Thursday, January 12, 2017

অপ্রকাশিত দুঃখরাই দলে ভারি

দোকানদারের বান্ধা কাস্টমারের মতো আমারও বেশকিছু বান্ধা পাঠক আছে। বৃহস্পতিবার দুপুরের আগেই যাদের ফোন পাবই কী পাব, দিনাজপুর সরকারি কলেজের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক প্রিয়ভাজন মাহাতাব তাদের একজন। গত বৃহস্পতিবারেই ঠিক করেছিলাম আজকের এই কলামটি যেহেতু ১২ তারিখ ছাপা হবে, সেহেতু বর্তমান সরকারের তিন বছর পূর্তি নিয়েই লিখব। দোলাচলে ভুগছিলাম, কী লিখতে কী লিখি।
আওয়ামী লীগারদের সমস্যা হল- তারা ভগ্নাংশ পছন্দ করেন না, একশ’ ভাগ প্রশংসা চান, অর্থাৎ আমাকে লিখতে হবে দেশে এখন উন্নয়ন ও গণতন্ত্র দুটোই সমান তালে চলছে। যদি লিখি এ তিন বছর বিএনপিকে যে নাশকতার অজুহাত তুলে সভা-সমাবেশ করতে দিলেন না, তো আপনাদের পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর কাজটা তাহলে কী- তারা ক্ষেপে যাবেন। এসব ভাবছি যখন, ঠিক তখনই মাহাতাবের ফোন। গত লেখাটা ছিল নিরেট রাজনীতিভিত্তিক আর তাতেই তার ঘোর আপত্তি। গ্রামাঞ্চলে নষ্ট সাইকেল, ঘড়ি, চাবি ইত্যাদি সারানোর কাজকে বলা হয় মেকারি, আর কাজটি যিনি করেন তিনি মেকার। ঘনিষ্ঠ উচ্চারণেই মাহাতাব বলে- রাজনীতির মেকারি করতে কে বলেছে আপনাকে? তার চেয়ে ঘড়ি মেরামতের একটা দোকান দিন অথবা ভাঙা ছাতা সারাতে রাস্তার পাশে বসে পড়–ন, কিছু না কিছু আয় হবে। তার পরামর্শ- রাজনীতির ধারেকাছেও যাবেন না, তাতে রিস্ক আছে, তাছাড়া মানুষের সাধ্যি নেই ওটা ঠিক করে, দায়িত্বটা প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দিন। ডারউইনের সেই যে হধঃঁৎধষ ংবষবপঃরড়হ- কোন্টা টিকে থাকবে আর কোন্টা অপসৃত হবে- প্রকৃতিই সিলেক্ট করে দেবে একসময়। হয়তো একসময় আজকের ডায়নোসররা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তেলেপোকারা (জনগণ) সগর্বে ঘোষণা করবে অস্তিত্ব। মাহাতাব আরও বলে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রকৃতি যেভাবে বিপর্যয় ঘটিয়ে ব্যালান্স করে- ম্যালথাসের সেই থিওরিই হয়তো কোনো একসময় রাজনীতিতে ওলট-পালট ঘটিয়ে সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে। এককথায় প্রকৃতিই আমাদের একমাত্র ভরসা। আপনি বরং সাধারণ মানুষের দুঃখ-বেদনার কথা লিখুন।
মাহাতাবের কাছে আমি সততই ঋণগ্রস্ত। কো-লেটারেল ছাড়াই সে আমাকে মাঝে-মাঝেই ঋণ দেয়। এটা আমার এক বড় ব্যাংকিং প্রিভিলেজ। যেমন, ভারতীয় আঞ্চলিক সাহিত্য, তা সেটা কন্নরা, মালয়ালাম, উড়িয়া, গুজরাটি, মারাঠি, তেলেগু, অসমীয়া কিংবা তামিল- আপডেট রাখে আমাকে। তার একটা অনুরোধ রাখতেই হয়, তাতে যদি কুঋণের (bad debt) কিছুটা হিল্লে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনীতির ধারেকাছে না গিয়ে সাধারণ মানুষের দুঃখ-বেদনার কথা লেখা কীভাবে সম্ভব? জাসদীয় রাজনীতি করার সময় মার্কসবাদ আমাকে শিখিয়েছিল- অর্থনীতি হচ্ছে একটি সমাজের নিন্মকাঠামো, বাকি সব উপরিকাঠামো। অর্থাৎ অর্থনীতিকে