বাঘাবাড়ি
নৌবন্দর ট্রানজিট বাফার গুদামে মজুদ জমাট বাঁধা সার সরবরাহ নিতে ডিলাররা
অস্বীকার করেছে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রায় সাড়ে ৫
হাজার টন রাসায়নিক সার জমাট বেঁধেছে। গত বছর চীন থেকে এই সার আমদানী করা
হয়েছে। বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ কাঠের হ্যামার দিয়ে জমাটবাঁধা সার গুড়ো করে নতুন
বস্তায় রিপ্যাকিং করছে। পরে রিপ্যাকিং করা এই সার উত্তরাঞ্চলের ১৪টি বাফার
গুদামে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এদিকে বাফার গুদামের জমাট বাঁধা সার সরবরাহ নিতে
ডিলাররা অস্বীকার করেছে। সরেজনি বাঘাবাড়ী ঘুরে ও বন্দর সূত্রে জানা যায়,
বিসিআইসি আমদানীকারকদের মাধ্যমে চীন, মিশর, সৌদি আরব, তিউনিশিয়াসহ বিভিন্ন
দেশ থেকে ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি সার আমদানি করে। পরে বিভিন্ন
ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মাধ্যমে ওই সার বাফার গুদামে পৌঁছে দেয়া হয়।
সুমুদ্র পথে বড় জাহাজে সার আমদানি করা হয়। পরে লাইটারেজ জাহাজে সার আনলোড
করে বাঘাবাড়ী বন্দরে আনা হয়। সেখান থেকে সড়ক পথে সার মজুদের জন্য
উত্তরাঞ্চলের ১৪টি বাফার গুদামে পাঠানো হয়। বাফার গুদামগুলোতে জায়গা না
থাকায় বাঘাবাড়ীর বড়াল নদীর উত্তর-দক্ষিণ পাড়ে সারের বস্তা স্তুপ করে রাখা
হয়েছে। কুয়াশায় ভিজে, রোদে শুকিয়ে শক্ত ও জমাট বেঁধে সার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সার পরিবহণ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বাল্ক এন্ট্রারপ্রাইজের প্রতিনিধি শাহান
শাহ জানিয়েছেন, গত বছর চীন থেকে আমদানীকৃত সার জাহাজ যোগে বাঘাবাড়ি বন্দরে
আনা হয়। বাফারগুদামে জায়গা না থাকার কারণে বাংলাদেশ ক্যামিক্যাল
ইন্ড্রাসট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) ওই সার বুঝে নেয়নি। ফলে প্রায় ১০
হাজার টন রাসায়নিক সার বন্দর এলাকায় খোলা জায়গায় মজুদ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন
খোলা আকাশের নিচে রাসায়নিক সার মজুদ করে রাখায় বৃষ্টি, কুয়াশায় ভিজে, রোদে
শুকিয়ে শক্ত ও জমাট বেঁধে গেছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বিসিআইসি কর্তৃপক্ষের
নির্দেশে জমাটবাঁধা সার গুড়ো করে তা রিপ্যাকিং করছে। পরে ওই সার
উত্তরাঞ্চলের পাবনাÑসিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী, বগুড়া, শান্তাহার, জয়পুরহাট,
রাজশাহী, নাটোর, রংপুর, লালমনিহাটের মহেন্দ্রনগর, দিনাজপুর, পার্রতীপুর
চরকাট, ঠাকুরগা, বিরামপুর ও গাইবান্ধায় বাফার গুদাম রয়েছে। গত বছরের সারে
বাফার গুদামগুলো ভরা রয়েছে। ফলে বন্দরে যে পরিমান সার আসছে, তা বন্দর
এলাকাতেই পড়ে থাকছে। দীর্ঘ দিন পড়ে থাকা সারের কার্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে,
ঝাঁঝালো গন্ধে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। সরেজমিন বাঘাবাড়ী বন্দরে গিয়ে জানা যায়,
প্রায় ছয় মাস ধরে হাজার হাজার মেট্রিক টন রাসায়নিক সার নদী তীরবর্তী ভেজা ও
স্যাঁৎসেঁতে মাটিতে ষ্ট্যাক দিয়ে রাখা হয়েছে। বৃষ্টি ও কুয়াশাতে ভিজে রোদে
পুড়ে সারের কার্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বাঘাবাড়ী বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে এই
সমস্যা চলছে। বাঘাবাড়ীর বড়াল নদীর উত্তর ও দক্ষিন পাড়ের বিভিন্ন স্থানে
হাজার হাজার টন সারের বড় বড় স্তুপ পড়ে আছে। বাতাসে ভাসছে সারের তীব্র
ঝাঁঝালো গন্ধ। আশপাশের এলাকায় এই গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। সারের ঝাঁঝালো গন্ধে
