Thursday, January 12, 2017

চট্টগ্রামে আরও দুই আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু

অবহেলিত জনপদকে আলোকিত করা ও মানসম্মত শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্য নিয়ে চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু হল আরও দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। সানোয়ারা ইসলাম ট্রাস্টের উদ্যোগে নগরীর চান্দগাঁও এলাকায় হাজেরা-তজু স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং চিটাগাং কিন্ডার গার্টেন নামে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উদ্বোধন হয়েছে বুধবার সকালে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে প্রতিষ্ঠান দুটির একাডেমিক ভবন ও শ্রেণী কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ উপলক্ষে পুরাতন চান্দগাঁওয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ক্যাম্পাস তথা বিএসসি চত্বরে বসেছিল হাজার হাজার শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মিলনমেলা। এতে প্রধান আকর্ষণ ছিলেন প্রধান অতিথি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, তার স্ত্রী ও সানোয়ারা ইসলাম ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সানোয়ারা বেগম এবং তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরা। শুধু এই দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয় চান্দগাঁওসহ চট্টগ্রামে এর আগে ২৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে নুরুল ইসলাম বিএসসি পরিবার। এই পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে এদিন এক সঙ্গে এক মঞ্চে পেয়ে এলাকাবাসী আনন্দে আত্মহারা ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নুরুল ইসলাম বিএসসি তার স্বপ্ন পূরণের কথা জানান। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের চান্দগাঁও এলাকায় যেখানে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন সেই এলাকার নাম ছিল পাঠাইন্যার গোদা। তিনি যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন তখন এখানে শিক্ষিতের হার ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। আর বর্তমানে এই হার ৪৬ শতাংশ। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়তে গিয়ে অনেক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছি। সানোয়ারা ইসলাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় করার সময় স্বয়ং এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের বাধার শিকার হয়েছিলাম।
এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে রাতারাতি বাঁশের বেড়া দিয়ে স্কুল তৈরি করেছি। মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করায় অনেকে এটিকে ভালো চোখে দেখেনি। নির্বাচনে অনেকে ভোটও দেয়নি স্কুল গড়ে তুলে মেয়েদের ঘর থেকে বের করে এনেছি বলে। এরপরও থেমে থাকিনি।’ স্কুলে আসার পথে মেয়েদের অনেকে উত্ত্যক্ত করত। কিন্তু এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। অবহেলিত চান্দগাঁও ও পাঠাইন্যার গোদা এখন শিক্ষার জন্য মডেল এলাকায় পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি কখনও নিজের আত্মীয়-স্বজনকে চাকরি দেননি। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে। যাতে মেধাবীরা সুযোগ পায়। তবে শিক্ষকরা কী করছেন, কীভাবে পড়াচ্ছেন তার খোঁজখবর সবসময় নেয়া হচ্ছে।’ হাজেরা-তজু স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং চিটাগাং কিন্ডার গার্টেন স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সানোয়োরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির স্ত্রী ও সানোয়ারা ইসলাম ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সানোয়ারা বেগম, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. রফিকুল আলম, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব মু. মোহসিন চৌধুরী, সানোয়ারা গ্রুপের পরিচালক ও সানোয়ারা ইসলাম ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সাইফুল ইসলাম, জাহেদুল ইসলাম, কামরুল ইসলাম, শাকিলা জাহান, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মীর এজহারুল হোসাইন, দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চের সম্পাদক সৈয়দ ওমর ফারুক, হাজেরা-তজু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ দবির উদ্দিন খান, দিলোয়ারা জাহান মেমোরিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মারুফুল ইসলাম, সমাজসেবক মাতব্বর আবদুল মোমেন, ৪ নম্বর চান্দগাঁও ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইফুদ্দিন খালেদ, হাজেরা-তজু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের উপাধ্যক্ষ কুতুব উদ্দিন, হাজেরা-তজু স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সেলিমুজ্জামান, চিটাগাং কিন্ডার গার্টেনের অধ্যক্ষ ফাতেমা বেগম, নুরুল ইসলাম বিএসসির নাতনি সিহিন্থা সাবিন রহমান ও অভিভাবকদের পক্ষে খায়রুননেছা দিনা প্রমুখ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে নগর আওয়ামী লীগ নেতা জামশেদুল আলম চৌধুরী, জাফর আহমেদ, হাজী মোনাফ সওদাগর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সানোয়ারা বেগম বলেন, ‘আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাই তাদের উচিত শ্রেষ্ঠ কাজটি করা। আমি পিতা-মাতার কাছ থেকে সেই শিক্ষাটিই পেয়েছি। ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হওয়ার পর শ্বশুর বাড়িতে এসে কঠোর পরিশ্রম করেছি।’ যুদ্ধের সময় পাক-হানাদারদের হাত থেকে ৩ বছরের শিশুকে বাঁচাতে না পারার দুঃখের কথাও তিনি জানান। সানোয়ারা বেগম বলেন, ‘বেগম রোকেয়া থেকে শিক্ষা নিয়ে নারী শিক্ষা প্রসারের স্বপ্ন দেখি। স্বামীকে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে উৎসাহ জোগাই।’ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবাইকে হারিয়ে এখনও মানুষের জন্য কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী। পিতার আদর্শ ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
কিছুই তিনি কবরে নেবেন না- যা করছেন দেশের মানুষের জন্যই করছেন। তাই মানুষের ব্রত হওয়া উচিত মানুষের জন্য কাজ করা। হাজেরা-তজু স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং চিটাগাং কিন্ডার গার্টেন প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে সানোয়ারা গ্রুপের এমডি ও নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে মুজিবুর রহমান বলেন, অস্ট্রেলিয়ার সাউথ ওয়েলেস ইউনিভার্সিটির দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাস দেখে অভিভূত হই। এ ধরনের ইউনিভার্সিটির একটি মিনি ভার্সন চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠা করার বাসনা জাগে। সেই বাসনা থেকেই চান্দগাঁও ৪ একর পৈতৃক জায়গায় আধুনিক যুগোপযোগী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজে হাত দিই। খুব কম সময়ের মধ্যেই দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। শিশুর চাহিদা কী তার ওপর ভিত্তি করেই সুপরিসর মাঠ, কালারফুল শ্রেণীকক্ষ, খেলনা সামগ্রী দিয়ে সাজানো হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তিনি বলেন, সাধারণত শিক্ষার্থীরা স্কুলে না যাওয়ার জন্য কান্না করে, কিন্তু শিক্ষার্থীরা যাতে চিটাগাং কিন্ডার গার্টেনে আসার জন্য কান্না করে সেভাবেই স্কুলটি সাজানো হয়েছে। স্কুলের প্রবেশ পথের দুই পাশের দেয়াল ও বাউন্ডারি ওয়ালে রয়েছে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশী ও বাঙালি ঐতিহ্যের নানা চিত্রকর্ম; যাতে শিক্ষার্থীরা ইতিহাসসচেতন হতে পারে। তিনি বলেন, পিতার পদাংক অনুসরণ করেই এগিয়ে যাচ্ছি। আগামীতে দোহাজারীতে একটি কৃষি টেকনিক্যাল কলেজসহ আরও দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ইচ্ছে রয়েছে। চুয়েটের ভিসি ড. রফিকুল আলম তার বক্তব্যে বলেন, শিক্ষার ঝান্ডা উড়াচ্ছেন নুরুল ইসলাম বিএসসি। তিনি চাইলে আরও অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারতেন। শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে পারতেন। তা করেননি। শিক্ষা বিস্তারে কাজ করছেন। মাতুব্বর আবদুল মোমেন বলেন, নুরুল ইসলাম বিএসসি সোনার চামচ নিয়ে জন্ম নেননি। আলাদিনের চেরাগও তার হাতে ছিল না। মহৎ উদ্দেশ্য থেকেই তিনি শিক্ষকতা পেশা শুরু করেন। এরপর ব্যবসা করেন। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করেন সেখানে, যেখান থেকে যত তাড়াতাড়ি মুনাফা আসবে। আর নুরুল ইসলাম বিএসসি ১০০ বছরের কথা মাথায় রেখে নিজের কামানো টাকা জনগণের জন্য খরচ করেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। তার এই উদ্যোগ বৃথা যায়নি।

No comments:

Post a Comment