Tuesday, January 31, 2017

দুদকের কড়া হুশিয়ারি দু’জন বরখাস্ত

দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সরেজমিন পরিদর্শনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উচ্চপর্যায়ের টিম হতবাক হয়েছে। পরিদর্শন শেষে কড়া হুশিয়ারি দিয়ে দুদক কমিশনার (তদন্ত) এএফএম আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রতিটি শাখায় অনিয়ম প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের অনুসন্ধান শুরু হয়ে গেছে। কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। জড়িত প্রমাণ হলেই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইনের আওতায় আনা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পরও জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এই কাস্টম হাউসে যেভাবে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষের লেনদেন চলে তা অত্যন্ত লজ্জার ও দুঃখজনক। দেশ যেখানে সুন্দরভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতা মেনে নেয়া যায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কাস্টমস কর্মকর্তারা যদি মনে করেন, তারা দুর্নীতি করে পার পেয়ে যাবেন, তাদের কেউ ধরবে না।
এটা ভুল।’ এদিকে যমুনা টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ঘুষ লেনদেনের ভিডিও ফুটেজ দেখে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দুর্নীতিবাজ দু’জন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। এরা হলেন : সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মনির আহমেদ ও উত্তম কুমার। এ ছাড়া অভিযুক্ত আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে বলে দুদক টিমকে অবহিত করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। দৈনিক যুগান্তর এবং যমুনা টেলিভিশনে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। এ বিষয়ে সত্যতা জানতে সোমবার সকালে এএফএম আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি টিম আকস্মিক কাস্টম হাউস পরিদর্শন করে। সংবাদ প্রকাশের পর দুদকের এত উচ্চপর্যায়ের টিমের সরেজমিন পরিদর্শন নজিরবিহীন। দুদক মহাপরিচালক (অনুসন্ধান) আতিকুর রহমান খান, মহাপরিচালক (প্রশাসন) মো. মুনীর চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. আবু সাঈদ ছাড়াও ছিলেন দু’জন উপপরিচালক, চারজন সহকারী পরিচালক এবং একজন উপসহকারী পরিচালক। এ নিয়ে সোমবার পুরো দিনই কাস্টম হাউসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছিলেন তটস্থ। কাস্টমস কমিশনার এএফএম আবদুল্লাহ খানের অনুপস্থিতিতেই দুদক টিম পুরো কাস্টম হাউস পরিদর্শন করে এবং অনিয়ম, দুর্নীতি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে। সংবাদ সম্মেলনেও দুদক টিম দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত তথ্যবহুল প্রতিবেদনগুলোর সত্যতা পেয়েছে বলে জানায়। কাস্টম হাউসের আমদানি শাখাসহ বিভিন্ন শাখা সরেজমিন পরিদর্শন শেষে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে দুদক টিম। টিমের প্রধান দুদক কমিশনার এএফএম আমিনুল ইসলাম কাস্টম হাউসের অনিয়ম-দুর্নীতি সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করলেও কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কাস্টমস কমিশনারের অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে ছিলেন অতিরিক্ত কমিশনার শওকত আলী সাদী।
বৈঠকে উপস্থিত দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের বিষয় অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। সিস্টেমের গলদের কারণেই এটি হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা। দুদক টিমের সামনে কাস্টমস কর্মকর্তারা ছিলেন এক প্রকার অসহায়। অনেকেই বেশিরভাগ সময় ছিলেন মাথা নিচু করে। সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশের পর জড়িতদের বিরুদ্ধে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হল না তাও জানতে চান দুদক কমিশনার। তিনি অবিলম্বে কাস্টম হাউসে ঘুষ-দুর্নীতির লাগাম টানার জন্য কাস্টমস কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেন। দুদক কমিশনার ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘কাস্টমসের ধাপে ধাপে যে দুর্নীতি হচ্ছে তার তথ্য-প্রমাণ আমরা সংগ্রহ করেছি। কোন কোন কর্মকর্তা দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তার তথ্য-উপাত্তও আমাদের কাছে আছে। কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাছেও একটি নির্দিষ্ট ফরম দেয়া হয়েছে কিছু তথ্য চেয়ে। লিখিতভাবে তথ্য দিতে বলেছি। তাছাড়া কাস্টম হাউসের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি অফিসের মধ্যে যেভাবে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কর্মচারীরা ফাইল নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করে সেটা ঠিক না। সরকারি অফিসের অভ্যন্তরে ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পরও জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার বিষয়টি অত্যন্ত লজ্জার ও দুঃখজনক। এ ঘটনায় আমি হতবাক ও বিস্মিত হয়েছি। এ কারণে তাৎক্ষণিকভাবেই জড়িত দুই কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করতে বলেছি। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’ দুদক কমিশনার আরও বলেন, ‘আমি কাস্টম হাউসের ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়মসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরবর্তী সময়ে এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলব। আমরা চাই দুর্নীতিমুক্ত কাস্টম হাউস গড়ে তুলতে। আমরা মনে করি,
দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য ২০১৭ সাল হবে আতংকের বছর।’ জানা গেছে, পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সকাল সাড়ে ৯টায় টিমের সদস্যরা কাস্টম হাউসে প্রবেশ করেন। কাস্টম হাউসে ঢুকেই তারা দ্বিতীয় তলায় আমদানি শাখার হলরুমে যান। সেখানে কর্মরত কর্মকর্তাদের কাজের গতি-প্রকৃতি দেখেন। অ্যাসেসমেন্টের জন্য জমা দেয়া বিভিন্ন কাগজপত্র দেখেন। পণ্য শুল্কায়নের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন। কাস্টম হাউসের সেকশন-৫, সেকশন-৭(বি)-সহ বিভিন্ন শাখা পরিদর্শন করেন। এ সময় ভুক্তভোগী কয়েকজন দুদক টিমের কাছে বিভিন্ন হয়রানি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেন। একইভাবে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তারাও নিজেদের পক্ষে নানা ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন। এরপর তারা কাস্টমস কমিশনার এএফএম আবদুল্লাহ খানের কক্ষে যান। দাফতরিক কাজে ঢাকায় অবস্থান করায় তিনি ওই সময় উপস্থিত ছিলেন না। এ সময় দুদক কমিশনার কাস্টম হাউসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ঘুষ লেনদেন কীভাবে হচ্ছে তা জানতে চান কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাছে। যুগান্তর ও যমুনা টেলিভিশনে প্রচারিত ঘুষ গ্রহণের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ল্যাপটপের মাধ্যমে তাদের দেখানো হয়। রিপোর্টে যেসব অভিযোগ এসেছে এবং ফুটেজে যাদের ঘুষ নিতে দেখা গেছে তাদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তাও জানতে চান।
প্রত্যুত্তরে অতিরিক্ত কাস্টমস কমিশনার শওকত আলী সাদী দুদক কমিশনারকে জানান, জড়িত দু’জন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মনির আহমেদ ও উত্তম কুমারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। অতিরিক্ত কমিশনার-২-কে দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্টের পর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ সময় দুদক কমিশনার আমিনুল ইসলাম বলেন, যাদের নাম এসেছে এবং ফুটেজে যাদের ঘুষ গ্রহণ করতে সরাসরি দেখা গেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আবার তদন্ত কমিটি কেন। কিংবা এতে সন্দেহের অবকাশ আছে কি? এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি কাস্টমস কর্মকর্তা। এক ঘণ্টা ধরে চলা এ বৈঠকে দুদক টিম কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাছে ওই সংস্থার দুর্নীতি-অনিয়ম ও হয়রানির বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করে। বৈঠক শেষে দুদক কমিশনার তিন তলায় কাস্টমসের হলরুমে পরিদর্শন সম্পর্কে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। আনুষ্ঠানিক এ ব্রিফিংয়ে দুদক কমিশনার বলেন, গণমাধ্যম তথা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কাস্টম হাউসের ঘুষ-দুর্নীতির সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এ রকম একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধে ঢাকায় বসে নির্দেশনা দিয়ে ছেড়ে দিলে চলবে না। বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করতেই তারা কাস্টম হাউস পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেন। কাস্টম হাউসের বিভিন্ন শাখা ঘুরে তারা প্রায় প্রতিটি শাখায় অ্যাসেসমেন্টসহ আটটি ধাপে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছেন। তিনি বলেন, গত বছরের ১৪ মার্চ দুদকের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর দেশ থেকে দুর্নীতি বিতাড়ন করতে তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি অফিস-আদালতে অভিযান ও পদক্ষেপের কারণে দুর্নীতি অনেকাংশে কমেছে। তিনি আরও বলেন, ‘দুর্নীতি বন্ধে সাত মাস কাজ করেছি। ১০ মাসের মধ্যেই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হয়েছি। দেশ যেখানে সুন্দরভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হয়নি।’ এরপর দুদকের টিম চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে জেটি কাস্টমস পরিদর্শন করেন। সেখানে অনেকেই বন্দরের সাবেক আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট ও দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) মুনির চৌধুরীকে দেখে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। অনেককেই বলতে শোনা যায়, ‘মুনির চৌধুরী আইস্যে। দুর্নীতিবাজ কাস্টমস অফিসার অ’ল এইবার ধরা পড়িব।’ অর্থাৎ ‘মুনির চৌধুরী এসেছেন। এবার কাস্টমসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা ধরা পড়বেন।’ দুদক টিমের সদস্য ও দুদকের মহাপরিচালক মুনির চৌধুরী সোমবারের পরিদর্শন সম্পর্কে যুগান্তরকে বলেন, তারা এসেছেন মূলত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের একটি মেসেজ দিতে। এর পর শুরু হবে মূল অভিযান।

No comments:

Post a Comment