ভিত্তি করেই রাষ্ট্রের অট্টালিকাগুলো শুধু নয়, গড়ে ওঠে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, আচার-আচরণ, রুচি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, চিন্তাপদ্ধতি- সব। মানুষ কতটা আনন্দে থাকবে আর কতটা দুঃখ সইবে, সেটাও নির্ধারিত হয় সমাজটির অর্থনীতি দ্বারা। আবার অর্থনীতিকে যেহেতু নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি, তাই চূড়ান্ত বিচারে মানুষের দুঃখ-বেদনাসহ সবকিছুর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে থাকে রাজনীতি। শ্রমিক বস্তির যে দুঃখ-বেদনা আর গুলশান-বনানীর আনন্দ-উচ্ছ্বাস, তার মূলে রয়েছে দুটি ভিন্ন অর্থনীতি। আর এই দুই অর্থনীতির জনক একজনই, তিনি রাজনীতি। নিত্যসঙ্গী দারিদ্র্য গতরখাটা যে রিকশাওয়ালার মেজাজ খিটখিটে করে রাখে সর্বক্ষণ, সে যখন ন্যায্য ভাড়া না পেয়ে যাত্রীর সঙ্গে বেয়াদবি করে, তখন হাজারো চেষ্টায়ও তাকে আদব শেখানো যাবে না, যতক্ষণ না তার উপার্জন সেই যাত্রীর সমপরিমাণ হয়ে উঠবে। আমি ভদ্র, কারণ আমার পকেটভর্তি টাকা; সে অভদ্র, কারণ তার টাকা তো নেই-ই, পকেটই নেই; লুঙ্গি-গেঞ্জির পকেট থাকে নাকি? আবার এই যে কারও পকেটভর্তি টাকা আর কারও পকেটই নেই, খুঁজে দেখুন- পলিটিক্স ইজ দ্য মেইন অ্যাক্টর। এই যে উৎস খুঁজে দেখতে বললাম, সঙ্গে সঙ্গে গল্পটা মনে এলো।
প্যারিসের এক আদালতে যে মামলাই উঠুক না কেন, বিচারকের ওই এক কথা- মেয়েটিকে খুঁজুন। উকিল হয়তো বললেন- মাননীয় আদালত, এটা তো স্রেফ ট্যাক্স ফাঁকির মামলা, এখানে মেয়ে থাকবে কীভাবে? বিচারক তারপরও বলে চলেন- বললাম তো, মেয়েটিকে খুুঁজুন। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, সব মামলায়ই কোনো না কোনো মেয়ের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তো একবার এক লোক মিউনিসিপাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ আদায় মামলা করল যে, ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকায় তিনি নিচে পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছেন। বিচারক যথারীতি মেয়েটিকে খুঁজতে বললেন; কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো মেয়ে খুঁজে পাওয়া গেল না এবং বিচারের রায়ে লোকটি ক্ষতিপূরণ বাবদ মোটা অংকের টাকা পেয়ে গেলেন। রায় ঘোষিত হওয়ার পর উকিল লোকটিকে একটু দূরে ডেকে নিয়ে বললেন, আচ্ছা ভাই আপনি তো মামলায় জিতলেন, এখন তো আর কোনো সমস্যা নেই, সত্যি করে বলবেন কি ঘটনার সঙ্গে কোনো মেয়ের সম্পর্ক ছিল কিনা? লোকটি বলল, লজ্জার কথা কী আর বলব, আমি হাঁটতে হাঁটতে উপরে তাকাতেই দেখি দোতলার ব্যালকনিতে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে সে ফিক করে হেসে ওঠে। ওই হাসিটা ফলো করতে গিয়েই আমি পড়ে গেছি! এই গল্পে বিচারক প্রতিটি ক্ষেত্রেই মেয়েটিকে খুঁজতে বলছেন বটে; কিন্তু সবক্ষেত্রেই তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না অবশ্যই, যদিও