Wednesday, February 22, 2017

রানার পরিকল্পনায় খুন অভিজিৎসহ ৬ ব্লগার

মুক্তমান ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ড. অভিজিৎ রায়সহ কমপক্ষে ৬ ব্লগার হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী দুর্ধর্ষ জঙ্গি রেদোয়ানুল আজাদ রানা। সে নিষিদ্ধ সংগঠন আনসারুল্লা বাংলা টিমের (এবিটি) স্লিপার সেলের সমন্বয়ক। ব্লগার রাজীব হায়দার শোভন হত্যা মামলার প্রধান আসামি রানা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। রানা ও তার সহযোগী আশরাফকে আসামি করে সন্ত্রাসবিরাধী আইনে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা হয়েছে। ওই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে মঙ্গলবার তাদেরকে ঢাকা মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত শুনানি শেষে তাদের পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জানতে চাইলে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের (সিটি) উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রেদোয়ানুল আজাদ রানা জানিয়েছে সে এক দালালের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করে গাজীপুরের ঠিকানা ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরি করে।
আমরা ওই দালালকে শনাক্ত করে আটকের চেষ্টা করছি। রানার পাসপোর্ট জালিয়াতির সঙ্গে পাসপোর্ট অধিদফতরের কেউ জড়িত কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনও আমরা কোনো তথ্য পাইনি। রানাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এখন তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটি ইউনিটের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, ব্লগার হত্যা ও হত্যা পরিকল্পনার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড রানা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রানা ব্লগার রাজীব হায়দার শোভনকে কুপিয়ে হত্যার বিষয়ে স্বীকার করেছে। রাজিব খুন হওয়ার পর রানা চলে যায় আফগানিস্তানে। পরে পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ঘুরে ২০১৫ সালে দেশে ফিরে আসে। ওই বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি তার পরিকল্পনায় ড. অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয়। একই বছর ৩০ মার্চ তেজগাঁওয়ে ব্লগার ওয়াসিকুর রহমান বাবু ও ১২ মে সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিল রানা। এ ছাড়া ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমবাগান এলাকায় কুপিয়ে ও গলা কেটে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ছাত্র ব্লগার আশরাফুল ইসলাম, ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল বুয়েটের কবি নজরুল ইসলাম ছাত্রাবাসে ব্লগার আরিফ রায়হান দ্বীপকে কুপিয়ে হত্যা এবং ২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ব্লগার জাফর মুন্সিকে হত্যার পরিকল্পনার কথাও স্বীকার করেছে রানা। ২০১৩ সালে ১৩ জানুয়ারি উত্তরায় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন, ৭ মার্চ মিরপুরের পুরবী সিনেমা হলের কাছে ব্লগার সানিউর রহমান, জুনে এলিফ্যান্ট রোড গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও ব্লগার রাকিব আল মামুন ও ১১ আগস্ট বুয়েট ছাত্র তন্ময় আহমেদকে হত্যার উদ্দেশ্যে যে হামলা হয় তারও পরিকল্পনাকারী রানা। সংশ্লিষ্টরা জানান, রানা মূলত এবিটির স্লিপার সেলের সমন্বয়ক। প্রতি সেলে চার থেকে ৫ জন করে থাকে। তারা কাট আউট পদ্ধতিতে কাজ করে।
সিটি সূত্র আরও জানায়, রানার গ্রামের বাড়ি ফেনীর দাগনভূঞায় উত্তর জয়লষ্করপুরে। তার বাবার নাম আবুল কালাম আজাদ। মায়ের নাম মমতাজ বেগম। ঢাকার ভাটারায় সে পরিবারের সঙ্গে থাকত। সে ঢাকার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি এবং নটর ডেম কলেজ থেকে ২০০৭ সালে এইচএসসি পাস করে। এরপর সে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। নর্থসাউথে পড়ার সময় সে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। এবিটি’র আধ্যাত্মিক নেতা মাওলানা জসিম উদ্দিন রাহমানীর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিল সে। রানার মাধ্যমে নর্থ সাউথের অনেক শিক্ষার্থী জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে। সে তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষ। মালয়েশিয়াতে পলাতক থাকা অবস্থায়ও সে এবিটির স্লিপার সেলের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে। সিটি ইউনিট সূত্র জানায়, রানার বাড়ি ফেনীর দাগনভূঞা থানায় হলেও এক দালালের মাধ্যমে গাজীপুরের মিথ্যা ঠিকানা দিয়ে সে পাসপোর্ট তৈরি করে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যায়। সেখানে অপর নিউ জেএমবির সদস্য জুন্নুন শিকদারের মাধ্যমে আইএসের প্রতি আকৃষ্ট হয় সে। রানা তার মাধ্যমে সিরিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। রানা ও তার অপর সহযোগী আশরাফ ফিলিপাইনে প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়ার জন্য আবু সায়েফ গ্রুপের সঙ্গেও যোগাযোগ করে।
রানাকে গ্রামের কেউই চেনে না : দাগনভূঞা প্রতিনিধি জানান, রেদোয়ানুল আজাদ রানাকে তার গ্রামের কেউই চেনেন না। এমনকি তার পরিবারের কেউ বাড়িতে অবস্থান করেন না। রানার বাবা গোয়েন্দা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সাবেক ওসি মৃত আবুল কালাম আজাদ চাকরির সুবাদে রানা ঢাকাতেই লেখাপড়া করেছে। রানার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সুনসান নীরবতা। বাড়ির লোকজন রানার পরিবার কোথায় থাকে তা জানে না বলে জানান। রানাদের কালের সাক্ষী হয়ে আছে একটি চৌচালা আধাপাকা টিনের ঘর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার বাড়ির জনৈক মুরব্বি জানান, রানার অপকর্মের কারণে আমাদের বাড়ির ঐতিহ্য নষ্ট হয়েছে। পুলিশ ও আইনশৃংখলার বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন প্রায়ই খোঁজখবর নিতে আসে। তাতে আমরা বিব্রত। কবে রানা ও তার পরিবার বাড়ি এসেছে সঠিক সাল-তারিখ বলতে পারব না। তিনি জানান, রানার বাবা আবুল কালাম আজাদ বিগত ১০ বছর আগে মারা গেছেন। একই বাড়ির দিদারুল হক জানান, ৩০-৩৫ বছর আগে রানার পরিবার বাড়ি ছাড়ে, আমি তখন ছোট ছিলাম। তাকে আমি কখনও দেখিনি। তাদের পৈতৃক জরাজীর্ণ ঘর দেখিয়ে বলেন, এটিই রানাদের বসতঘর।

No comments:

Post a Comment