নতুন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার অভিষেক ভাষণে অতীতের চর্বিতচর্বণ
করে কথিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির দম্ভ শুনিয়েছেন। এ দর্শন গত শতাব্দীর
ত্রিশের দশকের বিচ্ছিন্নতাবাদী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ কমিটির প্রচারণার
প্রতিধ্বনি বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারি নীতিতে এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে সারা
বিশ্বের বিশ্বস্ত মিত্রদের হারাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের
পূর্বসূরিরা প্রেসিডেন্টের অভিষেক ভাষণে আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেই
ঘোষণা দিতেন, বিশ্বের সুপারপাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে গেলে তার সব
মিত্রও এর সুফল পাবে এবং তারা উন্নতি ও প্রগতির পথে হাঁটবে। উন্নয়নের
গাড়িতে সবাইকে নিয়ে বিশ্ব ব্যবস্থার চালক থাকত আমেরিকা। কিন্তু ডোনাল্ড
ট্রাম্প ওই নীতির পরিবর্তে একটি কালো নীতির ঘোষণা দিয়েছেন। ‘আমেরিকা
ফার্স্ট’ নামের চরম কট্টরপন্থী দর্শন ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। এর ফলে ৭০ বছর
ধরে বিশ্ব ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র প্রবর্তিত উদারনীতির অবসান হতে পারে বলে
আশংকা দেখা দিয়েছে।
ট্রাম্পের নতুন কৌশল হিসেবে বলা হচ্ছে, সব ক্ষেত্রে
আমেরিকার স্বার্থই প্রথম। নতুন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিয়েছেন, এতকাল যা হয়েছে
ওইদিন শেষ। কোনো দেশের প্রতিরক্ষার কাজে আমেরিকা ভর্তুকি দেবে না। নিজেদের
বিলিয়ন ডলার খরচ করে কথিত মিত্রকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। ট্রাম্পের
ভাষায়, ‘আজ থেকে যেদিন শুরু হচ্ছে, তা হবে সবার আগে শুধু আমেরিকার। অন্য
দেশের ব্যবহার থেকে আমরা আমাদের সীমান্ত রক্ষা করব। আমাদের পণ্য, আমাদের
কোম্পানি ও আমাদের কর্মসংস্থানে অন্য কারও ভাগ দেব না।’ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের
পর ত্রিশের দশকে চার্লস লিন্ডবার্গ প্রথম ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধারণা প্রদান
করেন। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা চার্লস লিন্ডবার্গ এ নীতি পেয়েছিলেন তার
বাবা কংগ্রেসম্যান চার্লস অগাস্ট লিন্ডবার্গের কাছ থেকে, যিনি প্রথম
বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার অংশগ্রহণের চরম বিরোধিতা করেছিলেন। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে এ নীতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্টের
বিরোধিতা করেন সেনা কর্মকর্তা লিন্ডবার্গ। রুজভেল্ট চেয়েছিলেন জার্মানির
হামলা থেকে মিত্র ব্রিটেনকে রক্ষা করতে। ১৯৪১ সালে রুজভেল্টের সিদ্ধান্তের
বিরোধিতা করে লিন্ডবার্গ তার কর্নেল পদ ছেড়ে দেন। ৪ বছর পর জাপান পার্ল
হারবারে হামলা করলেই শুধু তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণের পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বিশ্ব এক নতুন ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। উদারনীতির
স্লোগান নিয়ে তৈরি হয় জাতিসংঘ। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তকে জাতিগুলোকে সহায়তা করে
গণতান্ত্রিক ধারায় তাদের উত্তরণের সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এ পদ্ধতিতে
বাড়তে থাকে মার্কিন মিত্র দেশের সংখ্যা। মার্শাল প্ল্যানের ভিত্তিও ছিল
এটি।
বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করে আমেরিকার অর্থ সাহায্য,
প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া হয়। সর্বজনীন
প্রতিরক্ষার দেয়াল হিসেবে দাঁড় করানো হয় ন্যাটো। ডোনাল্ড ট্রাম্পের
