Thursday, January 26, 2017

সেভেন মার্ডারস মাফ হয়, সাত খুন মাফ নয়

স্বাধীন বাংলাদেশে একসঙ্গে সাত ব্যক্তিকে হত্যা করার ঘটনা আমরা দেখেছি দু’বার। প্রথমটি ঘটেছিল ’৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বিল্ডিংসংলগ্ন এলাকায়। দ্বিতীয়টি নারায়ণগঞ্জ ট্রাজেডি। প্রথমটির নামকরণ হয়েছে ইংরেজিতে- সেভেন মার্ডারস, পরেরটি বাংলায়- সাত খুন। সেভেন মার্ডাসের ঘটনাটি ছিল সেই সময়ের শাসক দল আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলের চেইন-ইফেক্ট। পেরেন্ট অর্গানাইজেশন আওয়ামী লীগের পরস্পরবিরোধী দুই গ্রুপের অন্তর্দ্বন্দ্ব সম্প্রসারিত হয়েছিল দলটির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগে,
অতঃপর এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধানের নেতৃত্বে অপর গ্রুপের সাত নেতাকর্মীর প্রাণনাশ। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পরপর নিজেরই এক নির্দোষ, হালকা ফাজলামোর আক্কেল সেলামি হিসেবে আসামির খাতায় নাম উঠে যাচ্ছিল প্রায় আমার। মজার সেই কাহিনীটিই বলে নিই আগে। তবে সেই কথায় পৌঁছতে একটু দেরি হবে। কারণ, অ্যাপ্রোচ রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা কিছুক্ষণ প্রাসঙ্গিক কিছু গালগপ্প করব। তখন আমি বিপ্লবী রাজনীতির টকটকে লাল ঝাণ্ডা হাতে ধরে আছি। কপালে দাগানো রয়েছে মহান এক স্লোগান- চাই শ্রেণীহীন সমাজ। তবে অন্য কমরেডদের সঙ্গে আমার একটা পার্থক্যও ছিল। অন্যরা তখন আদর্শ বাস্তবায়নে দুর্দান্ত, তাদের মধ্যবিত্তীয় মূল্যবোধগুলো পড়ন্ত; আমি ধরে রেখেছি সবই। আমার সিভি তখন নানারকম এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিতে ঠাসা এবং বেশ লম্বা। যা হোক, অন্য অনেক অবিপ্লবী কাজের সঙ্গে ছোটখাটো একজন হস্তরেখাবিদ হিসেবে আমি বন্ধু-বান্ধবের হাতও দেখে বেড়াচ্ছি তখন। হস্তরেখাবিদ্যা অর্থাৎ পামিস্ট্রি নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান নয়, তবু কেন জানি ধারেকাছে জ্যোতিষী কিংবা পামিস্টের খোঁজ পেলেই সবাই ছুটে যায় তার কাছে।
মানুষমাত্রই নার্সিসাস কমপ্লেক্সে ভোগে, নিজেকে মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসাই তার প্রধান কাজ। সে যখন অন্যকে ভালোবাসে, তখন আসলে তাকে ভালোবেসে পরখ করতে চায় তার নিজের প্রতি পাত্র-পাত্রীর রেসপন্সটা কেমন। মানুষ যখন প্রচণ্ড কাজের মধ্যে থাকে এবং তার মনেই থাকে না যে সে নিজেকে ভালোবাসে, তখন বুঝতে হবে ওই সময়টায় নিজের প্রতি ভালোবাসাটা কাজের মধ্যে ট্রান্সফারড অবস্থায় আছে। একই সূত্রে কোনো রাজনীতিক যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশে বলেন- আমি আপনাদের নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে কাজ করে যেতে চাই- তখন তার মতো স্বার্থপর পুঁজিপতি পৃথিবীতে একটাও নেই। কারণ সে একসঙ্গে লাখ লাখ মানুষের ভালোবাসা উপভোগ করতে চায়। নিজেকে