বয়সসীমা
শিথিলসহ দলীয় কর্মীদের নিয়োগের দাবিতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বাধায়
স্থগিত হয়ে গেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষা। শুক্রবার সকাল
৮টা, ১০টা ও বিকাল ৩টায় এসব পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। এর আগে ২১ ডিসেম্বর একই
দাবিতে তারা রাবি স্কুলের নিয়োগ পরীক্ষাও বন্ধ করে দিয়েছিল। নিয়োগ পরীক্ষা
দিতে আসা প্রার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, সকাল ৮টার আগেই
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও কাজলা ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় মতিহার থানা
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আলাউদ্দিন। একই সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা
ছাত্রলীগের নবমনোনীত কমিটির সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল
আহমেদ রুনুর নেতৃত্বে নিয়োগ পরীক্ষার কেন্দ্র চতুর্থ বিজ্ঞান ভবনে তালা
লাগায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ক্যাটালগার পদে নিয়োগ পরীক্ষা যথাসময়ে শুরু
হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পরীক্ষা কক্ষে গিয়ে তা বন্ধে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য
করে। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বেলা ২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত
বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক’টি প্রবেশপথ অবরোধ করে রাখে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের
নেতাকর্মীরা।
প্রার্থীদের হুমকি-ধমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেয় তারা। বেশ কয়েকজন
প্রার্থীর প্রবেশপত্র কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। এ সময় কয়েকজন প্রার্থীকে ধাওয়া
দিতেও দেখা যায়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও ক্যাম্পাসে
প্রবেশ ও বের হতে বাধা দেয়া হয়। পরে ঘটনাস্থলে আসেন মহানগর আওয়ামী লীগের
সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার। তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের উপপ্রচার সম্পাদক
মীর ইসতিয়াক লিমন, মতিহার থানার সাধারণ সম্পাদক মো. আলাউদ্দিনসহ ৩০-৩৫ জন
নেতাকর্মীকে নিয়ে ক্যাম্পাসে মহড়া দেন। ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকা প্রার্থীদের
তারা হুমকি-ধমকি দেয়। এতে গোটা ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রধান
ফটকের সামনে মাইক লাগিয়ে সমাবেশ করে নেতাকর্মীর। মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ
সম্পাদক মাহমুদ হাসান রাজিবের সঞ্চালনায় মহানগর, মতিহার থানা ও বিভিন্ন
ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এতে অংশ নেয়। নিয়োগ পরীক্ষায় বাধা দেয়া
প্রসঙ্গে ডাবলু সরকার বলেন, যে বয়সসীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে তা বাতিল, নিয়োগ
প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের ভর্তির
সুযোগ দেয়ার দাবি নিয়ে আমরা আন্দোলন করেছি। এই তিনটি দাবি না মেনে
কর্তৃপক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়া চালালে আমরা আবারও একই কর্মসূচি পালন করব। ২৫
তারিখে যে পরীক্ষা আছে, সেদিনও কর্মসূচি থাকবে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা
অভিযোগ করেন,
আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে বর্তমান প্রশাসন ক্ষমতায় বসলেও তারা
জামায়াত-শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে। বর্তমান প্রশাসন দলীয় লোকদের
মূল্যায়ন করছে না। যোগ্যতার ধোয়া তুলে জামায়াত-শিবির দ্বারা নির্যাতিত
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চাকরি থেকে বঞ্চিত করার ফন্দি আঁটছে। রাবি ভিসি
অধ্যাপক মিজানউদ্দিনের উদ্দেশে তারা বলেন, টালবাহানা না করে দ্রুত অযৌক্তিক
শর্ত শিথিল করে দলের ত্যাগী ও নির্যাতিতদের চাকরির সুযোগ দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, তিনটি ক্যাটাগরিতে ২৭ জনের নিয়োগের জন্য
পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল শুক্রবার। সকাল ৮টায় ক্যাটালগার পদে (৩টি পদ), ১০টায়
ডাটা এন্ট্রি অপারেটর (২০টি পদ) এবং বিকাল ৩টায় গ্রন্থাগার সহকারী পদের
(৪টি) পরীক্ষার সময়সূচি ছিল। রংপুর থেকে আসা সুমনা আক্তার নামের এক
চাকরিপ্রার্থী বলেন, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে পরীক্ষা দিতে এসেছিলাম।
কিন্তু ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেয়নি একদল লোক। বাধ্য হয়ে ফিরে যাচ্ছি। আহসান
হাবিব রনি নামের আরেক প্রার্থী বলেন, চাকরির পরীক্ষা দিতে এসে এমন
পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে কল্পনাও করিনি। মিছিল,
স্লোগান, ফটকে
অবরোধকারীদের মারমুখী আচরণে ভয় পেয়ে গেছি। এ সময় ক্যাম্পাসে বিপুলসংখ্যক
পুলিশ মোতায়েন থাকলেও তাদের কোনো অ্যাকশনে যেতে দেখা যায়নি। প্রশাসনও ছিল
নিশ্চুপ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ
করেছেন একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রক্টরের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। প্রক্টর দফতরে গিয়েও
তার দেখা মেলেনি। চাইলে রাবি প্রোভিসি অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন,
পূর্বনির্ধারিত সময়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল, বহিরাগতরা বিশৃংখলা
করে তা বন্ধ করে দিয়েছে। আপাতত এ নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। ভিসি
অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ক্যাম্পাসে শৃংখলাবিরোধী কাজে
জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছিলাম।
তাদের সহযোগিতা চেয়েছিলাম। তারা কেন নিশ্চুপ ছিল, তা তারা ভালো বলতে
পারবেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) আমির জাফর
যুগান্তরকে বলেন, অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে দিনভর পুলিশ ক্যাম্পাসে সতর্ক
অবস্থানে ছিল। পুলিশ প্রশাসন সেখানে শক্তি প্রয়োগ করতে গেলে ঘটনা আরও বড়
হয়ে উঠতে পারত।
অ্যাকশনে যাওয়া হয়নি, কারণ যা করা হয়েছে ঊর্ধ্বতন
কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও
সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাতিল সিরাজ বলেন, সকালে কয়েকজন
সহকর্মীর সঙ্গে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে চাইলে সেখানে বাধা দেয়া হয়। শিক্ষক
পরিচয় দিলে তারা দুর্ব্যবহার করে। একপর্যায়ে আমাদের তারা লাঞ্ছিত করে।
বহিরাগতরা ফটক দখলে নিয়ে শিক্ষকদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেবে না, এটা
লজ্জাজনক। প্রোভিসিসহ দু’জনকে প্রাণনাশের হুমকি : এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রোভিসি ও আইসিটি সেন্টারের পরিচালককে প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার অভিযোগ
পাওয়া গেছে। প্রোভিসি অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান ও আইসিটি সেন্টারের
পরিচালক খাদেমুল ইসলাম মোল্লা যুগান্তরকে জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১০টায়
মহানগর আওয়ামী লীগের উপপ্রচার সম্পাদক মীর ইশতিয়াক লিমনের নেতৃত্বে ২০-২৫
জন নেতাকর্মী তাদের বাসায় গিয়ে নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধের দাবি জানায়। তা না হলে
প্রাণনাশের হুমকি দেয় তারা। অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, হুমকি
পাওয়ার পর থেকে পরিবারের সদস্যরা আতংকে আছেন। বিষয়টি মৌখিকভাবে পুলিশকে
জানানো হয়েছে।

No comments:
Post a Comment