প্রকৃত
অর্থে নিরপেক্ষ, সৎ, যোগ্য ও গ্রহণযোগ্যদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি)
গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন ১২ বিশিষ্ট নাগরিক। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,
দলপন্থী নিরপেক্ষরা যাতে কোনোভাবেই এখানে স্থান না পান তা নিশ্চিত করতে
হবে। তবেই ইসির প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। আগামীতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু
এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে তারা এসব প্রস্তাব দেন।
প্রস্তাবের ব্যতিক্রম হলে শুরুতেই নির্বাচন কমিশন ঘিরে রাজনৈতিক সংকট তৈরি
হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা। বিশিষ্টজনরা বলেন, অতীতে কোনো
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না এমন নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য
ব্যক্তিদের নিয়ে ইসি গঠন এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। যাদের নৈতিক ও
চারিত্রিক গুণাবলী হবে অনন্য। তারা হবেন সৎ ও যোগ্য। তাদের মাঠ প্রশাসন
পরিচালনায় দক্ষ হতে হবে। এছাড়াও বিশিষ্টজনরা নির্বাচন কমিশন গঠনে সংবিধান
অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব আইন প্রণয়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা
বলেছেন, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সংবিধান
মেনে এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন।
এ কাজটি যত দ্রুত করা যায় ততই দেশের জন্য
মঙ্গল। সার্চ কমিটি কতটা আন্তরিক সে বিষয়টিও জানতে চান বিশিষ্টজনরা। তারা
বলেন, দেশের মানুষ অনেক আশা নিয়ে সার্চ কমিটির দিকে তাকিয়ে আছেন। তাই সার্চ
কমিটির এ বৈঠক যাতে লোক দেখানো না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। বৈঠক শেষে
মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বলেন, ‘সার্চ কমিটিতে ১২ জন বিশিষ্ট নাগরিক
এসেছিলেন। কমিটি তাদের স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মূল্যবান পরামর্শ ও বক্তব্য
শুনেছে। তারা সিইসি (প্রধান নির্বাচন কমিশনার) ও ইসি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কী
ক্রাইটেরিয়া হতে পারে সে ব্যাপারে মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন। কী আঙ্গিকে,
কী পদ্ধতিতে সিইসি ও ইসি বাছাই করতে হবে সে পরামর্শ দিয়েছেন। সেগুলো আমরা
রেকর্ড করেছি। তাদের অধিকাংশের মতামত হচ্ছে, যারা পার্টিজান নন
(দলনিরপেক্ষ) সে রকম লোককে বাছাই করতে হবে।’ নিয়োগের পদ্ধতি কী হবে- এমন
প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পদ্ধতি ওটাই যে সৎ, নিরপেক্ষ, দক্ষ ও মাঠ প্রশাসনে
অভিজ্ঞ এমন লোককে নিয়োগ দিতে হবে। আশা করি, কমিটি তাদের পরামর্শ রাখবেন।’
বিশিষ্টজনরা কোনো নাম প্রস্তাব করেননি বলেও জানান তিনি। সোমবার
সুপ্রিমকোর্টের জাজেস লাউঞ্জে সার্চ কমিটির সঙ্গে দেশের বিশিষ্ট ১২ নাগরিক
মতবিনিময় করেন। বিকাল ৪টা ১৫ থেকে সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিট পর্যন্ত বৈঠক চলে।
দেশের জনগণ কি ধরনের ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনে দেখতে চান তা নিয়ে প্রায় ২
ঘণ্টা ধরে আলোচনা হয়। ইসি গঠনে কর্মপদ্ধতি নির্ধারণে বিশিষ্ট নাগরিকের
মতামত নিতেই মূলত এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। একই উদ্দেশে আগামীকাল সার্চ
কমিটির সদস্যরা আরও ৫ বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বেলা ১১টায়
সুপ্রিমকোর্ট জাজেস মিলনায়তনেই এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় দফায়
আমন্ত্রিত ৫ বিশিষ্ট নাগরিক হলেন- সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনা,
প্রবীণ সাংবাদিক ও সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, ডেইলি স্টার সম্পাদক
মাহফুজ আনাম, প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ এবং
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ। এছাড়া রাষ্ট্রপতি মো.
