Monday, January 23, 2017

নাসিরাবাদে দখল-দূষণের কবলে খাল

বেশ কয়েক বছর ধরে অবৈধ দখল-দূষণের কবলে নাসিরাবাদ ইউনিয়নের প্রায় ১৬ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ পানি নিষ্কাশন খাল। সরকারদলীয় ও অন্যান্য প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় শতাধিক দখলদার এলাকার অভ্যন্তরীণ খাল দখল করে বসতবাড়ি, টং দোকান, রিকশা গ্যারেজ, হোটেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চালু করে রেখেছে। আর অধিবাসীদের ফেলা পলিথিন, ময়লা-আবর্জনার পাশাপাশি বর্জ্য মিশে খালগুলো ভরাট হয়ে নষ্ট হয়েছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। কারণ বেশিরভাগ খালের দু’পাড়েই অবৈধ দখল আর মানুষের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। কোথাও কোথাও সরু নালায় পরিণত হয়েছে খাল। আর দূষণে বালু নদ, নড়াই নদ ও খালের পানি কালচে রঙ ধারণ করে চারপাশে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কারণ নির্বিচারে রাজধানীর হাতিরঝিল, রামপুরা, মাণ্ডা ও মুগদা এলাকার অবর্জনা, মল-মূত্র, ময়লা ও বর্জ্য বালু নদ ও রামপুরা খাল হয়ে সরাসরি নড়াই নদে এসে পড়ে। মিশে যায় বালু নদেও। তাছাড়া এখানকার নদ ও খালের দু’পাড়ের বাসিন্দারা তীরেই ঝুলন্ত পায়খানা ব্যবহার করছেন। সহস্রাধিক ঝুলন্ত পায়খানা রয়েছে এ এলাকায়।
পায়খানার মল-মূত্র সরাসরি নদ ও খালের পানিতে মিশে যায় বলেও পানি দূষিত হয়। এ বিষয়ে এলাকাবাসী যুগান্তরকে বলেন, আসলে পায়খানার ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। তাই বাধ্য হয়ে নদ ও খালের পানিতে ফেলতে হয়। আর যুগ যুগ ধরে একই চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে নাসিরাবাদে। রাজধানীর অদূরে খিলগাঁও থানাধীন সাবেক নাসিরাবাদ ইউনিয়ন ও বর্তমান ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায় রয়েছে। নাসিরাবাদ রাজধানীর অতি নিকটে হলেও এখানে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার মধ্যেই জীবনযাপন করছেন অধিবাসীরা। যে যার মতো করে দখল-দূষণ করেই চলেছে নাসিরাবাদে। সূত্রে জানা গেছে, ৯টি ওয়ার্ড ও ১৩টি গ্রাম নিয়ে প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে নাসিরাবাদ ইউনিয়ন। এখানে ৭০ হাজারের অধিক মানুষের বসবাস। তবে ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার। ফকিরখালী, ইদারকান্দি, বালুরপাড়, বাবুর জায়গা, দাসেরকান্দি, গৌড়নগর, নাসিরাবাদ, নাগদারপাড়, শেখের জায়গা ও ত্রিমোহনীসহ ১৩টি গ্রাম নিয়ে নাসিরাবাদ ইউনিয়ন। আর ইউনিয়ন অভ্যন্তর এলাকা ও ইউনিয়নের কোলঘেঁষে বয়ে চলেছে নড়াই নদ ও প্রায় ১৬ কিলোমিটার খাল। কিন্তু বেশিরভাগ খালের দু’পাড়েই অবৈধ দখল আর মানুষের ফেলা বর্জ্যে পানির প্রবাহ নষ্ট হয়ে গেছে। নাসিরাবাদ ইউনিয়নবাসীর জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ বালু ও নড়াই নদের পচা পানি। আগে এ দুটি নদের পানি দিয়ে জমি সেচ, গোসল, কাপড় ধোয়াসহ নানান সাংসারিক কাজ করা যেত। কিন্তু বর্তমানে এ পানি ব্যবহার করা তো দূরের কথা উৎকট গন্ধে কাছেও যাওয়া যায় না। তাছাড়া ময়লা পানির প্রভাবে নদ ও খালের আশপাশের মানুষ ময়লা পানিবাহিত নানা রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন এখানকার অধিবাসীরা।
