কট্টর
জাতীয়তাবাদী হাঁকডাক দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড
ট্রাম্প। বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের চিফ ইন কমান্ডার হয়েও
নিরীহ প্রতিবেশী মেক্সিকোকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। কথিত অবৈধ অভিবাসী
প্রবেশ বন্ধে মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।
কিন্তু ওই কাজের খরচ দাবি করেছেন মেক্সিকোর কাছে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট
এনরিকো পেনা নিয়েতো সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কথিত ওই প্রাচীর নির্মাণে এক পয়সাও
দেবেন না তিনি। প্রাচীর নির্মাণসংক্রান্ত নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের
প্রতিবাদে ট্রাম্পের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত একটি বৈঠক বাতিল করেছেন পেনা
নিয়েতো। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক একতরফাভাবে বাতিল করার সিদ্ধান্ত
নজিরবিহীন। এতে পেনা নিয়েতোর শক্তি ও সাহস তার দেশের জনগণসহ সারা বিশ্বের
কাছে প্রশংসিত হয়েছে। অন্যদিকে মুখের ওপর না বলে দেয়ায় অপমানিত হয়েছেন
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফিলাডেলফিয়ায় কংগ্রেস রিপাবলিকানদের এক সমাবেশে শাক দিয়ে
মাছ ঢাকার চেষ্টা করেন তিনি। সেখানে ট্রাম্প বলেন, ‘আসলে বৈঠক বাতিলের
সিদ্ধান্ত দু’পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে হয়েছে।’
একই সঙ্গে গলা বাজিয়ে
বলেছেন, ‘মেক্সিকো যদি যুক্তরাষ্ট্রকে যথাযথ সম্মান না করে, তবে অমন বৈঠক
অর্থহীন। তাই আমি ভিন্নপথে এগোচ্ছি। আমাদের কোনো বিকল্প নেই।’ পরবর্তী সময়ে
পেনা নিয়েতোকে যেচে টেলিফোন করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ঘণ্টাব্যাপী
ফোনালাপের পর ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই নেতা ‘অত্যন্ত
বন্ধুত্বপূর্ণ’ আলাপ করেছেন। দু’দেশের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা প্রশমনে
কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা হচ্ছে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়। আগ বাড়িয়ে
মেক্সিকোর নেতাকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের টেলিফোন কলকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য
‘আরেকটি পরাজয়’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পই নত
হয়েছেন। অন্যদিকে, প্রাচীর নির্মাণের খরচ দিতে মেক্সিকো অস্বীকৃতি জানানোয়
ভিন্ন পদ্ধতিতে তা আদায় করার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। হোয়াইট হাউসের
মুখপাত্র শন স্পাইসার ঘোষণা দেন, প্রাচীরের খরচ তুলতে মেক্সিকোর কাছ থেকে
২০ শতাংশ হারে রফতানি শুল্ক আদায় করা হবে। মেক্সিকো কর্তৃপক্ষ এর নিন্দা
জানিয়ে বলেছে, এমনটা করলে মার্কিন নাগরিকরাই বিপদে পড়বে। কারণ কর আরোপের
কারণে মেক্সিকান পণ্য তাদের আগের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে কিনতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম পণ্য বাণিজ্যের অংশীদার মেক্সিকো। ২০১৫ সালের
হিসাব অনুযায়ী তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৫৩১ বিলিয়ন ডলার।
ওয়াশিংটনে মেক্সিকোর দূতাবাসে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইস ভিদাগেরে বলেন,
মেক্সিকোর পণ্যে কর আরোপ দেয়াল বানানোর খরচ জোগানোর পন্থা হতে পারে না।
এতে মেক্সিকো থেকে আমদানি করা অ্যাভোকাডো ফল, ওয়াশিং মেশিন ও টেলিভিশন অনেক
বেশি দাম দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লোকজনকে কিনতে হবে। তিনি বলেন, তারা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে চান। কিন্তু প্রাচীর তোলার বিষয়টি
কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারেন না। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কর আরোপের
সিদ্ধান্ত নিলে মেক্সিকোও পাল্টা কর বসাতে পারে। এতে দু’দেশ বাণিজ্যযুদ্ধে
জড়িয়ে পড়তে পারে। মেক্সিকোর একজন স্বতন্ত্র অর্থনীতিবিদ জনাথন হিথ
গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমি মনে করছি, দু’দেশ বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করতে যাচ্ছে।
আর তেমনটা হলে যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাণ শিল্প, কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত হবে মার্কিন ভোক্তারাও।’ জনাথন জানান,
মার্কিন অটো পার্টসের
৭৫ শতাংশই মেক্সিকোতে রফতানি হয়। দুর্বল অর্থনীতির দেশ হিসেবে মেক্সিকোও
ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এদিকে, মেক্সিকোর এই সংকটপূর্ণ সময়ে পেনা নিয়েতোর
পাশে দাঁড়িয়েছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ভিসেন্টে ফক্স। তিনি বলেছেন,
‘যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ করতে চাইলে আমরা প্রস্তুত।’ বিশ্বের চতুর্থ
শীর্ষ ধনী ও মেক্সিকান ব্যবসায়ী কার্লোস স্লিমও বলেছেন, ট্রাম্পকে তার
দেশের ভয় পাওয়ার কারণ নেই। ল্যাটিন আমেরিকার অন্য দুই দেশ পেরু ও কলম্বিয়া
জানিয়েছে, তারা মেক্সিকোর পাশে দাঁড়াবে। ল্যাটিন আমেরিকা ছাড়াও বিশ্বের
অনেক দেশ মেক্সিকোর প্রতি সংহতি জানাচ্ছে। এর মধ্যে মার্কিন মিত্র বলে
পরিচিত ইউরোপীয় রাষ্ট্রও রয়েছে। ফলে শুরুতেই একঘরে হয়ে পড়তে যাচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্র। নিউইয়র্ক টাইমসের এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাচীর
নির্মাণের ব্যয় নিয়ে দরকষাকষি নয়, কোনো প্রাচীরই যাতে নির্মিত না হয়, সে
বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেয়া দরকার মেক্সিকোর। কোনো ধরনের দেয়াল তোলা
বন্ধুত্বপূর্ণ একটি দেশের জন্য বন্ধুত্বসুলভ আচরণ নয়। এর সামাজিক,
সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য বিপজ্জনক দিকে মোড় নেবে। অভিবাসী প্রবেশ
ঠেকানো, মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কমানো কিংবা চোরাকারবারিদের ধরতে
প্রাচীর নয়, দুই দেশের সহযোগিতাই মুখ্য। যতই প্রাচীর উঠুক, মেক্সিকোর
সহযোগিতা ছাড়া মাদক পাচার বন্ধসহ সীমান্ত অপরাধ কখনোই বন্ধ হবে না।

No comments:
Post a Comment