সিরিয়ার
শিশু আয়লান কুর্দির নিষ্প্রাণ দেহটি ভেসে এসেছিল তুরস্কের একটি সমুদ্র
সৈকতে। বিশ্ববিবেককে প্রচণ্ডভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল ছবিটি। এর বছর দেড়েক পর
নাফ নদী দিয়ে ভেসে আসে আরও একটি শিশু। শিশুর নিথর দেহটি কাদামাটির মধ্যে
পড়ে ছিল। নরম কাদামাটিতে নুইয়ে ছিল শিশুর মুখমণ্ডল। ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ
মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ঠিক যেন আরেক আয়লান! ছবিটি ফের ঝাঁকুনি দেয়
বিশ্ববিবেককে। কিন্তু শিশুটির পরিচয় নিয়ে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। গণমাধ্যমে
বারবার খবর প্রকাশ হয় শিশুটি রোহিঙ্গা। রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের
সেনাবাহিনীর পাশবিক নির্যাতন থেকে বাঁচতে শিশুটি পরিবারের সঙ্গে নাফ নদী
দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু মাঝপথে নৌকাডুবে প্রাণ হারায়
শিশুটি। ভাসতে ভাসতে তীরে এসে পড়ে থাকে নিথর দেহ। এ ধরনের খবরে অনেকে
সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে এতদিন পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরিচয় মিলেছে
শিশুটির। মোহাম্মদ শোহায়েত নামের ১৬ মাস বয়সী শিশুটি রোহিঙ্গা। তার পিতার
নাম জাফর আলম। তিনি নিশ্চিত করেছেন শোহায়েত তার সন্তান। বর্ণনা করেছেন
কিভাবে নাফ নদী পাড়ি দেয়ার সময় শোহায়েত ও তার মায়ের সলিল সমাধি হয়েছে। এ
নিয়ে বিস্তারিত এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সিএনএন। এতে শোহায়েত সম্পর্কে
বর্ণনা দেয়া হয়েছে এভাবে- মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে আছে একটি ছোট্ট শিশু। তাকে
পানির স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে এসেছে তীরে। তার নাম মোহাম্মদ শোহায়েত। রাখাইন
প্রদেশে সহিংসতা থেকে তার পরিবার পালিয়ে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু তার মা, এক চাচা ও তিন বছর বয়সী আরেক ভাইসহ নদীতে ডুবে মারা যায়
শোহায়েত। জাফর আলম সিএনএনকে বলেছেন, যখন তিনি শোহায়েতের নিথর দেহ এভাবে
তীরে পড়ে থাকা ছবি দেখতে পান, তার মনে হয়েছিল এর চেয়ে তার মরে যাওয়া ভাল।
তিনি বলেছেন, সেনারা আমার দাদা-দাদিকে পুড়িয়ে মেরেছে। পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে
দিয়েছে।
এখন সেখানে কিছুই নেই। আমাদের জীবন বাঁচাতে গ্রাম থেকে গ্রামে
পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। জাফর আলম বলেন, আমি ৬ দিন ধরে হেঁটেছি। চার দিন পেটে
কোনো দানাপানি পড়েনি। ওই ৬ দিন আমি ঘুমাতে পারিনি। এ সময়ে অব্যাহতভাবে
আমাদের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পালাতে হয়েছে। কিন্তু চলার পথে জাফর আলম
একপর্যায়ে তার পরিবার থেকে আলাদা হয়ে পড়েন। তিনি নাফ নদী দিয়ে পালিয়ে চলে
আসেন বাংলাদেশে। জাফর আলম বলেন, সর্বশেষ ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর পরিবারের
সদস্যদের সঙ্গে আমার কথা হয়। তারা মিয়ানমার ছাড়তে বেপরোয়া হয়ে পড়েছিল। সেই
ছিল পরিবারের সঙ্গে আমার শেষ কথা। এই ফোনকলের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই আমার
পরিবার পালানোর চেষ্টা করে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা রক্ষীরা যখন এটা টের পেয়ে
যায়, তখন তারা গুলি শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে মাঝি নৌকার সবাইকে গুলির হাত
থেকে জীবন বাঁচানোর আহ্বান জানান। নৌকাটিতে ছিল অতিরিক্ত মানুষ। তারা
নড়াচড়া শুরু করায় নৌকাটি ডুবে যায়। তুরস্কের সমুদ্র সৈকতে পড়ে থাকা আয়লানের
ছোট নিথর দেহের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বড় ধরনের ঝাঁকুনি খায়
অভিবাসী-সংকট নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ইউরোপ। ঘুম ভাঙে বিশ্ববাসীরও। সংবাদপত্র ও
সামাজিক যোগাযোগের অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আয়লানের ছবিটি অনেকখানি পাল্টে
দেয় জনমত। কিন্তু শোহায়েতের ছবিটি বিশ্ববিবেকের ঘুম ঠিকভাবে ভাঙাতে
পেরেছে? পারলে এখনও কেন রোহিঙ্গা নিধন বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গৃহীত হয়নি?
কেন বন্ধ হয়নি রোহিঙ্গা নিধন?

No comments:
Post a Comment