Wednesday, January 25, 2017

তাহলে এবার আইনটি হচ্ছে না?

নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন নিয়ে যে ৩০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বঙ্গভবনে আলোচনায় মিলিত হয়েছে, তাদের মধ্যে জাতীয় সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং দু’-একটি ছোট দল ছাড়া বাকি সব দল কমিশন গঠনের জন্য এখনই সংবিধান নির্দেশিত আইন প্রণয়নের পক্ষে মতপ্রকাশ করেছে। আইন প্রণয়নের পক্ষে মত পোষণকারী দলগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, জাতীয় সংসদে বিরোধী দল এবং একইসঙ্গে সরকারে থাকা জাতীয় পার্টি, এলডিপি, জাসদ, গণফোরাম, ইসলামী ঐক্যজোট, বিএনএফ, তরিকত ফেডারেশন,
বিজেপি, বাসদ, বিকল্পধারা, ইসলামী আন্দোলন, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, জমিয়েতে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, জাকের পার্টি ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল)। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী ৯টি নিবন্ধিত দলকে বঙ্গভবন থেকে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বঙ্গভবন থেকে এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি। তবে বঙ্গভবন সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রপত্রিকায় আরও বলা হয়েছে, ১৮ জানুয়ারি জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির বৈঠকের মধ্য দিয়ে সংলাপ শেষ হয়েছে। আলোচনায় যোগদানকারী প্রায় সব রাজনৈতিক দলই শুধু নয়, সুশীল সমাজ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম সচেতন জনগণ সবাই চাচ্ছেন আগামী ইসি গঠনের আগে এ সংক্রান্ত আইন প্রণীত হোক। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আগামী ইসি গঠনের আগে আইনটি প্রণয়নের কোনো সম্ভাবনা নেই।
দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি কেন আগামী ইসি গঠনের আগে এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করল না, দলটি এখন পর্যন্ত তার আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপের বরাত দিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, বর্তমান সংসদে বিএনপির কোনো প্রতিনিধি না থাকায় ইসি গঠনের জন্য এখনই আইন প্রণয়নের পক্ষে নয় দলটি। কারণ বর্তমান সংসদে আইন প্রণয়ন করা হলে তাতে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে না। বরং আওয়ামী লীগ নিজেদের সুবিধামতো আইনটি করে নেবে। বিএনপির এ ধরনের চিন্তাভাবনার সঙ্গে অনেকের মতো আমিও একমত নই। কারণ শাসক দল এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে যাবে না, যা কোনো এক সময় তাদের নিজেদের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া আইনটি আগামী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য করা হয়েছে বলে জনমনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাবে, যা ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের জন্য শুভ হবে না। গত ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনায় আওয়ামী লীগ ইসি গঠনে এখনই উপযুক্ত আইন প্রণয়ন এবং সময়াভাবে তা সম্ভব না হলে অধ্যাদেশ জারির প্রস্তাব দেয়। তবে দলটি এখনই ইসি গঠন আইন প্রণয়নে কতটা আন্তরিক তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংলাপের পরদিন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ইসি গঠনে এখনই আইন প্রণয়নের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। ১২ জানুয়ারি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, তার মনে হয় এ আইনটা ঝটপট তৈরি করা যায় না। এটার একটা সুদূরপ্রসারী ইফেক্ট আছে।
সে কারণে এ আইনটা চিন্তাভাবনা করে করা উচিত। সেক্ষেত্রে তিনি রাষ্ট্রপতির নির্দেশনার অপেক্ষা করবেন (যুগান্তর, ১৩ জানুয়ারি)। তবে ‘সুদূরপ্রসারী ইফেক্ট’ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিতভাবে কিছু বলেননি। তবে এটি যে আইনমন্ত্রীর নিজস্ব মতামত তা ভাবার কারণ নেই। বরং এতে ইসি গঠন আইন প্রণয়ন সম্পর্কে আওয়ামী লীগের অন্তর্নিহিত চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। আসলে বিএনপি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনায় ইসি গঠন আইন প্রণয়ন সম্পর্কে কোনো প্রস্তাব না করায় আওয়ামী লীগ সুযোগটি হাতছাড়া করতে চায়নি। আইন করার প্রস্তাব করে তারা জনগণের মন জয় করতে চেয়েছে। এ যাবৎ আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেছে। এর পরের অবস্থান বিএনপির। কিন্তু এ দুটি দল সরকার গঠন করে ইসি গঠন আইন প্রণয়নে কোনো উদ্যোগ নেয়নি, যদিও এ বিষয়ে সংবিধানে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে এবং রাষ্ট্রপতি সময়ে সময়ে যেরূপ নির্দেশ করবেন, সেরূপ সংখ্যক অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকবে এবং এ বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করবেন। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারের সংখ্যা অনধিক চারজনে নির্ধারণ করা হয়েছে। সংবিধান প্রণীত হওয়ার চার দশকের বেশি সময় ধরে এ দুটি দল শুধু সংবিধান নির্দেশিত ইসি গঠন আইন প্রণয়নে উদ্যোগ নেয়া থেকে বিরত থাকেনি,
