Saturday, February 11, 2017

মনস্তাত্ত্বিক চাপের কৌশলে দু’দল

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মনস্তাত্ত্বিক চাপের কৌশল গ্রহণ করেছে দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল- আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এর মধ্যে ক্ষমতাসীনরা প্রায় প্রতিদিনই তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে এমন সব মন্তব্য করছে, যাতে মামলা-হামলায় জর্জরিত বিএনপির নেতাকর্মীদের মনোবল আরও ভেঙে যায়। শাসক দলের মতে, এ মুহূর্তে বিএনপির সাংগঠনিক ও আর্থিক অবস্থা খুবই নাজুক।
আছে শুধু জনসমর্থন ও বিপুলসংখ্যক ত্যাগী নেতাকর্মী। দলটি নিয়ে এমন নেতিবাচক মন্তব্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের হতাশা চরমে পৌঁছবে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে ক্ষমতাসীনরা পুরোদমে শুরু করেছে নির্বাচনী প্রচার। যাতে প্রয়োজনে সুবিধাজনক সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা যায়। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের এমন পরিকল্পনার কথা জেনে গেছে বিএনপি। তাই এ ফাঁদে পা দেবে না দলটি। কারণ বিএনপি এখনও তৃণমূল পুনর্গঠনের কাজ শেষ করতে পারেনি। এমন অবস্থায় নতুন নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) বর্জন বা গ্রহণ কোনোটিই না করে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠান ও সরকারের ওপর নানা কৌশলে চাপ অব্যাহত রাখা হচ্ছে। এতে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের সময় নিরপেক্ষ প্রশাসন নিশ্চিত করতে বাধ্য হবে ক্ষমতাসীনরা।
সুবিধাজনক সময়ে নির্বাচন চায় আওয়ামী লীগ
বিএনপিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাপে রাখার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে শাসক দল আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, বর্তমানে সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত বিএনপি। তাদের আর ঘুরে দাঁড়ানোর অবস্থা নেই। মামলা-হামলায় জর্জরিত দলটির নেতাকর্মীরা আর কোনো ঝুঁকিও নিতে চান না। এ অবস্থায় মনস্তাত্ত্বিক চাপ অব্যাহত রেখে তাদের সংগঠিত হওয়া ঠেকিয়ে সুবিধাজনক সময়ে জাতীয় নির্বাচন দিলে ফল অনুকূলে আসবে। সেজন্য আওয়ামী লীগ দলের ভেতরে-বাইরে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিএনপির অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে যে কোনো সময় আসতে পারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা। সরকার ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক সূত্র যুগান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছে। সরকার ও আওয়ামী লীগের মনস্তাত্ত্বিক চাপের এ কৌশল সম্পর্কে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, রাজনীতিতে চরম অবক্ষয় ঘটেছে- তারই প্রতিফলন এটা। তিনি বলেন, এটা রাজনীতি নয়, অপরাজনীতি। চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। শুক্রবার ঢাকায় এক স্মরণসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সময় খুব বেশি নেই, ইলেকশন হবে, রেফারি নিযুক্ত হয়ে গেছে। আমরা ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চাই না, এটা ভালো লাগে না। খেলে জিততে চাই। খেলতে চাই বলেই আজ আমরা প্রস্তুত হচ্ছি। বিএনপিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, খেলার জন্য প্রস্তুত হন। মাঠে জার্সি পরে নামেন। জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মোহাম্মদ নাসিম নিজেও তার নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তার এসব সভা-সমাবেশ ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দলের অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদেরও উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। তারা বিএনপির দুর্বল সাংগঠনিক ভিত্তির বিষয় জনগণের সামনে তুলে ধরছেন। সেই সঙ্গে প্রচার করছেন সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। মোহাম্মদ নাসিম ছাড়াও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ তার নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়ায় সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। করছেন