Thursday, January 26, 2017

শুধু বাংলাদেশ নয় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে সারা বিশ্ব শংকিত

কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত। বর্ণাঢ্য কূটনৈতিক জীবনে কলকাতায় ডেপুটি হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে অবসর জীবনেও কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউটে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি আমেরিকার ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোকাম্মেল হোসেন।
যুগান্তর : আমরা যত অস্বস্তিতেই ভোগি না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে- ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। নতুন এ প্রেসিডেন্টকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-শংকার যে চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে, তার শব্দরূপ দিন।
এম হুমায়ুন কবীর : ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন অল্প ক’দিন আগে। তবে তাকে নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে বহুদিন ধরেই। যখন থেকে তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তখন থেকেই বিভিন্ন কারণে আলোচনার মধ্যে থেকেছেন। আমার ধারণা, তিনি আলোচনার মধ্যে থাকতেই পছন্দ করেন। এটা যে কোনো রাজনীতিকের জন্য খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। তিনি মানুষের মনোযোগ চেয়েছেন এবং সেটা পেয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর থেকে আমরা যা শুনছি বা দেখছি, তা আমাদের অনেককেই চিন্তিত করছে। শংকায় ফেলেছে। তিনি শপথ গ্রহণের পর যে বক্তব্য দিয়েছেন ও সেই বক্তব্যের মধ্যে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান চেহারাটা তিনি যেভাবে চিত্রায়িত করেছেন, এতে অনেকে শুধু প্রশ্নই তোলেননি, অনেক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। তিনি বলতে চেয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট একটা খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একটা ভীতিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কথাটা যেমন খানিকটা সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রগতি সাধন করেছে। গত আট বছর আগে প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখনকার অর্থিৈনতক অবস্থা এবং এখনকার অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে অনেক তফাত। এছাড়া দেশটির কমিউনিটি রিলেশনশিপ বা অভ্যন্তরীণ মানবাধিকারের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। যদি পররাষ্ট্রনীতির কথা বলেন, সেখানেও উল্লেখযোগ্য কিছু অগ্রগতি হয়েছে। মোদ্দা কথা, অগ্রগতির পাল্লাই ভারি। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প এটাকে সেভাবে দেখছেন না বা দেখানোর চেষ্টা করছেন না। তিনি নির্বাচনকালীন যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছেন। অথচ আমেরিকায় এটা মনে করা হয়ে থাকে, একজন প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তার প্রথম কাজ হল, তিনি যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব মানুষের প্রতিনিধি, সব মানুষের নেতা- এ বিষয়টিকে স্পষ্ট করা। ট্রাম্প সে চেষ্টা খুব একটা করেননি। তাকে যারা ভোট দিয়েছেন এবং যারা সমর্থন করেছেন কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা নিয়ে যারা নেতিবাচক চিন্তাধারায় অভ্যস্ত, সেই জনগোষ্ঠীর বক্তব্য তুলে এনেছেন। প্রথাগতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান চার বছর পরপর হয়। এ অনুষ্ঠানের যে ভাবগাম্ভীর্য, প্রত্যাশা ও চিত্রকল্প তৈরি করে ভবিষ্যতের জন্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেলায় তেমনটি দেখা যায়নি। বস্তুত এর পরপরই মানুষের মধ্যে এক ধরনের শংকা তৈরি হয়েছে- ট্রাম্প তাহলে আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
যুগান্তর : ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুগ বিশ্বকে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত কী হবে?
