বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চুরি হওয়া রিজার্ভ
ফেরত আনতে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে
সরকার। ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) এক
আইনজীবী মঙ্গলবার বিবৃতিতে বলেছেন, বাংলাদেশের রিজার্ভের চুরি যাওয়া বাকি
অর্থ ফেরত দেবে না তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অবহেলার কারণেই রিজার্ভের অর্থ
চুরি হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিষয়টি সেদেশের দৈনিক পত্রিকা
ইনকোয়ারারে প্রকাশ পেলে বাংলাদেশ জানতে পারে। বুধবার অর্থমন্ত্রী
সাংবাদিকদের বলেন, চুরি হওয়া রিজার্ভের অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে আমি
আশাবাদী। এর জন্য প্রয়োজনে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করা
হবে। একই কথা বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা।
তিনি যুগান্তরকে বলেন, আরসিবিসিতে পাচার হওয়া রিজার্ভের ৮ কোটি ১০ লাখ
ডলারের মধ্যে তারা দেড় কোটি ডলার ফেরত দিয়েছে। বাকি ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার
ফেরত আনতে আইনি ব্যবস্থাসহ সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে। আইনমন্ত্রী
অ্যাডভোকেট আনিসুল হকসহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল ফিলিপাইনের
ম্যানিলায় অবস্থান করছে। মূলত চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারেই তিনি কাজ
করছেন। মঙ্গলবার ম্যানিলায় এক সংবাদ সম্মেলনে আনিসুল হক বলেছেন,
বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির কেলেংকারির সঙ্গে আরসিবিসি জড়িত, তার প্রমাণও
পাওয়া গেছে। জড়িত আছে বলেই তারা চুরির একটা অংশ ফেরত দিয়েছে। বাকি অর্থ
ফেরত দিতে বাধ্য তারা। গত ফেব্র“য়ারির প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের
ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে (নিউইয়র্ক ফেড) রক্ষিত বাংলাদেশ
ব্যাংকের রিজার্ভের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরির ঘটনা
ঘটে। এর মধ্যে ২ কোটি ডলার চলে যায় শ্রীলংকায় আর বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার
ফিলিপাইনে। শ্রীলংকায় যাওয়া ২ কোটি ডলার ফেরত পাওয়া গেছে বলে বাংলাদেশ
ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। চুরি হওয়া অংশের ১ কোটি ৫২ লাখ ডলার
ফিলিপাইন থেকে ফেরত পাওয়ায় বাকি থাকল আরও ৬ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। এ ঘটনায় জড়িত
থাকার দায়ে আরসিবিসি ব্যাংককে ২ কোটি ১০ লাখ ডলার জরিমানা করে দেশটির
কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চুরির এ ঘটনায় আরবিসির ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে
ফিলিপাইনের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিল মামলা করেছে। বাকি ৬ কোটি ৬০
লাখ ডলার উদ্ধার নিয়ে আলোচনা করতে বর্তমানে ফিলিপাইনে আছে বাংলাদেশের
উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল। সেখানে অবস্থানকালে গত ২৮ নভেম্বর
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল তাদের। কিন্তু সেটি
আগেই বাতিল হয়ে যায়। তবে বৈঠকটি বাতিল হওয়ার ব্যাপারে ম্যানিলাস্থ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ বলেছেন, ফিলিপাইনের একটি শহরে জঙ্গিদের
সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ চলছে।
সে কারণে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্টের
সঙ্গে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ দল বুধবার ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। এদিকে একই দিন মঙ্গলবার
আরসিবিসি ব্যাংকের আইনজীবী থিয়া দায়েপ বিবৃতিত বলেন, বাংলাদেশের রির্জাভের
বাকি অর্থ ফেরত দেয়া হবে না। কারণ হিসেবে তারা বলেন, আগে বাংলাদেশ সরকার
তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করুক। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অবহেলার কারণে রিজার্ভ
চুরির ঘটনা ঘটেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার এ বিবৃতি প্রকাশের পর
বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে সবাই নড়েচড়ে বসেন। একই সঙ্গে ম্যানিলায়
আইনমন্ত্রী তাৎক্ষণিক প্রেস ব্রিফিং করে পাল্টা বলেছেন, আইনগতভাবে এ অর্থ
আরসিবিসি ব্যাংক দিতে বাধ্য। আমরা সে অর্থের ব্যাপারে ম্যানিলায় এসেছি। আশা
করছি আরসিবিসি পুরো দায় নেবে। আরসিবিসি ব্যাংকের বিবৃতির একদিন পর বুধবার
