Tuesday, January 3, 2017

বারবার পিছু হটছে সরকার

বারবার আদালতের নির্দেশনা, সরকারের আলটিমেটাম, মালিকদের অঙ্গীকার এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা কোনো পদক্ষেপই ট্যানারির বিষাক্ত দূষণ থেকে মুক্ত করতে পারেনি হাজারীবাগকে। রাজধানী থেকে এসব ট্যানারি সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে সরিয়ে আনতে বরাবরই ছিল সরকারের কড়া অবস্থান। কিন্তু তারপরও বারবার পিছু হটছে শিল্প মন্ত্রণালয়। অনেকটা এক ‘পা’ এগিয়ে আবার দু-‘পা’ পেছনে সরে আসতে হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন অজুহাতে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে জনমনে সংশয় বাড়িয়েছে। এ ছাড়া সরকারের নমনীয়তাকে পুঁজি করে ট্যানারি মালিকরাও সুযোগ নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ কারণেই দীর্ঘ ১৫ বছরের চেষ্টা সত্ত্বেও রাজধানী থেকে ট্যানারি সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ এখন পর্যন্ত কার্যকর করা যায়নি। অপরদিকে নির্দিষ্ট সময়ে ট্যানারি স্থানান্তরে নির্দেশনা রয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের। আদালতের সর্বশেষ রায় অনুযায়ী যেসব ট্যানারী মালিক স্থানান্তরে বিলম্ব করবেন তাদের প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা গুনতে হবে। এরপরও ট্যানারি স্থানান্তর হচ্ছে না। এই জরিমানা পরিশোধ করেই অনেকে ট্যানারি স্থানান্তরে কালক্ষেপণ করছেন। এ অবস্থায় রাজধানীকে পুরোপুরি ট্যনারিমুক্ত করা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। এদিকে শিল্পমন্ত্রী ও শিল্প সচিব দফায় দফায় আলটিমেটাম দিয়েছেন। কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। আবার সে অবস্থান থেকেও সরে এসেছেন। বলা হয়, গত বছর ৩১ মার্চের মধ্যে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর না হলে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দেয়া হবে। প্রয়োজনে ট্যানারির গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। শুধু তাই নয়, গেল বছরের এপ্রিল থেকে কোনো কাঁচা চামড়া হাজারীবাগের ট্যানারিতে ঢুকতে দেয়া হবে না সরকারের এমন অনড় অবস্থানও ছিল। তবে সময় গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে আলটিমেটামও ধোপে টেকেনি। সর্বশেষ সরকার এবং ট্যানারি মালিকদের যৌথ সম্মতিতে নির্ধারণ হওয়া সময়সীমা ছিল ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬। সবাই ধরে নিয়েছিল যেহেতু ট্যানারি মালিকরাই এ সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন; তা কার্যকর হবে। কিন্তু বাস্তবে বছর শেষে দেখা গেল ১৫৫টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে মাত্র ৩৭টি ট্যানারি সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর হয়েছে। অর্থাৎ সিংহভাগই সেখানে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সচেতন মহলের ধারণা ছিল নতুন বছরে হয়তো এবার সরকার তার কঠোর মনোভাব পরিবর্তন করবে না। নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিশ্চয় এর একটা শেষ সীমারেখায় যাবে। কিন্তু সেটি হয়নি।
এবারও সেই পিছু হটার নজিরই দেখাল সরকার। ব্যর্থ ট্যানারিগুলোকে হাজারীবাগ থেকে সাভারে সরিয়ে নিতে আরও তিন মাস সময় দেয়া হয়েছে। একইভাবে কাঁচা চামড়া প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসংবলিত সরকারি নির্দেশনার ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশের মেয়াদ আরও এক মাস বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘এটাই ওদের জন্য শেষ সুযোগ। ওরা অনেক আবেদন-নিবেদন করেছে। অঙ্গীকার করেছে এ সময়ের মধ্যে যেতে না পারলে সরকারের যে কোনো পদক্ষেপকে তারা স্বাগত জানাবেন। অন্যদিকে কঠোর অবস্থানে থাকলেও সরকার চায় দেশের শিল্প ও ব্যবসার উন্নয়ন এবং প্রসার। তাই দেশের বৃহৎ স্বার্থেই তাদের শেষবারের মতো এ সুযোগ দেয়া হয়েছে। আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে স্থানান্তরে ব্যর্থ ট্যানারিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার হুশিয়ারিও দেন তিনি। বাণিজ্য বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, যে কোনো নীতিনির্ধারণের আগে সরকারের সুষ্ঠু ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকা উচিত। একই সঙ্গে তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা দেয়ার পাশাপাশি কঠোর মনোভাবও অব্যাহত রাখতে হবে। ট্যানারি স্থানান্তরে এর সবটারই ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ কারণেই বারবার ভেস্তে যাচ্ছে সরকারের সব হুশিয়ারি বার্তা। আর এসবের সুযোগ লুফে নিতে বিন্দুমাত্র ভুল করছেন না ট্যানারি সংশ্লিষ্টরা। কারণ, তারাও বুঝে গেছেন এটাই শেষ আলটিমেটাম নয়। সামনে আরও সময় মিলবে। ট্যানারি স্থানান্তরে আবারও সময় বাড়ানো হল এটা কি সরকারের প্রস্তুতির কোনো দুর্বলতা- এমন প্রশ্নের জবাবে সাভার চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. আবদুল কাইয়্যূম যুগান্তরকে বলেন, সরকার সবদিক থেকেই প্রস্তুত।
কোনো দিক থেকেই প্রকল্পের কোনো ঘাটতি নেই। তারপরও বারবার সময় দেয়া হচ্ছে গণতান্ত্রিক সরকার বলে। কারণ সরকারের সব পদক্ষেপই হয় জনকল্যাণ এবং উন্নয়নমূলক। এ শিল্পটি নিয়ে সরকার খুব বেশি আশা করছে। ফলে খোদ প্রধানমন্ত্রীই এ খাতটিকে ইয়ার অব দ্য প্রোডাক্ট ঘোষণা করেছেন। সে অবস্থায় যাওয়ার জন্য পূর্ণ সক্ষমতা অর্জনেই এ সময় বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রবিউল আলম যুগান্তরকে বলেন, সবকিছুরই একটা শেষ আছে। ট্যানরি শিল্পেও সবকিছুরই শেষ হয়েছে। এরপরও না যাওয়াটা ট্যানারি মালিকদের দৈন্যতাই। বলেন, এভাবে সময় দিতে থাকলে তিন মাস কেন আগামী ৩ বছরেও সরানো যাবে না। তিনি দাবি করেন, শুনেছি এখন পর্যন্ত ৩৭টি ট্যানারি সাভারে গেছে। তারা ওখানে ওয়েট ব্ল– প্রসেসিংও শুরু করে দিয়েছে। দেশে পাওয়া ১ কোটি ২০ লাখ গরু ও ৮০ লাখ খাসির চামড়ার প্রক্রিয়াজাতের জন্য ৩০-৪০টি ট্যানারিই যথেষ্ট। তদপুরি যারা গেছে সবারই উৎপাদন ক্ষমতা ব্যর্থদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এ পরিস্থিতিতে সরকারের সময় বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং সরকারের এ নমনীয়তা অন্যান্য প্রকল্পে বা খাতে দেখা গেলে দেশের জন্য একটা খারাপ দৃষ্টান্তই হবে বলে দাবি করেন তিনি।

No comments:

Post a Comment