সমাজের অনর্থগুলোর একটি বড় অংশই নারীকেন্দ্রিক। তবে মার্কসবাদীরা বিশ্বাস করেন, সমাজ-রাষ্ট্রের সব অনর্থ ও দুঃখ-বেদনার উৎসমুখ হল অর্থনীতি এবং তার অভিভাবক রাজনীতি। আমিও এই বিশ্বাসে আচ্ছন্ন ছিলাম অনেক কাল। ভাগ্যিস মার্কস নিজেকে প্রফেট দাবি করে তার ‘ক্যাপিটাল’ কিংবা ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’কে ঐশ্বরিক গ্রন্থ আখ্যা দেননি। তাহলে হয়তো এর ভেতর কোনো গলদ আছে কিনা, ভাবতেই চাইতাম না। ধর্মগ্রন্থ নিয়ে আবার দ্বিতীয় চিন্তা কীসের? মার্কসবাদ যে পরিত্যাগ করলাম,
তার সোজাসাপ্টা কারণ এই যে, একটা পর্যায়ে এসে মতবাদটিকে ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্পষ্টতই দেখলাম, এ মতবাদ জীবনকে সামগ্রিকতায় পরিব্যপ্ত করতে পারে না। মানুষের এমন অনেক প্রবৃত্তি, অনুভূতি, আবেগ, আকাক্সক্ষা, সুখ-দুঃখ থাকে, যা রাজনীতি অথবা অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন; সরাসরি তো বটেই কোনো দূরবর্তী বন্ধনেও এগুলোকে আবদ্ধ করতে পারে না মার্কসবাদ। সুতরাং মাহাতাবকে আগেই সুখবরটা জানিয়ে রাখি, রাজনীতির উঠানে পা না দিয়েই একটা বাইপাস রোড ধরে আমি নিশ্চয়ই পৌঁছে যেতে পারি দুঃখ-বেদনার ভুবনে। তবে তার আগে, এই যে বললাম মার্কসবাদ জীবনের সব প্রবৃত্তি, আকাক্সক্ষা ধারণ করতে পারে না, তার একটা উদাহরণ দিয়ে ওকে একটু হাসিয়ে নিই। এক কমিউনিস্ট দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেছেন সেখানকার ভূমিহীন কৃষকদের সমাজতান্ত্রিক আদর্শে দীক্ষিত করতে। ক্ষেতমজুরদের সভা ডেকে তিনি সহজ ভাষায় বোঝাচ্ছিলেন শোষণহীন সমাজে সবাই কীভাবে সমান অধিকার ও সুযোগ ভোগ করতে পারবে ইত্যাদি। তার বক্তৃতার এক পর্যায়ে এক ক্ষেতমজুর উঠে বলল- আমি আপনার এই রাজনীতি মানি না। নেতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কেন? ক্ষেতমজুরের জবাব, সবাই যদি সমান হয়ে যায়, আমি তাহলে দেওয়ানী হব কীভাবে? দেওয়ানী মানে জোতদার, যার জমিতে সে মজুরের কাজ করে। তার আকাক্সক্ষা সে-ও একদিন জমির মালিক হবে, ক্ষেতমজুর পুষবে, সবাই দেওয়ানীকে যেভাবে সালাম দেয়, তাকেও তেমনি সম্মান করবে। শ্রেণীহীন সমাজে তো সে তেমনটা হতে পারবে না। মার্কসবাদ কি সত্যিই পারে মানুষের এই অকৃত্রিম,
স্বতঃস্ফূর্ত আকাক্সক্ষাকে দমন করতে? হ্যাঁ, মাতাহাব সাধারণ মানুষের দুঃখ-বেদনার কথা লিখতে বলেছে। এর কি শেষ বলে কিছু আছে? আমরা ক’জনের অন্তর্গত দুঃখের কথা জানি অথবা বুঝতে পারি? একদিন এক নারী তার কিছু কথা বলবে বলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে এলেন আমার কাছে। ফ্যাশনদুরস্ত, চোখে সানগ্লাস, প্রসাধনীর আড়ালে গায়ের রঙ বোঝা যায় না। কথা বলতে বলতে ভদ্রমহিলা ঝরঝর করে কাঁদতে শুরু করলেন। তার প্রসাধনী গলে গলে পড়ছে। স্মার্টনেসের বেলুন এত সহজেই চুপসে যেতে পারে! হ্যাঁ, রাস্তায় বেরোলে আমরা বাহারি পোশাকের যে নিত্যনতুন ফ্যাশন দেখি, সেগুলোর ভেতরের অনেক গেঞ্জিই