শুধু
বাংলাদেশ নয় বিশ্বের জন্যও ২০১৬ সালটি ছিল কঠিন একটি বছর। অবশ্য এ কথাটা
আমরা প্রতিটি বছরের ক্ষেত্রেই বলি কিন্তু ২০১৬ সালের মতো অপ্রত্যাশিত কিছু
ঘটনা, ইতিহাসের কিছু পালাবদল সব বছর ঘটে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন, এমন কেউ
ভাবতে পারেননি। তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোগানের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান
প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলে যে বিশাল প্রতিহিংসাযজ্ঞ চলেছে তা তুর্কিদের বিস্মিত
করেছে। ফিলিপাইনের রাষ্ট্রপতি দুতের্তে নিজের মুখে স্বীকার করেছেন তিনি
মাদক ব্যবসায়ীদের নিজ হাতে গুলি করে মেরেছেন। এটিও অভূতপূর্ব। ইউরোপজুড়ে
দক্ষিণ এবং চরম দক্ষিণ পন্থার উত্থান উদারপন্থী ইউরোপীয়দের হতবাক করেছে।
ঘরের কাছে মিয়ানমারের রাষ্ট্রশক্তি রোহিঙ্গাদের ওপর যেভাবে হামলা করেছে,
গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে, নারীদের সম্ভ্রমহানি করেছে,
নিরীহ গ্রামবাসীকে
মেরেছে তাতে বিবেকবান মানুষমাত্রই স্তম্ভিত হয়েছে অথচ কথার মারপ্যাঁচে একে
বৈধতা দিচ্ছেন শান্তিতে নোবেল জয়ী সু চি। নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া আর
কেউ এরকম বর্বরতাকে সমর্থন করেছেন কিনা কে জানে (প্যালেস্টাইনিদের ওপর
ইসরাইলি বর্বরতার সমর্থক ও অনুমোদনকারী ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ও ১৯৭৮ সালের
নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া মেনাখেম বেগিনের কথা বাদ দিলে)। ২০১৬ সালে
বিশ্ব অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়েছে; চরমপন্থা অনেক বেশি তীব্রতা নিয়ে দেখা
দিয়েছে। ভিন্নমত সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিচয়ে আক্রমণ করার প্রবণতা বেড়েছে।
মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর বিখ্যাত মার্কিন
সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, বিশ্বায়নের যুগ শেষ হচ্ছে। বিশ্বায়ন
বলতে পত্রিকাটি সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের সুবাদে সংস্কৃতি স্থানীয়
চিন্তাভাবনার ও জীবনচর্চার বিষয়গুলোর বৈশ্বিক মাত্রায় বিকশিত হওয়াকে
বুঝিয়েছে। আমরা জানি পশ্চিমের অনুকূলে বিশ্বায়নে বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক ও
ক্ষমতাগত পরিব্যাপ্তি ঠিকই জারি থাকবে। আমাদের দেশেও তো একটা কঠিন সময় আমরা
এ বছর পার করলাম। বছরের শুরু থেকেই মুক্তচিন্তার মানুষদের ওপর হামলা
হয়েছে। ১ জুলাই হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ হামলা হয়েছে। ঠাণ্ডা মাথায়
অনেক নিরীহ মানুষকে খুন করা হয়েছে। এ ঘটনার জের ধরে বছরের বাকি সময় জঙ্গি
আস্তানার খোঁজে চিরুনি অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। শুধু পুরুষ নয়, জঙ্গিবাদে
নাম লেখানো পরিবারের নারী ও শিশুরাও ধরা পড়েছে, মারাও গেছে। যে সংকট
বছরজুড়ে আমরা দেখেছি, তার মূল অনেক গভীরে প্রোথিত।
ওই সংকট দূর করতে হলে
