠলেও
তিনি আর কাজ করতে পারবেন না। কিভাবে চলবে সংসার আর কি হবে সন্তানদের
ভবিষ্যৎ তা নিজেও জানেন না। পঙ্গু হাসপাতালে স্বামীর পাশে বসে কান্নাজড়িত
কণ্ঠে আর্জিনা খাতুন যুগান্তরকে জানান, হামলাকারীরা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে
বেড়ালেও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না। বিচার তো পাব না, এখন বাড়ি যেতেও ভয়
লাগছে। তিনি বলেন, একজন মানুষের ওপর ৭-৮ জন মিলে হামলা চালায়।
হামলাকারীদের ভয়ে তাকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। মরে গেছে ভেবে ফেলে রেখে
যায় হামলাকারীরা। ওই দিন রাতেই তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসি। হামলায়
প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে, ২০ ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার বাম পায়ে
অপারেশন হবে। ডাক্তার বলেছেন, আরও রক্ত লাগবে। তার একার আয়ে চলত সংসার।
সেই
লোক এখন হাসাপাতালে ভর্তি। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের টাকায় চিকিৎসা
চলছে বলে জানান তিনি। শাহনুরের বড় মেয়ে শারমিন যুগান্তরকে জানান, যে বাবা
স্বপ্ন দেখাতেন পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করার। তিনি আজ দু’পা হারিয়ে
হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। আমার জন্যই বাবার আজ এ পরিণতি। মামলার বাদী ইয়াকুব
আলী যুগান্তরকে জানান, শাহনুরের মতোই আমারও হাত-পা কেটে ফেলা হবে বলে হুমকি
দিচ্ছে হামলাকারীরা। থানায় প্রথমে মামলা না নেয়ায় আদালতে মামলা করি।
অধিকাংশ আসামি এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও পুলিশ বলছে তাদের খুঁজে
পাচ্ছে না। অভিযোগের বিষয়ে কালীগঞ্জ থানার ওসি আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে
বলেন, এ মামলায় দু’আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে কামাল মেম্বারকে এখনও
খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। ওসি বলেন,
হামলাকারীরা আবারও হুমকি দিচ্ছে এমন অভিযোগ পাইনি। ওসি জানান, কামাল
মেম্বারের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

No comments:
Post a Comment