ভারত
অভিন্ন নদীর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রন করায় চলতি বোরো মওসুমে বাংলাদেশে সেচের
পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। উত্তরাঞ্চলের দুই শতাধিক নদী শাখা নদী,
উপশাখা প্রশাখানদী ও সহ¯্রাধিক বিল শুকিয়ে যাওয়ায় অসংখ্য ভূউপরিস্থ পানির
প্রাকৃতিক উৎস হারিয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে
যাচ্ছে। ফলে সেচ সম্প্রসারন নিয়ে কৃষি সম্প্রসারন বিভাগ চরম বিপাকে পড়েছে।
শুধুমাত্র সেচের পানির অভাবে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় প্রায় ১২ লাখ হেক্টর এক
ফসলী জমি তিন ফসলীতে রুপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না বলে কৃষি সম্প্রসারন
বিভাগ সূত্রে জানো গেছে। বাংলাদেশে পানির প্রয়োজন অনেক বেশি। দেশের মানুষের
গৃহস্থালি ও চাষাবাদের জন্য যতটুকু পানির প্রযোজন হয় তার চেয়ে অনেক বেশি
পানি প্রযোজন হয় পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নদীর
পানির প্রযোজনীয় খাতগুলো হচ্ছে, সমুদ্রের লোনা পানিকে ঠেকানো, ভূগর্ভস্থ
জলাধার পূনর্ভরণ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষন করা, পরিবেশ এবং চাষাবাদের
জমিতে পুষ্টি সরবরাহ করা, নৌপথের নাব্যতা বজায় রাখা, গৃহস্থালি ও
কলকারখানার পানির জোগান দেয়া ইত্যাদি। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে
প্রবাহিত ৫৪টি নদীর উৎস ভারতে অবস্থিত। এসব নদীর প্রত্যেকটিতেই বাঁধ দিয়ে
ভারত সেচ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মান করেছে। এর ফলে এসব নদীর পানি প্রবাহ
বাংলাদেশ অংশে সীমিত হয়ে পড়েছে। ভারত পদ্মা-যমুনা বেসিনে অর্ধশতাধিক সেচ ও
বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মান করেছে। তার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পদ্মা, যমুনা
ও তিস্তাসহ এর শাখানদীগুলো পানি শুন্য হয়ে পড়ছে।
ফলে ভূউপরিস্থ অসংখ্য
প্রাকৃতিক পানির উৎস শুকিয়ে গেছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে
নেমে যাচ্ছে। সেই সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে আর্সেনিকের মাত্রা। পদ্মা নদীতে
পর্যাপ্ত পানি না থাকায় এর প্রধান শাখা নদী আত্রাই ও গড়াই নদীতে পানির টান
পড়েছে। গড়াই নদীর কষ্টিয়া কয়ারা ব্রিজের নিচে বালু চর। জিকে প্রজেক্ট
কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পদ্মা, মধুমতি, নবগঙ্গা, কাজলা, মাথাবাঙ্গা,
গড়াই, আত্রাই, চিকনাই, হিনসা, কুমার, সাগরখালি, কপোতাক্ষ, চন্দনাসহ পদ্মার
৫৩টি শাখা-প্রশাখা নদী নব্যতা সঙ্কটে নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। কোন কোন
স্থানে বালু স্থায়ী মৃত্তিকায় রুপ নেয়ায় ফসল আবাদ করেছে অনেকেই। পদ্মার
প্রধান শাখা নদী হলো মাথাভাঙ্গা, কুমার, ইছামতি, গড়াই, আড়িয়ালখা প্রভৃতি।
প্রশাখা হলো মধুমতি, পশুর, কপোতাক্ষ। উপনদী একটি মহানন্দা। মহানন্দা
রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানায় পদ্মায় মিলিত হয়েছে। পদ্মার পানি দিয়ে শুকনো
