Monday, December 26, 2016

অর্ধেকই বিতর্কিত সাইফ পাওয়ারের নিয়ন্ত্রণে

চট্টগ্রাম বন্দরের বেশির ভাগ জেটিই নিয়ন্ত্রণ করছে বেসরকারি বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। ১৩টি বার্থ বা জেটির মধ্যে সর্ববৃহৎ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) চারটি এবং চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) তিনটিসহ সাতটি জেটিই পরিচালনা করছে এ প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে এনসিটির দুটি জেটিতে অংশীদার হিসেবে রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের মালিকানাধীন এমএইচ চৌধুরী এবং একরামুল করিম চৌধুরী এমপির প্রতিষ্ঠান এ অ্যান্ড জে কনসোর্টিয়াম। বাকি ছয়টি জেনারেল কার্গো বার্থ (জেসিবি) বা জেটি পরিচালনা করছে পৃথক বেসরকারি বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠান।
সূত্র জানায়, টেন্ডারের মাধ্যমেই প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জেটি পরিচালনার দায়িত্ব পেলেও বন্দরের অর্ধেকেরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ জেটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর করায়ত্তে থাকায় তারা ইচ্ছামতো জেটি পরিচালনা করছেন। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ধীরগতি, যন্ত্রপাতি সংযুক্ত করতে উদ্যোগ না নেয়া, সক্ষমতার বাইরে জাহাজের সিরিয়াল নেয়াসহ নানা অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে বন্দরে কনটেইনার জট ও বহির্নোঙরে জাহাজজট লেগে থাকছে। এই জটের কবলে পড়ে আমদানিকারকদের প্রতিনিয়ত গুনতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকার ডেমারেজ।
এদিকে কয়েক মাস ধরে চলে আসা কনটেইনার ও জাহাজজটে অস্থির আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাইছেন। তারা বলছেন, কোনো ধরনের অজুহাত নয়; যত দ্রুত সম্ভব এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যবস্থা নিতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে কনটেইনার বা পণ্য খালাস যেমন দ্রুত করতে হবে, তেমনি ডেলিভারি প্রদানেও কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা করা যাবে না।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করে আসা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর যে ‘মাফিয়া চক্রের’ হাতে জিম্মি হয়ে পড়ছে এ বিষয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরে কথা বলছি। প্রতিবাদ করছি। সর্বশেষ এনসিটির ৪ ও ৫ নম্বর জেটি সাইফ পাওয়ার টেকের হাতে তুলে দেয়ার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু টেন্ডারে কঠিন শর্ত আরোপ করে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়নি। এই দুটি জেটিও সাইফ পাওয়ার টেকসহ তিন প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়া হয়। অথচ কেউ আমার কথায় কর্ণপাত করেনি। স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রতিষ্ঠান যখন বন্দরের অর্ধেক হ্যান্ডলিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করবে তখন তারা স্বৈরাচারী হবে সেটাই স্বাভাবিক। এখন বন্দর জিম্মি করার কুফল দেশের মানুষ ভোগ করছে। আমদানিকারকরা ভোগ করছেন। জাহাজজট ও কনটেইনার জটে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।’
এর আগে প্রকাশ্য সমাবেশে চট্টগ্রাম বন্দর ‘পাঁচ ডাকাতের হাতে জিম্মি’ বলে দাবি করেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এ বক্তব্যেও তিনি সাইফ পাওয়ারটেকের নাম উল্লেখ করেন। তার এমন বক্তব্যে দেশজুড়ে তোলপাড় হয়। ভুক্তভোগীরা যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ১৩ জেটির সাতটিই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সাইফ পাওয়ারটেক স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে এবং তাদের অবহেলা ও উদাসীনতার কারণেই চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক জাহাজজট ও কনটেইনার জট হচ্ছে। একই সঙ্গে আমদানিকারকদের গুনতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকার ডেমারেজ। এ ছাড়া কারসাজির মাধ্যমে আমদানি পণ্যবাহী বেশির ভাগ জাহাজ নিজেদের জেটিতে ভেড়াচ্ছে তারা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাইফ পাওয়ারটেকের এমডি তরফদার রুহুল আমিন রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘টেন্ডারের শর্তপূরণসহ বন্দরের সব আইন-কানুন মেনেই আমরা কাজ পেয়েছি। ২০০৭ সাল থেকে সুনামের সঙ্গে কাজ করছি। যারা টেন্ডারে কাজ পায়নি, যাদের স্বার্থ হানি হয়েছে, তারাই আমার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। বন্দরের অর্ধেক হ্যান্ডলিং কার্যক্রম তার প্রতিষ্ঠানই সম্পন্ন করে স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘বন্দরের প্রবৃদ্ধি প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ বাড়ছে। কিন্তু সে অনুপাতে যন্ত্রপাতি না থাকায় তারা হ্যান্ডলিং কার্যক্রম চালাতে পারছেন না। আগামী মার্চের মধ্যে ১৩০ কোটি টাকার ১১টি আরটিজি রাবার টায়ার গ্যান্ট্রিক্রেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়ে আসবে। এসব যন্ত্রপাতি যুক্ত হলে জট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে দাবি করেন তিনি।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের ৭ জেটির বাইরে অপর যে ৬টি জেটি (জেনারেল কার্গো বার্থ) রয়েছে সেগুলোও পরিচালনা করে বেসরকারি বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠান। সেগুলো হচ্ছে এমএইচ চৌধুরী, এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজ, এ অ্যান্ড জে ট্রেডার্স, ফজলে অ্যান্ড সন্স, এফকিউ অ্যান্ড ব্রাদার্স ও বশির আহমদ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ৬ বার্থ অপারেটরের একজন রোববার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, এনসিটি ও সিসিটি একক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সেখানে যাচ্ছে-তাই হচ্ছে। তারা ইচ্ছামতো কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। আমদানিকারকদের সুখ-দুঃখ বুঝতে চায় না তারা। সাইফ পাওয়ারটেকই বিগত ওয়ান-ইলেভেনের সময় সিসিটি ইয়ার্ডে বার্থ অপারেটর হিসেবে ঢুকে একে একে অন্য সব অপারেটরকে বন্দরের অসাধু লোকজনের সঙ্গে যোগসাজশ করে কৌশলে তাড়িয়ে দিয়েছে। এরপর থেকেই তারা স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে। যার কুফল হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজজট ও কনটেইনারজটে অস্থির হয়ে উঠেছেন আমদানিকারকরা।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি আহসানুল হক চৌধুরী গতকাল যুগান্তরকে বলেন, ‘বন্দর যে একটি সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে এটা খোলা চোখেই দেখা যায়। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি সংযোজনের। হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে গতি আনার জন্য। কারণ প্রতিদিন যেভাবে আমদানি বাড়ছে সেভাবে হ্যান্ডলিং কার্যক্রম হচ্ছে না। উল্টো হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের বড় অংশ যারা নিয়ন্ত্রণ করছে তারাও কাজ করছে না। যে যন্ত্র দিয়ে জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানো হচ্ছে সেই একই যন্ত্র দিয়ে আবার কনটেইনার লরিতে তোলা হচ্ছে। এভাবে জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র একটি বন্দর চলতে পারে না। তিনি আমদানিকারকদের ডেমারেজের খড়গ থেকে মুক্তি দিতে, দেশকে বাঁচাতে, দেশের আমদনি-রফতানি বাঁচাতে অবিলম্বে এ বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) ও মুখপাত্র জাফর আলমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রশিক্ষণে আছেন জানিয়ে এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

No comments:

Post a Comment