উঠোন বৈঠকও। অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের অবস্থা প্রায় একই। তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। মাঠের প্রকৃত অবস্থা জানতে দলের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে কমপক্ষে তিনটি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা জরিপ চালাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রার্থী মনোনয়নে এসব জরিপ কাজে লাগানো হবে। দলের সর্বশেষ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারি দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, বিএনপি সংগঠিত হতে পারলে আগামী নির্বাচনে তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই যাতে কোনোভাবেই এ দলটি শক্তি সঞ্চয় করতে না পারে, সেজন্য অব্যাহত মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে সরকারি দল। এ কৌশল গ্রহণে সুদূরপ্রসারী সাফল্য প্রত্যাশা করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। তাদের মতে, মাঠ থেকে বিতাড়িত হয়েছে বিএনপি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন তাদের হাতছাড়া। মামলায় জর্জরিত বিএনপি নেতাকর্মীরা দলটির ঘরোয়া বৈঠকগুলোয়ও ভয়ে উপস্থিত হচ্ছেন না। সারা দেশেই সংগঠনের অবস্থা চরম নড়বড়ে। বিএনপির অনেক এবং থানা পর্যায়ের নেতা সরকারি দলের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করে চলছেন। ফলে সংগঠন রয়েছে নড়বড়ে অবস্থায়। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিভিন্ন মামলার বিচার কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। নিষ্পত্তি হলেই নির্বাচনে অযোগ্য হতে পারেন বিএনপি চেয়ারপারসনসহ একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। এ অবস্থায় নির্বাচনের কাজ গুছিয়ে উঠতে পারছে না দলটি। মামলা ও হয়রানির ভয়ে অধিকাংশ জেলা-উপজেলা এমনকি ঢাকায় নেতারা অর্থ খরচ করছেন না। বর্তমানে দলটির সব স্তরে বিরাজ করছে ভয়-আতংক। সরকার বিএনপির এ অবস্থাকেই জিইয়ে রাখতে চাচ্ছে। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে বিএনপি। এতে সরকারি দলের জয় আসার পাশাপাশি বিএনপিকে ভোট বর্জন থেকে দূরেও রাখতে পেরেছে আওয়ামী লীগ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও চার নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কৌশলে বিএনপিকে যুক্ত করা হয়েছে। যাতে তারা নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। ১৪ দলের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে সার্চ কমিটিতে নাম প্রস্তাব করে পছন্দের ব্যক্তিদের সিইসি ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ সম্পন্ন করেছে আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে সরকার ও দলটির নীতিনির্ধারকরা বেশ স্বস্তিবোধ করছেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রীরা বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপিকে আক্রমণ করে নিয়মিত কথা বলছেন। লক্ষ্য বিএনপির নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে দেয়া। শুক্রবার ঢাকায় যুবলীগের এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বেপরোয়া চালকের মতো বিএনপি এখন বেপরোয়া দল। আন্দোলন ও নির্বাচনে ভুল করে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি হতাশায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বেপরোয়া চালক যেমন দুর্ঘটনার কারণ, আমি জানি না বিএনপি আবার কখন কোন দুর্ঘটনা রাজনীতিতে ঘটিয়ে বসে। এর আগে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ওবায়দুল কাদের বলেন, ফের নির্বাচন বর্জন করলে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাওয়ার শংকা থেকেই বিএনপি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে। তিনি বলেন, বিএনপির মধ্যে নেগেটিভ বিষয় চলে এসেছে। মানি না, মানব না- এই একটি মানসিকতায় তারা ভুগছে। এটা থেকে তারা বের হতে পারছে না। গত নির্বাচনে অংশ না নিয়ে দলকে সংকুচিত ও দুর্বল করেছে। এর আগে ৩ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের তাড়াশে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেন, রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে