মুখে
মিষ্টি হাসি। জানা আছে তার নানা কৌশল। সেই কৌশলে টার্গেট পূরণ করে। আর তার
এ কৌশলের কাছে ধরা দেয় একে একে ২৭ নারী। প্রত্যেককেই তিনি বিয়ে করেছেন।
এভাবেই বিয়েকে নেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আর তার পেশা মাদক ও সুদের ব্যবসা।
এমনটাই জানিয়েছেন ইয়াসিনের ২৫তম স্ত্রী তানিয়া। তার কথায় : ‘ও একজন
প্রতারক। তার দু’হাতের ৮ আঙুলেই থাকে স্বর্ণের আংটি। গলায় স্বর্ণের চেইন।
হাতে থাকে স্বর্ণের ব্রেসলেট। ব্যবহার করে চারটি দামি মোবাইল ফোন। বয়স্ক
হলেও যুবকদের মতোই শার্ট, প্যান্ট পরে চলাফেরা করে। প্রতিদিনই নতুন নতুন
পোশাক পরে। মাদকের ব্যবসা, অসামাজিক কার্যক্রম ও সুদের ব্যবসা করে টাকা
বানিয়েছে।’
বিয়েপাগলা খুলনার ইয়াসিন ব্যাপারী (৪৮) সম্পর্কে তানিয়া জানান,
‘ইয়াসিনের ৭ম স্ত্রী ছিল বরিশালের মেয়ে মাজেদা। যে ‘সাথী মালা কার জন্য’
গানের গীতিকার। খুলনায় থাকাকালে তাদের সম্পর্ক হয়। পরে চট্টগ্রামে পালিয়ে
গিয়ে তারা বিয়ে করেন।’ ইয়াসিন তার দ্বিতীয় স্বামী উল্লেখ করে এই
প্রতিবেদককে তানিয়া জানান, বিয়ের আগে ইয়াসিন সব বিয়ের তথ্যই গোপন রাখে। ওর
মিষ্টি কথায় এত খারাপ চরিত্র সম্পর্কে ধারণা বা সন্দেহ করা কঠিন। বিয়ের পর
একে একে ইয়াসিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠতে থাকে। চট্টগ্রামের
বায়েজিদে থাকাকালে প্রতি রাতেই ইয়াসিন মেয়ে নিয়ে বাসায় আসত। সকলকেই আত্মীয়
বলে পরিচয় দিত। প্রতিবাদ করলে মারধর করত। প্রায় রাতেই ওই মেয়েদের সঙ্গে
আপত্তিকর অবস্থায় তাকে দেখা গেছে। এসব ঘটনার ফলে স্থানীয় কলোনির
বাসিন্দারাও ক্ষিপ্ত ছিল। এসব কিছু জানার কারণে প্রায়ই নির্যাতন করত। এক
পর্যায়ে তিন মাসের গর্ভ অবস্থায় ইয়াসিন তাকে খুলনার রূপসার ইলাইপুরে পৈতৃক
বাসায় রেখে চলে যায়। তানিয়া আরো জানান, ইয়াসিনের এ ধরনের আচরণের পাশাপাশি
বিভিন্ন এলাকায় তার বিয়ের খবর পাওয়া যায়।
ইয়াসিনের প্রথম বিয়ে ছিল খুলনা
মহানগরীর চানমারী এলাকার শাফিয়ার সঙ্গে। এরপর নারায়ণগঞ্জের লাভলীকে বিয়ে
করে ইয়াসিন। বর্তমানে লাভলীর সংসারে সাবিনা ও সূচনা নামে দুটি মেয়ে রয়েছে। এ
খবর জানার পর শাফিয়া তালাক দেয় ইয়াসিনকে। পরে তৃতীয় বিয়ে করে বাগেরহাটের
দেপাড়ার রাশিদাকে। রাশিদার সংসারে নয়ন নামে এক ছেলে রয়েছে। ইয়াসিনের ৪র্থ
স্ত্রীর নাম আজমিরা। সে খুলনা মহানগরীর লবণচরা এলাকার পুঁটিমারীর বাসিন্দা।
পঞ্চম স্ত্রী শেফালীকে বিয়ে করার পর আজমিরা নিজেই ইয়াসিনকে তালাক দেয়।
শেফালী খুলনা মহানগরীর শিরোমণি এলাকার নিবাসী। ষষ্ঠ স্ত্রী নোয়াখালীর
জেসমিনের সংসারে রয়েছে ইয়ামিন নামে এক ছেলে। সপ্তম স্ত্রী গীতিকার মাজেদা
এখন ভারতে অবস্থান করছেন। তার বড় বোন চট্টগ্রামে থাকে। ইয়াসিনের অষ্টম
স্ত্রী চট্টগ্রামের বায়েজিদ মাস্তন শেরশাহ এলাকার মিনারা। তার সংসারে দুই
ছেলে-মেয়ে এখন কলেজে পড়ে। ৯ম স্ত্রী চট্টগ্রামের গার্মেন্টকর্মী জেসমিন।
এরপর বিয়ে করে চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকার মনি ও চট্টগ্রামের বায়েজিদ
এলাকার গার্মেন্টকর্মী অপর এক মনিকে। চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার
গার্মেন্টকর্মী বকুল তার ১২তম স্ত্রী। বকুল পরে একাধিক বিয়ের খবর পাওয়ার পর
ইয়াসিনকে তালাক দেয়। ইয়াসিনের ২৪তম স্ত্রী চট্টগ্রামের বাঁশখালীর আরজুর
সংসারে সানজিদা নামে এক মেয়ে রয়েছে। ওর ২৫তম স্ত্রী তানিয়া নিজের সংসারে এক
বছর ১৬ দিনের মেয়ে খাদিজা আক্তার খুকুমনি রয়েছে। এরপর পিরোজপুরের রাজাপুর
থানা এলাকার মাটিভাঙ্গা গ্রামের পুতুলকে বিয়ে করে ইয়াসিন। ২৭তম স্ত্রী
