Monday, December 26, 2016

সূর্যভিলা থেকে ১৭ গ্রেনেড উদ্ধার

রাজধানীর আশকোনার জঙ্গি আস্তানা (সূর্যভিলা) থেকে রোববার কিশোর জঙ্গি আদরের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় হাতে তৈরি ১৭টি তাজা গ্রেনেড। পরে সেগুলো আস্তানার পাশের একটি খোলা মাঠে নিষ্ক্রিয় করা হয়। এছাড়া ওই আস্তানায় পাওয়া গেছে কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র, সুইসাইডাল ভেস্টসহ বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক। নিহত আদরের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। শনিবার আশকোনায় জঙ্গি আস্তানায় পুলিশি অভিযানের (অপারেশন রিপল টোয়েন্টিফোর) সময় সুইসাইডাল ভেস্ট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নারী জঙ্গি শাকিলা ও পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে কিশোর জঙ্গি আদর নিহত হয়। রোববার নারী জঙ্গি শাকিলার লাশের ময়নাতদন্ত ঢামেক হাসপাতালে সম্পন্ন হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বোমা বিস্ফোরণেই তার মৃত্যু হয়। তার শরীর থেকে রাখা হয় ডিএনএ নমুনা। সেপ্টেম্বরে আজিমপুরের আস্তানায় অভিযানের সময় নিহত জঙ্গি তানভীর কাদেরী ওরফে শিপারের ছেলে হচ্ছে রাশেদ ওরফে আদর (১৪)।
আর শাকিলা (৩০) হচ্ছে জঙ্গি সুমনের স্ত্রী। তার আগের স্বামী ইকবাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। শাকিলা সুইসাইডাল ভেস্টের বিস্ফোরণ ঘটানোর সময় গুরুতর আহত হওয়া তার ৪ বছরের মেয়ে সাবিনাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আর অভিযান চলাকালে আত্মসমর্পণ করা দুই নারী জঙ্গি জেবুন্নাহার শিলা ও তৃষা মণি এবং তাদের দুই শিশু সন্তানকে মিন্টো রোডের মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে রাখা হয়েছে। আজ মামলার পর তাদের এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হবে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জঙ্গি বাসারুজ্জামান, মারজান, সুমন এবং মাইনুল ইসলাম ওরফে মুসাসহ নব্য জেএমবির কয়েকজনকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে। জেবুন্নাহার শিলা হল মেজর (অব.) জাহিদ ওরফে মুরাদের স্ত্রী এবং তৃষা মণি হচ্ছে জঙ্গি মুসার স্ত্রী। মেজর (অব.) জাহিদ রাজধানীর রূপনগরের জঙ্গি আস্তানায় পুলিশি অভিযানে মারা যায়। আর জঙ্গি মুসা গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনায় জড়িত ছিল বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। জঙ্গি আস্তানায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা শেষে রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সিটি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, জঙ্গিরা অভিযানের সময় কিছু জরুরি কাগজপত্র, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন পুুড়িয়ে ফেলেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, আস্তানাটি জঙ্গিদের দাফতরিক কাজে ব্যবহৃত হতো। সেখানে সব জঙ্গি ও তাদের স্ত্রীরা যাতায়াত করত। সেখানে কিছু নথিপত্র পাওয়া গেছে। সেগুলোতে কি আছে তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এছাড়া বেশ কিছু টাকা পুড়িয়ে ফেলার আলামত পাওয়া গেছে। আটককৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, বাসাটিতে ১২ লাখ টাকা ছিল। মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, বাসা থেকে হাতে তৈরি ১৭টি শক্তিশালী গ্রেনেড উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। সাতটি হাতে তৈরি বোমা ও দুটি সুইসাইডাল ভেস্ট পাওয়া গেছে। বোমা, গ্রেনেড তৈরির স্পি­ন্টার সরঞ্জাম মজুদ ছিল আস্তানাটিতে। এসব বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। তিনি বলেন, নিহত আদরের হাতে একটি পিস্তল পাওয়া গেছে। সেটি দিয়ে সে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে। আদর পুলিশের গুলিতে মারা যেতে পারে আবার