Saturday, January 14, 2017

বিশ্ব ইজতেমায় লাখো মুসল্লির জুমার নামাজ আদায়

গতকাল শুক্রবার বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শুরুর দিন ছিল। প্রথম দিনে দেশের সর্ববৃহৎ জুমার জামাত অনুষ্ঠিত হয় এখন। সকাল থেকেই সর্বস্তরের মুসলমানরা জুমার জামাতে শামিল হওয়ার জন্য টুপি, পাঞ্জাবি পরে জায়নামাজ হাতে নিয়ে ইজতেমা মাঠের দিকে ছুটতে থাকেন। বেলা ১২টায় জুমার জামাত মূল ময়দান ছাড়িয়ে পূর্বপাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক পর্যন্ত বিস্তৃৃতি লাভ করে। দেশ বিদেশের অগণিত মুসল্লির সঙ্গে একই জামাতে শরিক হয়ে নামাজ আদায় করার মাধ্যমে বেশি সাওয়াব হাসিলের উদ্দেশ্যে সকলের মধ্যে দেখা গেছে ব্যাকুলতা। যতই সময় গড়াতে থাকে ততই মুসল্লিদের ঢল নামে তুরাগের তীরে। শিশু কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের সমাগম ঘটে জুমার জামাতে। টঙ্গী, উত্তরা, কামারপাড়া, মিরপুর, আবদুল্লাপুরসহ আশপাশের এলাকার মসজিদে জুমার জামাতে মুসল্লির সংখ্যা ছিল খুবই কম। ইজতেমা মাঠে জুমার জামাতের সুবিশাল প্যান্ডেলের গন্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃতি লাভ করে চারপাশে। জুমার জামাতে ইমামতি করেন বাংলাদেশের তাবলীগ জামাতের শীর্ষ মুরুব্বি মাওলানা মোহাম্মদ ফারুক হোসেন। জুমার জামাত শেষে ইজতেমা ময়দানের চারদিকে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো মুসল্লিরা নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হন। বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দিতে দেশ-বিদেশ থেকে মুসল্লিদের টঙ্গীমুখী স্রোত অব্যাহত রয়েছে। আখেরি মোনাজাত পর্যন্ত এ স্রোত আরো প্রবল হবে। তুরাগ তীরবর্তী বিশাল প্রান্তরে নির্মিত পাটের চট ও লাইলন কাপড়ের প্যান্ডেল ইতিমধ্যে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। গত দু’দিনে শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়া এবং ময়দানে নতুন করে ফেলা বালিতে সমবেত মুসল্লিদের ভোগান্তি কিছুটা বেড়েছে। ধুলায় ধূসরিত গোটা ইজতেমা এলাকায় চলাচল কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। ওয়াসা এবং ফায়ার সার্ভিসের উদ্যোগে প্রধান প্রধান সড়ক ও বিদেশি মুসল্লিদের চলাচলের পথে পানি ছিটানো হলেও তা প্রয়োজনের তুলনা কম। একদিকে পানি ছিটিয়ে যাচ্ছে ওয়াসার গাড়ি অন্যদিকে মুহূর্তেই আবার ধুলায় ধূসর হচ্ছে রাস্তাগুলো। ফলে চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে ভিড় করছেন সর্দি, কাশি ও পেটের পীড়া নিয়ে শত শত মুসল্লি। গতকাল বাদ ফজর তাবলীগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বি পাকিস্তানের মাওলানা খোরশেদের আমবয়ানের মধ্য দিয়ে প্রথম পর্ব তিন দিনের ইজতেমার সূচনা হয়। গতকাল তাবলীগের ৬ উসুল সম্পর্কিত বিষয়ে বাদ আসর বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা এহসানুল হক এবং বাদ মাগরিব বয়ান করেন ভারতের মাওলানা সা’দ। এবারের ইজতেমায় শতাধিক দেশ থেকে ২০-২৫ হাজার বিদেশি মেহমান আসবেন বলে আয়োজক কমিটির ধারণা।
ইতিমধ্যে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে গতকাল সকাল পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার বিদেশি মুসল্লি ইজতেমা ময়দানে এসে উপস্থিত হয়েছেন। গাজীপুর জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক মো. মোমিনুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন। এর মধ্যে ভারত, পাকিন্তান, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, পানামা, মিশর, ওমান, সুদান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, কাতার, অস্ট্রেলিয়া, বরুনাই, কানাডা, কম্বোডিয়া, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, ইরান, জাপান, মাদাগাস্কার, মালি, সেনেগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, তাঞ্জেনিয়া, ত্রিনিদাদ, রাশিয়া, আমেরিকা, বেলজিয়াম, ক্যামেরুন, চীন, ফিজি, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, ইটালি, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, সুইডেন, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, কোরিয়া, আলজেরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন, কুয়েত, মরক্কো, কাতার, সোমালিয়া, সিরিয়া, তিউনিসিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন, জর্ডান, মৌরিতানিয়া, দুবাইসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের মুসল্লি রয়েছেন।