প্রচণ্ড ভালোবাসে বলেই মানুষ জানতে চায়, সে আসলেই কেমন, তার ভবিষ্যৎ কী। পামিস্টকে তাই সে আপন ভাবে, অথচ ভুলেও বুঝতে চায় না, নিজেকে আবিষ্কার করতে আপন ভেবে যার পানে ধাইছে সে, তিনি একজন মনোবিজ্ঞানী ও অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী এবং এই দুই শক্তিবলে তিনি অর্জন করেছেন অনুমান করার এক বিশেষ যোগ্যতা। তিনি চতুরও বটে, তার ক্লায়েন্টকে শোনান প্রশংসা ও আশার কথা, সেই কথা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বলেন দু’-একটি নেগেটিভ কথাও। এক অর্থে তিনি সার্ভ করেন সামান্য ঝাল বেশি দেয়া সুস্বাদু খাবার।
তাতে ভোক্তা মোটের ওপর খুশি থাকে। তাকে নিরংকুশ সন্তুষ্ট করার দরকার পড়ে না পামিস্টের, তাতে বরং অবিশ্বাসী হয়ে পড়ার আশংকা থাকে। যেমন আমাকে যিনি পামিস্ট্রি সম্পর্কে জ্ঞান দিয়েছিলেন, তিনি বুঝিয়েছিলেন- কারও হাত দেখার সময় প্রথমেই হাতের রেখাগুলো বিস্ময়ভরা চোখে দেখতে থাকবে, হাতটা উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করে বলবে- আপনার হাতটা ইউনিক। এমন একটি হাতের ছবি কিরোর (প্রখ্যাত আইরিশ হস্তরেখাবিদ উইলিয়াম জন ওয়ার্নার, কিরো নামেই বেশি পরিচিত তিনি) বইতে আছে, এমন হাত লাখে একটা পাওয়া যায়। ব্যস, ক্লায়েন্ট মানসিক প্রস্তুতি নেয়া শুরু করবে তোমার কথা বিশ্বাস করতে। এরপর তার আচরণ, চেহারা, কথা বলার ধরন ও বিশেষভাবে বয়সটা মাথায় রাখবে। ধরো, একটি মেয়ে, সে অষ্টাদশী অথবা দু’-এক বছর কম-বেশি, সুশ্রী এবং স্বভাবে উচ্ছ্বল। তাকে বলতে হবে- ১. তুমি এতগুলো ছেলে সামলাচ্ছ কীভাবে? তোমাকে তো অনেকেই ভালোবাসতে চায়। ২. একজনকে অবশ্য তোমার খুব ভালো লাগে, তবে তার কথা মনে হলেই আরেকটি মুখ ভেসে ওঠে। ৩. তুমি খুব সরল প্রকৃতির, এত সরল হওয়া ভালো নয়। ৪. তোমার বাবা-মা তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসে; কিন্তু মাঝে মাঝে ভুল বোঝে। ৫. সাবধান! তোমার বান্ধবীরা, যাদের তুমি খুব ভালোবাসো, তাদের একজন তোমার শত্রু, তুমি বুঝতে পারছ না। ৬. তোমার আবেগটা একটু বেশি এবং কখনও কখনও অন্যের কাছে নিজেকে ঠিকমতো উপস্থাপন করতে পারো না। ৭. কখনও প্রাইভেট টিউটর রেখে পড়বে না, ঝামেলায় পড়বে তাহলে (টিউটর না থাকলে তো কথাই নেই আর থাকলে ইতিমধ্যেই সে অন্তত তার অসংলগ্ন কথা বা আচরণ পেয়েছে। আর যদি ইতিমধ্যেই প্রেম ঘটে থাকে,
তাহলে সে দুশ্চিন্তায় পড়বে। এখানেই পামিস্টের সাফল্য)। ৮. কাউকে খুব বেশি বিশ্বাস করবে না। তুমি সহজেই মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলো। ৯. খুব চিন্তাভাবনা করে বিয়ের সিদ্ধান্ত দেবে। চাপিয়ে দেয়া ছেলে মানবে না। তাহলে সুখী হতে পারবে না ইত্যাদি। তো সেভেন মার্ডারসের দুই-তিন দিন আগে কোহিনুরসহ যে সাতজন নিহত হয়েছিল, তাদের একজন মনিরের হাত দেখেছিলাম আমি মধুর কেন্টিনে। তাকে চিনতাম না, তবে জানতাম সে আওয়ামী লীগসমর্থিত ছাত্রলীগের নেতা গোছের এবং