এম হুমায়ুন কবীর : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি থেকে শুরু করছি। আমেরিকাকে বলা হয়, বর্তমান বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার পুরোধা এবং একসময় এ বিশ্বায়ন তথা গ্লোবাইলাইজেশনকে ঠাট্টা করে আমরা ‘আমেরিকাজাইশেন’ও বলতাম। ত্রিশ বছর ধরে বিশ্ব পরিমণ্ডলে যে উদারনৈতিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে, এতে যেমন ইতিবাচক দিক তৈরি হয়েছে, তেমনি কতগুলো নেতিবাচক দিকও তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে একটা উদারনৈতিক বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজ হিসেবে পরিচিত। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব বক্তব্য দিয়েছেন এবং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও তার যে বক্তব্য আমরা পাচ্ছি, তাতে কিন্তু বৈচিত্র্যবিরোধী একটা বার্তা দিচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় এসেছে, আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে যে সৌজন্যবোধ প্রত্যাশিত, সেগুলো তার মধ্যে অনুপস্থিত। তাছাড়া অর্থনৈতিক বিষয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প যেটাকে অবলম্বন করে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, সেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি কতটা সক্ষম হবেন; কিংবা গত আট বছরে যে অগ্রগতি হয়েছে, তিনি সেটা কতটা ধরে রাখতে পারবেন, এ ব্যাপারেও বড় ধরনের একটা শংকা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বজুড়ে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করা, সামরিকভাবে বিশ্বময় প্রভাব বলয় বিস্তার করা, অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে এক নম্বরে থাকা- এসবের নেতৃত্বেই রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রশ্ন হল, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন অন্তর্মুখী নীতিমালা প্রণয়নের যে ইঙ্গিত দিচ্ছেন- তা যদি সত্যি হয়, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব নেতৃত্বে থাকবে কিনা, এটা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তো অবশ্যই তৈরি হয়েছে।
যুগান্তর : তার মানে ট্রাম্প এমন একটি চরিত্র হয়ে উঠেছেন, যার সম্পর্কে আগেভাগে কিছু বলা যাচ্ছে না!
এম হুমায়ুন কবীর : মোটামুটি তাই। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে প্রত্যাশা আছে। দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আমাদের প্রত্যাশা আছে। অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা আছে। নৈতিক গুণাবলীসম্পন্ন একটি রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আমাদের প্রত্যাশা আছে। এ প্রত্যাশার বিপরীতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যখন আমরা দেখছি, তখন আশাবাদী হওয়ার চেয়ে, স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তির বিষয়টা কিন্তু বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।
যুগান্তর : জার্মানরা ট্রাম্পের ওপর রাগান্বিত। চটেছে চীনারাও। ট্রাম্পের মিত্র আসলে কারা?
এম হুমায়ুন কবীর : বাইরের পৃথিবীতে এই মুহূর্তে ট্রাম্পের দুজন মিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি। একজন হচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, আরেকজন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। এছাড়া আর কেউ তার সঙ্গে বন্ধুত্ব বিষয়ে তেমন কোনো কথা বলেননি। মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ধরনের বক্তৃতা বা কথা বলছেন, এটাই তার কাছ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। তিনি তার প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকো নিয়ে কটু মন্তব্য করেছেন, তিনি ন্যাটো নিয়ে যেসব কথা বলছেন, তাতে ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র, যারা ১৯৪৯ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক বজায় রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, তাদের কেউই এখন স্বস্তিতে নেই।
যুগান্তর : ট্রাম্পের আচরণ ও বক্তব্যে ন্যাটোর নেতারা হত-বিহ্বল। ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কী?
এম হুমায়ুন কবীর : ডোনাল্ড ট্রাম্প তো পরিষ্কারভাবেই বলেছেন- এটার আর প্রয়োজন নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর প্রধান শক্তি। কাজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক এ অবস্থান অন্য সবাইকে আতংকিত করবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই মতামত ন্যাটোর অন্য সদস্যরা সমর্থন করছেন না। তাদের ধারণা, ন্যাটোকে এই মুহূর্তে আরও শক্তিশালী করা দরকার।
যুগান্তর : ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নকে জার্মানির আজ্ঞাবহ বলে অভিহিত করেছেন। আপনি কী একমত?
