Saturday, February 4, 2017

এটি কি দৃষ্টি ভিন্ন খাতে ফেরানোর চেষ্টা?

মুসলমানদের ৯০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা মার্কিন বিমানবন্দরগুলোয় উত্তেজনা ও প্রতিবাদ উসকে দিয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞা বাকিদেরও সাধারণ বিরোধিতায় ঐক্যবদ্ধ করে দিয়েছে। কিছু ডেমোক্রেট এ উত্তেজনাকে রাজনৈতিক কিছু সুবিধা অর্জনের পুঁজি হিসেবে নিয়েছে। তারা দ্রুত রণকৌশল সাজিয়ে নিজেদের অ্যাটর্নিদের জড়ো করেছে, যাতে নিজেদের পক্ষে ফেডারেল আদালতের আদেশ পাওয়া যায়।
যেখানে দেশব্যাপী একটি স্টে অর্ডার দিয়ে ট্রাম্পের মুসলিমবিরোধী নির্বাহী আদেশটি স্থগিত করা হবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সংশয় প্রকাশ করেছেন, এ নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর থেকে দৃষ্টি ভিন্ন খাতে ফেরানোর একটি কৌশল কিনা, যার বিপরীতে আরেকটি লক্ষ্য অর্জন করা যাবে, যা কিনা সাধারণভাবে মানুষের মনে আরও বেশি বিরোধিতা ও ক্ষোভের সঞ্চার করত। এক ফেসবুক পোস্টে বোস্টন কলেজের রাজনৈতিক ইতিহাসের অধ্যাপক হিদার কক্স রিচার্ডসন মন্তব্য করেছেন, “ব্যানন (স্টিভ ব্যানন- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সহকারী ও প্রধান নীতিনির্ধারক) যেটা করছেন, অতি নাটকীয়ভাবে সাত মুসলিমপ্রধান দেশের ওপর অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা আরোপ, তা একটি দুঃখজনক ঘটনা যা ‘শক ইভেন্ট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এমন একটা ঘটনা অপ্রত্যাশিত ও বিভ্রান্তিকর, যা সমাজকে সহিংসতায় নিক্ষেপ করবে।” তিনি আরও লিখেছেন, ‘মানুষ বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়েছে ট্রাম্পের এমন উদ্যোগের প্রতিক্রিয়া জানাতে। এতে কিছু সাধারণ ভুল আছে। যারা এর সঙ্গে জড়িত তারা যেন আরও বড় পরিসরে দাবি না তোলে যে, শুধু তারাই জানে কীভাবে আইনশৃংখলার স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা যায়। যেখানে বিরোধীরা মুখ খুলেছেন এ শক ইভেন্টের জন্য দায়ীরা তাদের শত্রু বলে ঘোষণা করেছেন। যেহেতু সমাজ বিক্ষুব্ধ হচ্ছে ও ক্ষোভ বাড়ছে, শক ইভেন্টের উদ্যোক্তারা দক্ষ হাতে তাদের আসল লক্ষ্য অর্জনের কাজ করছে। যে লক্ষ্যটি প্রচণ্ড অজনপ্রিয় বলে তারা জানে। কিন্তু সবাই সেটা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কারণ তারা প্রাথমিক ঘটনার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে গেছে। বিরোধীরা প্রকৃত লক্ষ্যে আর কেন্দ্রীভূত নেই;
তারা শক ইভেন্ট দ্বারা গড়ে ওঠা পক্ষপাতদুষ্টে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।’ রিচার্ডসন ব্যাখ্যা করেছেন, মুসলমানদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা শক ইভেন্টের পরিমাপে উপযুক্ত বলা যেতে পারে। কারণ, ‘এটা প্রকাশ করার আগে কোনো সরকারি সংস্থা বা আইনজীবীর মাধ্যমে পর্যালোচনা করানো হয়নি। এমনকি সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলাবিষয়ক (কাউন্টার টেরোরিজম) বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তাদের এ বিষয়ে কিছুই জিজ্ঞাসা করা হয়নি। যেসব ব্যক্তি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করবেন, তাদেরও বলা হয়নি কীভাবে সেটা করতে হবে। কয়েকটি আদালত তাৎক্ষণিকভাবে মুসলমানদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার নির্বাহী আদেশকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছেন; কিন্তু কিছু বিমানবন্দরে সীমান্ত পুলিশ এটির বাস্তবায়ন বন্ধ করতে অস্বীকার করেছে।’ দ্য হিল রিপোর্ট করেছে, রিপাবলিকান নেতারা এবং শীর্ষ কমিটিগুলোর প্রধানরা ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি সম্পর্কে আগে থেকে কোনো নোটিশ বা প্রজ্ঞাপন পাননি। এতে করে বিশৃংখলা আরও বেশি প্রকট আকার ধারণ করেছে। রিচার্ডসন আরও যোগ করেছেন, ‘আজ আমি বলতে চাই, যতক্ষণ না আপনি সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়িত্বে বসাচ্ছেন, ততক্ষণ শক ইভেন্ট গেম খেলা কোনো ব্যক্তির কাজ নয়। স্পষ্টভাবেই এটা সাজানো হয়েছে মানুষকে বিভক্ত করার জন্য। অন্যথায় তারা পছন্দ করে না এমন কোনো বিষয়ের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে দাঁড়ানোর আশংকা আছে বলে সংশ্লিষ্টরা ভেবেছেন। আমি জানি না ব্যানন এখন কী ভাবছেন- যদিও আমার কিছু অনুমান আছে;