দুঃখমাখা। এসব দুঃখের অধিকাংশেরই রাজনীতি অথবা অর্থনীতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এ দুঃখ অলংঘনীয়, কোনো রাষ্ট্রনায়ক, কোনো দার্শনিকের মুরোদ নেই তা লাঘব করার। যেমন ধরুন, উদাহরণটা মফস্বল শহর থেকে নিই- কো-এডুকেশনের একটি হাই স্কুলে ক্লাস টেনে পড়ছে ২০ জন ছাত্র আর একজন মাত্র ছাত্রী, সে আবার সুশ্রীও। মনোবিজ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই, এমনিতেই বলে দেয়া যায়, ওই ২০ ছাত্রের অন্তত কয়েকজন মেয়েটিকে নিয়ে কল্পনা সাজায়। কেউ কেউ হয়তো কাটায় বিনিদ্র রজনী। একটাই আরাধনা- যদি সে তাকে ভালোবাসে! মুখ ফুটে বলাও যায় না সে কথা। অসম্ভব পুলকে কাটে দিন, রাত আসে, আবার দিন। কখন স্কুলের ঘণ্টা বাজবে, দেখবে মেয়েটিকে। কিন্তু ঘটল কী? একদিন দেখা গেল কেউ একজন ইটখণ্ডের খয়েরি রঙে স্কুলের দেয়ালে লিখে রেখেছে- রুমা+আমজাদ বিএসসি। কয়েকদিন পর সেই বিএসসি স্যার মেয়েটিকে বিয়ে করে ঘরে তোলে। কয়েক তরুণের এই যে দুঃখ, এই বোবা কান্নার খোঁজ কে রাখে? নিউজইউক কিংবা টাইম ম্যাগাজিনের পাতায় এদের কারোরই ছবি ছাপা হবে না। এই অপ্রকাশিত বেদনার প্রতিকারই বা কী! মার্কসবাদ? ডিজিটাল বাংলাদেশের রাজনীতি অথবা বিশ্বায়নের তত্ত্ব?
আমার ধারণা, প্রবাসে ও কারাগারে কিছুকাল বাস না করলে বাঙালির দুঃখ-বেদনা-কষ্টের সম্যক উপলব্ধি সম্ভব নয়। প্রবাসী ও কারাগারের বাঙালির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে দুঃখ-বেদনার নানা রঙ ও বিচিত্র রূপ দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। লন্ডন ও নিউইয়র্কের একটি টিপিক্যাল (প্রতিনিধিত্বশীল) বাঙালি চরিত্র এমন : যৌবনে কোনোভাবে পাড়ি জমিয়েছিলেন সমুদ্র। স্বপ্নের ভূমিতে পা রাখতে না রাখতেই শুরু হয় উপার্জন। টাকায় টাকা। বউ নেই, সন্তান নেই- কী করবেন অত টাকা দিয়ে? পাঠান দেশে- জমি কেনো, দোকান রাখো, ঘর পাকা করো। ভাতিজির ফর্ম ফিল-আপ, বড় চাচার চিকিৎসা, খালাতো বোনটার বিয়ে- চাহিবামাত্র সুপারসনিক গতিতে চলে যায় টাকা। কয়েক বছর পর বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে আসেন দেশে। কিন্তু এ কী! তিনি যে প্রতারিত। তার নামে কেনা হয়নি কোনো জমি, রাখা হয়নি দোকান। ঘরের যে হাল দেখে গিয়েছিলেন, তার উন্নতি তো হয়ইনি, ধসে গেছে। আত্মীয়-স্বজনরা টাকা চায়; কিন্তু ইতিমধ্যে বিয়ে করে সন্তানের জনক হয়েছেন বলে আগের মতো তা দিতে পারেন না। আগে ১২ আনা উপকার করেছেন তো কী হয়েছে, এখন ৪ আনা দিতে পারছেন বলেই তো তাদের ১ টাকা হচ্ছে না! উপকৃতরা তাই অকৃতজ্ঞ হয়ে ঝাল মেটায় না শুধু, কৃতঘœ হয়ে ওঠে। ক্ষতি করতে চায় তার। বেচারা কী আর করে! একগাদা গিফট এনেছিলেন, খালি হয়ে গেছে ব্যাগ, সেই ব্যাগে একরাশ দুঃখ ঢুকিয়ে ছোটেন এয়ারপোর্টের দিকে, দ্রুতই ধরতে হবে প্লেন। দেশে ফিরলে বাড়তে থাকে বিতৃষ্ণা, ওদিকে বাড়ে সন্তানের বয়সও। তারা শিক্ষিত হয় ইংরেজি মিডিয়ামে, মিশতে থাকে মেইনস্ট্রিমে, সাদাদের