হচ্ছে বরগুনার আমতলী থানার গ্যান্দামারা এলাকার জয়নাল আকনের মেয়ে রুমানা
আক্তার। এই বাড়ি থেকেই ২২ জানুয়ারি পুলিশ ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার হয়ে ইয়াসিন এখন বরগুনা কারাগারে রয়েছে। তানিয়ার মা ওলেমা বেগম
জানান, ইয়াসিনের বড় ভাই ছিল তাদের প্রতবেশী।
সে হিসেবে মেয়ের সঙ্গে
ইয়াসিনের সখ্যতা গড়ে ওঠে। এরপর নানা টালবাহানার পর ওদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর
গোপন বিয়ের খবর পাওয়ার পরই অশান্তি সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, ‘তার বাবার বাড়ি
বাগেরহাটের যাত্রাপুর এলাকায়। তানিয়ার বাবা মো. আলম মোড়ল। তিনি রূপসার
জাবুসা এলাকার গ্লোরী জুট মিলের সিকিউরিটি গার্ড।’ ওলেমা বেগম বলেন,
‘তানিয়াকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বরগুনার রুমানার বাড়ির পাশের বাসায় গোপনে
অবস্থান নিয়ে ইয়াসিনকে পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করান। এরপর থানায় সামনা সামনি
হলে ইয়াসিন তাকে হুমকি দিয়ে বলে আটক হয়ে থাকব সর্বোচ্চ তিন মাস। এরপর আমি
এর প্রতিশোধ নেব।’ তানিয়ার মা বলেন, ‘মামলায় ইয়াসিনকে আটক করার পর গত ২৪
জানুয়ারি দুটি মোটরসাইকেলে চার জন লোক মুখে কাপড় পেঁচিয়ে আমার ইলাইপুরের
বাসায় আসে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।’ তানিয়ার পিতা মো. আলম মোড়ল বলেন,
‘তিনি এক সময় গ্লোরী জুট মিলে চাকরি করতেন। তার বাড়ি খুলনার পাইকগাছা
উপজেলার গোপালপুর গ্রামে। তিনি এখন মহানগরীর শিরোমণি এলাকার বৈদ্যুতিক পোল
তৈরির প্রতিষ্ঠান পিসিএল এর সিকিউরিটি গার্ড।’ বিয়েপাগলা ইয়াসিনের বড় ভাই
এস্কেন্দার ব্যাপারী খুলনার রূপসা ফেরিঘাট এলাকার পাবলিক টয়লেটের পাশের
সরকারি জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছেন। তিনি জানান, ‘ইলাইপুরে থাকাকালে তানিয়া ও
ইয়াসিনের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তখনই তানিয়া ও তার পিতা-মাতাকে জানানো
হয়েছিল ইয়াসিনের একটি বিয়ে আছে। কিন্তু তারা তা মানেনি। তারা কৌশলে
ইয়াসিনের সঙ্গে তানিয়ার বিয়ে দেয়।’
শেফালী আকতার তানিয়ার দায়েরকৃত মামলার
বিবরণে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এক লাখ এক টাকা দেনমোহরে
ইয়াসিনের সঙ্গে তানিয়ার বিয়ে হয়। এরপর তাদের কোলে আসে খাদিজা। গত বছরের ২৪
সেপ্টেম্বর ইয়াসিন তার পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। এরপরই
২৯শে সেপ্টেম্বর তিনি বাদি হয়ে খুলনার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের
বিচারক মো. মঞ্জুরুল হোসেনের আদালতে মামলা করেন। আদালত ওই দিনই আসামি
ইয়াসিনের নামে সমন জারি করেন। এরপর ৩০ অক্টোবর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু
করেন। গত ২২ জানুয়ারি বরগুনার আমতলা থানা পুলিশ ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করে এবং
৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ২৩ জানুয়ারি বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল
ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রেরণ করে। এ খবর জানার পর ২৫শে জানুয়ারি খুলনার চিফ
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে বরগুনার জেল সুপার বরাবর ইয়াসিনকে
আগামী ৯ই ফেব্রুয়ারি খুলনার আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়ে পিডব্লিউ ইস্যু
করেছেন। একই সঙ্গে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ২৯ জানুয়ারি দিন ধার্য
করেছেন।

No comments:
Post a Comment