নারায়ণগঞ্জ
সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের শেষ সময়ে চলছে জমজমাট প্রচারণা। নৌকা ও
ধানের শীষের পক্ষে অলি-গলি চষে বেড়াচ্ছেন নেতাকর্মীরা। প্রধান দু’দল
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি শিবিরে উৎসবের আমেজের পাশাপাশি জয়-পরাজয় নিয়ে বিরাজ
করছে টান টান উত্তেজনা। প্রার্থী ও তার সমর্থকরা ভোটারদের মন জয় করতে
দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভোটাররাও নানা
অংক কষতে শুরু করেছেন। যদিও ইসি (নির্বাচন কমিশন) ভোটগ্রহণে শংকার কোনো
কিছু দেখছে না। তারপরও সাধারণ ভোটারদের অনেকে পুরোপুরি আশংকামুক্ত হতে
পারছেন না। আবার বেশিরভাগ ভোটার কোনো বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। তারা
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।নাসিকে মোট ভোটারের প্রায় শতকরা ৩০ ভাগের বেশি
নীরব ভোটার। এরসঙ্গে রয়েছে ভাসমান ভোটার। এদের একটি অংশ আবার শ্রমিক।
সবমিলে প্রায় ৪০ ভাগের মতো নীরব ও ভাসমান ভোটার রয়েছে নাসিকে। এ নীরব ও
ভাসমান ভোটাররাই জয়-পরাজয় নির্ধারণে মূল ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবেন বলে মনে
করছেন সংশ্লিষ্টরা। নীরব ও ভাসমান ভোটারদের যারা কাছে টানতে পারবেন তাদের
পাল্লাই ভারি হবে। আজ মধ্য রাত থেকে সব ধরনের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা
বন্ধ হয়ে যাবে।
সোমবার মধ্যরাতের আগেই নাসিক নির্বাচনী এলাকায় অবস্থানরত
বহিরাগতদের এলাকা ছাড়তে হয়েছে। ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছেন
নাসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান তালুকদার। একেবারে
শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় প্রধান দু’দলের নেতাকর্মীদের কোনো অবসর নেই।
যেহেতু এ নির্বাচনে মূল ফ্যাক্টর নীরব ও ভাসমান ভোটার, সে জন্য আওয়ামী লীগ
প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী ও বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন
খান এদের কাছে টানতে নানা কৌশলে এগোচ্ছেন। নীরব ভোটারদের পাশাপাশি
সরকারবিরোধী নেতিবাচক ভোটও ধানের শীষের পক্ষে আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা
চালাচ্ছে বিএনপি। সোমবার নাসিকের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা
বলে জানা গেছে এসব তথ্য। ভাসমান ও নীরব ভোটাররা কেউ সরাসরি নৌকা বা ধানের
শীষের পক্ষে প্রচারে অংশ নিচ্ছেন না। এসব ভোটাররা জানার চেষ্টা করছেন কোন
দলের প্রার্থীর অবস্থান কেমন। তাদের অনেকেই নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি
পর্যবেক্ষণ করছেন। শহরের ১৫নং ওয়ার্ডের টানবাজার এলাকায় চা দোকানদার আবু
জাফরের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে নানা কথা হয়। কাকে ভোট দেবেন জানতে চাইলে
সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখনও সিদ্ধান্ত নেইনি। সময় তো আছে। দেখি
কাকে ভোট দেয়া যায়।’ একই কথা জানালেন সিদ্ধিরগঞ্জ পোল এলাকার এক মহিলা মুদি
দোকানদার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো রাজনীতি করি
না। নির্বাচনে বিভিন্ন প্রার্থী এসে ভোট চাচ্ছেন। কাকে ভোট দেব সিদ্ধান্ত
নিলেও বলব না। তবে যাকেই ভোট দেব পরিবারের সবাই একজনকেই দেব।’ জানা গেছে,
নাসিকে ভাসমান ভোটারদের ওপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই নানা জরিপ
চালিয়েছে। এসব ভোটারের কত ভাগ কোন জেলার তার একটি সম্ভাব্য হিসাবও করেছেন
তারা। কোন এলাকায় কোন জেলার লোক বেশি সেই তালিকাও করেছে দু’দল।
তালিকাভুক্তদের কাছে টানতে গণসংযোগেও নেয়া হয়েছে নানা কৌশল।
ভাসমান
ভোটারদের মধ্যে যেসব জেলার ভোটার বেশি সেই এলাকায় ওই জেলার কেন্দ্রীয়
নেতাদের গণসংযোগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে আছে বিএনপি।
কেন্দ্রীয়ভাবে এসব সমন্বয়ে একাধিক টিম গঠন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রায়
