ক্ষমতার
প্রতিমূর্তি হিসেবে তিনি একসময় ইউরোপীয় মঞ্চ কাঁপিয়েছেন। একাধারে পর পর
তিনবার জার্মানির চ্যান্সেলর পদে নির্বাচিত হয়ে ইউরোপের অন্যতম শক্তিধর দেশ
জার্মানিকে এখনও শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি জার্মান চ্যান্সেলর
অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। ইউরোপ মহাদেশের উদারনৈতিক রাজনীতির পুরোধা মার্কেলকে
ইউরোপীয় ঐক্যের চ্যাম্পিয়ন বলা হয়। জার্মান অর্থনীতিকে তিনি প্রায় একযুগ
ধরে শক্তিশালী ও চাঙ্গা রেখেছেন। অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের সেই জার্মানির
রাজধানী বার্লিনের রাজপথে চলতি সপ্তাহে ভয়ংকর ও বর্বরোচিত এক সন্ত্রাসী
হামলা হয়েছে। বড় ধরনের এ সন্ত্রাসী হামলা মার্কেলের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই
চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
তাছাড়া অভিবাসী সংকটের প্রতি তার যে
উদারনীতি অর্থাৎ ‘ওপেন বর্ডার অ্যাপ্রোচ’-এর যে ঝুঁকি সেটাকে স্মরণ করিয়ে
দিল এ হামলা। সর্বোপরি বর্ধিষ্ণু সন্ত্রাসবাদের মুখে জার্মান ফেডারেল
কর্তৃপক্ষের অপরিমেয় ব্যর্থতাকেও মনে করিয়ে দিল। বার্লিনের কেন্দ্রে একটি
মার্কেটে ক্রিসমাসের কেনাকাটার জন্য বহু জার্মানের সমাগম হলে অমানবিক এ
আক্রমণ করা হয়েছিল। পাশবিক এ হামলার প্রধান সন্দেহভাজন হচ্ছে তিউনিসীয় এক
রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী আনিস আমরি। আনিস আমরি আগে থেকেই জার্মানির সন্ত্রাস
তদন্তকারী একটি দলের তদন্তাধীন ছিল। কিন্তু তাকে দেশে ফিরিয়ে না দিয়ে বরং
তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল, এমনকি সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা থাকা
সত্ত্বেও। সিএনএনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জার্মান নিরাপত্তা কর্মকর্তারা
বলেন, জার্মানিতে সক্রিয় ইসলামিক স্টেট সন্ত্রাসীদের জন্য সদস্য সংগ্রহকারী
একটি দলের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। আনিস আমরির বর্বরোচিত হামলার ঘটনা
অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের উদারনৈতিক অভিবাসী নীতিকে নতুন করে ঝুঁকিতে ফেলে
দিয়েছে। ২০১৫ সালের শুরু থেকেই ইউরোপে সে াতের মতো অভিবাসী আসতে থাকে।
বিরোধীদের অনেক সমালোচনা সত্ত্বেও মার্কেল প্রায় ১০ লাখ অভিবাসীকে
জার্মানিতে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। মার্কেলের সরকার আরও আলোচিত এ কারণে,
তার সরকার অভিবাসী নীতিতে ব্যাপক শিথিলতা দেখিয়েছে এবং দেশটিতে ইসলামি
সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। সব কারণে
জার্মানিতে মার্কেলের জনপ্রিয়তা ইতিমধ্যে পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিচে
নেমে গেছে। সাম্প্রতিক এ সন্ত্রাসী হামলার আগেই তার জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছিল।
গত সেপ্টেম্বর মাসে এক জরিপে তার জনপ্রিয়তা ৪৭ ভাগ বলে দেখানো হয়েছিল।
শরণার্থী সংকটের ব্যাপারে মার্কেলের দৃঢ় অবস্থান ইতিমধ্যে পোল্যান্ড ও
হাঙ্গেরিসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এটা সেই
জার্মানি যার ক্ষমতা এক সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নে অগ্রাহ্য করা হতো না। কিন্তু
বর্তমানে মার্কেলের জার্মানির আর সেই অবস্থা নেই।
তবে মার্কেল সরকার
ক্রমান্বয়ে প্রত্যাখ্যাত ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। বিপরীতে ক্রিসচিয়ান
সোস্যাল ইউনিয়ন জোটের অবস্থান ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হচ্ছে। সম্ভবত আগামী
বছরেই জার্মানিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আর এ নির্বাচনে
অ্যাঞ্জেলা মার্কেল চতুর্থবারের মতো তার দলের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন।
জার্মান ফেডারেল নির্বাচনে নির্বাচিতে হয়ে তিনি ক্ষমতায় ফিরে এলেও আগের মতো
শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন না বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আর এর
একমাত্র কারণ মার্কেল তার নিজের দেশের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর উদার
মানবতাবাদকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটা সত্য, একের পর এক সন্ত্রাসী হামলায়
ইউরোপ অনেকটাই ভীত হয়ে পড়েছে। এ সপ্তাহের বার্লিন হামলাও ভয়াতুর ইউরোপজুড়ে
যেন একটা ঝাঁকুনি দিয়েছে। এই সন্ত্রাসী হামলার কারণে ইউরোপের বহু নেতাই এখন
মার্কেলের সমালোচনা করছে এবং এটা আরও তীব্রতর হতে পারে। বিশেষ করে পূর্ব
ইউরোপ ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলোর নেতারা মার্কেলের অভিবাসী নীতির সমলোচনায়
সোচ্চার। কারণ তারা মনে করছেন মার্কেলের এ উদার অভিবাসী নীতি ইউরোপ
মহাদেশকে আরও নাজুক করে তুলছে। সিএনএন।

No comments:
Post a Comment