হাইপারঅ্যাক্টিভ। আমি জাসদসমর্থিত ছাত্রলীগের হলেও মনিরদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল ছিলাম। সবটা মিলিয়ে অনেক কথার সঙ্গে তাকে এটাও বলেছিলাম- আপনার একটি রেখা বলছে আপনি সহসাই বড় ধরনের বিপদে পড়তে পারেন। মার্ডার সংঘটিত হওয়ার পর এই খবর পত্রপল্লবিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল যে, আমি মনিরকে তার আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সাবধান করেছিলাম। এরপর আর কী লাগে? গোয়েন্দার আগমন এবং আমার যা-তা অবস্থা। জেরার পর জেরা- কোন্ জাদুমন্ত্রবলে মার্ডারের কথা আগাম জেনেছিলাম আমি। শেষ পর্যন্ত আমার সতীর্থরা তাদের বোঝোতে সক্ষম হয় যে, সেই ভবিষ্যদ্বাণী ছিল নিছকই পামিস্ট্রি।
২. নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার রায় বেরোনোর পরদিন দু’-তিনটি পত্রিকা শিরোনাম করেছিল- সাত খুন মাফ নয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি চমৎকার শিরোনাম হলেও সামান্য ব্যাকরণগত ত্রুটির কারণে আমার পছন্দ হয়নি, কারণ সাত খুন মাফ নয় কথাটি বাংলাদেশে স্বতঃসিদ্ধ নয়। যদি লেখা হতো- র‌্যাবের সাত খুন মাফ নয়- সেটাই বরং উপভোগ করা যেত। তাতে বোধকরি র‌্যাবের মহাপরিচালক মহোদয়ও রাগ করতেন না। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন স্পষ্ট- তার কোনো সদস্যের অপকর্মের দায় নেয়া হবে না। যাকগে, সেভেন মার্ডারের আসামিদের কারোরই ফাঁসি হয়নি। হত্যার পরদিন চক্রান্তের মাস্টারমাইন্ড শফিউল আলম প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনের বটতলায় (মুক্তিযুদ্ধে অকৃত্রিম-অকপট-নিচ্ছিদ্র সহায়তা প্রদানকারী সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি স্বাধীনতার পর এই বৃক্ষের চারা রোপণ করেছিলেন) নিজের দোষ ঢাকতে ছবি বিশ্বাসের চেয়েও দক্ষ অভিনয়ে চোখের জল-নাকের জল এক করে দুঃখে ফেটে পড়েছিলেন- আমার কোহিনুরকে হত্যা করা হয়েছে!! তার অবশ্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল; কিন্তু সেই সাজা দু’-এক বছর খাটতে না খাটতেই মাফ করে দেয়া হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগ ও জাসদের বিপরীতে শক্তি সঞ্চয় করতে তাকে কারাগার থেকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। দিস ইজ কলড প্রেসিডেন্ট’স ক্লেমেন্সি! এই রাষ্ট্রের আইনশৃংখলা পরিস্থিতির বর্তমান যে দুর্দশা, সর্বনাশের সেই শুরুটা যারা করেছিলেন, শফিউল আলম প্রধান তাদের অন্যতম। তিনি এখন জাগপার সভাপতি! নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মাফ হয়নি। তবে তা এখন পর্যন্ত হাইপোথিসিস, থিসিস নয়।