বরং তারা তাদের দলীয় ভাবধারায় বিশ্বাসী বা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ দিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে তাদের সহায়তায় জয়লাভ করে ক্ষমতায় থাকার সময় দীর্ঘায়িত করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, আগামী ইসি গঠনের আগে এ সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন জরুরি কেন? দেশে দলীয় সরকারের সময় গঠিত ইসি এবং তাদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এ প্রশ্নের উত্তর সহজে পাওয়া যাবে। স্বাধীনতার পর এ যাবৎ ১১ জন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে ইসি গঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রথম ইসি গঠিত হয় বিচারপতি মো. ইদ্রিসের নেতৃত্বে। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে। আশ্রয় নেয় ভয়ভীতির। কোনো কোনো আসনে বিরোধী প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে ১১টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। কমিশন সংসদের মোট ৩০০ আসনের ২৯৩টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দু’জন সামরিক শাসক সামরিক ও বেসামরিক পোশাকে ১৫ বছর দেশ শাসন করেন। বেসামরিক পোশাকে রাজনৈতিক দল গঠন করে তারা যে তিনটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, সেসব নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ১৯৭৭ সালে বিচারপতি একেএম নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে এবং ১৯৮৫ সালে বিচারপতি চৌধুরী এটিএম মাসুদের নেতৃত্বে গঠিত ইসি এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে একটি বা দুটি বাদে অন্যসব ইসি দলীয় সরকারের আমলে গঠিত হলেও এ সময়ের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। ইসি ও নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতার কারণে এসব নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে সরকার গঠিত সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাবেক সচিব কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় বর্তমান পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ইসি। এ কমিশনে আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক একাধিক কমিশনার নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। এ কমিশন এ পর্যন্ত তাদের পরিচালিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন,
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, সংবিধান নির্দেশিত আইন প্রণয়ন না করে আগামী ইসি গঠিত হলে তার ফলাফল কী হতে পারে? এর উত্তরে বলা যায়, এর আগে দলীয় সরকারগুলোর আমলে ক্ষমতাসীন দলের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিদের নিয়ে যেভাবে কমিশন গঠিত হয়েছে এবারও তা-ই হবে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করে নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি গঠনের যে প্রস্তাব করেছে তা বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। গতবারের সার্চ কমিটি ও বর্তমান ইসি গঠন এর প্রমাণ। সরকারি দল আওয়ামী লীগ তথা প্রধানমন্ত্রী সার্চ কমিটিতে যাদের নাম প্রস্তাব করবেন, রাষ্ট্রপতি তা-ই অনুমোদন করবেন। আর সে সার্চ কমিটি যে সরকারের পছন্দসই ব্যক্তিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করবে তা বলাই বাহুল্য। কারণ সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে এসব পদে নিয়োগদানে কোনো স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা দেয়নি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগদানে সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। সংবিধান নির্দেশিত ইসি আইন প্রণীত হলে এবং সে আইনে বিশেষ কিছু বিধান রাখার ব্যবস্থা করা গেলে আগামীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে। এসব বিধানের মধ্যে যেগুলো অত্যাবশ্যক সেগুলো হল- ক. সংবিধানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ইত্যাদির উল্লেখ না থাকায় তা নির্ধারণ করে দেয়া; খ. সার্চ কমিটি গঠন করা; গ. প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ন্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগদান প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার বাইরে রাখা; ঘ. সার্চ কমিটির সুপারিশ জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় কমিটিতে চূড়ান্তকরণ ও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা অনুমোদন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান। এসব প্রস্তাবের মধ্যে কেবল গ-তে উল্লিখিত প্রস্তাবটির ক্ষেত্রে সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে সংশোধনী আনতে হবে। সংসদের চলতি অধিবেশনে সংবিধানের উল্লিখিত সংশোধনী এবং ইসি গঠন আইন বিল পাসের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এজন্য নতুন কমিশন গঠন কিছুদিন পিছিয়ে দেয়া যেতে পারে। দৈনন্দিন কাজগুলো নির্বাচন কমিশন সচিবালয় নিষ্পন্নে ক্ষমতাবান।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক
latifm43@gmail.com

No comments:

Post a Comment