মওসুমে রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর প্রভৃতি জেলায় সেচকাজ
চালানো হয়। এ নদীর পানি দিয়ে প্রায় ২০ ভাগ জমির সেচকাজ চলে। ভারতের সবগুলো
সেচ ও বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের
উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিনাঞ্চলের পদ্মা-ব্রক্ষপুত্র-যমুনা নদীর পুরো অববাহিকা এক
সময় মরুভূমিতে পরিনত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে এসব
অঞ্চলের চাপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী,
ফরিদপুর, শরিয়তপুর, খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নীলফামারী,
লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, মোমেনশাহী,
টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জসহ ৩০টি জেলার কৃষি, সেচ, মৎস্য ও নৌ-যোগাযোগসহ
প্রাকৃতিক পরিবেশ হবে বিপর্যস্ত। পদ্মা সংযুক্ত বরেন্দ্র অঞ্চলের উপর দিয়ে
প্রবাহিত মহানন্দা, আত্রাই, বারনই, শিব, রানী ও ছোট যমুনাসহ ১২টি নদী ও
২০টি খালে এর প্রভাব পড়েছে। এসব নদী-খাল পলি ও বালু পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায়
এখন মৃতপ্রায়। ফলে এ অঞ্চলের কৃষির সেচ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ পানির
উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে
যাচ্ছে। এছাড়া চলনবিল অঞ্চলের ৩৯টি বিল, ১৬টি নদী এবং ২২টি খাল, নীলফামারী,
লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁ
অঞ্চলের ইছামতি, করতোয়া, ভেটেশ্বর, ধরলা, দুধকুমার, সানিয়াজান, তিস্তা,
ঘাঘট, ছোটযমুনা, নীলকুমার, বাঙ্গালী, বড়াই, মানস, কুমলাই, সোনাভরা,
হলহলিয়া, জিঞ্জিরাম, বুড়িতিস্তা, যমুনেশ্বরী, মহানন্দা, টাঙ্গান, কুমারী,
রতœাই, পূনর্ভবা, ত্রিমোহনী, তালমা, ঢেপা, কুরুম, কুলফি, বালাম, ভেরসা,
ঘোড়ামারা, মালদহ, চারালকাঁটা, পিছলাসহ দুই শতাধিক নদী, শাখা নদী ও উপনদী
শীতকালেই শুকিয়ে মরা নদীতে পরিনত হয়েছে। ফলে নদীনির্ভর সেচ ব্যবস্থা ভেঙে
পড়েছে। শুধুমাত্র সেচের পানির অভাবে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় প্রায় ১২ লাখ
হেক্টর এক ফসলী জমি তিন ফসলীতে রুপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না রাজশাহী ও
রংপুর কৃষি সম্প্রসারন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সেচের পানির অভাবে
উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় প্রায় ১২ লাখ হেক্টর এক ফসলী জমি তিন ফসলীতে
রুপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। এরমধ্যে রাজশাহী বিভাগের পাবনা জেলায়
আবাদযোগ্য জমির পরিমান এক লাখ ৯০ হাজার হেক্টর, সেচের আওতায় এসেছে ৫৬ হাজার
হেক্টর, সিরাজগঞ্জে আবাদযোগ্য জমি এক লাখ ৯১ হাজার হেক্টর, সেচের আওতায়
এসেছে এক লাখ হেক্টর। রাজশাহী জেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমান এক লাখ ৭৭ হাজার
হেক্টর, সেচের আওতায় এসেছে ৮৭ হাজার হেক্টর। নওগাঁ জেলায় আবাদযোগ্য জমির