উচ্চ আদালতই পারে থিসিস পেপারটি জমা দিতে। আরও কথা আছে। উচ্চ আদালতে যদি সাজা কমে যায়, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করে দেয়ার ক্ষমতা তো আর সেই আদালত কমাতে পারবেন না। দুরভিসন্ধি দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হওয়া বাঙালি এখন পজিটিভ চিন্তা করাই ভুলে গেছে। গুরু দোষীর দায়মুক্তি এবং নির্দোষ অথবা লঘু দোষীর শাস্তি- আমাদের চোখ সয়ে গেছে। বজ আঁটুনি ফসকা গেরোর দড়ির খেলাটি রাজনীতিকরা কতই না দেখিয়েছেন আমাদের। যা হোক, আপাতত আমরা আনন্দিত বৈকি! মন্ত্রীর জামাই মানে যে সমগ্র জাতির জামাই নয়, এবং সে পেতে পারে না আদালতের জামাই-আদর, সুসংবাদ বটে। কার্ল মার্কসের কিছু কথা সব সময়ের জন্য প্রযোজ্য, সব কথা কিছু সময়ের জন্য; তবে সব কথা সব সময়ের জন্য নয় (বোকা বানানোর প্রবাদটি অনুসরণে)। বলেছিলেন- ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি ঘটায় এবং প্রথমবার যা ট্রাজেডি, দ্বিতীয়বার তা হয় প্রহসন। সেভেন মার্ডারসের আসামিদের লঘুদণ্ড কিংবা মাফ পেয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ছিল ট্রাজেডি; কিন্তু সাত খুনের ক্ষেত্রে তা প্রহসন হয়নি। কেউ বলতে পারবে না- বিচার প্রহসনমূলক হয়েছে। তবে আমাদের বিচারব্যবস্থায় এক বড় ট্রাজেডির দিক আছে। ধরা যাক, সাত খুনের ঘটনার সময় আমি তারেক সাঈদের অধীনে র‌্যাব-১১-এর একজন সদস্য ছিলাম। ওই নিষ্ঠুর, স্বেচ্ছাচারী, রক্তস াবী অপারেশনে অংশ নেয়ার প্রশ্নে আমি কী করতে পারতাম? আমি তো পৃথিবীর সব বিনয়ীর সব বিনয় কণ্ঠে মিশিয়েও বলতে পারতাম না- স্যার আমাকে মাফ করে দেয়া যায় না! জিহ্বা আছে বলে বলতে পারতাম অবশ্যই, সেক্ষেত্রে নিদেনপক্ষে চাকরিটা চলে যেত, ঘটতে পারত মৃত্যুও।
মানুষ মাত্রই ভুল করে আর সেই ভুল নষড়ি ঁঢ় করে (ছোটকে বড় করে দেখানো) অধঃস্তনকে শাস্তি দেয়া কোনো কঠিন কাজ নয়, যদি না টার্গেটের থাকে আইনি সুরক্ষা। সেই সুরক্ষা কি দিচ্ছে কেউ আমাকে? আমি তো প্রমাণই করতে পারতাম না, আমাকে বাধ্য করা হচ্ছিল একটা অন্যায় অপারেশনে অংশ নিতে। অবশ্য নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা পরে, ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে যেমন প্লট সাজানো হয়, তেমন অন্যরকম একটা প্লট করে মেরেও ফেলতে পারত তারেক আমাকে। ফলে আমি অংশ নিতাম এবং বিচারক সাক্ষীর কথা ও সারকামাসটেন্সিয়াল এভিডেন্সের ভিত্তিতেই রায় দিতেন, উপলব্ধি করতে অক্ষম থাকতেন আমার মনের ভাষা। সুপার ইন্টেলিজেন্ট হলে বুঝতে পারতেন হয়তো, কিন্তু তিনি তো সাক্ষ্য-প্রমাণের বিপরীতে গিয়ে রায় দিতে পারতেন না। সেক্ষেত্রে তিনি নিজেই বিপদে পড়তেন। ফলে আমিও এখন থাকতাম কনডেমড সেলে। পৃথিবীর সব মানুষকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে শুধু গাইতাম- ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা প্রভু তোমার পানে, তোমার পানে। অথবা ধরুন, ব্যাংকের আর্থিক অনিয়মের কাগজপত্রে সই করেছিলেন যে কর্মকর্তা, যিনি কলম ধরেছিলেন এমডির আদেশে এবং কেলেংকারির টাকার ভাগও পাননি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, তিনি কেন থাকবেন কারাগারে?