পরিবেশ দূষিত হচ্ছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন। স্থানীয় কৃষি বিভাগ,
বাঘাবাড়ী বন্দর ও ডিলারদের সূত্রে জানা গেছে, চীন থেকে আমদানি করা
বিসিআইসির বাঘাবাড়ী বাফার গুদামে মজুদ প্রায় ২ হাজার ৬৫০ টন ইউরিয়া সার এবং
পরিবহন ঠিকাদারদের হেফাজতে থাকা বন্দর এলাকায় মজুদ প্রায় ৩ হাজার টন
ইউরিয়া সার বস্তায় জমাট বেঁধে গেছে। ওই জমাট বাঁধা সার গুড়ো করে সরবরাহ
করায় রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলার কৃষকরা চলতি ইরি-বোরো আবাদে ভাল ফলন
পাওয়া যাবে কি না তা সংশয়ে রয়েছেন। বিসিআইসির বগুড়া আঞ্চলিক অফিসের
কর্মকর্তা মোঃ শামিম আক্তার বলেন, উত্তরাঞ্চলের ১৪টি বাফার গুদামে এ বছর
প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টন সার মজুদ রয়েছে। চলতি ইরি-বোরো আবাদ মওসুমে সারের
চাহিদা ধরা হয়েছে ৩ লক্ষ ৮২ হাজার টন। ফলে সার সঙ্কটের কোন সম্ভাবনা নেই।
জমাট বাঁধা সারের নমুনা ঢাকার পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে গুণগত মান ঠিক আছে
নিশ্চিত হয়েই সার রিপ্যাকিং করে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ দিকে সিরাজগঞ্জ জেলার
ডিলাররা জমাট বাঁধা সার উত্তোলনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা নতুন আমদানী করা
সার সরবরাহের দাবী করে সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের
কর্মকর্তাদের কাছে আবেদন করেছেন। এই আবেদন পত্র পাওয়ার পর সিরজগঞ্জ
কৃষিসম্প্রসারণ বিভাগের উপ পরিচালকের কার্যালয় থেকে নতুন আমদানী করা সার
সরবরাহের জন্য বাঘাবাড়ি বাফার গুদাম ইনচার্জকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই
সাথে জমাট বাঁধা সারের বস্তা ক্র্যাসিংয়ের মাধ্যমে রিপ্যাকিং করে সরবরাহ
করার কথা বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ জেলা সার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি
মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম জানান, কৃষকরা জমাট বাঁধা সার নিতে অনিহা প্রকাশ করায়
আমরা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছি। বাঘাবাড়ি
বাফার গুদামের ইনচার্জ মোঃ সোলায়মান জানান,
গুদামে মজুদ জমাট বাঁধা সার
সরবরাহ করা হচ্ছে না। নতুন আমদানী করা সার সরবরাহ করা হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের
১৪টি বাফার গুদামে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আমদানি করা
সার বন্দর এলাকায় মজুদ করে রাখছে। ঠিকাদারের হেফাজতে থাকা জমাট বাঁধা সার
গ্রহন করা হচ্ছে না। সেগুলো গুড়ো করে রিপ্যাকিং করার পরই গ্রহন করা হবে।
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ পরিচালক মোঃ আরশেদ আলম জানান,
ডিলারদের অভিযোগের ভিত্তিতে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা
কৃষি কর্মকর্তাসহ ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি
বাঘাবাড়ি বাফার গুদাম পরিদর্শন করে সেখানে রক্ষিত ৯ হাজার টন সারের মধ্যে ২
হাজার ৬৫০ টন সার জমাট বাধা অবস্থায় পান। পরীক্ষা করে সারের গুণগতমান ভাল
পাওয়া গেছে। সে জন্য জমাট বাঁধা সার গুড়ো করে রিপ্যাকিং করে দিতে এবং
ডিলারদের মাঝে এবছর নতুন আমদানীকৃত সার সরবরাহের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আলীমুন রাজীব বলেন, জমাটবাধা
সারগুলো রিপ্যাকিং করে ব্যবহার উপযোগী করা হচ্ছে। সারগুলো জমাট বাঁধলেও এর
গুণগতমান এখনো সঠিক মাত্রায় বজায় রয়েছে। তাই এ সার গুলো রিপ্যাকিং করে
সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।

No comments:
Post a Comment