বাংলায়
একটা কথা আছে, ‘যত গর্জায় তত বর্ষায় না’। অনেকের ধারণা আমেরিকার নতুন
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যত গর্জাচ্ছেন, তত বর্ষাবেন না।
শপথগ্রহণ-পরবর্তী ভাষণে ট্রাম্পের যে উগ্রমূর্তি দেখা যায়, হোয়াইট হাউসে
তার পাঁচ বছর অবস্থানের সময়ে হয়তো তার সেই মূর্তি দেখা যাবে না। এটা অতি
আশাবাদীদের আশা। কিন্তু পশ্চিমা সুশীল সমাজের বড় অংশেরই ধারণা, ডোনাল্ড
শুধু আমেরিকার জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্যই বিপজ্জনক নীতি অনুসরণ করবেন।
এখন দেখার রইল, ডোনাল্ড ট্রাম্প সত্যই বাঘ, না আসলে মোষ, বাঘের চামড়া ধারণ
করেছেন মাত্র। গত শনিবার লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে বিশাল নারী
মিছিল দেখছিলাম। তাদের কণ্ঠে ট্রাম্পবিরোধী স্লোগান এবং প্লাকার্ডে
ট্রাম্পবিরোধী নানা উক্তি। শুধু ইউরোপে নয়, বিশ্বের বহু শহরে ট্রাম্পের
বিরুদ্ধে নারী-বিক্ষোভ বিশালভাবে গর্জে উঠেছে। এটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের
জন্য শুভ সূচনা নয়। কোনো কোনো মার্কিন সাংবাদিক আশংকা প্রকাশ করেছেন,
ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি তার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভকে গ্রাহ্য করে
নিজেকে সংযত ও সংশোধন না করেন, তাহলে তার পরিণতি হতে পারে প্রেসিডেন্ট
নিক্সনের মতো। যে কোনো বড় ভুলত্রুটির জন্য তার ইমপিচমেন্ট হতে পারে।
ট্রাম্প-প্রেসিডেন্সির শুরুতেই এতটা আশংকা আমি পোষণ করি না। আমার অনেক
বামপন্থী বন্ধু ট্রাম্পকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেন। হিটলারের
ইহুদি-বিদ্বেষ ও ট্রাম্পের মুসলমান-বিদ্বেষের মধ্যে সঙ্গতি দেখাতে চান।
হিটলার ছিলেন প্রতিবেশী অস্ট্রিয়া দেশটির ওপর বেজায় চটা। ক্ষমতায় এসেই তিনি
অস্ট্রিয়া গ্রাস করেছিলেন। অন্যদিকে আমেরিকার ট্রাম্প প্রতিবেশী মেক্সিকো
দেশটির ওপর বিরূপ। তার দেশে বহিরাগত ঠেকাতে তিনি মেক্সিকো সীমান্তে বিশাল
উঁচু দেয়াল দিতে চান। তার খরচ আদায় করতে চান মেক্সিকোর মানুষের কাছ থেকে।
এজন্যই তার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সময় মেক্সিকোয় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। আমার
একটি ধারণা, ট্রাম্প আসলে হিটলার নন। হিটলার হওয়ার মতো সুযোগ ও পরিবেশ তার
নেই। হিটলার প্রথম মহাযুদ্ধে পরাজিত এবং অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত জার্মানির
যুবশক্তির মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা জাগিয়ে ভার্সাই চুক্তির বিরাট দেনা থেকে
জার্মান জাতিকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখিয়ে নির্বাচনে জিতে বার্লিনে ক্ষমতা
দখল করেছিলেন। যুদ্ধে পরাজয়ের ধাক্কায় জার্মানির সিভিল ও মিলিটারি
ব্যুরোক্রেসি তখন বিপর্যস্ত। তারা হিটলারের অভ্যুত্থানকে সমস্যার সমাধান
ভেবে সাহায্য জুগিয়েছে। দুর্বল গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিন্ডেনবার্গ
অনেকটা স্বেচ্ছায় হিটলারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছেন। জার্মানির বামপন্থী
দলগুলো তখন চরম অনৈক্য-জর্জরিত। দেশটির সুশীল সমাজ বাংলাদেশের বর্তমান
সুশীল সমাজের মতো তখন সুবিধাবাদী ও পথভ্রষ্ট। পশ্চিমা শক্তিবর্গ- বিশেষ করে
ব্রিটেন, আমেরিকা ও ফ্রান্স রাশিয়ায় কম্যুনিজমের অভ্যুদয়ের ভয়ে ভীত হয়ে