ব্যাপারটা তো এমন নয় যে, এক বিশেষ পাপীকে এই পৃথিবীতে রাখা যায় না, তাই ঈশ্বর তার ওপর বজ পাত ঘটালেন আর তার পাশে থাকা নির্দোষ লোকটিও সঙ্গদোষে মরে গেলেন! প্রশ্নটা অতি পুরনো, নুরেমবার্গ ট্রায়ালেও উঠেছিল এ প্রশ্ন, বিচারক রায়ে শুধু বলেছিলেন- ঊর্ধ্বতনের অন্যায় আদেশ অধঃস্তন মানতে বাধ্য নন- ব্যস এটুকুই। প্র্যাকটিক্যালি তার সুরক্ষা কীভাবে হবে, এর কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি এখনও। জুডিশিয়াল এথিক্সে শুধু বলা হয়, দোষী ছাড়া পেয়ে যাবে যাক, নির্দোষ যেন শাস্তি না পায়। কে মানছে এ কথা? ফলে প্রশ্নটা এখনও খুব জোরালো। আমি ভাবি, ভাবি আর ভাবি- ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ২৬ জনের মধ্যে একজনও কি ছিলেন না, সুযোগ থাকলে যিনি হাতের বন্দুকের নলটা ঘুরিয়ে ঠেকাতেন তারেকের বুকে? ব্যতিক্রম খোঁজাটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে আমার। হয়তো সিম্পটমবিহীন এটা বড় কোনো রোগ, ধরতে পারছি না। আমার দ্বিতীয় চিন্তাটা মায়া আর আফসোসে আচ্ছন্ন। উপরে কার্ল মার্কসের একটি উক্তিকে যেভাবে নাকচ করেছি, বাঙালি সমাজে এমন কিছু প্রবাদ-প্রবচন চালু আছে, যেগুলো একইভাবে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ছুড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করে। সংবেদনশীল, শিষ্ট স্বভাবের লজ্জাবতী অনেক মেয়ে তাকে প্রেম নিবেদন করা হলে মুখ টিপে হাসে অথবা তার চেহারা লাল হয়ে ওঠে। সে মুখে কিছু বলে না। অতঃপর তার সেই মৌনতা কি সম্মতি? হতে পারে না কি তা প্রত্যাখ্যান? অথচ প্রবাদ রয়েছে- মৌনতা সম্মতির লক্ষণ। বুকে লোম মমিনের (বিশ্বাসী, সজ্জন), কানে লোম কমিনের (বদলোক)- প্রবাদটি যাচ্ছেতাই বাজে। জেলে বসে হত্যা মামলার একাধিক আসামির বুকভর্তি লোমের ঘন ক্ষেত দেখেছি, যেমন দেখেছি নির্লোম পাটাতনের মতো বুকের ভেতরের হৃদয়। আবার দেখুন, কানে লোম থাকা আমার থানার এক ওসিসহ বেশ কয়েকজনকে চিনতে পেরেছি- তারা অমায়িক, ভালো মানুষ হিসেবে রেটিং করা যায়। এভাবেও যদি বলি,
কানে লোম না থাকলেই যে তিনি কমিন হবেন না, কে বলেছে? আমাদের চারপাশে থাকা ক’জনের কানে লোম? তবে কি এদের কেউই কমিন নন? একটি প্রবাদ কতটা ফালতু হতে পারে, আমরা এখন প্রসঙ্গতই তা দেখার চেষ্টা করব। ন্যাংটোর নেই বাটপারের ভয়- বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করার পর প্রবাদটিকে নাইন-টেনের ব্যাকরণ বই থেকে তুলে ফেলা যায়। প্রবাদটির অর্থ- ঠকিয়ে বা বলপূর্বক যার কাছ থেকে টাকা বা বস্তুগত কিছু আদায় করা সম্ভব নয়, সে বাটপার বা কোনো ধরনের শত্রুর ভয় থেকে মুক্ত। অন্যভাবেও বলা যায়, স্বার্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা নেই যার কাছ থেকে, তার কোনো শত্রু নেই। একটা পুরনো অভিজ্ঞতা আগে বলি, তিন মাসের পেট্রুলবোমা অপারেশনের দিনগুলোয় আমরা কী দেখেছিলাম? ভাই-ব্রাদার নন, নন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, নেই জমি নিয়ে বিরোধ অথবা করছিল না পেট্রুলবোমাধারীর স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া- কিছুই না- নেহায়েতই জীবিকার সন্ধানে প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে আসছিল সে মফিজ বাসে রাজধানীর