ভবিষ্যতে বিএনপিকে বাটি চালান দিয়েও পাওয়া যাবে না। ওই দিন মুন্সীগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সার্চ কমিটি নিয়ে বিএনপি নিজেদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিএনপি এখন নিজেরাই নিজেদের বিশ্বাস করে না। তারা একে অন্যকে সন্দেহ করছে। শুক্রবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনে ফেরেশতা পাঠালেও বিএনপি তার মধ্যে দলীয় গন্ধ খুঁজবে। বিএনপির প্রতিক্রিয়া দেখলে মনে হয়, আল্লাহ পাক ফেরেশতা পাঠালেও সেখানে তারা রাজনৈতিক গন্ধ খুঁজবে। আল্লাহ ইবলিশ শয়তানকে খুশি করতে পারেননি, বিএনপিকেও খুশি করতে পারবেন না। এর আগে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, রাজনীতির মাঠ ছেড়ে বিএনপি এখন শুধু মিডিয়ার সামনে হুংকার দিয়ে বেড়াচ্ছে। মিডিয়া না থাকলে বিএনপিকে খুঁজে পাওয়া যেত না। কর্মসূচি ঘোষণা করার পরে বিএনপির কোনো নেতাকর্মীকে রাজপথে দেখা যায় না। মিডিয়ার সামনে তারা শুধু হুংকারই ছাড়ে। কিন্তু তাদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। শাসক দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, বিএনপির প্রতি জনগণের একটা বড় অংশের সমর্থন থাকলেও তাদের দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থা, আন্দোলনে বারবার ব্যর্থ হওয়ায় নেতাকর্মীরা হতাশ। মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে এ হতাশাটাই তারা নির্বাচন অবধি জিইয়ে রাখতে চান। যাতে বিএনপি কোনোভাবেই সংগঠিত হয়ে লড়াই করতে না পারে।
সরকারের ফাঁদে পা দেবে না বিএনপি
সরকার চাইছে বিএনপিকে আরও বেকায়দায় ফেলে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে। সে ক্ষেত্রে মেয়াদপূর্তির আগেই নির্বাচন দেয়ার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করা হতে পারে। রাজনীতির এরকম কূটকৌশলের অংশ হিসেবে সরকারি দল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের মামলার বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত ত্বরান্বিত করতে চায়। সরকারের এ গোপন মনোভাব বিএনপির শীর্ষমহলও জেনে গেছে। এ অবস্থায় করণীয় ঠিক করতে সম্প্রতি দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েক নেতা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। সেখানে তারা একমত হন, সরকার যতই ফাঁদ পাতুক- চাপের মুখে হলেও তাতে বিএনপি পা দেবে না। কারণ, বিএনপি জানে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হলে সরকারি দল তাদের একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে প্রহসনের নির্বাচন করবে। আর শেষ পর্যন্ত সে রকম কিছু হলে বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও বিএনপি ভোটের প্রকৃত ফল ঘরে তুলতে পারবে না। এ অবস্থায় সংকট নিরসনে প্রশাসন নিরপেক্ষ করার বিশেষ কৌশল গ্রহণসহ নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার গঠন করতে সরকারের ওপর নানামুখী চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রাখবে। যুগান্তরকে এমন তথ্য জানিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন সিনিয়র নেতা। শুক্রবার তারা যুগান্তরকে বলেন, তাদের জানামতে সরকার এখন নির্বাচন দেয়ার ক্ষেত্রে দুটি কৌশলকে সামনে রেখে এগোচ্ছে। প্রথমত, মেয়াদ শেষেই যথা সময়ে নির্বাচন দেয়া। কিন্তু এক্ষেত্রে দলটির অভ্যন্তরীণ বেপরোয়া কোন্দল, খুনোখুনি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার মনে করছে, যত সময়ক্ষেপণ হবে দলের এ সংকট তত জটিল হবে, যা আগামী নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যদি সরকারকে কোনো কারণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে হাঁটতে হয়, সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। সেজন্য এ ধরনের কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সরকার দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে আরও বেকায়দায় ফেলে কিছুটা সময় এগিয়ে এনে নির্বাচন দিতে চায়। এজন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সিনিয়র নেতাদের আইনি কাঠামোর মধ্যে দ্রুত সাজা দিয়ে অথবা একেবারে কারাগারের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দলটির চরম