আবদুল হামিদের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেয়া রাজনৈতিক দলগুলোকে নাম দেয়ার সময়
বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সার্চ কমিটি।
মঙ্গলবার বেলা ১১টার পরিবর্তে একই
দিন বিকাল ৩টার মধ্যে প্রত্যেক দলকে ৫ জনের নাম মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের
অতিরিক্ত সচিবের (প্রশাসন ও বিধি) কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। বৈঠক শেষে
আলাপকালে কয়েকজন যুগান্তরকে তাদের হতাশার কথা জানান। কয়েকজনের মতামত ও
পরামর্শ কতটা রাখা হবে তা নিয়েই সংশয় প্রকাশ করেছেন। এমনকি এক্ষেত্রে
সমস্যার স্থায়ী সমাধানমূলক বক্তব্য দিতে গিয়ে কেউ কেউ বিরত ছিলেন। এ
প্রসঙ্গে নামপ্রকাশ না করে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা তর্ক করতে
যাইনি। মতামত দিতে গিয়েছিলাম। যে যার মতো কথা বলে এসেছি।’ আরেক সদস্য বলেন,
‘আগে থেকেই যদি বিষয়টি সেটল (নির্ধারিত) করা থাকে, তাহলে এ বৈঠকের কোনো
অর্থ নেই। তারপরও জাতীয় স্বার্থে আমরা আমাদের কথা বলতে এসেছি।’ অপর সদস্য
বলেন, ‘এবার যদি আমরা সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করি, তাহলে আগামীতে আরও বড় মাসুল
দিতে হতে পারে।’ তার মতে, ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থেই অবাধ,
সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা জরুরি। এজন্য নির্বাচন কমিশনে
মেরুদণ্ডসম্পন্ন ব্যক্তিদের দরকার। যদি বিতর্কিত কাউকে দিয়ে কমিশন করা হয়,
তবে তা জনগণও গ্রহণ করবে না।’ নতুন ইসি নিয়োগে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ
২৫ জানুয়ারি সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ
হোসেনের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করেন। এ কমিটির অন্য সদস্যরা
হলেন- হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, সরকারি
কর্ম-কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক, মহা-হিসাবনিরীক্ষক
(সিএজি) মাসুদ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক শিরীন
আখতার। সার্চ কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে নতুন নির্বাচন কমিশনের জন্য
নাম প্রস্তাবের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের সুপারিশ থেকেই অনধিক পাঁচ
সদস্যের ইসি নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ কমিটির কাজে
সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে। গত শনিবার (২৮ জানুয়ারি) সুপ্রিমকোর্ট জাজেস
লাউঞ্জে সার্চ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে ১২ জন বিশিষ্ট
নাগরিকের নাম ঘোষণা করে তাদের মতামত নেয়ার কথা জানানো হয়।
এছাড়া
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যে ৩১টি রাজনৈতিক দল সংলাপে অংশ নিয়েছে তাদের ৩১
জানুয়ারির মধ্যে নতুন নির্বাচন কমিশনের জন্য ৫টি করে নামের প্রস্তাব দিতে
বলা হয়। প্রস্তাবিত নাম মন্ত্রিপরিষদের অতিরিক্ত সচিবের (প্রশাসন ও বিধি)
কাছে জমা দিতে বলা হয়। এ সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবেই সোমবার বিশিষ্ট নাগরিকদের
সঙ্গে বৈঠক করে সার্চ কমিটি। এ বিশিষ্ট নাগরিকরা হলেন- শিক্ষাবিদ অধ্যাপক
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি আবদুর রশিদ, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক দুই উপাচার্য অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী ও অধ্যাপক
এসএমএ ফায়েজ, ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেম
ফজলুল হক, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল,
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা, সাবেক দুই নির্বাচন
কমিশনার ছহুল হোসাইন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন,
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল
আলম মজুমদার, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ এবং পুলিশের সাবেক
মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা। বৈঠক শেষে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম
শামসুল হুদা সাংবাদিকদের বলেন, এমন একটা কমিশনের প্রস্তাব করা উচিত যা
মানুষের মনে প্রাথমিকভাবে একটা আস্থার সৃষ্টি করতে পারে।
শুরুতেই যদি
অনাস্থা ভাব আসে তবে সেই কমিশনের জন্য কাজ করা অসুবিধাজনক। আমরা যাদের
ক্যান্ডিডেট হিসেবে মনোনীত করি তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক না করলেই মূলত