নির্দেশিত কিছু বিষয়ের হয়তো সত্যতা রয়েছে। তিনি বলেছেন, ন্যাটো জোটের অনেক
দেশই নিজেদের দায়িত্ব পালন করছে না। তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে
সুবিধা নিচ্ছে। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমরা অন্য দেশকে ধনী বানিয়েছি। কিন্তু
আমাদের সম্পদ-শক্তি-সামর্থ্য দিগন্তে ভেসে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
আমেরিকার মধ্যবিত্ত শ্রেণী। আমেরিকার স্বপ্নকে কেটে কেটে পুরো বিশ্বে উড়িয়ে
দেয়া হয়েছে।’ এ প্রসঙ্গে মার্কিন বিশেষজ্ঞ রিচার্ড এন হ্যাস বলেন,
‘ট্রাম্পের ঘোষণা স্থূলদৃষ্টিসম্পন্ন। ট্রু–ম্যান, আচেসন সবাই মার্কিন
স্বার্থ রক্ষা করেছেন ‘ওয়ার্ল্ড ফার্স্ট’ নীতি দিয়ে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নয়।
সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির আমেরিকা ফার্স্ট নীতি চালু করলে অন্য দেশগুলোও
সমান্তরালভাবে তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে স্বার্থবাদী স্বাধীন নীতি গ্রহণ করবে।
তাতে মার্কিন আধিপত্যই নষ্ট হবে এবং বৈশ্বিক উন্নয়নে প্রভাব পড়বে।’ রিয়েল
স্টেট ব্যবসায়ী ট্রাম্পের বোধবুদ্ধি অনুযায়ী বিনিয়োগ করলেই মুনাফা মেলে।
তাই তিনি আমেরিকান পারফরম্যান্সকে দাঁড়ি-পাল্লায় ফেলে লাভ-ক্ষতির হিসাব
করছেন। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু ট্রাম্পের এই নীতির বিরোধিতা
তার নিজের মন্ত্রিসভার ভেতরেই উঠেছে। তার মনোনীত প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল
জেমস ম্যাটিস সিনেট শুনানিতে ন্যাটো টিকিয়ে রাখার পক্ষে বলেছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন, জাতিসংঘে নিযুক্ত নিকি হ্যালি মার্কিন
মিত্রদের সুরক্ষার কথা বলেছেন। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আমেরিকা ফার্স্ট
বলতে আসলেই কী বোঝানো হচ্ছে আর ট্রাম্প তা কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন মনে মনে
ভেবেছেন। গত বছরের মার্চে নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক এই পরিভাষা সম্পর্কে
ট্রাম্পকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী নই, আমি চাই সবার
আগে আমেরিকা থাকুক। তাই আমি এই টার্মটি পছন্দ করি।’ রিপাবলিকান মনোনয়ন
পাওয়ার পর দ্য টাইমসকে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বলতে
লিন্ডবার্গ যা বুঝিয়েছিলেন আমি তা বোঝাচ্ছি না। আমি এটাকে নতুন ব্র্যান্ড
হিসেবে ও আধুনিক পরিভাষা হিসেবে দেখছি। তার মানে বিশ্বে কোথায় কী হচ্ছে তার
চেয়ে নিজের দেশের যতœ নিতে হবে।’ ট্রাম্পের দৃষ্টিতে পৃথিবীতে আমেরিকার
ভূমিকা সুপার পাওয়ার হিসেবে থাকবে না। বিশ্বকে বদলে দেয়ার কোনো আকাক্সক্ষাও
থাকবে না। স্বৈরশাসন, ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে অবস্থান থাকবে না। বিশ্বজুড়ে
মানবাধিকার রক্ষার কোনো দায় থাকবে না। অথচ ৫৬ বছর আগে জন এফ কেনেডি তার
বিখ্যাত ভাষণে বলেছিলেন, দেশের এবং দেশের বাইরে বিশ্বের সর্বত্র মানবাধিকার
রক্ষা করতে হবে। আমেরিকা বিশ্বের সব যন্ত্রণার ভার বহন করবে, সব কাঠিন্য
মোকাবেলা করবে, বন্ধুর পাশে দাঁড়াবে, শত্রুর বিরোধিতা করবে। আর এভাবেই
স্বাধীনতাকে অর্থবহ করবে ও টিকিয়ে রাখবে।’ কিন্তু ট্রাম্প কোনো ভার বহন
করতে চান না। তিনি তো বলেই দিয়েছেন, ‘আমরা আমাদের জীবন পদ্ধতি কারও ওপর
চাপিয়ে দিতে চাই না। বরং একে আরও উজ্জ্বল ও দৃষ্টান্তমূলক করব, যাতে অন্যরা
এটা অনুসরণ করতে পারে।’
নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে মো. হাসানুজ্জামান।
নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে মো. হাসানুজ্জামান।

No comments:
Post a Comment