দু’শতাধিক নেতাকে নির্দিষ্ট এলাকা ভাগ করে গণসংযোগে নামানো হয়েছে। জানা
গেছে, নাসিকে ভাসমান ভোটারদের বড় একটি অংশ মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা। বিএনপির
প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেনের বাড়িও মুন্সীগঞ্জে। এক্ষেত্রে বিএনপি বাড়তি
সুবিধা পাবে। সাখাওয়াতের পাশাপাশি মুন্সীগঞ্জের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতাকে
গণসংযোগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা ধানের শীষের পক্ষে ভোট দিতে
মুন্সীগঞ্জের ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করেন। মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা কেন্দ্রীয়
জাসাসের (জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা) সহসভাপতি অভিনেতা বাবুল
আহমেদ কয়েকদিন ধরে ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন অলি-গলিতে প্রচারণা চালান।
তিনি যুগান্তরকে বলেন, এবারের নাসিক নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জের ভোটাররা
জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবেন। এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই আমরা গণসংযোগ
চালিয়েছি। আমি নিজেও মুন্সীগঞ্জের মানুষ। মুন্সীগঞ্জের ভোটারদের সঙ্গে কথা
বলে বুঝতে পেরেছি তারা ধানের শীষে ভোট দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নির্বাচন
অবাধ ও সুষ্ঠু হলে মুন্সীগঞ্জ জেলার ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ভোট ধানের শীষে পড়বে
বলে আশা করি। মুন্সীগঞ্জের পর ভাসমান ভোটারদের বড় একটি অংশ চাঁদপুর ও
কুমিল্লা জেলার। এ দুটি জেলার ভোট নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে টানতে দু’দলই
মরিয়া। নীরব ও ভাসমান ভোটারদের পাশাপাশি নাসিকে প্রায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি
ভোটার শ্রমিক। এসব শ্রমিকও জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রাখবেন। শ্রমিকদের বেশিরভাগ
সরাসরি কোনো দলের পক্ষে প্রচারে নামেননি। তারা নির্বাচনী মাঠ পর্যবেক্ষণ
করছেন। ভোটের আগের দিন এমনকি ভোটের দিনও অনেক শ্রমিক কাকে ভোট দেবেন সে
ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। এসব শ্রমিকদের ভোট টানতে দু’দলই চেষ্টা চালিয়ে
যাচ্ছে। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে দেয়া হচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি।
শীতলক্ষ্যা নদীর ২নং ঘাট এলাকার শ্রমিক নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন,
‘ভোটের আগে অনেকেই অনেক কথা কয়। কিন্তু পরে আর কেউ খবর রাহে না। তাই এবার
ভাইবা (ভেবে) ভোট দিমু।’ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও নাসিক নির্বাচনের
কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক কমিটির সদস্য সচিব ফজলুল হক মিলন যুগান্তরকে বলেন, নীরব
ভোটারদের মাধ্যমেই নাসিকে ধানের শীষের নীরব বিপ্লব ঘটবে। নাসিকে শ্রমিকরা
মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের জীবনমান উন্নয়নে বিগত মেয়র কোনো পদক্ষেপই
নেননি। ধানের শীষের প্রার্থী জয়ী হলে শ্রমিকদের ভাগ্যোন্নয়নে নানা উদ্যোগ
নেবেন বলে তার ইশতেহারে ঘোষণা করেছেন। আশা করি তারা ধানের শীষের পক্ষেই ভোট
দেবেন। আওয়ামী লীগ নেতা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি
অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দিপু যুগান্তরকে বলেন, শ্রমিকদের ভোট সব সময় নৌকায়
যায়। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বর্তমান সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। আশা
করি এবারের নির্বাচনে শ্রমিকরা নৌকার পক্ষেই রায় দেবেন। শুধু শ্রমিক নয়,
নীরব কিংবা ভাসমান ভোটাররাও নৌকায় ভোট দেবেন বলে দাবি করেন আওয়ামী লীগের এ
নেতা।

No comments:
Post a Comment