দুঃসময়ে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে দিতে পারে। বিএনপি নেতারা বলেন, সে কারণে সরকার মুখে যতই না না বলুক আগেভাগে নির্বাচনী জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিএনপি নেতাদের আশংকা, সরকার নির্বাচনের আগে বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টাও করবে। সে ধরনের নানা আলামত তারা এখন দেখতে পাচ্ছেন। এমন সংকট কিভাবে মোকাবেলা করবেন জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় যুগান্তরকে বলেন, সরকার বিএনপিকে নিয়ে যতই ষড়যন্ত্র করুক, কোনো লাভ হবে না। এ দলের প্রাণ হচ্ছে দেশের মানুষ ও তৃণমূল নেতাকর্মী। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা দল ও দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বিগত সময়েও এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়াও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে থাকলেও তিনি আমাদের মন থেকে দূরে নন। তার সঙ্গেও নেতাকর্মীদের প্রতিনিয়ত যোগাযোগ আছে। তাই সরকার যতই ফাঁদ পাতুক না কেন সে ফাঁদে বিএনপি পা দেবে না। প্রশাসন নিরপেক্ষ করাসহ নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার গঠনের ওপর বিএনপি সবচেয়ে বেশি জোর দেবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে বিপুল জনসমর্থন ছাড়াও সাংগঠনিক শক্তি, প্রয়োজনীয় নির্বাচনী ব্যয়ের সামর্থ্য থাকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিএনপির বিপুল জনসমর্থন থাকলেও তাদের সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী ব্যয়ের প্রয়োজনীয় অর্থ বর্তমানে নেই। ত্যাগী নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এখনও যেটুকু মনোবল আছে তাও সরকারের কৌশলের কাছে পরাস্ত হতে বসেছে। এ অবস্থায় বিএনপিকে ভবিষ্যতে সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখতে হলে রাজনৈতিকভাবে কৌশলী হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনীতি হল বুদ্ধির খেলা। সে খেলায় আওয়ামী লীগ এখন এগিয়ে, পিছিয়ে আছে বিএনপি। তাই বিএনপিকে নির্বাচনের ফসল ভালোভাবে ঘরে তুলতে হলে সবার আগে যারা নির্বাচন পরিচালনা করবেন তাদের নিরপেক্ষ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই পদক্ষেপ কী হবে তা বিএনপির নীতিনির্ধারক মহলকেই ঠিক করতে হবে। তবে কৌশলটি অবশ্যই রক্তপাতহীন পজিটিভ হতে হবে, থাকতে হবে আশান্বিত হওয়ার মতো অভাবনীয় চমক। আর স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত সঙ্গ অবশ্যই ছাড়তে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে সেরকমের একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এখন প্রশাসনের যারা রয়েছেন, তারাও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসনের এসব পদে নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের বসাতে হবে। আর প্রশাসন পরিচালনার জন্য নিরপেক্ষ একটি সরকারও প্রয়োজন। কারণ নির্বাচনকালীন সময়ে কমিশনের অধীনে প্রশাসন থাকলেও তাদের কথা শুনবে না। প্রশাসন সরকারের কথাই শুনতে বাধ্য হয়। এই ক্ষেত্রে বিএনপিকে নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে জোরালোভাবে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দিলেই সরকার মেনে নেবে- এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। মানাতে গেলে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। সেটা তখনই সম্ভব, যখন সরকার চাপ অনুভব করবে। আর চাপ অনুভব করাতে না পারলে সরকারি দল অওয়ামী লীগ সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করে ফের ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করবে। ক্ষমতার রাজনীতিতে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। বিশ্বজুড়ে কেউ কাউকে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা আসার সুযোগ করে দেয় না। আর আওয়ামী লীগ ভালো করেই জানে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের কী হবে। কিন্তু বিএনপি যদি মনে করে, নির্বাচনে জিতে আসার মতো বিপুল জনসমর্থন আছে। তাই ভোট হলেই তারা ক্ষমতায় চলে যাবে। সে পরিস্থিতি এখন মনে হয় নেই। তাদের মতে, যারা নির্বাচন পরিচালনা করবেন তাদের নিরপেক্ষ করতে এখন থেকেই বিএনপিকে কৌশলী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে নির্বাচনকালীন সরকারে অংশীদারিত্ব পেতে প্রবল জনমত সৃষ্টির পদক্ষেপ নেয়া। কেননা নির্বাচনকালীন প্রশাসন কতটুকু নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে তা নির্ভর করবে নির্বাচনকালীন চেহারার ওপর। নির্বাচন কমিশন কিছুই করতে পারবে না। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় এক অনুষ্ঠানে বিএনপির প্রতি পরামর্শ রেখে গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়াকে সাহস নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে। আর কত দিন ঘোমটা দিয়ে বাড়িতে বসে থাকবেন? বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসুন। ১৪ হাজার লোক জেলে আছে, আরও হয়তো ২০ হাজার লোক জেলে যাবে- একটু চেষ্টা করে দেখুন না।
জনগণ কিন্তু আপনাদের একেবারে ফেলে দেয়নি। আজকে সুষ্ঠু রাজনীতি ও সুষ্ঠু নির্বাচন জন্য কেবল বিএনপি নয়, সমগ্র বিরোধী দলকে এক হতে হবে। এদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েক নেতা যুগান্তরকে জানান, বিএনপি চায় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পরীক্ষা দিতে। কিন্তু বিদ্যমান অবস্থায় নির্বাচন যখনই হোক না কেন- অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কেননা, নির্বাচন পরিচালনা করে মূলত প্রশাসন। সেই প্রশাসনেরই পুরোটাই এখন আওয়ামী সরকারের দখলে। শুধু এক ধাপ নয়, তিন চার ধাপে সরকারি দল সমর্থক কর্মকর্তাদের দিয়ে শক্তিশালী প্রশাসনিক স্তর সাজানো হয়েছে। সে ক্ষেত্রে যদি সব ডিসি এসপি ইউএনও এবং ওসিকে সরানো হয় তাহলেও প্রশাসনকে নিরপেক্ষ সম্ভব হবে না। উপরন্তু সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। সে সময়কার কেবিনেটও হবে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা অনুযায়ী। এ ছাড়াও নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়ে অবশিষ্ট যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হওয়া দূরের কথা উল্টো দলীয়করণের মাপকাঠিতে রকিবউদ্দীন কমিশনের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে বর্তমান কমিশন। বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এ অবস্থায় বিএনপির সামনে শেষ ভরসা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি উত্থাপন। বিএনপির নীতিনির্ধারক মহল মনে করেন, সহায়ক সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠিত করে যদি মন্দের ভালো মানেরও নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা না যায় তাহলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়া তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। বিএনপি নেতারা মনে করেন, এ অবস্থায় মাঠে নামতে না পারলেও সরকার ও নতুন নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে বিএনপি। একই সঙ্গে প্রশাসনকে এখন থেকে কিভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যায় তা নিয়ে কৌশল নির্ধারণে তারা কাজ করছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সিইসি নিয়োগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তার পরও আমরা নতুন কমিশনের কিছু কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করব। ছোট ছোট কিছু নির্বাচন আছে সামনে। এগুলো দেখব। তবে জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার। সে বিষয়টিও আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এ নিয়ে আমাদের চেয়ারপারসন শিগগিরই একটি রূপরেখা দেবেন। অপর দিকে, এ প্রসঙ্গে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আরও বলেন, সিইসির কথা একটি থানার ওসিও শোনেন না। তারা শোনেন স্থানীয় এমপি এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কথা। সুতরাং সিইসি যত নিরপেক্ষ নির্বাচনের চেষ্টাই করুন না কেন, সহায়ক সরকারের প্রধান যদি দলনিরপেক্ষ না হন, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন কখনোই আশা করা যায় না। এজন্য আমাদের মূল লক্ষ্য নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা। ক্ষমতাসীন সরকারেরও ভয় সেখানেই। তাই তারা আগেভাগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছে।

No comments:

Post a Comment