লাল-সোভিয়েত জুজু ঠেকানোর জন্য জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের ক্ষমতা দখলের কাজে
সাহায্য জোগাচ্ছে। তাদের আশা ফ্যাসিবাদ সাম্যবাদের জোয়ার ঠেকাবে।
বর্তমান
আমেরিকায় গত শতকের ইউরোপের এই পরিবেশ নেই। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা পরাজিত
হয়েছে, কিন্তু বহু দূরে দেশের এ পরাজয় তার সাম্রাজ্যবাদী নখর ভাঙেনি। গাল্ফ
যুদ্ধে জর্জ বুশের হঠকারিতা ও ব্যর্থতা আমেরিকা তথা সারা পশ্চিমা বিশ্বে
অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে এনেছে। কিন্তু সামরিক পরাজয় ঘটায়নি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের
মতো গাল্ফ যুদ্ধের ব্যর্থতা আমেরিকার সুপার পাওয়ার স্ট্যাটাসে দারুণ আঘাত
হেনেছে। তার দম্ভে আঘাত লেগেছে। মার্কিন জনগণ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি
হয়েছে। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ওবামা চেষ্টা করেছেন এ অবস্থা থেকে আমেরিকাকে
উদ্ধার করতে। তিনি অধিকতর বিপর্যয় ঠেকিয়েছেন। কিন্তু হোয়াইট
এসটাবলিশমেন্টের চক্রান্ত ও বাধার মুখে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার সব
প্রতিশ্রুতি পালনে সফল হননি। হিলারি ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট হলে কি আমেরিকাকে
সংকটমুক্ত করতে পারতেন? সে সম্ভাবনা কম ছিল। হিলারি ওবামা প্রশাসনের
স্থিতাবস্থা রক্ষা করার নামে বহির্বিশ্বে মার্কিন হস্তক্ষেপের নীতি তলে তলে
আরও বাড়াতেন বলে আমার ধারণা। মধ্যপ্রাচ্যে বর্বর আইএসের প্রকৃত
প্রতিষ্ঠাতা কে? ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারি কখনও
বলেননি, বুশের ইরাক যুদ্ধ ছিল অবৈধ ও অন্যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে
স্বীকার করেছেন, ‘ইরাক যুদ্ধ আমেরিকার জন্য একটা বড় ভুল ছিল।’ ডোনাল্ড
ট্রাম্প আমেরিকাকে সংকটমুক্ত করতে চান এবং তার পূর্ব গৌরবে ফিরিয়ে নিতে
চান। কিন্তু সঠিক পথে নয়। এ ব্যাপারে তার আন্তরিকতা কতটুকু সে প্রশ্নও তোলা
চলে।
বিশ্ব-গণতন্ত্রের নেতা হিসেবে আমেরিকার পূর্ব গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে
লিংকন-জেফারসনের আমেরিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা দরকার। যুদ্ধবাদী ও আধিপত্যবাদী
অবস্থান থেকে সরে আসা দরকার। সে ইচ্ছা ও ক্ষমতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবশ্যই
নেই। তাই তিনি বর্তমানের স্থিতাবস্থা ভেঙে অতি জাতীয়তাবাদী স্লোগান দ্বারা
সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গদের উত্তেজিত ও একত্রিত
করে আমেরিকার আসল সংকট থেকে তাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চান। সস্তা
জনপ্রিয়তাকে তার রাজনৈতিক সাফল্যের মূলধন করতে চান। তিনি তাতে সাময়িকভাবে
সফলও হয়েছেন। কিন্তু এ সাফল্য যে স্থায়ী সাফল্য নয়, তার প্রেসিডেন্ট পদে
বসার মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ তার প্রমাণ। গত শতকে
জার্মানিতে হিটলারের ক্ষমতায় বসার সময় সারা ইউরোপে কেন, জার্মানিতেও কোনো
প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়নি। বরং জার্মানির মানুষ ভেবেছিল হিটলার তাদের ত্রাতা
হিসেবে এসেছেন। তাদের ভুল ভাঙতে অনেক দেরি হয়েছিল। প্রথম মহাযুদ্ধে পরাজিত ও
বিধ্বস্ত জার্মান ইমপেরিয়াল এসটাবলিশমেন্টও হিটলারের বশ্যতা স্বীকার করে
নিয়েছিল। এই শতকে আমেরিকায় ট্রাম্পের ক্ষমতায় বসার সময় বিশ্ব পরিস্থিতি তা
