আমি
বিশ্বাস করি, দেশভাগের পর এবং পাঁচের দশকে তদানীন্তন পূর্ববাংলা তথা
পূর্বপাকিস্তানের তরুণদের ওপর ইতিহাসের দাবি মেটাতেই একটা দায়িত্ব এসে যায়।
বলাবাহুল্য, সে দায়িত্ব মাতৃভাষাকে বাঁচানো শুধু নয়, তাকে রক্ষা করা,
সমৃদ্ধ করা, তার উৎকর্ষ বৃদ্ধি করা, বিস্তৃতি ঘটানো। যেহেতু, ততদিনে
উপমহাদেশ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, আমাদের স্বতন্ত্র একটি পথ খুঁজে নিতেই
হবে। সে জন্যই রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের কর্মক্ষেত্র কলকাতার অনুসরণ নয়, চাই
নতুন চরিত্রের বাংলা ভাষা, নবরীতির সাহিত্য, নবতর বৈশিষ্ট্যের শৈল্পিক
উপস্থাপনা। ইতিহাসের কী লীলা, পাকিস্তান সরকারই ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১-এর পরিসরে
এমন কিছু আধিপত্যবাদী অঘটন ঘটাতে থাকে,
যা আমাদের রাজনৈতিক অধিকারগুলোর
পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যে সংস্কৃতির ভিন্ন অধিকারের দাবিও ক্রমশ উচ্চকিত হতে
থাকে, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উপায় অনুসন্ধান করতে থাকে। একটি দেশের বা জাতির
প্রাপ্তির প্রত্যাশা সাধারণত হঠাৎ করে প্রকাশিত বা উচ্চারিত হয় না। তার
জন্য চাই নির্দিষ্ট পটভূমি, পক্ষ-প্রতিপক্ষের সংঘাত বা বৈরিতা, মানুষের
আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। আমরা পাকিস্তান আমলে অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি
দেখেছি, শাসকের শোষণ নীতি, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির নৈরাজ্য, বঞ্চনা,
উপেক্ষা, প্রভুত্ব। বাংলাদেশের প্রকৃতিই নির্ধারণ করে দিয়েছে আমাদের
চরিত্র- বর্ষায় নরম ও কাদা; গ্রীষ্মে কঠিন ও রুক্ষ। চরিত্রের এই দ্বৈত রূপ
কি প্রতি বছর বা নিয়মিত ঘটে? ঘটে, তবে অস্ত্ররূপে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য সময়ই
সময়ের অপেক্ষা করে। আমাদের জন্য মোক্ষম সেই সময়টা এলো ১৯৭১ সালে। উল্লেখ
করা নিষ্প্রয়োজন যে, ’৫২-র ভাষা আন্দোলনই আমাদের ভিত্তির চিত্রটা এঁকে দেয়।
১৯৭১ থেকে ২০১৬- সময়টা ৪৫ বছর। আমরা এখন ‘আমরা’ হয়ে উঠেছি দাবি করতে পারি।
দাবি করা আর প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। একসময় আমরা কলকাতার দিকে
তাকিয়ে থাকতাম, তারা কি বলে, কি লিখছে, কি উপহার দিচ্ছে; কিন্তু মোহ কাটতে
দেরি হয়নি, তারাই এখন অন্ধগলিতে আলো পাচ্ছে না, চোরাবালিতে পথ আটকে
যাচ্ছে। বাংলাদেশের সেই করুণ অবস্থা না হলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার তেমন
কিছুই নেই, কারণ আমরা এখনও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হয়ে আছি। প্রমাণের
জন্য বেশিদূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
শুধু পশ্চিমবঙ্গের টিভি চ্যানেলগুলোর
দিকে চোখ রাখলেই দেখব আমরা কিভাবে নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরে যাচ্ছি। আমাদের
তো গৌরবগাথা অজস , অসংখ্য! কিন্তু কোথায় তার সমার্থক প্রতিফলন? মুক্তিযুদ্ধ
মানেই কি ধর্ষণ আর হত্যা ও নির্যাতন? এক ১৯৭১ সালেই তো গর্ব করার মতো কত
গৌরবজনক ঘটনা ঘটেছে। আর ’৭১-এর পর আজ আমরা পৃথিবীতে মাথা উন্নত জাতি হয়েও
বিশেষ করে শিল্প-সাহিত্যেও পৃথিবীতে কেন যে দৃশ্যমানভাবে মাথা উঁচু করে
দেখাতে পারছি না, সেই দুঃখটাও অমোচনীয়। আমার ভাষা আন্দোলন আমাকে কী শেখাতে
চেয়েছিল? সোজা কথায়- এই হচ্ছি আমি, এই হচ্ছে আমার ভাষা, এটা আমার সংস্কৃতি।
আমরা কিছু দিন সেই পথে চলে পরিণত হওয়ার আগেই বিসর্জন দিতে শুরু করি আমার
অজস অর্জনকে। হেনরি কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ এখন অর্থনৈতিক প্রাচুর্যে
স্ফীত হয়ে উঠতে শুরু করেছে বলে অনেকেরই চক্ষুশূল, কিন্তু সাংস্কৃতিক,
বিশেষত সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় যে যথেষ্ট পশ্চাৎপদ, তা কি অস্বীকার
করা যায়? ১৯৫২ সালে বিনা অস্ত্রে ছাত্রজনতা যেভাবে পুলিশের সামনে এগিয়ে
গিয়েছিলেন, এখনই সময়, শুধু ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে, তেমনি এগিয়ে যাওয়ার এখনই
মোক্ষম সময়। নইলে পরিণতি কিন্তু জ্বী হুজুর! এই হলে ২১ই কিন্তু আবার ঘুরে
আসবে।
অনুলিখন : শুচি সৈয়দ
অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

No comments:
Post a Comment