Monday, January 30, 2017

এবার দুর্ধর্ষ দস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর আত্মসমর্পণ

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভির মধ্যস্থতায় সুন্দরবনের দুর্ধর্ষ দস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেছে। রোববার দুপুরে বরিশালে র‌্যাব-৮ এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের হাতে বাহিনীপ্রধান জাহাঙ্গীরসহ ২০ জন ৩১টি আগ্নেয়াস্ত্র ও এক হাজার ৫০৭ রাউন্ড গুলি জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণকারীদের বিরুদ্ধে এদিন বিকালে বাগেরহাটের শরণখোলা থানায় দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে। র‌্যাব-৮ এর ডিএডি মো. দোলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
জমা দেয়া অস্ত্র ও গুলি শরণখোলা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। জানা যায়, জাহাঙ্গীর বাহিনী সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় দস্যু বাহিনী হিসেবে পরিচিত। এ বাহিনীর দৌরাত্ম্যে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল কৃষক, জেলে ও ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ ছিলেন। জাহাঙ্গীর বাহিনীর আত্মসমর্পণ নিয়ে এ পর্যন্ত যমুনা টিভির মধ্যস্থতায় সুন্দরবন এলাকায় সক্রিয় দস্যু বাহিনীগুলোর মধ্যে ৯টি বাহিনী আত্মসমর্পণ করল। জাহাঙ্গীর বাহিনীর আগে মাস্টার বাহিনী, নোয়া বাহিনী, খোকাবাবু বাহিনী, শান্ত বাহিনী, আলম বাহিনী, সাগর বাহিনী, মস্তু বাহিনী ও ইলিয়াস বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণের পর ৯০ জনের অধিক দস্যু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। আত্মসমর্পণকারী দস্যুরা হল- বাগেরহাট ও যশোর জেলার বাসিন্দা ও জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শিকারী (৩৮), তার সহযোগী শেখ মো. ফরিদ (৩৮), মারুফ শেখ (৪১), আকরাম শেখ (৩৫), মোস্তাহার শেখ (৫০), এরশাদ খান (৩৫), গাজী তরিকুল ইসলাম (৩৫), কামরুল শেখ (২২), কামরুল হাসান (৩৮), হায়দার শেখ (২৯), হারুন শেখ (৫৫), আইয়ুব আলী শেখ (৫২), মাফিকুল গাজী (৩৮), কবির গাজী (৩২), পলাশ হোসেন (৩৫), বাছের শিকদার (২৬), হান্নান সরদার (২৩), ইজাজ মোল্লা (৪১), মহাসিন মোড়ল (৩৯) ও ইয়াকুব সরদার (২৯)। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা রক্ত ঝরাতে চাই না। আমরা চাই ভুল পথ থেকে দস্যুরা ফিরে আসুক। তাদের জন্য আমাদের পথ সবসময় খোলা।
সুস্থ জীবনের বিকল্প কিছুই নেই। যারা এখনও আত্মসমর্পণ করেননি তাদেরও পরিবার রয়েছে, যদি সুন্দর জীবনযাপন করতে চান তাহলে সময় আছে আত্মসমর্পণ করার। তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্যজীবী বা জেলেদের জন্য মূর্তিমান আতংকের নাম ছিল জাহাঙ্গীর ওরফে শিকারী বাহিনী। এ বাহিনীর একটি অংশ এর আগে আত্মসমর্পণ করেছিল। এখন সবাই করল। জাহাঙ্গীর বাহিনী জলদস্যু বা বনদস্যু বাহিনীগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় একটি বাহিনী। এ বাহিনী যে অস্ত্র ব্যবহার করত তা ১০ হাজার বা এক লাখ টাকার অস্ত্র নয়, এগুলো অনেক দামি অস্ত্র। এ অস্ত্রগুলো তারা কোথায় বা কিভাবে পেল সেটাও বের করা হবে। যারা এসব জলদস্যু ও বনদস্যুদের মদদ দিচ্ছে তাদেরও রেহাই দেয়া হবে না। বিশেষ অতিথি র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, জলদস্যুদের মদদদাতাদেরও তালিকা করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বরিশাল র‌্যাব-৮ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ার-উজ জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন র‌্যাব-৬ এর অধিনায়ক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, মহানগর পুলিশ কমিশনার এসএম রুহুল আমিন, জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান প্রমুখ। উল্লেখ্য, যমুনা টেলিভিশনের মধ্যস্থতায় গত ৩১ মে সুন্দরবনের কুখ্যাত জলদস্যু ‘মাস্টার বাহিনী’র ১০ দস্যু ৫২টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রায় তিন হাজার ৯০৪ রাউন্ড গুলি জমা দিয়ে প্রথমবারের মতো আত্মসমর্পণ করে।
এর ধারাবাহিকতায় ১৪ জুলাই ‘মজনু ও ইলিয়াস বাহিনী’র ১১ জন ২৫টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং এক হাজার ২০ রাউন্ড গুলি জমা দেয়। ৭ সেপ্টেম্বর জলদস্যু ‘আলম ও শান্ত বাহিনী’র ১৪ জলদস্যু ২০টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং এক হাজার ৮ রাউন্ড গুলি জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। ১৯ অক্টোবর সাগর বাহিনীর ১৩ সদস্য ২০টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৯৬ রাউন্ড গুলি জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। গত ২৮ নভেম্বর খোকাবাবু বাহিনীর ১২ সদস্য ২২টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র ও এক হাজার তিন রাউন্ড গুলিসহ র‌্যাব-৮ এর কাছে আত্মসমর্পণ করে। ৭ জানুয়ারি নোয়া বাহিনীর ১২ সদস্য ২৫টি অস্ত্র ও এক হাজার ১০৫ রাউন্ড গুলিসহ আত্মসমর্পণ করে। সর্বশেষ রোববার বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর ২০ সদস্য ৩১টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র ও এক হাজার ৫০৭ রাউন্ড গুলি জমা দিয়ে আত্মসর্মপণ করল। র‌্যাব-৮ এর পরিচালক লে. কর্নেল আনোয়ার-উজ জামান জানান, বিশাল সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার উপকূলবর্তী মানুষ প্রতিনিয়তই দস্যুদের আক্রমণের শিকার হয়। সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকায় বনদস্যু, জলদস্যুদের দমনের লক্ষ্যে র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড, বিজিবি ও বন বিভাগের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স কাজ করছে।

No comments:

Post a Comment