এম হুমায়ুন কবীর : না, আমি এই বিষয়ে একমত হতে পারছি না। তার কারণ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখতে হবে- যখন আমরা এ ধরনের বড় অর্থনৈতিক গ্রুপ বা বড় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান অথবা কাঠামোর কথা বলি, তখন সবগুলো দেশ যদি এই কাঠামো থেকে উপকৃত না হয়, তাহলে কিন্তু সেই কাঠামো ধরে রাখা সম্ভব নয়। আপনি হয়তো বলবেন, ব্রেক্সিট ঘটনায় তো আমরা প্রমাণ পাচ্ছি, মানুষ মনে করছে, এটা থেকে তারা উপকৃত হচ্ছে না। কিন্তু ২৮টি দেশের সংগঠন ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ব্রিটেন ছাড়া আরও ২৭টা দেশ আছে এবং ২৭টা দেশের মধ্যে ছোট ছোট অনেক দেশ আছে। দিনকয়েক আগে দেখলাম, ইউরোপের ডানপন্থী দলগুলো আবার পুরনো জাতীয়তাবাদে ফেরত যেতে চায়। ব্রেক্সিটে যে ফলাফল পাওয়া গেছে বা ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে নির্বাচনে জিতে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, একই ধরনের ফলাফল ইউরোপের অন্য দেশগুলোর মানুষও প্রত্যাশা করতে পারে। বিশেষ করে, ফ্রান্সে আমরা দেখছি ডানপন্থী ন্যাশনালিস্ট দল। নেদারল্যান্ডসেও এমনটাই দেখা যাচ্ছে। কাজেই এ ধরনের একটা আশংকা কিন্তু রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা যা দেখছি, যোগফল হিসেবে বলা যাবে- ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে জনপ্রিয় এবং আমার ধারণা, তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে কার্যকর সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
যুগান্তর : ট্রাম্প মনে করেন, ১০ লাখের বেশি অভিবাসী জার্মানিতে প্রবেশের সুযোগ দিয়ে জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল সর্বনাশা ভুল করেছেন। আসলেই কী তাই?
এম হুমায়ুন কবীর : হা-হা-হা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যেসব অভিবাসী জার্মানিতে গেছেন, ওখানকার প্রেক্ষাপট থেকে যদি বিচার করি, তাহলে একটা ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাবে। যেমন ধরুন, জার্মান অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য তরুণ প্রজন্মের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি মেটানোর জন্য জার্মানি বিভিন্ন দেশের দক্ষ জনগোষ্ঠীকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। আমার ধারণা, অ্যাঞ্জেলা মার্কেল যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার এ পদক্ষেপ খুবই যুক্তিসঙ্গত ও নীতিভিত্তিক। আমি এটা সমর্থন করি। জার্মানিতে কয়েক বছর ধরে শিল্পশ্রমিকের ঘাটতি চলছে। মার্কেল হয়তো এই হিসাব করে থাকবেন- ১০ লাখ মানুষকে যদি আমি এখানে রাখতে পারি এবং তারা যদি তরুণ কর্মীবাহিনী হয়, তাহলে তারা জার্মানির উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। কাজেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য এবং জার্মানির বাস্তব অবস্থার মধ্যে বড় একটা ফারাক রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের সিদ্ধান্তকে ভাবাবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। আমি মনে করি, বিষয়টি বাস্তবতার নিরিখে ব্যাখ্যার একটা সুযোগ আছে।
যুগান্তর : তাইওয়ান প্রশ্নে চীন বলেছে, ট্রাম্প আগুন নিয়ে খেলছেন। সত্যিই কী তাই?
