Tuesday, January 24, 2017

মিসরীয় বিপ্লবের ছয় বছর পর...

তিউনিসিয়ায় শুরু হওয়া ‘আরব বসন্তের’ হাওয়া মিসরেও লেগেছিল। ২০১১ সালে এক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তিন দশকের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতন হয়েছিল। ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মিসরে সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন হোসনি মোবারক। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে থাকে মিসরের জনগণ। এরপর ২০১১-এর নভেম্বর থেকে ২০১২-এর জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন জয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে ইসলামপন্থীরা। কিন্তু মিসরের এক আদালতে এই সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করা হলে পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। ২০১২ সালের ৩০ জুন অপর এক পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে ৫১ দশমিক ৭ ভাগ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মুসলিম ব্রাদার হুডের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি। মিসরের ইতিহাসে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম কোনো প্রেসিডেন্ট ও ইসলামী নেতা হচ্ছেন মোহাম্মদ মুরসি। এক বছর যেতে না যেতেই দুঃস্বপ্ন আবারও হানা দেয় মিসরের বুকে। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি গণতান্ত্রিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত মুহাম্মদ মুরসিকে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসেন এবং দেশটির সংবিধান বাতিল করেন। আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির ঘটানো এ অভ্যুত্থানের তীব্র নিন্দা জানান মোহাম্মদ মুরসি। স্বৈরশাসক হোসেনি মোবারকের ক্ষমতাচ্যুতির ছয় বছর পর ২০১১ সালের বিপ্লবী কর্মীরা এখনও স্বৈরশাসনের নির্যাতন নিপীড়িনের মুখে নতুন দিনের আশায় প্রত্যাশায় তারা সংগ্রাম করে যাচ্ছে। বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপে মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। বহু বিপ্লবী কর্মী এখন কারাগারে। সরকার তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে।
এছাড়া তাদের ভ্রমণের সুযোগের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সাবেক সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট আল-সিসির সমালোচনা করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, কোনো বিরোধী মতকেই তোয়াক্কা করছে না আল-সিসি। ২০১১ সালে বিপ্লবের প্রাণকেন্দ্র তাহরির স্কয়ার থেকে ৩৮ বছর বয়সী বিপ্লবী কর্মী ইসরা আবদেল ফাত্তাহ এক সাক্ষাৎকারে এএফপিকে বলেন, ‘এখনকার মিসরের পরিস্থিতি ভায়াবহ শোচনীয়।’ ইসরা জানান, তার ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের স্বৈরশাসনের সমাপ্তির দাবিতে প্রায় ১৮ দিন ধরে লাখ লাখ মিসরীয় বিক্ষোভ জানায়। বিক্ষোভে পুলিশের হামলায় নিহত ৮৫০ জন বিপ্লবী কর্মীর কথা স্মরণ করে ইসরা বলেন, ‘আমাদের শরীর থেকে যে রক্ত ঝরেছে, তা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার জন্য আমি খুবই দুঃখিত।’ ২০১১ সালের ওই বিক্ষোভে অংশ নেয়া ৩২ বছর বয়সী আহমাদ বলেন, ‘আগে আমি দেশের জন্য মরে যেতেও প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু এখন আমার দেশ ছেড়ে যেতে মন চায়।’ তিনি আরও বলেন, আগে আমি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম করতাম। আর এখন আমি আমার পরিবারের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার তুলে দেয়ার জন্য সংগ্রাম করছি। এটা এখন বেঁচে থাকার সংগ্রাম।’ মিসরীয়রা বর্তমানে ওষুধ ও চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঘাটতিতে ব্যাপক দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে জিনিসপত্রের দাম হুহু করে বাড়ছে। গত বছরের নভেম্বরে সরকার তেল খাতে ভর্তুকি কমিয়েছে ও মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়েছে। এমএফের প্রতিশ্রুত ১২ বিলিয়ন ডলারের ঋণের শর্ত হিসাবে অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে মিসর। বিপ্লবী কর্মী আহমেদ বলেন, ‘এসব সত্ত্বেও মিসরীয়রা আর কোনো বিপ্লব চায় না। অসফল বিপ্লবের পর মিসরীয়রা এখন ভগ্ন মনোরথ।’ এএফপি।

No comments:

Post a Comment