ধর্মের আদর্শ চিন্তা, মানবিকতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে।
সহিংসতার বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু যারা এ কাজটি করবেন তারা
কোথায়? আমাদের দেশে হিন্দুদের মন্দির ভাঙা হয়েছে, প্রতিমা ভূলুণ্ঠিত করা
হয়েছে। সাঁওতালদের ঘরছাড়া, জমিছাড়া করা হয়েছে। এ ভয়ানক অপরাধগুলো সমাজ মেনে
নিচ্ছে, রাষ্ট্রও চুপচাপ বসে আছে। নাসিরনগর ও অন্যত্র হিন্দুদের ওপর
আক্রমণের পেছনে ক্ষমতাসীন দলের মানুষগুলোর কথা কাগজে-টিভিতে এসেছে, দু-একজন
ধরাও পড়েছে। সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে খোদ পুলিশ- এরকম ভিডিও
দেখিয়েছে আলজাজিরা টেলিভিশন। এরকমটা হতে থাকলে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো
বেপরোয়া হয়ে উঠবে। যেটি মোটেই কাম্য হতে পারে না। আমাদের দেশে অপরাধীরা
শক্তিশালী হলে শাস্তি পায় না। রাজনৈতিকভাবে সরকারি দল থেকে ভিন্নমতের হলে
অবশ্য ভিন্ন কথা। ২০১৬ সালে একটি কঠিন বিষয় ছিল আইনের শাসনের এ স্খলনের
বিষয়টি। আইনশৃংখলার সাধারণ চিত্র ভালোই ছিল- ছিনতাই, রাহাজানি, চুরি,
ডাকাতি অন্যান্য বছরের চেয়ে কিছুটা কম ছিল, কিন্তু গুম হওয়ার বিষয়টি এখন
একটি দুর্ভাগ্য হিসেবে রয়ে গেছে। কাগজে এসেছে ৮৪ জন মানুষ এ বছর গুম
হয়েছেন। এ পরিসংখ্যান শূন্যে নামিয়ে না আনতে পারলে আমরা বলতে পারব না, আমরা
উন্নতির পথে আছি। রাজনীতির ক্ষেত্রে কঠিন একটি বাস্তবতা হল বহুদলীয়
গণতন্ত্রের চর্চাটা যথেষ্ট উন্মুক্ত না হওয়া।
সরকারের সঙ্গে সদ্ভাব রয়েছে
যেসব দলের তারা ছাড়া অন্যদের জন্য বছরটা ছিল উদ্বেগের। দেশের অন্যতম বড় দল
বিএনপি সভা-সমিতি করার অনুমতি পায় না, এটি গণতন্ত্র চর্চার জন্য সুখবর নয়।
এদিকে বিএনপিও শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে পারছে না- এর অনেক কারণের মধ্যে একটি
হচ্ছে এখনও অনেক মৌলিক বিষয়ে দলটির বিপরীত অথবা অস্পষ্ট চিন্তা। দলটি
তরুণদের আর তেমন আকৃষ্ট করতে পারছে না, এখনও যেহেতু এক বিকৃত ইতিহাস তারা
স্থির ধরে বসে আছে। এখন ইউটিউবে ইন্টারনেটে গেলে তরুণরা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
শুনতে পায়, তার সম্পর্কে জানতে পারে, তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়তে পারে।
তারপরও বিএনপি বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করে যাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে
গাঁটছড়া বেঁধে বসে আছে। এ দলটি যদি সত্যকে স্বীকার করে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে
বিতর্কিত না করে নিজেদের কর্মকাণ্ড চালাত, তবে আজ প্রচুর তরুণ দলটিকে
সমর্থন করত। ২০১৬ সাল কঠিন ছিল প্রতিটি দলের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, তবে
বছর শেষে নারায়ণগঞ্জে পৌর নির্বাচন একটা ব্যতিক্রমী ঘটনার জন্ম দিল- এ
নির্বাচনটি দেখিয়ে দিল ইচ্ছা থাকলে দলগুলো পারে সুস্থ গণতন্ত্রের পথে
দেশটিকে ফিরিয়ে আনতে। নারায়ণগঞ্জ পৌর নির্বাচনের দুই প্রার্থীই ছিলেন
স্বচ্ছ ভাবমূর্তির, তাদের কোনো ক্যাডার বাহিনী ছিল না, তারা মানুষের কাছে