কিন্তু যেহেতু ব্যাননের আইডিয়া সম্পর্কে আমি ভালো জানি, আমি নিশ্চিত, সেখানে এমন একজন মানুষও নেই যাকে করিডোরের যে কোনো একপ্রান্তে বন্ধু বিবেচনা করতে পারি এবং আমার বন্ধুর সারি খুব কমই বিস্তৃত- যারা পরিস্থিতি যাই হোক তা থেকে উপকৃত হতে পারে।’ দি অবজারভারের জন শিন্ডলার তার এক নিবন্ধে ব্যাখ্যা করেছেন, মুসলমানদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার উন্মাদনার সময় ‘আসল ও প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধন করা হয়েছে প্রত্যেক ব্যক্তিকে হোয়াইট হাউসের আরও বেশি আনুষঙ্গিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল থেকে বিভ্রান্ত করার মাধ্যমে।’ ওই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে ছিল জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান এবং ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালককে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল থেকে সরিয়ে দেয়া; এবং ট্রাম্পের প্রধান পরামর্শক হিসেবে স্টিভ ব্যাননকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা। ব্যানন ও জেনারেল মাইকেল ফ্লিন দু’জনই পুরোপুরি অযোগ্য ব্যক্তি, যাদের নিয়োগে কংগ্রেসের যাচাই-বাছাই ছিল না। এ নিয়োগের মাধ্যমে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে তাদের উল্লেখযোগ্য কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করা হল। গুগলের প্রকৌশলী ইয়োনাতান জুনগার প্রকাশিত এক ব্লগ পোস্টে একই ধরনের তত্ত্ব দেয়া হয়েছে। ‘ট্রাম্প চাইতে পারেন বিদ্যমানের বিপরীতে তার নিজস্ব গোয়েন্দা সেবা এবং সরাসরি তার কাছে প্রতিবেদন দাখিলের সুবিধা।
বর্তমান স্টাফ নিয়োগের দ্বারা এবং তার ঘনিষ্ঠদের ভূমিকার মাধ্যমে ব্যানন হবেন সরাসরি প্রতিবেদন পাওয়ার জন্য ট্রাম্পের স্বাভাবিক পছন্দ (তার নিয়োগের ওপর কংগ্রেস ও সংবিধানের কোনো বাধ্যবাধকতা বা অভিজ্ঞতা না থাকার পরও যেমনটি অন্য উচ্চপদস্থদের ক্ষেত্রে করা হয়)।’ এ থিওরি ব্যাখ্যা করে জুনগার লিখেছেন, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক রদবদল নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে ক্ষমতা নিয়ে দরকষাকষির একটি চেষ্টা হিসেবে করা হচ্ছে। ‘বিশেষত যদি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং এফবিআইয়ের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা যায়, ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় যেগুলোকে প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুগত দেখা গেছে। এর মাধ্যমে একটি ছায়া সরকারের ঢাল তৈরি করা হবে; গোয়েন্দা ও পুলিশ বাহিনীর সমন্বয়ে যারা সাধারণ কোনো প্রক্রিয়ায় দায়বদ্ধ নয়, শুধু প্রেসিডেন্টের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।’ ২০১৬ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার সময় মূলধারার মিডিয়ার প্রতি প্রায়ই মিথ্যা ও কল্পনাপ্রসূত বিবৃতির মাধ্যমে তোপ দাগানো বিস্ফোরক মন্তব্য ও ক্ষোভের প্রকাশ দিয়ে মনোযোগ আকর্ষণের প্রবণতা এবং এক্ষেত্রে তার দক্ষতা দেখা গেছে। এটি যদি তিনি তার প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রয়োগ করেন, তবে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না। রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলে এমন আচরণ না করলে তাকে কঠোর বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে।
কাউন্টারপাঞ্চ ডট অর্গ থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম
মাইকেল সেইনাটো : মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট

No comments:

Post a Comment