নিজে গুলি করে আত্মহত্যাও করে থাকতে পারে। এর বাইরে আরও একটি নাইনএমএম পিস্তলসহ দুটি ম্যাগাজিন পাওয়া গেছে। এছাড়া দুই নারী জঙ্গি আত্মসমর্পণের সময় একটি পিস্তল জমা দেয়। এ নিয়ে তিনটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। মনিরুল ইসলাম বলেন- আমাদের ধারণা, জঙ্গিরা থার্টিফার্স্ট নাইটে বড় ধরনের নাশকতা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু পুলিশি তৎপরতার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। এ আস্তানার মতো রাজধানীতে আরও আস্তানা থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জঙ্গিরা কিছু দিন পরপর আস্তানা পরিবর্তন করে। রাজধানীর অন্য এলাকাতেও আস্তানা থাকতে পারে। তিনি দাবি করেন, আত্মঘাতী ওই নারীর লক্ষ্য ছিল পুলিশের ওপর হামলা করা। মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে শাকিলার আগের স্বামী ইকবাল মারা যায়। পরে মোবাইল ফোনে পরিচয়ের সূত্র ধরে জঙ্গি সুমনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।
সুমন তাকে জঙ্গিবাদে দীক্ষা দেয়। মামলা রুজু প্রক্রিয়াধীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে দক্ষিণখান থানায় মামলা করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শনিবার ‘পরিবেশগত’ কারণে অনুসন্ধান ও লাশ উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হয়নি। রোববার বেলা ১১টায় উদ্ধার ও অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ। প্রথমেই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা বাড়ির কক্ষগুলো থেকে গ্যাস ও ধোঁয়া সরিয়ে ফেলে। এদিন দুপুর সোয়া ২টায় বাড়িতে প্রবেশ করে ডিএমপির বোম ডিসপোজাল ইউনিট। তারা উদ্ধারকৃত গ্রেনেডগুলো দুপুর ২টা ৪৮ থেকে বিকাল ৫টা ১২ মিনিটের মধ্যে কয়েক দফা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষ্ক্রিয় করে। রোববার উদ্ধার অভিযান শুরুর আগে দুপুর ১২টার দিকে সিটি ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ছানোয়ার হোসেন বলেন, কক্ষগুলোজুড়ে গ্রেনেড ও বিস্ফোরক ছড়ানো-ছিটানো ছিল। জানালা দিয়ে দুটি গ্রেনেডের পিন খোলা অবস্থায় দেখা যায়। ওই কক্ষের খাটের পাশে আরও একটি গ্রেনেড ছিল। আরেকটি গ্রেনেড ছিল ড্রেসিং টেবিলের উপরে। তিনি আরও জানান, জানালা দিয়ে আমরা দেখতে পাই, দরজার পাশেই একটি সুইসাইডাল ভেস্ট পড়ে আছে। আরেকটি সুইসাইডাল ভেস্ট পড়েছিল কিশোর আদরের লাশের পাশে। রান্নাঘরের তাকের ওপরও গ্রেনেড দেখা যায়। ফলে আমাদের খুবই সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হয়। কারণ কোন গ্রেনেড কী অবস্থায় আছে তা দূর থেকে বোঝা সম্ভব নয়। বাসার কক্ষগুলোতে অনেকটা মৃত্যুফাঁদ তৈরি করা ছিল। এছাড়া অভিযান শুরুর আগে ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সিটি ইউনিটের স্পেশাল অ্যাকশন ডিভিশনের উপ-কমিশনার প্রলয় কুমার জোয়ার্দ্দার। তিনি জানান, ভেতরে গ্যাস থাকার কারণে কক্ষে ঢোকা যায়নি। প্রাথমিক কাজ হল গ্যাস দূর করা। গ্যাস দূর করতে ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে। এরপর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল কাজ করবে। এরপরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম ইউনিট ও কাউন্টার টেরোরিজমের ক্রাইম ইউনিট কাজ করবে। উত্তরা ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, বিপুল পরিমাণ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করার কারণে বাসাটি গ্যাস চেম্বারের মতো হয়ে ছিল। ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা জানালা ভেঙে বাতাস দিয়ে গ্যাসগুলো বের করে দেন। দুপুর ২টায় তারা বাসাটি গ্যাসমুক্ত করতে সক্ষম হন। তাদের ৫টি ইউনিট সেখানে নিয়োজিত আছে। কারণ ঘটনাস্থলে যদি আগুন ধরে যায় অথবা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যেন দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়।