এম হুমায়ুন কবীর : আমি বলব, এটা আসলেই আগুন নিয়ে খেলার শামিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য যেসব আমেরিকান সমর্থন করেন, তারা বলার চেষ্টা করছেন- ‘ওয়ান চায়না পলিসি’ আমাদের পলিসি নয়, চীনের পলিসি। তবে মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেয়া-নেয়ার ভিত্তিতেই সম্পর্ক তৈরি হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘এক চীন নীতিতে’ বিশ্বাস করেই ১৯৭২ সালে তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেছিল। সেই ভিত্তিতেই ৪০-৪৫ বছর ধরে দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক পরিচালিত হচ্ছে। এখন যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘এক চীন নীতি’ থেকে বেরিয়ে আসতে চান, তাহলে তাকে যথেষ্ট যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে হবে, কেন তিনি সেটা করতে চান? ১৯৭২ সালের চীন এবং আজকের চীন, বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ভিন্ন দুই চীন। তখনকার চীন ছিল দুর্বল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে ডিক্টেট করতে পারত বা তার ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে পারত। আজকে সেটা কঠিন হবে। হ্যাঁ, চাপিয়ে দেয়া যাবে, কিন্তু সে রকম কিছু ঘটলে যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। এ বিবেচনায় আমি মনে করি, এই মুহূর্তে তাইওয়ানকে নিয়ে কোনো ধরনের ‘নাড়াচাড়া’ দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভালো কিছু বয়ে আনবে না।
যুগান্তর : শুধু আমেরিকা নয়, বর্ণবাদ, আধিপত্যবাদ ও জাতিবিদ্বেষ সারা বিশ্বেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে- যার ফসল হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ কথা বলা কী ভুল হবে?
এম হুমায়ুন কবীর : না, আপনি ভুল বলেননি। এটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। কয়েক বছর ধরেই এক ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদ- বিশেষ করে ইউরোপে চোখে পড়ছে। তবে ব্রেক্সিটের মধ্য দিয়ে এটা ব্যাপকভাবে আমাদের সামনে চলে এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী বক্তব্যে এ বিষয়গুলো আবার সামনে নিয়ে এসেছেন এবং ২০ জানুয়ারির বক্তৃতায় বলেছেন, এটা একটা আন্দোলন এবং এই আন্দোলনকে তিনি বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে আগ্রহী। তিনি সারা পৃথিবীকে আহ্বান করছেন, তারা স্ব-স্ব জাতীয়তাবোধ, জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে তাদের কর্মপন্থা নির্ধারণ করুক। এটা যদি হয়, তাহলে আমরা জানি, জাতীয়তাবাদের অত্যধিক চর্চা উগ্র জাতীয়তাবাদে রূপান্তরিত হতে খুব বেশি সময় লাগে না এবং তার ফল হিসেবে আমরা প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছি।
যুগান্তর : ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় আমেরিকা কি বড় ধরনের কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে?
এম হুমায়ুন কবীর : চ্যালেঞ্জ তো বটেই। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তর্মুখী পরিচয় বা নীতির ভেতর ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে যেহেতু তিনি প্রেসিডেন্ট- উদ্যোগ নিলে অনেক কিছুই তিনি করতে পারবেন। কিন্তু প্রশ্ন যেটা আসবে- কাজটা করা ঠিক হবে কিনা? আমার ধারণা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া থেকে গত বিশ-ত্রিশ বছরে যে পরিমাণ লাভবান হয়েছে, এখন যদি সে অন্তর্মুখী হয়ে যায়, তাহলে সেই লাভ সে আর পাবে না। যদি না পায়, তাহলে ট্রাম্প যে জনগোষ্ঠীকে আশা দেখিয়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, সেই জনগোষ্ঠীও তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে।
যুগান্তর : ফ্লোরিডার এক নাগরিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। শপথ গ্রহণের পর আমেরিকায় ব্যাপক সহিংসতা ও গাড়ি পোড়ানোর ঘটনা আমাদের থেকে আলাদা নয়। এর দ্বারা কী প্রমাণ হয়?