ইজতেমার আয়োজক সূত্রে জানা যায়, মুসল্লিদের এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। বিভিন্ন ভাষাভাষী ও মহাদেশ অনুসারে ইজতেমা ময়দানের উত্তর পাশে বিদেশি মেহমানদের জন্য পৃথক বিদেশি নিবাস নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাদের খেদমতে সর্বদা কাজ করছেন তাবলীগ জামায়াতের কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবক।
সুযোগ সুবিধা: ইসলাম ধর্মের প্রচার প্রসারের কাজে আসা মুসল্লিদের বয়ান শোনার জন্য ইজতেমা মাঠের পশ্চিম পাশের মাঝামাঝি এলাকায় তৈরি করা হয়েছে বয়ান মঞ্চ। একই পাশে আরো রয়েছে নামাজ পড়ার মিম্বার, তাশকিলের কামরা, জামায়াত কক্ষ ও মোকাব্বির মঞ্চ। এছাড়া বয়ান শোনার জন্য মাইকের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা: বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে নিয়োজিত ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ইজতেমাস্থল ও আশপাশের খাবারের দোকান ও হোটেলে বেশ কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য পরিবেশন ও ভেজাল খাদ্য বিক্রির অভিযোগে বিভিন্ন খাবারের দোকান ও হোটেল মালিকের বিরুদ্ধে মামলাসহ প্রায় ৫৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
বিদেশি মেহমানদের বিশেষ আপ্যায়ন: বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হাজার হাজার মেহমানদের জন্য মাঠের পশ্চিম-উত্তর কোণে করা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের আপ্যায়ন ব্যবস্থা। ইংলিশ ও অ্যারাবিয়ানদের জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন তাঁবু। এখানে টেলিফোন ও ইন্টারনেট থেকে শুরু করে রয়েছে সকল ধরনের আধুনিক ব্যবস্থা। খাবারের ক্ষেত্রেও করা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আয়োজন। সকালের নাস্তায় রয়েছে স্যুপ, ডিম, রুটির পাশাপাশি দুপুর ও রাতের জন্য বিরিয়ানি। এসব রান্নার জন্য ২ শতাধিক জিম্মাদার রয়েছে বলে জানান আয়োজক কমিটি।
তিন বিদেশি মেহমান অসুস্থ: অ্যাজমাজনিত কারণে সৌদি আরবের এক মুসল্লি টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সৌদি আরবের মো. ইব্রাহীমের ছেলে মো. সুলাইমান (৫৪), থাইল্যান্ডের নাগরিক মাইনমারের ছেলে মো. আমিন (৬৫) ময়দানে পড়ে ব্যথা পেয়ে ও ওমানের বাসিন্দা মোহাম্মদের ছেলে সুরাইয়া (৬০) বুকের ব্যথা নিয়ে টঙ্গী হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র: ইজতেমা মাঠে সকল প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে রয়েছে বিভিন্ন সংস্থার কয়েকটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। যার মধ্যে নিউ মুন্নু ফাইন কটন মিল ক্যাম্পাসে রয়েছে জেলা প্রশাসন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), র‌্যাব, পুলিশ এবং বিদ্যুৎ বিভাগের বেশ কয়েকটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। গাজীপুর জেলা প্রশাসক এসএম আলম জানান, চার ভাগে ভাগ করার পরও এবারের ইজতেমায় অন্যবারের চেয়ে মুসল্লির উপস্থিতি কম নয়। তাই প্রতিরের মতো এবারো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এখানে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন ১৫ জন ম্যাজিস্ট্রেট।
৫ মুসল্লির মৃত্যু: টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে গত বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত ৫ মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন নোয়াখালী জেলার দাগনভূইয়া থানার মাছিমপুর গ্রামের মৃত আবদুর রশিদ ভুঁইয়ার ছেলে বাবুল ভুইয়া (৬০), সাতক্ষীরা সদরের খেজুরডাঙ্গা গ্রামের মৃত আব্দুস সোবহানের ছেলে আবদুস সাত্তার (৬৫), টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী থানার নিজবন্নি গ্রামের মৃত গোলাম হোসেন ফকিরের ছেলে জানু ফকির (৭০), পাটুরিয়া মানিকগঞ্জের সাহেব আলী (৬৫), কক্সবাজার জেলার হোসেন আলী (৬৫)। এ নিয়ে বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে ৬ মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। তাদের লাশ জানাজা শেষে নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ ফুটওভারব্রিজ: বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে আসা মুসল্লিদের মহাসড়ক পারাপারের স্টেশনরোডের ফুটওভারব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফুটওভারব্রিজের স্টিলের পাটাতনগুলো মরিচা পড়ে ক্ষয়ে যাওয়ার পথচারীদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
>>>মানবজমিন

No comments:

Post a Comment