Tuesday, February 14, 2017

অস্বাভাবিক আচরণেই ধরা পড়ে ঘাতক

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা বছিলা খালে প্রায়ই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত কিশোর রাশেদ খান রাসেলের ঘাতক সাজিদ আহমেদ রাহাত। দুর্গন্ধ সত্ত্বেও প্রায় দিনই সে খালের পাড়ে বসে তাকিয়ে থাকত এক দৃষ্টিতে। রাহাতের এই অস্বাভাবিক আচরণই পুলিশের মধ্যে তাকে নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধে। রাহাতকে সন্দেহের তালিকায় রেখে কাজ শুরু করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের সপ্তাহ না পেরোতেই আসে ফল। গ্রেফতার করা হয় ঘাতক রাহাতকে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মেজবাহ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ২ জানুয়ারি এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
ঘটনাটি ছিল জটিল এবং ক্লুলেস। রহস্য উদঘাটনে আমরা গুপ্তচর নিয়োগ করি। জানতে পারি, রাহাত প্রায়ই বছিলার খালের পাড়ে গিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছে। বিষয়টি আমাদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি করে। এটি আমলে নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায় ৭ জানুয়ারি গভীর রাতে রাহাতকে নিয়ে সেই খালের কাছে যাই। তাকে তীরে রেখে ময়লা পানিতে কিছু একটা খোঁজাখুঁজি করি। তখন ঘাতক রাহাত বলে, ‘স্যার আর সামনে যাইয়েন না। ময়লা পানিতে ডুবে যেতে পারেন।’ এতে রাহাতের ওপর সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। পরদিন রাসেলের পরিবারের সদস্যদের ওই খালের মধ্যে লাশ খোঁজার জন্য বলি। পরদিন সকালে পরিবারের সদস্যরা সেখানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। বেলা ১১টার দিকে তারা রাসেলের অর্ধগলিত বস্তাবন্দি লাশ দেখতে পান। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় লাশ। ৯ জানুয়ারি রাহাতকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পরপরই সে সবকিছু স্বীকার করে। ১০ জানুয়ারি সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জানা যায়, রাসেলকে বিদেশে পাঠানোর সব আয়োজন পাকা করার পরই ঘটে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। সাড়ে তিন লাখ টাকা নিয়ে রাসেলকে বিদেশে পাঠানোর সব আয়োজন করে তারই মামাতো বোন তানিয়া বেগমের স্বামী ঘাতক সাজিদ আহমেদ রাহাত। দেশ ছাড়ার আগে একটি তুচ্ছ ঘটনায় রাহাত বাঁশ দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে কিশোর রাসেলকে মেরে লাশ বস্তায় ভরে খালের নর্দমায় ফেলে দেয়। ৮ জানুয়ারি রাহাতকে গ্রেফতার করার পরের দিন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাজহারুল হকের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। রাহাতের স্বীকারোক্তি এবং পুলিশের তদন্তে হত্যার পুরো চিত্রটি বের হয়ে আসে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মেজবাহ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, রাসেলের পরিবারের লোকজন রাহাতকে সন্দেহ করেনি প্রথমে। রাসেলকে বিদেশ পাঠানোর সব আয়োজন রাহাতই করে। তবে রাহাতের গতিবিধি দেখে তার ওপর পুলিশের সন্দেহ হয়। শুরু হয় রাহাতের ওপর নজরদারি। এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বলেন, ঠাণ্ডা মাথায় রাসেলকে খুন করে লাশ বস্তায় ভরে খালের ময়লা পানির মধ্যে ডুবিয়ে দেয় খুনি রাহাত।
রাহাত আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, রাসেল বিদেশে যাওয়ার সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। এই খুশিতে ঘটনার দিন রাসেলের মা রাশেদা বেগমের কাছ থেকে বিরিয়ানি খাওয়ার টাকা নেয় সে। পরে রাসেলকে নিয়ে রায়েরবাজারে গিয়ে বিরিয়ানি খায় তারা দু’জনে। পরে রাসেল বলে, ‘দুলাভাই বিদেশ তো চলেই যাব, চলেন এই আনন্দে আজকে মদ খাই।’ রাসেল বলে, তুই বাসায় যা। সন্ধ্যার পর মদ এনে তোকে খবর দিচ্ছি। সন্ধ্যার পর রাহাত ফোন করে রাসেলকে বলে, ‘বছিলার মেট্রো হাউজিং খালপাড় চলে আয়।’ রাসেলের বন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় রাসেল। জবানবন্দিতে রাহাত বলেছে, মদ্যপ অবস্থায় রাসেল রাহাতকে গালাগাল দিতে থাকে। এতে রাহাত ক্ষেপে যায়। রাহাত তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলেও রাসেল এ সময় রাহাতের বাবা-মা তুলে বকাঝকা দেয়। রাহাত ক্ষিপ্ত হয়ে একটি বাঁশ দিয়ে রাসেলের মাথায় আঘাত করে। এতে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তারপর ঝোপের ভেতরে নিয়ে মাথায় আরও দুটি আঘাত করে। এরপর রাসেল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। রাহাত বাসায় গিয়ে একটি সাদা বস্তা নিয়ে আসে। বস্তায় লাশ ভরে খালের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়। এরপর রক্তের দাগ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়। বাসায় গিয়ে রক্তমাখা হাত ধুয়ে ফেলে রাহাত। এ সময় রাসেলের মোবাইল ফোনটি তার কাছে রেখে দেয়া হয়। পরে রাহত অপহরণের গল্প সাজায়। রাসেলের বাড়িতে ফোন করে রাহাত মুক্তিপণ চায়। এক পর্যায়ে মোবাইল ফোনটি ওই খালের মধ্যেই ফেলে দেয় রাহাত। ২ জানুয়ারি বন্ধুর জন্মদিনে যাওয়ার কথা বলে আর ফেরেনি রাসেল।

No comments:

Post a Comment