এম হুমায়ুন কবীর : এটা তো অবশ্যই অস্থিরতার একটা চিত্র তুলে ধরেছে। আমাদের সঙ্গে তাদের একটা মৌলিক তফাত আছে, সেটা মনে রাখতে হবে। এখানে অনেক ধরনের ভায়োলেন্স হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভায়োলেন্স ছাড়াও পরিবর্তন সম্ভব। যেমন ধরুন, আপনার কথার রেশ ধরেই বলছি- ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকতে পারবেন কিনা, অথবা তিনি যা করতে চান তা করতে পারবেন কিনা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যারা সংবিধানপ্রণেতা, যারা এই দেশটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারা এ ব্যাপারে অনেক চিন্তা করেছেন। তারা মনে করেছেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। এজন্য তারা প্রতিষেধকমূলক ব্যবস্থা রেখেছেন। আমি ব্যাখ্যা করছি- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতা তিন পর্যায়ে বিভাজিত। এর একটা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, আরেকটা হচ্ছে কংগ্রেস- হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ বা প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট। তৃতীয় জায়গাটা হচ্ছে জুডিশিয়ারি, সুপ্রিমকোর্ট। স্তর তিনটি পরিষ্কারভাবে বিভাজিত এবং এটাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় বলা হয়, সেপারেশন অব পাওয়ার। সেপারেশন অব পাওয়ার বজায় রাখার জন্য চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ একটা আরেকটাকে ব্যালেন্স করবে। কাজেই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে অনেক কিছু করতে পারেন। কিন্তু সেজন্য তাকে কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করতে হবে। তাকে সফল হতে হলে জুডিশিয়ারির সঙ্গে কাজ করতে হবে। কংগ্রেস তার আইন পাস না করলে এক পয়সাও তিনি খরচ করতে পারবেন না। তিনি যদি আইন করেন আর সুপ্রিমকোর্ট সেটা বাতিল করে দেন, তাহলে তিনি আর সামনে এগোতে পারবেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই যে প্রাতিষ্ঠানিক চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স ব্যবস্থা, এটা কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইচ্ছা-অনিচ্ছার অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এখানে আরও একটা স্তর আছে। প্রতি দুই বছর অন্তর সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ এবং পুরো কংগ্রেস পুনর্নির্বাচিত হয়। এর মানে হচ্ছে, এখন যে রিপাবলিকান কংগ্রেস রয়েছে, দু’বছর পর তা নাও থাকতে পারে।
যুগান্তর : অন্তত দুই বছর তো রিপাবলিকানরা দলে ভারি থাকবে। এ সময়কালে কী ঘটবে?
এম হুমায়ুন কবীর : সেক্ষেত্রে অনেকগুলো সিদ্ধান্ত হয়তো সুপ্রিমকোর্টে যেতে পারে। আন্দাজ করছি, সেই ভয় থেকেই সম্ভবত লাখ লাখ নারী রাস্তায় নেমে এসেছেন। যতটুকু মনে পড়ে, ১৯৭৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্ট নারীদের গর্ভপাতের ব্যাপারে, তাদের অধিকারের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। অনেক রিপাবলিকান বা কনজারভেটিভ আছেন, যারা এখনও চেষ্টা করছেন- এটাকে পাল্টানো যায় কিনা! যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা ভয় পাচ্ছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুগান্তকারী এ রায় পাল্টে যেতে পারে। সেই আশংকা থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নারীরা কয়েকদিন ধরে রাস্তায় নেমে এসেছেন।
যুগান্তর : এশিয়া-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির আওতায় রয়েছে বাংলাদেশ। সুতরাং এ অঞ্চলে যে কোনো পরিবর্তন বাংলাদেশকেও স্পর্শ করবে। বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে?
এম হুমায়ুন কবীর : এখনকার প্রেক্ষাপটে আমরা কোথায় আছি- তা আমি তিনটি স্তরে দেখতে চাই। প্রথম স্তরটা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এশিয়া পলিসি। তিনি এশিয়াকে কীভাবে দেখছেন? আমরা জানি, প্রেসিডেন্ট ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এশিয়ার অনেক কাছাকাছি নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন এবং এর অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করেছিলেন টিপিপি- ট্রান্স এশিয়া পার্টনারশিপ। ট্রাম্প ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, ট্রান্স এশিয়া পার্টনারশিপ থেকে সরে আসবেন। ওবামা প্রশাসন জাপান, সাউথ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য সব সময় চেষ্টা করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প কিন্তু সেটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। আমার আগ্রহের বিষয় হল- প্রথমত, চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কী হবে? দ্বিতীয়ত, জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে? আর তৃতীয় হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। তিনটি রাষ্ট্রের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যেমন হবে, তার একটা সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় যায়, চীনের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সীমিত পরিসরে হলেও নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে। কাজেই এটি আমাদের জন্য একটা বেকায়দা অবস্থা তৈরি করবে। ভারতের সঙ্গে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক গভীর হয় এবং সেটা যদি আবার চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে টানাপোড়েন সৃষ্টি করে, তাহলে তা আমাদের জন্য বিড়ম্বনার কারণ হবে।
যুগান্তর : শুধু স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব নয়। দক্ষিণ চীন সাগরে বিপুল সম্পদরাজিও যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহের শীর্ষে রয়েছে। আগামী দিনে এ অঞ্চলের উত্থান-পতন বিশ্ব রাজনীতিতে কীরকম প্রভাব ফেলবে?
