একুশে
ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে গোটা ফেব্রুয়ারি মাস বইয়ের সমারোহে ভরে ওঠে। এখন
আর শুধু ঢাকায়ই নয়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সারা দেশেই চলে বইমেলার আয়োজন। গত কয়েক
বছর ধরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমি মেলায় যেতে পারি না। কিন্তু বইমেলার
এই মাসটি এলে আমারও প্রাণে দুর্নিবার তারুণ্যের সাড়া জাগে। প্রকাশকরা নতুন
বইয়ের জন্য তাগাদা দেন। এ মাসে আমার বিভিন্ন বই মুদ্রণ পুনর্মুদ্রণের জন্য
লেখক সম্মানীর টাকাও তারা কমবেশি আমাকে পৌঁছান। তাই অসুস্থ শরীরে আমি
প্রত্যক্ষভাবে মেলার মাঠে হয়তো থাকতে পারি না কিন্তু আমার প্রাণটা যেন
মেলার মাঠে চড়ে বেড়ায়। বইমেলার মাঠ তো লেখকের নিজস্ব আঙিনা। কত পাঠক, ব›ধু,
শুভানুধ্যায়ীর যে সাক্ষাৎ মেলে সেখানে। মানসচক্ষে আমি সেই দৃশ্যাবলী
অবলোকন করি। একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদেরা তাদের নিজেদের প্রাণোৎসর্গের মধ্য
দিয়ে বাঙালি জাতির জীবনকে জাগিয়ে দিয়ে গেছেন।
আত্মত্যাগের মহত্তম উদাহরণ
তারা। ক্ষুদিরাম, তিতুমীর, প্রীতিলতার আত্মবলিদানের মিছিলের অবিচ্ছেদ্য
অংশীদার বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার। তাদের রক্তেই রোপিত হয়েছিল স্বাধীনতার
বীজ। তাদেরই পথ ধরে আসাদ, মতিউরসহ লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বদেশ। তারা
আমাদের ভাষার অধিকার রক্ষা করে গেছেন, দিয়ে গেছেন একটি সার্বভৌম ভূখণ্ড।
আন্দোলন-সংগ্রামের সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রজন্মকে নিতে হবে গড়ার শপথ।
সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে নিজেদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে। সমৃদ্ধ করতে হবে
মাতৃভূমিকে। একুশের মাস আমাদের মহত্তম আবেগে জাগরিত হওয়ার, স্পন্দিত হওয়ার
কাল। ফাল্গ–নে জারিত বসন্তে এ দেশের তরুণ সমাজ ব্যতিক্রমী প্রেরণায়
উদ্দীপ্ত, উদ্বুদ্ধও বটে। একুশে তাই ফিরে ফিরে আসে প্রেরণার তাগিদ নিয়ে।
ফেব্রুয়ারি হয়ে ওঠে সৃজনশীলতার কাল। প্রতিবছর মেলা উপলক্ষে নবীন-প্রবীণ
লেখকদের অনেক বই বের হয়। আমি সেগুলোর কিছু পাই, কিছু সংগ্রহ করি। চোখের
সমস্যায় পড়তে পারি না আজকাল, মুখে বলে যেমন অন্যের সাহায্যে নিজের
লেখালেখির কাজ চালাই তেমনই কিছু কিছু পড়িয়ে শুনে থাকি। শুচি সৈয়দ তুমি
জানো, নিজেকে আমি কানা মামুদ বলে থাকি, একান্ত ঘনিষ্ঠদের কাছে।
‘কানা
মামুদের উড়াল কাব্য’ নামে আমার একটি দীর্ঘ কবিতাও তুমি ছেপেছিলে খুব যতœ
নিয়ে তোমার সম্পাদিত একটি পত্রিকায়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দৈহিক সীমাবদ্ধতা
বাড়া সত্ত্বেও সত্যি কথা বলতে কি ফেব্রুয়ারি মাস যেন আমাকে উসকে দেয়,
উজ্জীবিত করে তোলে প্রাণের উত্তাপে। এ মাসে প্রিয় তরুণ বন্ধুদেরও কমবেশি
সাক্ষাৎ মেলে তোমাদের মতো। যেন একধরনের বসন্তের দোলা লাগে আমার প্রাণেও।
আমি আশাবাদী মানুষ বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষা নিয়ে আমার ভরসা অনেক। এ সময়ের
তরুণদের লেখায় মেধার দ্যুতি লক্ষ্যযোগ্য। অনেক দিন আগে আমি যে কথা
বলেছিলাম- ‘ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্যের রাজধানী হবে ঢাকা’- উনিশ শতকের আশির
দশকে আমার সেই কথাকে অনেকেই আমলে নিতে চাননি কিন্তু আজ তাদের মুখেই মিলছে
তার অকুণ্ঠ স্বীকৃতি। তারাই স্বীকার করে নিচ্ছেন অকপটে যে, বাংলাদেশেই
বেঁচে থাকবে বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য। আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী আমাদের
তরুণেরা উপযুক্ত সামর্থ্য দিয়ে তাদের কাঁধে বর্তানো দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে
পালন করবে। ফেব্রুয়ারি এলে আমি খুঁজে পাই ভরসার ভূমি। অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

No comments:
Post a Comment