অনাস্থাটা সৃষ্টি হয়। যারা পলিটিক্যাল এক্টিভিস্ট সে রকম লোক যদি হয় তাহলে
একটা অনাস্থার সৃষ্টি হয়। কারণ আমাদের দেশের রাজনীতিটা একটা বিভাজিত
রাজনীতি। তবে আমরা এ কথা বলি না যে তাদের পলিটিক্যালি নিউট্রাল হতে হবে।
সবারই একটা পলিটিক্যাল মতাদর্শ থাকে। কিন্তু এমন হতে হবে যে, তারা অতীতে
ছাত্র জীবনে হোক কিংবা কর্মজীবনে হোক কোন ধরনের রাজনীতির সঙ্গে এক্টিভলি
জড়িত ছিলেন না। অর্থাৎ তারা কোন পার্টির পোস্ট হোল্ড করেন নাই। তারা কখন
নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য কারও কাছ থেকে নমিনেশন চান নাই। কিংবা অন্যান্য
প্রফেশনাল সংগঠনের সঙ্গে তারা কখনও জড়িত ছিলেন না। তিনি আরও বলেন, পাঁচ বছর
সময়ের জন্য যদি কাজগুলো তারা শুরু করেন তাহলে আস্তে আস্তে আস্থা অর্জনে
সক্ষম হবেন। এমন লোককে বাছাই করা উচিত যারা ওই পদের যোগ্যতাসম্পন্ন।
নিম্নযোগ্যতার লোককে যদি দেন তারা এটাকে একটা প্রিভিলেজ বলে মনে করে। এতে
প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ থাকে। তিনি বলেন, কমিটি আমাদের কাছে নাম চায়নি।
আমাদের কাছে পদ্ধতি চেয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী পরামর্শ দিয়েছি। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি একে আজাদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন,
সুষ্ঠু
নির্বাচনের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন অপরিহার্যের বিষয়টি তুলে
ধরেছেন সবাই। এজন্য অধিকাংশই সংবিধান অনুযায়ী আইন তৈরির কথা বলেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক যারা তাদের মধ্য থেকে, সততা, মর্যাদা ও
ন্যায়পরায়ণতা অদ্বিতীয় ও জাতির কাছে স্বচ্ছ এমন লোক বেছে নেয়ার পরামর্শ
দিয়েছেন। যার নাম দেয়া হবে তারা যেন সততার সঙ্গে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের
সক্ষম হন সে দিকটি দেখতে হবে। পাবলিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছে,
অভিজ্ঞতাও আছে এমন ব্যক্তি হতে হবে। ন্যায়-নীতির প্রশ্নে আপসহীন হতে হবে।
অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, একটা কথা আপনাদের মনে রাখতে
হবে আমরা আমন্ত্রিত হয়েছি এখানে নাগরিক কমিটির সদস্য হিসেবে। কমিশনে কারা
যাবেন তাদের নাম পাঠানোর দায়দায়িত্ব সার্চ কমিটির। আমাদের সঙ্গে তাদের
মতবিনিময় হচ্ছে একটা ধারণা নেয়া। জনগণ কোন ধরনের মানুষকে নির্বাচন কমিশনে
দেখতে চায়। আমরা বলেছি, এমন মানুষকে নির্বাচন কমিশনে দেখতে চাই যারা সুষ্ঠু
নির্বাচন করতে পারবেন। বিষয়টা খুব একটা গবেষণা করে বের করতে হবে তেমন নয়।
সৎ, যোগ্য, উপযুক্ত, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে এমন ব্যক্তিদের খুঁজে পেতে
সার্চ কমিটি আমাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি আরও বলেন, আস্থার সংকট
বিভাজিত। কিছু মানুষের আস্থার সংকট আছে, কিছু মানুষের আস্থার সংকট নেই।
আস্থার সংকটের ওপর যদি আমরা দাঁড়িয়ে থাকি তাহলে কখনই সামনের দিকে এগুতে
পারব না।
সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছে। যে আস্থার সংকটের কথা এতদিন ধরে আসছিল তা
অনেকটা প্রশমিত হয়ে আসছে। সার্চ কমিটির সদস্যরা পেশাগত জীবনে যোগ্যতার
সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাদের ওপর আস্থা আনা জনগণের নৈতিক দায়িত্ব।
নির্বাচন ভণ্ডুল নির্বাচন কমিশন করে না, সার্চ কমিটিও করে না। নির্বাচন
অন্যরকম হলে মূলত দায় থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর এবং জনগণের। ব্রিগেডিয়ার
জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমি লিখিত বক্তব্য দিয়েছি। সার্চ
কমিটির যদি ভালো নাম প্রস্তাব করতে না পারেন তাহলে উনারা জাতির কাছে দায়ী
থাকবেন। তার সঙ্গে আমাদের নামও যুক্ত হল। তিনি বলেন, কী কী যোগ্যতা ও
দক্ষতার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনারদের নাম প্রস্তাব করা যায় তা বলেছি। যে
লোকটি নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে, যার ওপর রাজনৈতিক দলসহ সাধারণ মানুষের
বিশ্বাস থাকবে, এমন ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের কথা বলেছি।
উনারা সিনসিয়ারলি দেখছেন। না হলে আমাদের ডাকার কোনো মানে হয় না। ঢাবির
বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক সাংবাদিকদের বলেন, কী
যোগ্যতাসম্পন্ন লোকেরা নির্বাচন কমিশনার হলে ভালো হবে তাই আলোচনা হয়েছে।
আমরা কেউ আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। বলেছি, এখনও সময় আছে আইন প্রণয়ন
