রংপুরের কাউনিয়ার চাঞ্চল্যকর জাপানি নাগরিক হোসিও কোনি (৬৬) হত্যা মামলার রায় কিছুক্ষণের মধ্যে দেয়া হবে। আসামিদের ইতোমধ্যে আদালতে নিয়ে আসা হয়েছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রংপুর স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক নরেশ চন্দ্র সরকার উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে এ রায় ঘোষণার দিনক্ষণ নির্ধারণ করেছিলেন। রায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে বলে আশা করছেন সরকার পক্ষের কৌঁসুলিরা। তবে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডটির পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে এর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয় বিএনপি, জামায়াত এবং তাদের ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফে। কিন্তু জেএমবির কিলিং লিডার মাসুদ রানা গ্রেফতার হয়ে স্বীকারোক্তি দিলে তদন্ত সঠিকপথে এগোতে থাকে। অব্যাহতি দেয়া হয় বিএনপি নেতাসহ বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হওয়া ২৫ জনকে। হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৭ মাসের মাথায় আজ রায় দেয়া হবে। এ হত্যাকাণ্ডের পর থেকে দৈনিক নয়া দিগন্ত অনুসন্ধানী সংবাদ পরিবেশন করে আসছে। রংপুর স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রথিশ চন্দ্র ভৌমিক নয়া দিগন্তকে জানান, চাঞ্ছল্যকর জাপানি নাগরিক হোসিও কোনি মামলায় দশ দফায় বাদি পক্ষে ৫৫ জন এবং আসামি পক্ষে একজন সাফাই সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ এবং ১৯ ফেব্রয়ারি উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটির রায়ের দিন আজ ধার্য করেছেন আদালত। পিপি জানান, বিদেশী নাগরিক হত্যা করতে পারলে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। তখন বাংলাদেশে ইসলামি হুকমাত কায়েম করা যাবে। জেএমরি এ ধরনের সাংগঠনিক নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতেই জেএমবির কিলিংমিশনের সদস্যরা হোসিও কোনিকে হত্যার পরিকল্পনা করে ও তাকে হত্যা করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। পুলিশ শক্তভাবে মামলাটি তদন্ত করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসে। আমরা আশা করি এ মামলার রায়ে জনগণের আশা সর্বোচ্চ শাস্তির প্রতিফলন হবে। আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আফতাব হোসেন ও আবুল হোসেন জানান, প্রসিকিউশন এবং সাক্ষীরা আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। আশা করি সব আসামি দায় থেকে মুক্তি পাবেন। আদালত সূত্র জানায়, এর আগে ১৪ ফেব্রুয়ারি অভিযুক্ত আসামি সাখাওয়াত হোসেনের পক্ষে স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মজিদ মণ্ডল সাফাই সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি আসামিদের জবানবন্দী ও সাক্ষীদের দেয়া বয়ান পড়ে শোনান বিচারক।
৬ ফেব্রুয়ারি মামলার চার্জশিট প্রদানকারী কর্মকর্তা কাউনিয়া থানার ওসি আব্দুল কাদির জিলানীর সাক্ষ্য ও জেরার মধ্য দিয়ে বাদি পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছিল। দশ দফায় মোট ৫৫ জন সাক্ষী আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। আদালত সূত্রে আরা জানা গেছে, গত বছর ১৫ নভেম্বর এ আদালতে ৭ উগ্রবাদীর বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ করেন বিচারক। ওই দিন ৪ জানুয়ারি এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এরপর ৯ দফায় সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এই মামলায় গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে তিনজন তাদের নিজস্ব আইনজীবী অ্যাডভোকেট আফতাব হোসেন এবং বাকি চারজনের জন্য স্টেট ডিফেন্স হিসেবে আবুল হোসেন ও আলাউদ্দিন আহাম্মেদকে নিয়োগ করা হয়। আদালত সূত্র জানায়, এর আগে গত বছর ১০ নভেম্বর একই আদালতের একই বিচারক মামলাটির চার্জ গঠনের দিন ধার্য করেছিলেন ১৫ নভেম্বর। আদেশ দিয়েছিলেন আসামি পক্ষে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী নিয়োগের। এর আগে গত ২৬ অক্টোবর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক হুমায়ুন কবির এক আদেশে স্পেশাল জজ আদালতে বিচারের জন্য মামলাটি স্থানান্তর করেন। ১৩ অক্টোবর রংপুর জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক আরিফুল এক আদেশে জজ ও দায়রা আদালতের বিচারকের কাছে মামলাটি স্থানান্তরের আদেশ দিয়েছিলেন। ৭ আগস্ট রংপুর জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক আরিফুর রহমানের আদালতে জাপানি নাগরিক হোসি কোনিও হত্যাকাণ্ডের ১০ মাস সাত দিন পর আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ করেন। এরা সবাই নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠন জমিয়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) কিলিং মিশনের লিডার ও সদস্য। চার্জশিটভুক্ত জেএমবি কিলিং স্কোয়াড লিডার পীরগাছার মাসুদ রানাকে গ্রেফতারের পর সে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়ে এ হত্যাকাণ্ডের সবকিছু উন্মোচন করে দিয়ে জানায় মাসুদ রানা নিজেই হোসিও কোনিকে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় অপর জেএমবি সদস্য বিজয়ও তার সাথে ছিল। পরে তারা হাসান নামে এক জেএমবি সদস্যের মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। এই মামলায় জেএমবি সদস্য বিজয়ের পূর্ণাঙ্গ নাম ঠিকানা না পাওয়ায় তাকে মামলা থেকে অব্যাহিত দেয় পুলিশ। এ ছাড়াও এ মামলায় দুই দফায় ২৫ দিনের রিমান্ডে থাকা হোসিও কোনির ব্যবসায়িক পার্টনার হুমায়ুন কবির হিরা, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন খান সোহেলের ছোট ভাই চট্টগাম মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতিকে গ্রেফতার করে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া রাশেদ উন নবী খান রুবেল, চাঁপাইনবাগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হওয়া ও রিমান্ডে নেয়া রংপুর মহানগর যুবদলের সদস্য রাজিব হাসান সুমন ওরফে মেরিল সুমন, যুবদলের সদস্য নওশাদ হোসেন রুবেল ওরফে কালা রুবেল এবং কাজল চন্দ্র বর্মণ ওরফে কাজলকে অব্যাহতি দেন আদালত। এ ছাড়া পুলিশ এ মামলায় গ্রেফতার করা দুই দফায় ২৫ দিনের রিমান্ডে থাকা হোসিও কোনির ব্যবসায়িক পার্টনার হুমায়ুন কবির হিরার স্ত্রী সুলতানা আখতার, শ্যালক তিতাস, রিকশাচালক মোন্নাফ, ভাড়াবাসার মালিক জাকারিয়া বালা, ঘাসের খামারের শ্রমিক আব্দুর রশিদ ও আবেদ আলী, রাজশাহী থেকে আটককৃত দুই ব্র্যাক ব্যাংক কর্মকর্তা ও পাবনা থেকে আটককৃত হীরার খালাতো ভাই সুইটকে অব্যাহতি দেয়। মামলার দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা ও চার্জশিট প্রদানকারী কাউনিয়া থানার ওসি আব্দুল কাদের জিলানী জানান, এ মামলায় বিভিন্ন সময় ২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে এখন পাঁচজন কারাগারে আছেন। তারা হচ্ছেন চার্জশিটভুক্ত গ্রেফতারকৃত আসামি উগ্রবাদী জঙ্গি জেএমবির উত্তরাঞ্চলের স্কোয়াড লিডার মাসুদ রানা, এছাহাক আলী, লিটন মিয়া, আবু সাঈদ, সাখাওয়াত হোসেন। চার্জশিটভুক্ত আটজনের মধ্যে রাজশাহীতে নজরুল ইসলাম ওরফে বাইক হাসান পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে এবং সাদ্দাম হোসেন ঢাকায় পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। আর অপর চার্জশিটভুক্ত রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহসান উল্লাহ আনছারী এখনো পলাতক আছে। এ ছাড়া বিজয়ের কোনো নাম-ঠিকানা ও ট্রেস না পাওয়ায় তাকে চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়। এ মামলার তদন্ত ও চার্জশিট দিতে পেরে একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে আমি গর্বিত। আশা করি, রায়ে সর্বোচ্চ শাস্তির বিষয়টিই উঠে আসবে। রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুখ বলেন, জাপানি নাগরিক হোসিও কোনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তের বিষয়টি পুলিশের একটি বিরাট সাকসেস। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মামলাটি তদন্ত করা হয়েছে। আদালত মামলাটির বিচারের দিন ধার্য করেছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের তথ্যউপাত্ত এভিডেন্স আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। আশা করি, এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির রায় আসবে। এর মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশের শ্রম ইতিহাস হয়ে থাকবে। প্রসঙ্গত ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টায় রংপুর মহানগরীর উপকণ্ঠ কাউনিয়া উপজেলার কাচু আলুটারী এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে খুন হন হোসি।
এ ঘটনায় কাউনিয়া থানার ওসি বাদি হয়ে তিন অজ্ঞাত ব্যক্তির নামে মামলা করে। ময়নাতদন্ত শেষে হোসিও কোনির লাশ রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে রাখা হয়। লাশ ঢাকা ও জাপানে নিয়ে যাওয়া নিয়ে নানা নাটকীয়তার পর কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে ১১ দিনের মাথায় ওই বছর ১২ অক্টোবর মধ্যরাতে মুন্সিপাড়া কবরস্থানে মুসলিম শরিয়াহ মোতাবেক দাফন করা হয়। হোসিও কোনি ২০১৫ সালের ১৪ মে এক বছরের ভিসা নিয়ে রংপুর আসেন এবং তার জাপানি বন্ধু জাকারিয়া বালার রংপুর মহানগরীর মুন্সিপাড়ার বাড়ির দোতালায় পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকতেন। ২০১৫ সালের ২৭ রমজান তিনি বাড়ি লাগোয়া কাদেরিয়া মসজিদের ঈমাম সিদ্দিক হোসেনের কাছে মুসলমান হয়েছিলেন। মুসলমান হওয়ার পর তার নাম রাখা হয়েছিল গোলাম কিবরিয়া। রংপুরে এসে তিনি নগরীর পানির ট্যাংক এলাকার রজব আলীর ছেলে হুমায়ুন কবির হীরাকে নিয়ে কাউনিয়ার কাচু আলুটারিতে শাহ আলমের দুই একর জমি লিজ নিয়ে কোয়েল ঘাসের খামার তৈরি করে তা দেখাশুনা করতেন। কয়েক বছর আগেও তিনি রংপুর এসে ওই বাড়িতে ছয় মাস পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকতেন বলেও জানায় পুলিশ। সূত্র জানায়, এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর সরকারি এবং প্রশাসনের লোকজন এর দায়ভার বিএনপি, জামায়াত ও শিবিরের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। গ্রেফতারও করা হয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন-নবী খান সোহেলের ছোট ভাই রংপুর মহানগর যুবদল নেতা ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাশেদ উন-নবী খান বিপ্লবসহ একাধিক যুবদলের নেতাকর্মীকে। পরে জেএমবির কিলিং মিশনের লিডার মাসুদ রানা গ্রেফতার হওয়ার পর তার স্বীকারোক্তি পেয়ে তারা তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। একে একে আসতে থাকে এই হত্যাকাণ্ডসহ এই অঞ্চলের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে জেএমবির মিশনের চাঞ্ছল্যকর তথ্য। পুলিশ অভিযুক্ত পাঁচ খুনিকে গ্রেফতারও করতে সক্ষম হয়। বাকি পলাতক রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আনছারুল্লাহকেও পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে।
No comments:
Post a Comment