পৌঁছেছেন আন্তরিকতা নিয়ে। নির্বাচনের পরও দুই প্রার্থী পারিবারিক সৌজন্য ও
সৌহার্দ্যকে ভুলে যাননি। এ নির্বাচন আমাদের আগামীর জন্য আশাবাদী করছে।
২০১৬ শেষ হল। এখন নতুন একটি বছর এসে আমাদের আগামীর পথে ডাক দিচ্ছে। ২০১৬
সালের হিসাব-নিকাশে ভালোমন্দ ছিল- আমাদের ভালোর কথাগুলো মাথায় রেখে মন্দের
ব্যবচ্ছেদ করে কারণগুলো ও প্রতিকারগুলো নির্ধারণ করে এগোতে হবে। আমাদের
ভালো অর্জন ছিল অর্থনীতি, কৃষি, ডিজিটাল প্রযুক্তি যোগাযোগ এবং শিক্ষার।
পররাষ্ট্রবিষয়েও বছরটা ছিল সফল। কিন্তু আমাদের ব্যর্থতা ছিল রাজনীতির মাঠে,
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে, শিক্ষার মান বাড়ানোতে, যোগাযোগের কিছু ক্ষেত্রে।
যোগাযোগের কথায় বলা যায়- ২০১৬ সালের বড় একটি ব্যর্থতার নাম ছিল বাংলাদেশ
বিমান। অদক্ষতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা বিমানকে ডুবিয়েছে। একটি লজ্জার বিষয়
ছিল বিমানের গলায় বিশ্বের ২০১৬ সালের ২য় নিকৃষ্টতম বিমান সংস্থার মালা
পরানো। অথচ বিশ্বের অনেক বড় বিমান সংস্থা থেকেও বিমানের নিবেদিত যাত্রীর
সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ লাখ লাখ বাংলাদেশী যাত্রী বিমানকে তাদের এক নম্বর
পছন্দে রাখবেন, যদি এর সেবা উন্নত হয়। বিমানের অনেক কর্মকর্তা, বৈমানিক,
সেবাদানকারী ও অন্যরা আছেন যারা পরিশ্রমী, আন্তরিক এবং যাত্রীদের প্রতি
যতœশীল। কিন্তু তাদের পরিশ্রমেও বিমান বদলায় না। বিমান নিয়ে এত কথা বলার
কারণ, এ সংস্থাটি সরকারি নানা সংস্থার একটা প্রতিনিধিত্বশীল ছবি- সংস্থাটি
নিজের সম্ভাবনা নিজেই খর্ব করছে।
২০১৬ আমাদের দেখিয়েছে, কিছু মানুষের লোভ,
ক্ষমতার দম্ভ, কূটকৌশল এবং দুর্নীতির কাছে দেশটা কীভাবে একটা বিপন্ন শিকারে
পরিণত হয়ে যায়। ২০১৭ সালে আশা করতে পারি, এ প্রবণতাটা আমরা কিছুটা হলেও
কাটিয়ে উঠব। শিক্ষার ক্ষেত্রে ২০১৬ সাল শেষ হয়েছে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণী
সমাপনী পরীক্ষার ফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে। প্রায় ৯৯ শতাংশের কাছাকাছি পিইসি
এবং প্রায় ৯৩ শতাংশের কাছাকাছি জেএসসি শিক্ষার্থী পাস করেছে উভয় পরীক্ষায়।
বিষয়টা শিক্ষার্থী ও আমাদের সবার জন্য আনন্দের। কিন্তু শিক্ষার্থীদের
পাশাপাশি অভিনন্দন কাদের জানানো যায়- স্কুলগুলোকে, নাকি কোচিং
সেন্টারগুলোকে? নাকি পিতা-মাতাদের যাদের বেশিরভাগ কোচিং সেন্টারে পাঠিয়েছেন
ছেলেমেয়েদের, অনেক পয়সা খরচ করে? এ দুটি অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা একেবারে শিশু
বয়স থেকে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার্থীতে পরিণত করছে। তাদের কোচিং বাণিজ্যের
হাতে তুলে দিচ্ছে। একবার কথা হয়েছিল, পঞ্চম শ্রেণী সমাপনী পরীক্ষা তুলে
দেয়া হবে, কিন্তু তা আর হল না, হবেও না, সেহেতু কোচিং বাণিজ্য চক্র এখন
শক্তিশালী এবং বিত্তশালী। এদের বাগে আনা সহজ নয়। ২০১৭ সাল শুরু হবে পাঠ্যবই
উৎসব দিয়ে, এ উৎসবটি একটি সত্যিকার ইতিবাচক অর্জনের ছবি। আমরা আশা করব,
উৎসবটি চিরস্থায়ী হবে এবং বইয়ের ভার কমবে। ২০১৭ সালটা কেমন আশা করি আমরা?