দেখা গেছে, বালু থেকে নড়াই নদ হয়ে মেরাদিয়া হাট পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার, ত্রিমোহনী থেকে দেব ধোলাই পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার, জিরানী খাল থেকে নড়াই নদের মোহনা পর্যন্ত ১ কিলোমিটার, আবার নড়াই মোহনা থেকে ২ কিলোমিটার গজারিয়া খাল, বটতলা থেকে বড় বিল পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার, বালু থেকে গাবরখালী দেড় কিলোমিটার, বাবুর জায়গা খাল ১ কিলোমিটার, দাশেরকান্দি মৃত প্রায় কলমি খাল ২ কিলোমিটার, শেখের জায়গার আধা কিলোমিটার সোনাটুকি খাল বয়ে চলেছে নাসিরাবাদ ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ এলাকার কোলঘেঁষে। এর মধ্যে অনেক আগেই ভরাট হয়ে দখলে চলে গেছে দাশেরকান্দির কলমি খাল, বাবুর জায়গা খাল, জিরানি খালসহ অন্যান্য খাল। ৬০ ফুট প্রশস্ত নিষ্কাশন খালগুলো ভরাট হয়ে অবৈধ দখলে চলে গিয়ে কোথাও কোথাও সরু নালায় পরিণত হয়েছে। নাসিরাবাদের প্রবীণ নাগরিক মো. মোশারফ হোসেন যুগান্তরকে জানান, এখানকার অভ্যন্তরীণ খালগুলো অবৈধ দখল-দূষণের কবলে পড়ে পচা পানির কারণে নাসিরাবাদের ফসলি জমিতে বিভিন্ন রবিশস্য ও ধান এখন আর ঠিকমতো হয় না। এলাকার বাসিন্দা ইসতিয়াক আহম্মেদ বাবুল যুগান্তরকে বলেন, শিগগিরই যদি নাসিরাবাদ ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ খালগুলো দখল ও দূষণমুক্ত না করা যায় তাহলে এ এলাকা বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে। পচা পানির কারণে এখানে দিন দিন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অধিবাসীরা। তাছাড়া পানি নিষ্কাশন খালগুলো ক্রমেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে আরও বেশি সমস্যা বাড়তে থাকবে এলাকায়। এখানকার পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নাসিরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আকবর হোসেন যুগান্তরকে বলেন, রাজধানীর হাতিরঝিল, রামপুরা, মান্ডা ও মুগদা এলাকার অবর্জনা, মল-মূত্র, ময়লা ও বর্জ্যসহ শহরের সুয়ারেজের ময়লা বালু নদ ও রামপুরা জিরানি খাল হয়ে সরাসরি নড়াই নদে এসে পড়ে বলে নদ ও খালের পানি নষ্ট হয়ে গেছে। আর প্রভাবশালীদের দখলে খালের অনেক জায়গা ভরাট হয়ে খালগুলো ক্রমেই দখলের কবলে পড়ছে। তবে ঢাকা ওয়াসার আওতাভুক্ত নাসিরাবাদের খালগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ইউনিয়ন এলাকায় বারগ্রাম উন্নয়ন সংস্থা নামে একটি সামাজিক সংগঠন আমাদের রয়েছে। খালগুলোর পানি দূষণমুক্ত ও অবৈধ দখল করতে এ সংগঠনের ব্যানারে ২০০০ সাল থেকে মিছিল, মিটিং ও বিভিন্ন জনসভা করা হয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। তবে সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজকের এ হাতিরঝিল। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি নাসিরাবাদ ইউনিয়নের দাশেরকান্দি এলাকায় সরকারিভাবে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের কাজ শুরু হয়েছে। জমিও অধিগ্রহণ হয়েছে।

No comments:

Post a Comment