বিস্ফোরণেই শাকিলার মৃত্যু : শনিবার নিহত আত্মঘাতী নারী জঙ্গি শাকিলার (৩০) ময়নাতদন্ত রোববার ঢামেক হাসপাতাল মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ ময়নাতদন্ত শেষে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, বোমার আঘাতেই তার (শাকিলা) মৃত্যু হয়েছে। রোববার বেলা ১১টায় ময়নাতদন্ত শুরু করে দুপুর ১২টায় শেষ করেন চিকিৎসক। তিনি জানান, ভিসেরা পরীক্ষার জন্য লাশের পাকস্থলী, লিভার, কিডনির নমুনা ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য চুল ও ঊরুর অংশসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
চারজন হেফাজতে : আত্মসমর্পণ করা চারজনকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। মেজর (অব.) জাহিদ ওরফে মুরাদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা ও তার সন্তান (নাম অজ্ঞাত)। আরেকজন হচ্ছে জঙ্গি মুসার স্ত্রী তৃষা ও তার সন্তান (নাম অজ্ঞাত)। তাদের বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, শনিবার তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। রোববার তারা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে আত্মগোপনে থাকা জঙ্গি বাসারুজ্জামান, মারজান, ইকবাল ওরফে সুমন ও মুসাসহ কয়েকজনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু আগেই সরে পড়ায় সেখানে থাকা জঙ্গিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। সিটির কর্মকর্তারা আরও জানান, এ বিষয়ে দক্ষিণখান থানায় একটি মামলার প্রক্রিয়া চলছে। মামলার পর আত্মসমর্পণ করা নারীদের গ্রেফতার দেখানো হবে। এদিকে ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া সাংবাদিকদের বলেছেন, আস্তানা ভাড়া নিয়েছে নব্য জেএমবি নেতা মুসা। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি সফল অভিযানের মধ্য দিয়ে জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণ করতে সম্ভব হয়েছে। জঙ্গিদের অর্থদাতা, উৎসাহদাতা ও সমর্থনদাতা সবাইকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
প্রতিবেশীর বর্ণনায় সূর্যভিলা : বাসাটির নিচ তলার বাসিন্দারা কখনো বাইরে আসত না। বাচ্চাদেরও বাইরে খেলাধুলা করতে দিত না। সেখানে একজন হুজুর আসত। এমনটা জানালেন প্রতিবেশী নাসরিন আক্তার। তিনি জানান, ওই বাড়ির দোতলায় তার বোন থাকেন। সূর্যভিলার সামনের পূর্ব পাশের বাসাটি তাদের। আর পশ্চিম পাশের বাসাটি তার ভাইয়ের। সাবেক সেনা সদস্যের মেয়ে নাসরিন বলেন, বাসায় খুব সুন্দরী এক নারী থাকত। সে সব সময় মুখ ঢেকে রাখত। কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করলে সুন্দর করে হাসি দিত। তার সঙ্গে দু-তিন দিন সামান্য কথা হয়েছে। ওই নারী কেন বের হয় না জানতে চাইলে নাসরিনকে উত্তর দেয়, তার স্বামী হুজুর। তাই সে বাইরে বের হওয়া পছন্দ করে না। বাসায় সাদা পাঞ্জাবি পরা, লম্বা, দাড়িওয়ালা হুজুর আসত। তাকে দেখে হাফেজ মনে হয়েছে। নাসরিন আরও বলেন, একদিন ৪ বছরের ফুটফুটে শিশুটিকে সামনে খেলা করতে দেখেছেন। হঠাৎ করেই তার মা তাকে ডেকে ভেতরে নিয়ে যায়। কেন ভেতরে নিয়েছে জানতে চাইলে ওই নারী নাসরিনকে বলেছে, ‘তার স্বামী হুজুর মানুষ। তিনি বাইরে খেলাধুলা পছন্দ করেন না। নাসরিন আরও বলেন, বাসায় ১৪-১৫ বছর বয়সী একটি ছেলে থাকত। সে সব সময় গম্ভীর হয়ে থাকত। দেখতে খুব সুন্দর ছিল। কারও সঙ্গে কথা বলত না। বাইরে গেলে লম্বা লম্বা পা পেলে বাসায় ফিরে যেত। ভদ্র এ পরিবারটিকে কখনোই তাদের জঙ্গি মনে হয়নি। হাজী বাছির মসজিদসংলগ্ন হাজী জেনারেল স্টোরের কর্মচারী খোকা জানান, বাসায় কয়েকজন মহিলা থাকত। কখনও তাদের চেহারা দেখেননি। একটি কিশোর ছেলে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন সদাইপাতি নিতে আসত। সে কথা খুব কম বলত। শুধু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নিয়ে আবার চলে যেত। পরে শুনেছেন কিশোরটি মারা গেছে।

No comments:

Post a Comment