নয়, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও তা নয়। গাল্ফ যুদ্ধে আমেরিকা পরাজিত
শক্তি নয়, ব্যর্থ শক্তি। আমেরিকার সাদা এসটাবলিশমেন্ট শক্তিশালী এবং
নিজেদের অবস্থানে অনড়। ট্রাম্প-প্রেসিডেন্সিকে সমর্থনদানের ব্যাপারে তাদের
মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। এসটাবলিশমেন্টের ট্রাম্পবিরোধী অংশ প্রয়োজনে মাথাচাড়া
দিয়ে উঠতে পারে। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট এবং হোয়াইট সুপ্রিমেসির
পতন সম্পর্কে একশ্রেণীর শ্বেতাঙ্গের ভীতিকে মূলধন করে ট্রাম্প ক্ষমতায়
এসেছেন। তিনি হোয়াইট হাউসে বসেছেন বটে, কিন্তু হিটলারের মতো সামগ্রিক
ক্ষমতার অধিকারী হননি। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, He is in office, not in
total power (তিনি অফিসে বসেছেন, সমগ্র ক্ষমতার অধিকারী নন)। মার্কিন
সংবিধান তার এই সমগ্র ক্ষমতা গ্রহণের বিরোধী।
শক্তিশালী কংগ্রেস ও সিনেট
রয়েছে। মার্কিন এসটাবলিশমেন্টই দেশটির আসল ইনভিজিবল গভর্নমেন্ট বা অদৃশ্য
সরকার। এ অদৃশ্য সরকার ট্রাম্প কতটা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবেন তা সন্দেহের
বিষয়। তার ওপর হিটলারের অভ্যুত্থানের সময় জার্মানি এবং ইউরোপের জনগণ ছিল
নাৎসিবাদ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসচেতন। কিন্তু বর্তমান শতকে শুধু আমেরিকার
জনগণ নয়, বহির্বিশ্বের জনগণও নাজিদের মাইন ক্যাম্পের অনুরূপ আমেরিকার
নিউকন্ শাসকদের ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের’ বিভীষিকা সম্পর্কে সচেতন। জনগণের
ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ায় এবং জনগণকে প্রতারণা করায় সাম্প্রতিককালেই তারা
দু’জন প্রেসিডেন্ট- তথা নিক্সনকে হোয়াইট হাউস থেকে বহিষ্কার করেছে এবং জর্জ
বুশ জুনিয়রকে দেশটির নিকৃষ্টতম প্রেসিডেন্ট আখ্যা দিয়ে তাকে প্রায় অচ্ছুৎ
করে রেখেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাই হিটলার হয়ে উঠতে পারবেন এ আশংকা আমি করি
না। হতে চাইলেও তিনি তা হতে পারবেন না। মার্কিন গণতন্ত্র এখন যতই সংকটাপন্ন
হোক, তার শেকড় গভীরে প্রোথিত। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার বাড়াবাড়ির প্রতিষেধক
সংবিধান, কংগ্রেস ও সিনেট। মার্কিন এসটাবলিশমেন্টও অত্যন্ত শক্তিশালী। জনগণ
সতর্ক ও সচেতন। সুতরাং ডোনাল্ড ট্রাম্প একার শক্তিতে বিশ্ব রাজনীতির চাকা
ঘুরিয়ে দেবেন, মার্কিন জনগণকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করতে পারবেন এ আশংকা
আমি পুরোপুরি করি না। এজন্যই বলেছি, যত গর্জায় তত বর্ষায় না। প্রেসিডেন্ট
ডোনাল্ড ট্রাম্প যত গর্জাচ্ছেন, ততটা বর্ষাতে পারবেন মনে হয় না। যদি
বর্ষাতে চান, বর্তমানের জাগ্রত আমেরিকা এবং জাগ্রত বিশ্ব তাতে বাধা দেবে।
তিনি একগুঁয়ে হলে তাকে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের মতো মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই
হোয়াইট হাউস থেকে বিদায় নিতে হতে পারে। গত শনিবার লন্ডনের ট্রাফালগার
স্কোয়ারে ট্রাম্পবিরোধী বিশাল নারী মিছিলের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প সম্পর্কে
এসব কথাই আমার মনে জেগে উঠেছিল। এখন প্রতীক্ষা। দেখা যাক ঘড়ির কাঁটা
কোনদিকে এগোয়? সামনে না পেছনে?
লন্ডন, ২২ জানুয়ারি ২০১৭, রবিবার
লন্ডন, ২২ জানুয়ারি ২০১৭, রবিবার

No comments:
Post a Comment