শান্তিপূর্ণ
সমাজ বিনির্মাণে কমিউনিটি পুলিশিংকে আরও জোরদার করার কথা উল্লেখ করে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে একাত্ম হয়ে পুলিশ সেবাকে
আরও জনবান্ধব করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঔপনিবেশিক আমলের
ধ্যান-ধারণার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পুলিশের
সেবাকে আরও জনবান্ধব করতে হবে। প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে অসহায় ও বিপন্ন
মানুষের প্রতি অকুণ্ঠচিত্তে সেবার হাত প্রসারিত করতে হবে।’ শেখ হাসিনা
জাতির পিতার ভাষণের উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে যে কথা বলেছিলেন- আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক।
আমাদের পুলিশবাহিনী স্বাধীন দেশের পুলিশবাহিনী। আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে
দায়িত্ববোধ থাকতে হবে জনসেবা করার মানসিকতা নিয়ে।’ শান্তিময় ও নিরাপদ সমাজ
গঠনের লক্ষ্যে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে সরকার আরও জোরদার করবে উল্লেখ
করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর পুলিশকে আধুনিক ও
জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী সোমবার
রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০১৭’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান
অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল
ও আত্মনির্ভরশীল দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু
দেশী-বিদেশী একটি চক্র বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রাকে বানচালের অপচেষ্টায় লিপ্ত
রয়েছে। গণতান্ত্রিক পথে মানুষের মন জয় করতে ব্যর্থ হয়ে এরা সন্ত্রাসের পথ
বেছে নিয়েছে। তিনি বলেন, কোমলমতি যুবক-কিশোরদের ধর্মের নামে বিভ্রান্ত করে
জঙ্গিবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ধর্মের অপব্যাখ্যা করে তাদের হাতে অস্ত্র
তুলে দিয়ে সহিংস আক্রমণের মাধ্যমে মানুষ হত্যার মতো বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডে
প্ররোচিত করছে। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদকে একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং আমাদের
উন্নয়নের প্রধান বাধা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি হলি
আর্টিজান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা মোকাবেলায় ৪ জন পুলিশ সদস্য আত্মোৎসর্গ
করেছেন। নির্ভীক এই ৪ পুলিশ সদস্যের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অসংখ্য প্রাণ
রক্ষা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় পুলিশের সাফল্য প্রসঙ্গে
আরও বলেন, সম্প্রতি আশুলিয়ার আশকোনা ও মিরপুরের কল্যাণপুরে পুলিশ
জঙ্গিবিরোধী বিশেষ অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করেছে। পুলিশ জঙ্গি হামলার
মাস্টারমাইন্ড, অস্ত্রদাতা, প্রশিক্ষক ও আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর
ব্যবস্থা নিয়েছে। শেখ হাসিনা পুলিশবাহিনীর সদস্যদের প্রশংসা করে বলেন,
‘শুধু দেশেই নয়, গত প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ পুলিশ জাতিসংঘ
শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করে নিজেদের কর্মদক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয়
প্রদান করে বহির্বিশ্বে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে।’ এর আগে প্রধানমন্ত্রী
প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল,
আইজিপি একেএম শহীদুল হক ও প্যারেড কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত আইজিপি মো.
মোখলেসুর রহমান প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০১৭’ উপলক্ষে
পুলিশ সদস্যদের মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনা। প্যারেড কমান্ডার পুলিশ সুপার শামসুন্নাহারকে সঙ্গে নিয়ে একটি খোলা
জিপে তিনি প্যারেড পরিদর্শন করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ৪টি
ক্যাটাগরিতে ১৩২ জন পুলিশ সদস্যের মাঝে বাংলাদেশ পুলিশ পদক ও রাষ্ট্রপতি
পুলিশ পদক বিতরণ করেন। ২০১৬ সালের মরণোত্তর পুলিশ পদক বিপিএম পান গুলশানের
হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় নিহত সিনিয়র এসি (ডিবি, ডিএমপি) পুলিশ সদস্য
শহীদ রবিউল ইসলাম ও গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহীদ মো. সালাউদ্দিন
খান। উভয়ের স্ত্রী এই মরণোত্তর পদক গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে কিশোরগঞ্জের
শোলাকিয়ায় ঈদ জামাতে জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে নিহত পুলিশ কনস্টেবল শহীদ
জহিরুল ইসলামের পক্ষে তার স্ত্রী ও পুলিশ কনস্টেবল শহীদ আনসারুল হকের পক্ষে
তার মা মরণোত্তর পুলিশ পদক গ্রহণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ পুলিশ
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি, সাইবার ক্রাইম
ইনভেস্টিগেশন সেন্টার এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও
একাত্তরের বীর শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘রাজারবাগ-৭১’ নামের আবক্ষ মূর্তির
নামফলক উন্মোচন করেন। প্রধানমন্ত্রী ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে
নিয়ে পুলিশ সপ্তাহ-২০১৭ উদ্যাপন উপলক্ষে একটি কেক কাটেন। মন্ত্রিপরিষদ
সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন উত্তরের
মেয়রসহ সামরিক ও বেসামরিক পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিদেশী কূটনীতিক,
কূটনৈতিক মিশনের সদস্য, দাতা সংস্থার প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ পুলিশের
বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
স্থিতিশীল আইনশৃংখলা পরিস্থিতি দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত উল্লেখ করে
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, ‘আইনশৃংখলা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থকে আমরা ব্যয়
নয়, বিনিয়োগ মনে করি। আমাদের সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কার্যক্রমের বিস্তৃতি
দেশের প্রধান আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী বাংলাদেশ পুলিশেও সমভাবে বিস্তৃত
হয়েছে।’ তিনি বলেন, বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিত পুলিশের কর্মক্ষেত্র ও
কর্মব্যাপ্তি প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেবল চুরি-ডাকাতি, হত্যা-রাহাজানি
বন্ধ নয়, পুলিশের কাজের ক্ষেত্র আজ বিস্তৃত হয়েছে- সাইবার ক্রাইম, মানি
লন্ডারিং, মাদক পাচার এবং পণ্য চোরাচালান ও নারী-শিশু পাচার প্রতিরোধে,
এমনকি জলজ ও বনজসম্পদ এবং পরিবেশ সংরক্ষণেও। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ
পুলিশের নারী সদস্যরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
বিভিন্ন ইভেন্টে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে। বৈশ্বিক
পরিমণ্ডলে আমাদের পুলিশ সদস্যদের অর্জিত অভিজ্ঞতা দেশের আইনশৃংখলাসহ
গণতন্ত্রের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পুলিশবাহিনীর
আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তনশীল বিশ্বে প্রযুক্তির
উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও অপরাধের নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়
পুলিশের আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ পুলিশের কৌশলগত পরিকল্পনা,
অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করে কর্মক্ষেত্রে পুলিশের
সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার সরকারই ২০০৯
সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে ৭৩৯টি ক্যাডার
পদসহ ৩২ হাজার ৩১টি পদ সৃজন করে।’ দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে পুলিশের জনবল
যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার বাংলাদেশ পুলিশে আরও ৫০
হাজার জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৪১ হাজার পদ সৃজন করা
হয়েছে। বর্ধিত জনবলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যানবাহন ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি
সরবরাহের বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় রয়েছে’। কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট গঠন
প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে পুলিশের
সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট গঠন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ গঠন
করা হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ গঠনের ফলে শিল্প প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে
গার্মেন্ট সেক্টরে শৃংখলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ
সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া আরও বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট যেমন- পুলিশ ব্যুরো অব
ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), টুরিস্ট পুলিশ, নৌ-পুলিশ এবং ২টি স্পেশাল সিকিউরিটি
অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ
স্থাপনা ও ব্যক্তির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত ও জোরদার করতে সরকার
বিশেষায়িত ব্যাটালিয়ন গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেও উল্লেখ করেন
প্রধানমন্ত্রী। নগরীতে আরেকটি পুলিশ লাইন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা :
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পুলিশের আবাস হিসেবে বর্তমান রাজারবাগ
পুলিশ লাইন অপ্রতুল হয়ে পড়ায় সরকার নগরীতে দ্বিতীয় পুলিশ ব্যারাক
প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি পুলিশ সপ্তাহ-২০১৭-এর উদ্বোধন শেষে
‘পুলিশ ওয়েলফেয়ার প্যারেড’-এ প্রথমবারের মতো ভাষণকালে বলেন, ‘আমরা নগরীতে
আরেকটি পুলিশ লাইন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, এ ব্যারাক
প্রতিষ্ঠার জন্য উপযুক্ত জমি খোঁজা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণকে
অধিকতর ভালো সেবা দেয়ার জন্য ঢাকা মহানগরীকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে এবং
‘এজন্য আমরা নগরীতে আরেকটি পুলিশ লাইন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েছি।’
তৃণমূলের পুলিশ জওয়ানদের দেশের প্রধান নির্বাহীর সামনে দর্শক হিসেবে
উপস্থিত থাকা এবং তার সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম করে তোলার জন্য অন্যান্য
সশস্ত্র বাহিনীর দরবারের মতো বার্ষিক পুলিশ সপ্তাহের সঙ্গে এই প্রথমবারের
মতো ‘পুলিশ ওয়েলফেয়ার প্যারেড’র আয়োজন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আইজিপি শহীদুল হকও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ। এতে পুলিশের কনস্টেবল
থেকে শীর্ষ পদমর্যাদার কর্মকর্তারা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত পুলিশ
সুপার তানভীর সালেহীন ইমাম, সিনিয়র এএসপি তাপস রঞ্জন ঘোষ, ইন্সপেক্টর
মনিরুল ইসলাম, এসআই সুজন কুণ্ড, সার্জেন্ট খন্দকার মশিউর রহমান ও কনস্টেবল
খায়রুন্নাহার পেশার কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় তুলে ধরে বক্তব্য দেন।

No comments:
Post a Comment