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তাদের বক্তব্যের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক
প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল
ফিলিপাইন গেছে। দলটি দেশে ফিরে এলে বিস্তারিত জানা যাবে। অর্থমন্ত্রী আরও
বলেন, অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজনে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করা
হবে। রিজার্ভ চুরির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন সুবিধাজনক সময়ে প্রকাশ করা হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল
ব্যাংকিং কর্পোরেশন (আরসিবিসি) বক্তব্যকে আমলে নেয়া হচ্ছে না। কারণ শুরু
থেকে বাংলাদেশের রির্জাভ চুরির ঘটনায় আরসিবিসি নিজেদের নির্দোষ দাবি করছে।
অথচ এ ঘটনার অপরাধে মানিলন্ডারিং আইনে তাদের ওপর জরিমানা আরোপ করেছে
ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী
পরিচালক শুভঙ্কর সাহা যুগান্তরকে বলেন, দেড় কোটি মার্কিন ডলার ফেরত পাওয়া
গেছে। এটি আইনি প্রক্রিয়া ও ফিলিপাইনের সহযোগিতায় সম্ভব হয়েছে। বাকি অর্থ
ফেরত আনতে আইনি প্রক্রিয়াসহ প্রয়োজনে যা করতে হয় করা হবে। তিনি আরও বলেন,
আইনমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটি ফিলিপাইনে অবস্থান করছে। আজ দেশে
ফেরার কথা। প্রতিনিধি দল দেশে ফিরে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। তবে
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো ব্যর্থতা রয়েছে বলে মনে করি না।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের চুরি যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে হদিস
না মেলা ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার আরসিবিসিকে পরিশোধ করতে হবে। রিজাল ব্যাংক থেকে
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর দায় চাপিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকৃতি জানালেও
আইনমন্ত্রী বলেছেন, এ কেলেংকারির সঙ্গে আরসিবিসির যে বেশ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে
তা স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তারা তাদের দায় স্বীকার করেছে। সেখানে
৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার আছে এবং আমরা সেগুলো উদ্ধার করতে এসেছি।
ওই অর্থগুলো
আরসিবিসির মাধ্যমেই এসেছে। পরে ওই অর্থের কী হয়েছে না হয়েছে, তা আমাদের
দেখার বিষয় নয়। সিনেট শুনানির সময় রিজাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জো
তানের প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দেন আনিসুল হক। তিনি বলেন, সিনেট
শুনানিতে লরেঞ্জো তান বলেছিলেন, রিজাল ব্যাংকের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের
প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যাংক ওই অর্থ পরিশোধ করবে। আর সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী
হলেও আরসিবিসিকে অর্থ পরিশোধ করা উচিত। ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের
রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বাংলাদেশ ফিলিপাইনের সরকারের
মাধ্যমে ওই ব্যাংকের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকিং
কর্পোরেশনের যে তিনজন সিনিয়র আইনজীবী এ অর্থের বিষয়ে কাজ করছিলেন, তারা গত
(মঙ্গলবার) রাতে পদত্যাগ করেছেন। তিনি মনে করেন, ফিলিপাইনের সরকার অর্থ
আদায়ের ব্যাপারে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করছে। ফলে বাংলাদেশ রিজাল ব্যাংকের
সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করবে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, রিজাল ব্যাংক আগেই দোষ স্বীকার
করেছে। তারা টাকাও ফেরত দিয়েছে। এখন অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি
আরও বলেন, এ ঘটনায় বাংলাদেশে কারও জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত সরকারের। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি
গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, রিজার্ভ চুরি সংক্রান্ত
ড. ফরাসউদ্দিনের প্রতিবেদন নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে। তিনি চূড়ান্ত
প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময় বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্টের চেয়ে ৯০ শতাংশ
পরিবর্তন করা হয়েছে। এটি কীভাবে সম্ভব। তিনি আরও বলেন, আরসিবিসির বিবৃতি
দিয়েছে বাংলাদেশের পত্রিকার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে।

No comments:
Post a Comment