সঙ্গে। বাবার সেই যোগ্যতা নেই, সন্তানের সামনে ভোগে ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্সে, সন্তানের চোখে ফোটে বাবার প্রতি অবজ্ঞার রেখা। এরপর তাদের বয়স যখন ১৮, বিচ্ছিন্নতার স্কেলে সেই শেষ দাগ। কর্মক্ষমতা হারানোর পর স্ত্রীও যেন কেমন কেমন করেন। তখন ইচ্ছা হয়, সব ফেলে-টেলে ফিরে যাই দেশে; কিন্তু ততদিনে বাঁধিয়েছেন কিছু রোগ। ফলে যাবেন কোন্ যুক্তিতে? এই চিকিৎসা কি পাবেন তিনি সেখানে? উল্টো পরিবেশ-দূষণ আরও জটিল করে তুলবে রোগ। তাই মেডিকেল গ্রাউন্ডেই থেকে যাওয়া আর সীমাহীন দুঃখ দিয়ে মোড়া বিছানায় শুয়ে একটাই কনসোলেশন আওড়ানো- আমার আছে আমেরিকান অথবা ব্রিটিশ পাসপোর্ট। ’৭৬ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিখ্যাত কবির অপ্রকাশিত কবিতার মতো এক যুবকের অব্যক্ত দুঃখের কথা জেনেছিলাম কায়দা করে। প্রেমিকা নালিশ করেছিল, থানার অবিবাহিত এসআই তাকে বিয়ে করতে চায়। প্রেমের শক্তির চেয়ে বড় আর কোন্ সে পারমাণবিক অস্ত্র! এসআইকে ধমক লাগায় সে।
কয়েকদিন পর পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির থানা লুট পরিকল্পনার মামলায় জড়িয়ে তাকে আসামি করা হয়। এই নিয়তি তাকে এতটুকুও কাবু করতে পারেনি; কিন্তু জেলে বসে সে জানতে পেরেছে তার প্রেমিকা ওই এসআইকেই বিয়ে করেছে! জীবনানন্দ দাশের ‘কে হায় হৃদয়ে খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে’- এর চেয়েও মর্মস্পর্শী লাইন লেখা যেতে পারে না কি! মানবজীবনে সুখের চেয়ে দুঃখের পরিমাণ অবধারিতভাবেই বেশি। যারা সুখের আধিক্য অথবা আতিশয্য দেখতে পান, তারা অপ্রকাশিত দুঃখগুলোর খোঁজ রাখেন না। আবার এভাবেও বলা যায়, যারা নিজেকে সুখী ভাবছেন, তারা দুঃখগুলোকে জয় করেই সুখী হয়েছেন। অন্যভাবেও বলি, সুখের প্রচণ্ড শক্তি মানুষকে উজ্জীবিত করে বলে ক্ষণকালের সুখ দীর্ঘ একটা ব্রেকে ভুলিয়ে রাখে দুঃখ। অথবা এটাও হয়তো ঠিক যে, দুঃখের থাকে এক ধরনের চিনচিনে মিষ্টি ব্যথা, যা উপভোগ করে বেঁচে থাকে মানুষ। চূড়ান্ত হিসাবে দুঃখী মানুষের সংখ্যাই যে বেশি, আলবার্তো মোরাভিয়ার গল্পটিই তার একটি প্রমাণ। এক লোক গহীন বনের এক গাছে দড়ি টানিয়েছে আত্মহত্যা করবে বলে। ঝুলতে যাবে, এমন সময় সে দেখতে পায় দূরের আরেকটি গাছে দড়ি ঝুলিয়ে আরেকজন প্রস্তুতি নিচ্ছে আত্মহত্যার। লোকটি ভাবে, আমি তো মরছিই, মরার আগে ওই লোকটাকে বাঁচাতে পারলে একটা পুণ্য যদি হয়! সে তার কাছে গিয়ে জীবন সম্পর্কে আশাবাদী করে তোলে তাকে। আরও বোঝায়, সে যদি বেঁচে থাকে, তাহলে একদিন আজকের এই আত্মহত্যা প্রচেষ্টার কথা ভেবে সে মনে মনে হাসবে আর ভাববে কী বোকাটাই না ছিল সে। এভাবে বুঝিয়ে-সুজিয়ে তাকে আত্মহত্যা থেকে ফেরায় সে। এরপর সে ফিরে আসে তার গাছের কাছে, ঝুলবে বলে। এসে দেখে আরেকজন তারই দড়িতে ঝুলে আছে নিথর!
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
mahbubkamal08@yahoo.com

No comments:

Post a Comment