এম হুমায়ুন কবীর : গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। তার কারণ হচ্ছে, এখানে অনেকগুলো বিষয় জড়িত। যেমনটি আপনি বললেন, সম্পদ আহরণের কথা। জাপানের পুরো ব্যবসা-বাণিজ্য চলে এই রুট দিয়ে। চীনের বাণিজ্যের একটা বিরাট অংশ চলে এই রুট দিয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যও চলে এই অঞ্চল দিয়ে। কাজেই মেজর ট্রেড রুট হিসেবে এটাকে আমরা মনে করতে পারি। এখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা বাণিজ্যিক ভারসাম্যের বিষয়টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যদি কোনো ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়, তার প্রভাব সব জায়গায় পড়বে। দুটি দেশই আমাদের বন্ধু। তাদের এ টানাপোড়েন অবস্থায় আমরা কী করব- এটা একটা বড় প্রশ্ন। কাজেই আমরা চাই উভয়ের সহযোগিতা। শুধু চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভালো সম্পর্ক নয়, চীনের সঙ্গে ভারতের ভালো সম্পর্ক নয় অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ভালো সম্পর্ক নয়। শক্তিধর এসব দেশের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ ও ইতিবাচক সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করবে, এটা আমরা প্রত্যাশা করি।
যুগান্তর : ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক এখন অনেকটাই উষ্ণ। এ সুবাদে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলে এর সুফল বাংলাদেশ কতটা ভোগ করবে?
এম হুমায়ুন কবীর : এটা বলা মুশকিল। তার কারণ হল, এখানে একটা ভারসাম্যের বিষয় আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্রমাগত উন্নতি হচ্ছে এবং এটা আমাদের জন্য এখন পর্যন্ত ইতিবাচক পর্যায়েই আছে। তার কারণ হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-বাংলাদেশ নিরাপত্তা সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে সহযোগিতা- সবগুলোতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে আমাদের অবস্থানকে সমর্থন করছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক যদি ইতিবাচক থেকে নেতিবাচকের দিকে গড়ায় অর্থাৎ এটা চীনাদের প্রতিরোধের জন্য বা চীনাদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য কোনো সুযোগ বা প্রবণতা তৈরি করে, তখন আমাদের জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। ভারত এবং চীন এই অঞ্চলের উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি। আমরা দুই শক্তির সঙ্গেই শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান চাই। সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ বা সম্পর্ক কোনোভাবে আমাদের এ সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা রাখুক, সেটা আমরা চাই না।
যুগান্তর : যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কিছু ঘটবে বলে মনে করেন কি?
এম হুমায়ুন কবীর : কেবল ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নয়, যেমনটি আমি বলেছি- অনেকগুলো বিষয়ে আমরা এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ভুগছি। বস্তুত ডোনাল্ড ট্রাম্পের এশিয়া পলিসি, চায়না পলিসি, ভারত পলিসি কী হবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
যুগান্তর : ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের সূত্র ধরে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন ঘটবে?
এম হুমায়ুন কবীর : আমার তা মনে হয় না। রাশিয়া, ভারত ও আমেরিকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের মতো ছোট দেশগুলোর ভূমিকা রাখার সুযোগ খুব একটা থাকে না সাধারণত। তবে এ সুযোগ যদি আমরা আমাদের সপক্ষে কাজে লাগাতে পারি, সেই কূটনৈতিক দক্ষতা নিয়ে যদি অগ্রসর হতে পারি, তাহলে সেটা হয়তো কাজে লাগতে পারে।
যুগান্তর : ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি বাংলাদেশীদের কতটা বিপদে ফেলবে?
