মহাকাব্যিক।
রূপকথা-সম। স্বপ্নিল। অবিশ্বাস্য। অলৌকিক। ঐতিহাসিক। ক্রীড়াক্ষেত্রে সময়
সময় এমন কিছু মাহেন্দ্র-ক্ষণের আবির্ভাব হয়, শত চেষ্টায়ও যা ভাষায় প্রকাশ
করা সম্ভব নয়। ১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিকে জেসি ওয়েন্সের চারটি স্বর্ণ জয়।
অপরাজেয় জর্জ ফোরম্যানকে ৩২ বছরের মোহাম্মদ আলীর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে হারানো।
১৯৮৬ ফুটবল বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনা বনাম ইংল্যান্ড। শচীন টেল্ডুলকারের
শততম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি। রোববার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ফাইনালে রজার
ফেদেরার বনাম রাফায়েল নাদাল। সুইস শিল্পী আর স্প্যানিশ সম্রাট, দুইয়ের
প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুরণন টেনিস কোর্ট ছাপিয়ে গিয়েছে অনেক বছর। ইতিহাসের
পাতায় চলে যেতে বসা এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফের দেখা যাবে, সত্যি সত্যিই একটা
গ্র্যান্ড স্লাম ফাইনালে ফের রজার ফেদেরার লড়বেন রাফায়েল নাদালের বিরুদ্ধে,
এর চেয়ে বড় টেনিস রূপকথা হয়তো হতে পারত না। রোববারের মেলবোর্ন কিন্তু
প্রমাণ করে দিল, পারত।
রজার ফেদেরারের হাতে তার পঞ্চম অস্ট্রেলিয়ান ওপেন
ট্রুফি তুলে দিয়ে। তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে, ছয় মাসের টেনিস
নির্বাসনকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে, বয়সকে সংখ্যা নয়, নিরর্থক সংখ্যা বানিয়ে,
ফেদেরারকে সর্বকালের সেরার টেনিস মুকুট উপহার দিয়ে। এই ফাইনালের টিকিট যে
প্রায় চল্লিশ গুণ বেশি দামে বিক্রি হবে, স্বাভাবিক। এই ফাইনালের দর্শক
সংখ্যা যে রেকর্ড গড়বে, স্বাভাবিক। এই ফাইনাল জিতে উঠে যে কান্নায় ভেঙে
পড়বেন রজার ফেদেরার, স্বাভাবিক। স্বপ্নের লড়াই যে বাস্তবায়িত হতে চলেছে,
গ্রিগর দিমিত্রভকে হারিয়ে গত শুক্রবার বিশ্বাস করতে পারেননি রাফায়েল নাদাল।
স্বপ্নের লড়াই যে সত্যি সত্যিই জিতেছেন, রোববার যেন ফেদেরারের কাছেও সেটা
সমান অবিশ্বাস্য ঠেকছিল। ট্রুফি নিতে উঠে বারবার পিছনে তাকাচ্ছিলেন নাদালের
দিকে। বারবার বলছিলেন নাদালের কথা। বলছিলেন, পাঁচ-ছ’মাস আগে যখন তাদের
দেখা হয়েছিল, দু’জনের কেউই ভাবতে পারেননি অস্ট্রেলীয় ওপেন ফাইনাল তাদের
এভাবে মুখোমুখি করবে। রাফাকে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের জন্য অভিনন্দন
জানিয়ে শুরু করেছিলেন ফেদেরার। শেষ করলেন এমন কয়েকটা শব্দে, উচ্চারণের
সঙ্গে সঙ্গে যেগুলো বোধহয় অমরত্বের স্বাদ পেয়ে গেল। ‘তোমার কাছে হারলেও আজ
খুশি হতাম। আমার প্রত্যাবর্তন এই জয়ের আগেও যে নিখুঁত ছিল!’ তুমুল
অভিবাদনের পরে সংযোজন, ‘টেনিসে ড্র নেই। যদি থাকত, তাহলে আজ তোমার সঙ্গে এই
ট্রুফিটা ভাগাভাগি করে নিতাম!’ অর্ধেকটা বছর টেনিস কোর্টে তার পা পড়েনি।
বিশ্বের সাবেক একনম্বর মেলবোর্নে এসেছিলেন কিনা সপ্তদশ বাছাই হিসেবে। সেখান
থেকে নতুন রেকর্ড, নতুন ইতিহাস, স্বপ্নের নতুন আল্পসে আরোহণ। বাকি সতেরোটা
গ্র্যান্ড স্লামের চেয়ে এটা যে আলাদা, বলার অপেক্ষা রাখে না।
ফেডেক্স বলে
দিয়েছেন, ‘এই ট্রুফিটা সবার থেকে আলাদা। বাকিগুলো এক জায়গায়, আর এটা একা।’
এর আগে চার বার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতেছেন ফেদেরার। কিন্তু এই ট্রুফিটার
সঙ্গে তুলনায় তিনি টেনে আনছেন একমাত্র ফরাসি ওপেন জয়। ‘ওটা অনেক বছর ধরে
তাড়া করেছি। ওভাবে চাওয়ার পরে কিছু পাওয়ার অনুভূতি একেবারে আলাদা। প্লাস
এটা রাফার বিরুদ্ধে, কামব্যাকের পর, ছ’মাস কোর্টের বাইরে থেকে ফেরার পর।
সবকিছু একদম নিখুঁত ছিল। তার ওপর শেষ সেটে পিছিয়ে ছিলাম আমি,’ বলেছেন
ফেদেরার। একটা সময় যার মনে হয়েছিল, এবার বোধহয় আর হবে না! বড় ম্যাচ খেলতে
নামছেন, জানতেন। কিন্তু সেটাকে মাথায় বেশি ঘুরপাক খেতে দেননি। বরং
ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিলেন। ‘সত্যিই তো এটা বড় ম্যাচ। রাফার জন্য, আমার
জন্য, টেনিসের জন্য,’ বলেছেন ফেদেরার। বুঝিয়েছেন, ফাইনালের আগে কোন মনোভাব
নিয়ে দুটো দিন কাটিয়েছেন। ‘একটা দরকারি দূরত্ব ছিল, কারণ অনেক দিন রাফার
বিরুদ্ধে খেলিনি। এ রকম নয় যে, গত ছ’মাসে ওর কাছে চারবার হেরেছি। বিপক্ষ
নয়, চেষ্টা করেছি বলটা খেলতে। নিজেকে বলেছি, আজ তোমাকে প্রচুর লড়তে হবে।
কোচেরাও বলেছিলেন, দিনের শেষে এটা মানসিক যুদ্ধ। সেজন্যই বোধহয় শেষ সেটে
ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছি।’ ওয়েবসাইট।

No comments:
Post a Comment