করে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেয়া হোক। আইন প্রণয়নের কারণে কমিশনার নিয়োগে
এক মাস বা দুই মাস সময় লাগলে তাতে কোনো কাজ আটকে থাকবে না। একটু সময় নিয়ে
হলেও আইন করা প্রয়োজন। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অনুসন্ধান
কমিটির কাছে প্রত্যাশা হল- যেন কতগুলো সুস্পষ্ট মানদণ্ডের আলোকে ইসি
নিয়োগের সুপারিশ তৈরি করেন, অস্পষ্ট বিবেচনার ভিত্তিতে নয়। রাষ্ট্রপতির
কাছে যে নামগুলো সুপারিশ করবেন তাতে যেন বস্তুনিষ্ঠতা থাকে। আরও
সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার হওয়ার
যোগ্যতা ও অযোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করে তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার
অনুরোধ করছি। রাষ্ট্রপতি তার সুপারিশে যোগ্যতার একটি মাত্র মানদণ্ডই
নির্ধারিত করে দিয়েছেন, তা হল যে কমিশনারদের মধ্যে অবশ্যই একজনকে নারী হতে
হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের যোগ্যতার মানদণ্ড সম্পর্কে
২৫ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে জারি করা প্রজ্ঞাপনে কিছুই বলা নেই। তাই আপনাদের
কাজটি আরও সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে হবে। আপনাদের সিদ্ধান্তকে নাগরিকদের
কাছে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে বিবেচনাধীন ব্যক্তিদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার
মানদণ্ড আপনাদের নির্ধারণ করতে হবে। তাহলেই আপনাদের পক্ষে নিতান্তই
ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তে বস্তুনিষ্ঠভাবে ‘ক’-এর জায়গায় ‘খ’-কে
অথবা ‘খ’-এর জায়গায় ‘ক’-কে বেছে নেয়া সম্ভব হবে।
সুস্পষ্ট মানদণ্ড
নির্ধারণের ব্যাপারে অন্য দেশের আইন পর্যালোচনা করা যেতে পারে। তিনি বলেন,
আমরা শুনেছি যে, প্রতিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ
দেয়ার জন্য পাঁচটি করে নাম সুপারিশের অনুরোধ করা হয়েছে। আমি আশা করি, যে
কোনো আগ্রহী নাগরিকেরই নাম প্রস্তাব করার সুযোগ থাকা উচিত। কারণ নির্বাচন
শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়। নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য না হলে সব
নাগরিককেই তার মাশুল দিতে হয়। আমি আরও আশা করি, প্রস্তাবিত নামগুলো, বিশেষত
রাষ্ট্রপতির আহ্বানে রাজনৈতিক দলগুলোর জমা দেয়া নামগুলো যথাযথ গুরুত্বের
সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া হবে। আরও আশা করি যে, এসব নামের মধ্যে যেগুলো
নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করবে সেগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ সমর্থন পাওয়া
নামগুলোকে অনুসন্ধান কমিটির পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হবে। ড. বদিউল আলম
মজুমদার বলেন, আমি আরও প্রত্যাশা করছি যে, আপনাদের কার্যপদ্ধতিতে স্বচ্ছতা
নিশ্চিত করবেন। যেমন, আপনারা বিভিন্ন সূত্র থেকে যে নামগুলো পাবেন সেগুলো
থেকে, নির্ধারিত মানদণ্ডের আলোকে, একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করবেন এবং
তালিকার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের সম্মতি সাপেক্ষে, জনগণের অবগতির জন্য তা
প্রকাশ করবেন। আপনারা তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারও নেবেন। এছাড়াও
সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে একটি গণশুনানির আয়োজন করবেন।
আপনারা যাদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবেন, তাদের সম্পর্কে একটি
প্রতিবেদন তৈরি করে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করবেন। প্রতিবেদনে সুপারিশকৃত
ব্যক্তিদের প্রোফাইল অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পাশাপাশি, তাদের বেছে নেয়ার
যৌক্তিকতা এবং বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক দলের মতামত কীভাবে এবং কতটুকু
বিবেচনায় নেয়া হয়েছে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করবেন। নাগরিকরা যদি জানতে
পারে যে, নিতান্তই ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তে বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ডের
আলোকে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের জন্য নামগুলো
সুপারিশ করা হয়েছে, তাহলে আপনাদের এই প্রচেষ্টা নাগরিকদের কাছে অধিক
গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

No comments:
Post a Comment