অবশ্যই শান্তিময়। অহিংস, কর্মকোলাহলে মুখর একটি প্রাপ্তির বছর। কিন্তু একটা
শংকা থেকেই যায়- যারা সহিংসতায় সমাধান অথবা মুক্তি খোঁজে তারা নতুন বছর
বলেই সব ভুলে যাবে তা তো নয়। ফলে সহিংসতা থাকবে। ধর্মের নামে, রাজনীতির
নামে, ক্ষুদ্র স্বার্থের নামে, মতবাদের নামে এ সহিংসতা কীভাবে কমানো যায়
(নির্মূল করতে হলে মানবচরিত্রকে খোলনলচে পাল্টাতে হবে) তা নিয়ে ভাবতে হবে।
শুরুটা করতে হবে পরিবারে, তারপর শিক্ষাঙ্গনে। পরিবারে লোভের সংস্কৃতি আর
পণ্যপূজার চর্চা না থাকলে। মুখস্থ আর সনদমুখী পড়াশোনার পরিবর্তে পড়ার
সংস্কৃতি চালু করা গেলে, আমাদের সমাজের পুরনো এবং প্রচলিত মূল্যবোধগুলোকে
ফিরিয়ে আনা গেলে এক সময় তরুণেরা আত্মশক্তিতে জাগবে, শুভ-অশুভের পার্থক্য
নির্ণয় করতে পারবে, আলোকিত হতে পারবে। এজন্য আমি সব সময় বলি, শিক্ষার দিকে
প্রকৃত মনোযোগ দিতে হবে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মনোযোগের কেন্দ্রে রাখতে হবে
শিক্ষাকে। সমস্যা থাকবে; সমাজ ও জীবন বাস্তবতা, বৈশ্বিক অর্থনীতি, কূটনীতি
হয় তো ২০১৭ সালে অনেক কঠিন হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যদি বড় মাপের হয়,
আমাদের দেশের মতো উপচেপড়া ভিড়ের দেশে তা বিপর্যয় ডেকে আনতে পরে যে কোনো
সময়। কিন্তু এসব আশংকার কথা মনে রেখেই আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশে যেভাবে
নিজের শক্তিতে উঠে দাঁড়িয়েছে, পথ চলছে তাতে ২০১৭ সালে আরও অনেক অর্জন
আমাদের করতলে জমবে। এজন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সহনশীলতা, সামাজিক
সুস্থিরতা, প্রশাসনের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা সবার ঐকান্তিকতা এবং সব
সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতির প্রয়োজন। যে জাতি একাত্তরে এক
হয়েছিল, তার পক্ষে এসব অর্জন অসম্ভব নয়। সেই লক্ষ্যে ২০১৭ আমাদের নিয়ে
যাবে, আমরা তা আশা করতেই পারি। সবার জন্য ২০১৭ সাল শুভ হোক, সুন্দর হোক।

No comments:
Post a Comment