Monday, February 27, 2017

পরামর্শের বিধান কেন সংশোধন নয়

উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পরামর্শের বিধান সংশোধনের প্রশ্নে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। রুলে অতিরিক্তসহ অন্যান্য বিচারক নিয়োগের বিষয়টিও যুক্ত করতে সংবিধানের ৪৮(৩)অনুচ্ছেদে প্রয়োজনী সংশোধনী আনার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এছাড়া উচ্চ ও নিন্ম আদালতের বিচারক নিয়োগ বদলি পদোন্নতির বিধান সংবলিত সংবিধানের ৫টি অনুচ্ছেদের (৯৫(২)(খ), ৯৮, ১১৫, ১১৬ ও ১১৬(ক)) সব সংশোধনী কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতেও রুল দেয়া হয়েছে। এসব অনুচ্ছেদে বিচারক নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও শৃংখলা বিধানের ক্ষমতা আগে সুপ্রিমকোর্টের কাছে থাকলেও পরে তা সংশোধন করে রাষ্ট্রপতির হাতে নেয়া হয়। জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রোববার বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। চার সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়। প্রধান বিচারপতির ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যই এ রিট করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান চালিয়ে নেয়াটাই বড় কথা। বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে বর্তমানে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে তাতে বিচার বিভাগের মর্যাদা সমুন্নত আছে বলে মনে করি। তিনি বলেন, আইন তৈরি করার ক্ষমতা শুধু জাতীয় সংসদের। অন্য কেউ আইন করতে পারে না। তবে আইন যদি সংবিধানপরিপন্থী হয় তবে আদালত তা বাতিল করতে পারেন। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন : তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শদান করিয়াছেন কিনা এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোনো আদালত সেই সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।’ এ প্রসঙ্গে রিটকারী ইউনুছ আলী আকন্দ যুগান্তরকে বলেন, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের কারণে প্রধান বিচারপতি ছাড়া অন্য কোনো বিচারপতির নিয়োগ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক দলের প্রধান, তাই দলীয় বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগ হচ্ছে। অথচ সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা আছে। এখন সর্বোচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে যদি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে নিয়োগ দিতে হয়, সেক্ষেত্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকে না। বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করাটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ বিধান বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ মামলার (মাসদার হোসেন মামলা) রায়েরও পরিপন্থী। তিনি আরও বলেন, মূল রিট আবেদনে আমি ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ সংশোধনের দাবি জানিয়েছি। ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ব্যতীত- এই ‘ব্যতীতের’ মধ্যে অন্যান্য বিচারক নিয়োগের বিষয়টিও যুক্ত করার দাবি জানিয়েছি। যাতে উচ্চ আদালতের অন্যান্য বিচারপতিও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিতে পারেন। উচ্চ আদালতের বিচারপতি, অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যাতে রাষ্ট্রপতির কোনো আলোচনার প্রয়োজন না হয় সেই বিধান যোগ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের পাশাপাশি ৯৫(২), ৯৮, ১১৫, ১১৬ এবং ১১৬(ক) এর বৈধতা নিয়েও রুল জারি করা হয়েছে। এসব অনুচ্ছেদের সব সংশোধনী কেন সংবিধানের ২২ ও ১০৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়েছেন উচ্চ আদালত। বিচারাঙ্গনে ‘দ্বৈত শাসনের’ বিধান সম্বলিত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বিষয়টি প্রধান বিচারপতি সামনে আনার পর নানামুখী আলোচনার মধ্যে সংবিধানের পাঁচটি অনুচ্ছেদে দুই দফায় আনা সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. ইউনুছ আলী আকন্দ গত ৩ নভেম্বর এই রিট আবেদন করেন। বেশ কয়েক দিন এই রিট আবেদনটির ওপর শুনানি নিয়ে গত ২০ ফেব্রুয়ারি আদেশের দিন ধার্য করেন হাইকোর্ট। সে অনুযায়ী রোববার ওই রুল জারি করা হয়। জানা গেছে, বর্তমান সংবিধানের ৯৫-এর ২(খ) ধারায় বলা আছে, বাংলাদেশে ন্যূনতম ১০ বছর কোনো বিচার বিভাগীয় পদে দায়িত্ব পালন না করলে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক হওয়ার যোগ্য হওয়া যাবে না। বাহাত্তরের সংবিধানে এ অনুচ্ছেদে জেলা জজদের মধ্য থেকে বিচারপতি নিয়োগের জন্য জেলা জজ হিসেবে তিন বছরের দায়িত্ব পালনের বিধান ছিল। কিন্তু পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বাহাত্তরের সেই বিধান বাতিল করা হয়। ২০১১ সালে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করা হলেও ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে পঞ্চম সংশোধনীর বিধানটিই বহাল রাখা আছে। বর্তমান সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সংবিধানের ৯৪ অনুচ্ছেদের বিধানাবলী সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতির নিকট সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিভাগের বিচারক-সংখ্যা সাময়িকভাবে বৃদ্ধি করা উচিত বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন এক বা একাধিক ব্যক্তিকে অনধিক দুই বৎসরের জন্য অতিরিক্ত বিচারক নিযুক্ত করিতে পারিবেন। কিংবা তিনি উপযুক্ত বিবেচনা করিলে হাইকোর্ট বিভাগের কোনো বিচারককে যে কোনো অস্থায়ী মেয়াদের জন্য আপিল বিভাগের আসন গ্রহণের ব্যবস্থা করিতে পারিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, অতিরিক্ত বিচারকরূপে নিযুক্ত (কোনো ব্যক্তিকে এই সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের অধীন বিচারকরূপে নিযুক্ত) হইতে কিংবা বর্তমান অনুচ্ছেদের অধীন আরও এক মেয়াদের জন্য অতিরিক্ত বিচারকরূপে নিযুক্ত হইতে বর্তমান অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই নিবৃত্ত করিবে না।’ এ ব্যাপারে রিটকারী আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ বলেন, বাহাত্তরের মূল সংবিধানে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করে বিচারপতি নিয়োগের বিধান ছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে নেয়া হয়। বর্তমানে সেই বিধানই বিদ্যমান। সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদের ব্যাপারে রিটকারী বলেন, বাহাত্তরের সংবিধানে বলা ছিল সুপ্রিমকোর্টের সুপারিশ ছাড়া নিন্ম আদালতের জেলা জজ নিয়োগ দেয়া যাবে না। অন্যান্য পদে পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে আলোচনা করে নিয়োগ দিতে হবে এবং কমপক্ষে সাত বছর বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা না থাকলে তাকে জেলা জজ হিসেবে নিয়োগ দেয়া যাবে না। কিন্তু এসব বিধান বাতিল করে ১৯৭৪ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে নেয়া হয়। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের ব্যাপারে রিটকারী বলেন, এই বিধানে বলা হয়েছে বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরি) ও শৃংখলাবিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হবে। বাহাত্তরের সংবিধানে এসব বিষয় সরাসরি সুপ্রিমকোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ’৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি ফিরিয়ে আনে। কিন্তু ১১৬ অনুচ্ছেদে বাহাত্তরের বিধান আর ফেরেনি। অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি, বদলির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতেই থেকে গেছে। এ ছাড়া ১১৬(ক) অনুচ্ছেদটিও বাহাত্তরের সংবিধানে ছিল না।
উল্লেখ্য, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে গত বছরের ৩১ অক্টোবর এক বাণীতে প্রধান বিচারপতি ১১৬ অনুচ্ছেদকে বিচার বিভাগের ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদটি পুনঃপ্রবর্তন করা ‘সময়ের দাবি’ বলে মত দেন প্রধান বিচারপতি। এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক পরদিন সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতির প্রস্তাব ‘স্ববিরোধী’ এবং ১১৬ অনুচ্ছেদ বদলানোর ‘দরকার নেই’।

No comments:

Post a Comment