পরিমান দুই লাখ ৮০ হাজার হেক্টর, সেচের আওতায় এসেছে এক লাখ ৬০ হাজার
হেক্টর। চাপাইনবাবগঞ্জে আবাদযোগ্য এক লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে সেচের
আওতায় এসেছে ৩৫ হাজার হেক্টর। নাটোর জেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমান এক লাখ
৩৪ হাজার হেক্টর, সেচের আওতায় এসেছে ৬৮ হাজার হেক্টর। বগুড়া জেলায়
আবাদযোগ্য জমি দুই লাখ ৩১ হাজার হেক্টর, সেচের আওতায় এসেছে দুই লাখ হেক্টর।
রংপুর বিভাগের জয়পুরহাট জেলায় জমির পরিমান ৮৪ হাজার হেক্টর, সেচের আওতায়
এসেছে ৭০ হাজার হেক্টর। গাইবান্ধায় আবাদযোগ্য এক লাখ ৫৯ হাজার হেক্টর জমির
মধ্যে সেচের আওতায় এসেছে ৯০ হাজার হেক্টর। রংপুর জেলায় আবাদযোগ্য এক লাখ ৬৭
হাজার হেক্টর জমির মধ্যে সেচের আওতায় এসেছে এক লাখ হেক্টর। নীলফামারী
জেলায় আবাদযোগ্য জমি এক লাখ ২২ হাজার হেক্টর, সেচের আওতায় এসেছে ৫৫ হাজার
হেক্টর। লালমনিরহাট জেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমান ৯৫ হাজার হেক্টর, সেচের
আওতায় এসেছে ৪৪ হাজার হেক্টর। কুড়িগ্রাম জেলায় জমির পরিমান এক লাখ ৬৭ হাজার
হেক্টর, সেচের আওতায় এসেছে ৬৭ হাজার হেক্টর। দিনাজপুর জেলায় আবাদযোগ্য জমি
দুই লাখ ৮৭ হাজার হেক্টর, সেচের আওতায় এসেছে এক লাখ ৬২ হাজার হেক্টর।
ঠাকুরগাঁও জেলায় আবাদযোগ্য জমি এক লাখ ২৪ হাজার হেক্টর, সেচের আওতায় এসেছে
৬১ হাজার হেক্টর। পঞ্চগড় জেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমান ৯৮ হাজার হেক্টর,
সেচের আওতায় এসেছে মাত্র ১৯ হাজার হেক্টর। গত পাঁচ দশকের ব্যবধানে দেশে
সেচযন্ত্র গভীর অগভীর নলকুপের সংখ্যা বেড়ে দাড়িয়েছে প্রায় ৩৬ লাখে। এ সময়ে
সেচের জমি বেড়েছে প্রায় ২২ লাখ হেক্টর। এসব সেচযন্ত্র প্রত্যক্ষ ও
পরোক্ষভাবে দেশের বড় নদী, শাখা নদী, উপশাখা ও প্রশাখাগুলোর সাথে যুক্ত
অসংখ্য খাল, হাওর, বিল প্রভৃতির পানির উৎস থেকে পানি সরবরাহ করা হতো। ফলে
যে কোন নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে তার প্রবাহ বাধাগ্রস্থ করা মানেই সরাসরি ওই
নদীকেন্দ্রিক সেচব্যবস্থার ওপর আঘাত হানা। ভারত প্রত্যক্ষভাবেই বাংলাদেশের
কৃষি ব্যবস্থাকে অচল করে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে
করছেন। কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ভূউপরিস্থ প্রাকৃতিক
পানির উৎসগুলো সংকুচি হয়ে পড়েছে। ফলে সেচের জন্য অধিকমাত্রায় ভূগর্ভস্থ
পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ সেচের প্রধান উৎস হিসেবে ভূগর্ভের পানি
ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু সে তুলনায় পানি রিচার্জ না হওয়ায় এই উৎসগুলো
ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে
যাচ্ছে। গঙ্গা, তিস্তা, মহানন্দা, ব্রক্ষপুত্রসহ বিভিন্ন নদীর পানি ভারত
উজানে অধিক হারে প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশে সেচব্যবস্থায় ভয়াবহ পরিস্থিতির
সৃষ্টি হয়েছে।

No comments:
Post a Comment