বিএনপির সামনে আপাতত তিন চ্যালেঞ্জ। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মাজার স্থানান্তরে সরকারের চিন্তা, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন- নিকটবর্তী এ তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরব দলটি। গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে কিভাবে এসব ইস্যু মোকাবেলা করা যায় তার কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত দলটির নীতিনির্ধারকরা। তাদের মতে, চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে ভবিষ্যৎ বিএনপির রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, লুই আই কানের নকশার আলোকে জিয়ার মাজার সরানোর চিন্তা-ভাবনা থেকে সরকারকে সরিয়ে আনতে পারলে নেতাকর্মীদের মনোবল আরও চাঙ্গা হবে। আর নাসিক নির্বাচন হবে জনপ্রিয়তার ‘ব্যারোমিটার’। এই নির্বাচনে জয়ী হতে পারলেও ভবিষ্যৎ জাতীয় নির্বাচন ও রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া স্বাধীন নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের লক্ষ্যে দেয়া দলের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হবে। অন্যদিকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যর্থতার পরিচয় দিলে সামনের দিনগুলোতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে তাদের।
তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় নিয়ে শনিবার রাতে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, লুই আই কানের নকশা বাস্তবায়ন মূল উদ্দেশ্য নয়, জিয়ার মাজার সরানোই সরকারের প্রধান টার্গেট। কারণ সরকার জিয়া ও বিএনপির রাজনীতি নিশ্চিহ্ন করে দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চাচ্ছে। কিন্তু দলের প্রতিষ্ঠাতার মাজার নিয়ে সরকার যা খুশি তাই করবে আর বিএনপির লাখো নেতাকর্মী ও সমর্থক এর কোনো প্রতিবাদ জানাবে না এটা ঠিক নয়। শুধু বিএনপি নয়, স্বাধীনতাকামী সচেতন প্রত্যেকটি মানুষ সরকারের এ হঠকারী সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। তিনি বলেন, দলীয় ফোরামে আলোচনা ও নানা পেশার মানুষের মতামত নিয়ে এই ইস্যুতে করণীয় নির্ধারণ করা হবে। রাজপথে জ্বালাও-পোড়াও মানেই তো প্রতিবাদ নয়। এই ইস্যুতে আমরা কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও নিতে পারি। নানা আহ্বানের পরও সরকার যদি তাদের হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে তবে মনে রাখতে হবে কোনো সরকারই শেষ সরকার নয়। তিনি আরও বলেন, জনগণের স্বস্তি ও স্থিতিশীলতার কথা চিন্তা করেই আমরা ইসির প্রস্তাব দিয়েছি এবং নাসিকে অংশ নিয়েছি। নানা শংকা থাকলেও নাসিকে জয়ের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। এজন্য দলের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ইসির প্রস্তাব রাষ্ট্রপতি শেষ পর্যন্ত আমলেও নেবেন এমনটাই মনে করছি আমরা। বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতারা মনে করেন, জিয়াউর রহমানের মাজার সরানোর চিন্তা-ভাবনা থেকে সরকারকে বিরত রাখতে না পারলে তা দলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দলের প্রতিষ্ঠাতাকে নিয়ে সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে আলাদা আবেগ কাজ করে। তাদের আবেগকে গুরুত্ব দিয়েই এ ইস্যুতে করণীয় চূড়ান্ত করতে হবে। শেষপর্যন্ত সরকার মাজার সরিয়ে নিলে এবং এতে কার্যকর প্রতিরোধ গড়া সম্ভব না হলে নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে। নতুন করে সৃষ্ট মাজার ইস্যুকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে দলটি। এই ইস্যুতে সরকারের মনোভাব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দলটির একাধিক শীর্ষ নেতার মতে, ইসি পুরর্গঠনের প্রস্তাব ও নাসিক নির্বাচন নিয়ে সরকার নানামুখী চাপে রয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে এ চাপ মোকাবেলার দিকে না গিয়ে তারা কৌশল হিসেবে উল্টোপথ ধরেছেন। জিয়ার মাজার সরানোর ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিএনপিকে মাঠে নামানোর