এম হুমায়ুন কবীর : অভিবাসন ইস্যু আমাদের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছে। অভিবাসন প্রক্রিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের অগ্রাধিকারের তালিকায় এক বা দুই নম্বরে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ অবৈধ অভিবাসী আছে। এটা নিয়ে তিনি অনেক রকম কথা বলছেন। এখন অভিবাসী বিষয়ে তিনি যদি নীতি পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করেন, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেসব বাংলাদেশী আছেন, তারা একটা শংকার মধ্যে পড়বেন। বাংলাদেশীদের বেশির ভাগই ইতিমধ্যে নিয়মিত হয়েছেন। কিছু মানুষ প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে, কিছু মানুষ প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় আছে। আমরা যদি ধরে নিই, খুব অল্পসংখ্যক বাংলাদেশী প্রক্রিয়াধীন আছেন বা প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় আছেন, তাহলে তারা কোনো ধরনের শংকা বা অস্থিরতার শিকার হলে এর সরাসরি প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের কয়েক লাখ পরিবারের ওপর পড়বে, যা আমাদের সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের তৃতীয় বৃহত্তম রেমিটেন্স জোগানদাতা দেশ। গত বছর আমরা রেমিটেন্স হিসেবে চার বিলিয়ন ডলার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেয়েছি। বলা বাহুল্য, এ টাকাগুলো পাঠায় আমাদের বাংলাদেশী ভাইবোনরা। তারা যদি অস্থিরতায় ভোগে, শংকার মধ্যে পড়ে, তাহলে রেমিটেন্স প্রবাহে ধস নামবে। এটা আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে এক ধরনের অস্থিরতার সূত্রপাত ঘটাবে।
যুগান্তর : বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য বাংলাদেশের জন্য আশাপ্রদ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল নিয়েও অনিশ্চিত অবস্থা বিরাজ করছে। এতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কী ধরনের সংকটে পড়বে?
এম হুমায়ুন কবীর : আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় ক্রেতা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমরা প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের রেডিমেড গার্মেন্ট সেখানে পাঠাই। আমরা ইতিমধ্যে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ ডিউটি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঢুকছি। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, তিনি মেক্সিকোর জন্য ১০ শতাংশ বর্ডার ডিউটি ধার্য করবেন, ৩৫ শতাংশ ডিউটি ধার্য করবেন চীনের ক্ষেত্রে। যদি এগুলো বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সেটা জেনারেল পলিসি হিসেবে সব দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে এবং গার্মেন্টে যদি ১০ শতাংশ ডিউটি কোনোভাবে ঢুকে যায়, তাহলে আমাদের ঝুঁকি ও ক্ষতির মধ্যে পড়তে হবে। জটিলতা বাড়বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এবং এর ব্যাকওয়ার্ড ফলাফলটা হবে মারাত্মক। আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প দুই-তিন দশক ধরে ক্রমাগত উন্নতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং চল্লিশ লাখ নারী এখন এই সেক্টরে কাজ করছে। তাদের অনেকেই ক্ষতির সম্মুখীন হবে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জলবায়ু সংক্রান্ত বিষয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং তার নেতৃত্বে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্যারিসে ক্লাইমেট কনভেনশন স্বাক্ষরিত হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আকারে-ইঙ্গিতে বলেছেন, তিনি এসবে বিশ্বাস করেন না। তিনি যাদের কেবিনেটে নিয়োগ দিয়েছেন, তাদের অনেকেই এসব বিশ্বাস করেন না। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন যদি অবস্থার পরিবর্তন করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে, তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। শুধু আমরা নই, আমাদের মতো আরও অনেক দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।
এম হুমায়ুন কবীর : ধন্যবাদ।

No comments:

Post a Comment