পানে, হয়তো মধ্যরাতে আধোঘুম-আধো জাগরণে স্বপ্ন দেখছিল প্রথমে মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে, তারপর জুটবে কর্ম- হঠাৎ আগুনের ঝলকানি, অতঃপর মুহূর্তেই মাটি হয়ে গেল স্বপ্ন, শরীর হল ছাই। এই ন্যাংটোকে কেন করা হল টার্গেট? হ্যাঁ, এক ন্যাংটো গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন আপন মনে। গাড়িটা তার নয়, পেছনে বসা যিনি, তার- চন্দন সরকারের। এই ড্রাইভারের পরনে কাপড় ছিল বটে, তবে অন্তত তারেকের দৃষ্টিতে সে ন্যাংটোই; কারণ বড়জোর তার পরনের কাপড়টুকু খুলে নেয়া যায়; কিন্তু ওই জামা তারেক জীবনেও গায়ে দেবে না, ওই প্যান্টের ভেতর ঢোকাবে না পা। এখন আসি- চন্দন ও ড্রাইভার তারেকের অপারেশন নিয়ে কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে যাচ্ছিল না ওই পথে। কিলিং মিশন ও এ দু’জনের মুখোমুখি হওয়াটা ইংরেজিতে বললে- ধিং সবৎবষু ধ পড়-রহপরফবহপব, দুটি ঘটনার সমকালীনতা মাত্র। চন্দনকে ন্যাংটো বলা যাবে না, তবে এ কারণে নয় যে, তিনি সেই মুহূর্তে অন্তত একটি গাড়ির মালিক, বরং এ কারণে, তিনি দেখে ফেলেছিলেন পুরো ট্রাজেডি নাটকের একটা দৃশ্য এবং প্রতিবাদও করেছিলেন। অর্থাৎ কিলারদের চোখে তিনি হয়ে উঠলেন এক বড় স্বার্থ, এই আশংকায় যে তিনি বলে দিতে পারেন সব। এই স্বার্থ সরাসরি স্বার্থ নয়, এ হল মূল স্বার্থকে নির্বিঘ করার পরোক্ষ স্বার্থ। সুতরাং ন্যাংটো নন যেহেতু, তুলে নাও তাকে, উদ্ধার করতে হবে এই স্বার্থও। কিন্তু ড্রাইভার তো ন্যাংটোই ছিলেন। হ্যাঁ, তিনিও দেখে ফেলেছিলেন একই দৃশ্য। কিন্তু তিনি ঢোল পেটাবেন- এ তো নিছক অনুমান।
এ ধরনের নিন্মস্তরের লোককে ভয়ভীতি দেখিয়ে হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিলেই ক্ষান্ত করা যায়। প্রভাবশালীরা তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলে সাক্ষীদের সেভাবেই নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে থাকেন। নিন্মশ্রেণীর সাক্ষীকে মেরে ফেলা হয়েছে, এমন ঘটনা মনে করতে পারছি না। অর্থাৎ ড্রাইভার ন্যাংটোই ছিলেন, জোর করে তাকে কাপড় পরিয়ে, হাতে মূল্যবান সম্পদ ধরিয়ে দিয়ে একটা স্বার্থ তৈরি করা হয়েছে এবং তুলে নেয়া হয়েছে তাকেও। ন্যূনতম ঝুঁকিটিও ক্রাশ করে ফেলতে হবে। নিষ্ঠুরতার স্কেলে শেষ দাগ বলে কি কিছু নেই? তাহলে আমরা ‘ন্যাংটোর নেই বাটপারের ভয়’ প্রবাদটিকে বাতিল ঘোষণা করে সেখানে নতুন একটি প্রবাদ প্রতিস্থাপন করতে পারি। সেটা হতে পারে- বাটপারেরও আছে ন্যাংটোর ভয়। হকারদের নিয়ে একটি কলামে একবার লিখেছিলাম, তাদের অবৈধ স্থাপনা রাজধানীকে এতটাই ঘিরে রেখেছে যে, এই শহর থেকে পালানোরও কোনো পথ খোলা নেই। আজ লিখতে হচ্ছে, আমরা ডুবে আছি যেমন বাতাসে, ডুব-সাঁতারে যেখানেই পৌঁছে মাথা তুলি না কেন, সেই একই বাতাস; ঠিক তেমন আমরা সবাই ডুবে আছি অন্যায়-অবিচার-অপরাধে। সীমাহীন অপরাধের সাক্ষীও হয়ে আছি, প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ। সব কথা সবাইকে বলি না। তাতে কী! আমাদেরও সবাইকে মেরে ফেলা হোক। সবার পক্ষ থেকে আমিই কথা দিচ্ছি- মরার আগে কক্ষনো বলব না, এটা এক নিষ্ঠুর সমাজ।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
[email protected]

No comments:

Post a Comment