কৌশল নেয়া হয়েছে। আন্দোলন সংগ্রামে তৃতীয় পক্ষ জ্বালাও-পোড়াও ও নাশকতা করে এর দায়ভার বিএনপির ওপর চাপানো হতে পারে। তাই এই বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে বেশ সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সরকার মাজার সরানোর ব্যাপারে অনড় থাকলে এ ইস্যুতে হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর আন্দোলনের চিন্তা-ভাবনা না থাকলেও তা অত্যন্ত গুরত্বের সঙ্গে নেয়া হয়েছে। দলের প্রতিষ্ঠাতার মাজার নিয়ে নেতাকর্মীর পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষেরও আবেগ রয়েছে। এই আবেগকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর কথা ভাবা হচ্ছে। মাজার সরানোর সরকারের ভাবনা নিয়ে শুরুতেই বিভিন্ন পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধির মতামত নেয়া হবে। সরকার যাতে এমন ভাবনা থেকে সরে আসে সেজন্য তাদের দিয়ে জনমত তৈরির উদ্যোগ নেয়া হবে। পাশাপাশি এ ব্যাপারে আইনগত দিকও খতিয়ে দেখা হবে। সূত্র জানায়, জিয়াউর রহমানের মাজার যাতে না সরানো হয় সেজন্য সংসদের অভিভাবক স্পিকারের সঙ্গে দেখা করবে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। সরকার যাতে জিয়ার মাজার সরানোর চিন্তা থেকে সরে আসে, সেজন্য তার সহযোগিতা চাওয়া হবে। এছাড়া বিভিন্ন সভা-সমাবেশ থেকেও এ ব্যাপারে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হবে। স্পিকারের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে সাক্ষাতের চিন্তা-ভাবনা রয়েছে বিএনপির। এরপরও সরকার অনড় থাকলে সার্বিক বিষয়ে দেশবাসীর কাছে দলের অবস্থান তুলে ধরতে পারেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সূত্র জানায়, বিভিন্ন মহলের আহ্বানের পরও সরকার শেষপর্যন্ত মাজার সরালে রাজনৈতিকভাবে কঠোর সিদ্ধান্তের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বড় দুই দলের দূরত্ব আরও বেড়ে যেতে পারে। নানা ইস্যুতে রাজনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে যে ছাড় দেয়া হচ্ছে, সেখান থেকে সরে যাবে বিএনপি।
ভবিষ্যতে সমঝোতার বিষয়ে সরকারকে আর কোনো আহ্বান জানানো নাও হতে পারে। যে যার পথে হাঁটবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, লুই কান যে নকশা করেছে সেটা পাকিস্তানের চিন্তাধারায়। তারা তো কখনও ভাবেনি বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। আমরা স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর কেন পাকিস্তানের সেই চিন্তাধারাকে বাস্তবায়ন করব। আসলে জিয়াউর রহমানের নাম মুছে ফেলতেই সরকার নানা ষড়যন্ত্র করছে। জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম যুগান্তরকে বলেন, সরকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধার মাজার সরানোর হঠকারী চিন্তা-ভাবনা করছে। মূলত জিয়ার নাম মুছে ফেলে এক নেতার এক দেশ গঠনেই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, সরকার সিদ্ধান্ত নিলে কামান, ট্যাঙ্ক, বন্দুক দিয়ে মাজার সরিয়ে ফেলতে পারবেন। কিন্তু এটার পরিণতি ভালো হবে না। ভবিষ্যতে এসব কর্মকাণ্ডের হিসাব যে নেয়া হবে না তা তো বলা যায় না। তাই সরকারকে বলব, রাজনীতিতে বিভেদ না বাড়িয়ে সমঝোতার উদ্যোগ নিন। এসব হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তিনি।
নাসিক নির্বাচন : নতুন ইস্যু জিয়ার মাজার সরানো ছাড়া আপাতত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে নাসিক নির্বাচনকে নিয়ে নানা পরিকল্পনায় ব্যস্ত দলটির হাইকমান্ড। এই নির্বাচনকে তারা কয়েকটি কারণে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। নির্বাচনে জয়লাভ করলে দেশে ও বিদেশে বোঝানো যাবে এই সরকারের জনপ্রিয়তা নেই। পাশাপাশি প্রশাসন বা দলীয়ভাবে নির্বাচনে কারচুপি করা হলে তাও কাজে লাগানো হবে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনে খালেদা জিয়া যে প্রস্তাব দিয়েছেন এর গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। তাই এ নির্বাচনকে এসিড টেস্ট হিসেবে নিয়েই নানা ছক তৈরি করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের কোন্দলকেও কাজে লাগাতে চান তারা। জেলা ও মহানগর বিএনপি নেতাদের ভেদাভেদ ভুলে একযোগে মাঠে নামানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। এই নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে ১০৪ জন নেতাকে নির্বাচনী মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শনিবার নাসিক নিয়ে স্থানীয় সব নেতার সঙ্গে বৈঠক করে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক কমিটি। সেখানে প্রার্থীর জয় নিয়ে নানা কৌশল চূড়ান্ত করা হয়। সব মিলিয়ে নাসিকে জয় ছাড়া কিছু ভাবছে না দলটি।
ইসির প্রস্তাব : স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনে ১৮ নভেম্বর একটি বিশদ প্রস্তাব তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। ওই প্রস্তাব ক্ষমতাসীনরা প্রত্যাখ্যান করলেও নানামহল তা ইতিবাচকভাবে নেয়। সরকার প্রত্যাখ্যান করলেও থেমে যায়নি বিএনপি। এ ইস্যুতে জনমত তৈরির নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দলের পাশাপাশি জোটের পক্ষ থেকেও নানা কর্মসূচি নেয়া হবে। জনমত তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকেও এই ইস্যুতে একই প্লাটফরমে আনার চেষ্টা চলছে। সরকার প্রত্যাখ্যান করলেও দলটির নেতারা মনে করেন, খালেদা জিয়ার প্রস্তাব নিয়ে শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি উদ্যোগ নেবেন। এই ব্যাপারে রাষ্ট্রপতিকে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাবের কপি ও তাদের দাবি নিয়ে আলোচনা করতে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ চেয়ে ইতিমধ্যে টেলিফোন ও পরে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়া হয়েছে। তারা এখনও রাষ্ট্রপতির সাড়ার অপেক্ষায় আছেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাও বলেছেন, ‘ওনার (খালেদা জিয়া) প্রস্তাব উনি দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতিকে বলুক তিনিই (রাষ্ট্রপতি) ব্যবস্থা নেবেন।’ সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি সবার মতামতের ভিত্তিতেই ইসি গঠন করবেন এমন প্রত্যাশা বিএনপির। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকারকে বাধ্য করা গেলে সামনের নির্বাচন নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হবে।
ইসির প্রস্তাব : স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনে ১৮ নভেম্বর একটি বিশদ প্রস্তাব তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। ওই প্রস্তাব ক্ষমতাসীনরা প্রত্যাখ্যান করলেও নানামহল তা ইতিবাচকভাবে নেয়। সরকার প্রত্যাখ্যান করলেও থেমে যায়নি বিএনপি। এ ইস্যুতে জনমত তৈরির নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দলের পাশাপাশি জোটের পক্ষ থেকেও নানা কর্মসূচি নেয়া হবে। জনমত তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকেও এই ইস্যুতে একই প্লাটফরমে আনার চেষ্টা চলছে। সরকার প্রত্যাখ্যান করলেও দলটির নেতারা মনে করেন, খালেদা জিয়ার প্রস্তাব নিয়ে শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি উদ্যোগ নেবেন। এই ব্যাপারে রাষ্ট্রপতিকে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাবের কপি ও তাদের দাবি নিয়ে আলোচনা করতে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ চেয়ে ইতিমধ্যে টেলিফোন ও পরে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়া হয়েছে। তারা এখনও রাষ্ট্রপতির সাড়ার অপেক্ষায় আছেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাও বলেছেন, ‘ওনার (খালেদা জিয়া) প্রস্তাব উনি দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতিকে বলুক তিনিই (রাষ্ট্রপতি) ব্যবস্থা নেবেন।’ সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি সবার মতামতের ভিত্তিতেই ইসি গঠন করবেন এমন প্রত্যাশা বিএনপির। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকারকে বাধ্য করা গেলে সামনের নির্বাচন নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হবে।

No comments:
Post a Comment