ফেব্রুয়ারি
মানে বুকের মধ্যে একটি বড় ধাক্কা। একটি চমৎকার অভিঘাত। অর্জনের একটি সাহসী
জনপথ, যা একত্রিত করেছিল, সংঘবদ্ধ করেছিল, উত্থিত করেছিল সংগ্রামের শপথ।
বায়ান্ন’র সেই শপথের বীজ একাত্তরে যে বৃক্ষের জন্ম দিল তা ছিল এক চেতনার
রক্তময় অধিকার-যাত্রার স্থায়ী ফল। আমাদের একুশ, আমাদের বায়ান্ন আজ
স্বাধীনতার এতগুলো বছর পার করে সংগ্রামকে উৎসবে, রক্তকে পুষ্পে কিংবা
ভাষাকে ভালোবাসায় রূপান্তরিত করেছে। ফেব্রুয়ারি এলেই তাই ঝাঁপ দেয় জল, বাঁক
নেয় হাওয়া, মনের প্রশ্ন ছোটে উত্তর থেকে দক্ষিণে। ভাষা নিয়ে নানান কথা
আছে, বই নিয়ে মতের পাশে পথ ছুটছে, আর বাঙালির চেতনা নিয়ে অগ্নিময় সংশয় তো
বুকে দাপায়!
যদি প্রথমে ভাষার প্রশ্নে আসি, তবে বাংলা ভাষার যে রূপ আমরা
এখন প্রত্যক্ষ করছি তাতে কি কোনো ভাটার টান আছে? আছে কি কোনো ভৌগোলিক,
রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক চাপ? বিশ্বায়নের প্রবল প্রবাহে তার কি অদূর
ভবিষ্যতে দিশেহারা হওয়ার কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে? একে-একে রশি ধরে
এগোলে, কাদামাটি শক্ত করে পা বাড়ালে দেখি যে, বাংলা ভাষার সীমারেখা নিজ
মানচিত্র অতিক্রম করে গোলার্ধের প্রান্ত স্পর্শ করতে চাচ্ছে। কী রাজনৈতিক,
কী অর্থনৈতিক- হট্টগোল অথবা দিনযাপনে ভাষা তার পোশাকের আকার সামান্য পাল্টে
নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তন্তুচরিত্র অমলিন থেকে যাচ্ছে। প্রকৃতি ও প্রাণে
বাংলা আজ তথ্য-সংস্কৃতির অংশ কিংবা বিন্দু-বিজ্ঞানের সহচর হওয়ার জন্য
উদগ্রীব। পৃথিবীর ভাষা হওয়ার যাবতীয় মানদণ্ড বাংলায় বর্তমান। পাঠের কথায়
যদি আসি, জোরেশোরে মুদ্রণ মাধ্যমের সঙ্গে পাল্লা চলছে শব্দ-তরঙ্গের নানান
উপকরণের। বই কি থাকবে? থাকবে। বইয়ের বিকল্প একমাত্র বই অন্তত আরও শত বছর।
তবে পাঠ-মাধ্যমের অন্যান্য অংশ দ্রুত তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করবে। এড়ানোর দায়
খুব একটা সহজ নয়! বিজ্ঞান মানুষকে অবিরাম তাড়া করছে। আমাদের একুশের
বইমেলা। মাসব্যাপী বাংলা একাডেমি চত্বর ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলছে। এগারো
মাসের প্রস্তুতি যেন এই এক মাসে এসে উগড়ে দিচ্ছে। টইটম্বুর ময়দানে বইয়ের
দোকানের সাজসজ্জা, ক্রেতার দর্শন, সর্বোপরি পাঠকের মনোজগতে লেখকের সরব
উপস্থিতি নিঃসন্দেহে ধনাত্মক। নানা আপ্তবাক্য দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে জ্ঞান ও
গৌরবের গতি। ইট-কাঠ-কাপড়-রং-ধাতু সবাই যেন বইয়ের গুণগানের জন্য নিজেদের
উৎসর্গ করেছে। প্রকাশক তার পসরা সাজিয়ে যেমন ক্রেতার মনোযোগ চাচ্ছেন, লেখকও
তেমন তার সৃষ্টি বিনিময় করে আশা করছেন ভালোবাসার। মানে এই দাঁড়াল- বইমেলা
হচ্ছে লেখক-প্রকাশক-পাঠকের যৌথ কর্ম-সমবায়। বাঙালির চেতনার বিষয়টি খুব একটা
আবেগের, বড় একটা সম্ভ্রমের এবং উঁচু একটা ঐতিহ্যের সেতো।
মানুষ হওয়ার
পরিক্রমায় বাঙালি তার আবেগের অবস্থানে প্রায়শ দিকভ্রষ্ট হয়। সম্ভ্রম- সে তো
তৈরি করা একটা আবরণ, যাতে দাগ বসতে দেয়া মানে বিসর্জনের কাঠিতে হাত দেয়া।
ঐতিহ্য- যেন মূলে ও পত্রে যোগসূত্র সংরক্ষণ। বাঙালি তাই তার জাতিসত্তার
বিকাশে পরিবর্ধনে এবং অবস্থানে মৌলিক যে প্রতিক্রিয়াটি ব্যক্ত করে, তা
কেবলমাত্রই বাংলাভাষাকেন্দ্রিক। ভাষা তার প্রাণ। ভাষা তার গৌরবের সার্বজনীন
প্রকাশ। আমৃত্যু অহংকার। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর এসেও আমরা যেন আমাদের
জাতিসত্তা নিয়ে কেমন সংশয়ে জড়িয়ে আছি। বাঙালির টিকে থাকার, অস্তিত্বের
অন্যতম হাতিয়ার ভাষা। তাই তার ভাষা সমৃদ্ধির জন্য চাই অতীতের দাগ এবং
ভবিষ্যতের পরাগের যুগল অধিবাস। বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর অন্যতম ভাষার পাশে
দাঁড় করানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সাহিত্যকেও ছড়িয়ে দিতে হবে ভিন্ন ভাষার
মানুষের দুয়ারে। তার জন্য চাই প্রচুর অনুবাদ। লেখক-প্রকাশক-পাঠকের হয়ে এ
ফেব্রুয়ারিতে তাই দাবি জানাই স্বতন্ত্র অনুবাদ একাডেমির। বাংলা ভাষার
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো অনুবাদ করে পৃথিবীময় ছড়িয়ে দেয়ার কাজ আজ এতই জরুরি
যে, তার সঙ্গে আমাদের অস্তিত্ব জড়িয়ে আছে। দীর্ঘস্থায়ী এবং সুষ্ঠু
পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলা ভাষার রত্নভাণ্ডারের খোঁজ পৃথিবীর মানুষকে দেয়ার
প্রতিজ্ঞাই হোক এ বছর বইমেলার দাবি। অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

No comments:
Post a Comment