সাঁওতালপল্লীতে
আগুন দেয়ার ঘটনার বিচারিক তদন্তে সহযোগিতা না করায় গাইবান্ধার পুলিশ সুপার
আশরাফুল ইসলামকে দ্রুত প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ৬
নভেম্বর সাঁওতালপল্লীতে আগুন লাগানোর ঘটনার সময় চামগাড়ী এলাকায় দায়িত্বরত
সব পুলিশ সদস্যকেও প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিচারিক তদন্ত কমিটির
প্রতিবেদনের ওপর শুনানি শেষে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃঞ্চা
দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ মঙ্গলবার এ আদেশ দেন। এছাড়া আগুন লাগানোর
ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা চার সপ্তাহের
মধ্যে প্রতিবেদন আকারে আদালতকে জানাতে পুলিশের আইজি ও রংপুর রেঞ্জের
ডিআইজিকে নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, সাঁওতালপল্লীতে আগুন লাগানোর
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বিচারিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
কিন্তু
ওই কমিটিকে তথ্য না দিয়ে এসপি প্রকারান্তরে হাইকোর্টের আদেশের লংঘন
করেছেন। এ কারণে এসপিকে প্রত্যাহার করতে স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইজিপিকে
নির্দেশ দেয়া হল। অন্যদের ব্যাপারে আদালত বলেছেন, আগুন লাগানোর ঘটনায় তিন
পুলিশ সদস্য সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। কয়েকজন পুলিশ সদস্যের জন্য পুরো পুলিশ
বাহিনী দায়ী হতে পারে না। আইনশৃংখলা বাহিনীকে অবশ্যই জনগণের আস্থা অর্জন
করতে হবে। এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য ৯ মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছে। গত
বছরের ৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জের রংপুর চিনিকলের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে
পুলিশ ও চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষ হয়। উপজেলার
সাপমারা ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ এলাকায় ওই সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয়পক্ষের অন্তত ২০
জন আহত ও কয়েকজন সাঁওতাল নিহত হন। এরপর সাঁওতালদের জানমালের নিরাপত্তা
নিশ্চিতসহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে ১৬ নভেম্বর আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক),
ব্রতী সামাজিক কল্যাণ সংস্থা ও অ্যাসোসিয়েশন অব ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড
ডেভেলপমেন্ট একটি রিট করে। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে পরদিন হাইকোর্ট রুলসহ
অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন। হাইকোর্টের আদেশের আগে ঘটনার দিন আগুন লাগানোয়
পুলিশের সম্পৃক্ততা নিয়ে ১৩ ডিসেম্বর ছবিসহ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকসহ গণমাধ্যমে
প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে সম্পূরক আবেদন করে রিট আবেদনকারী পক্ষ। ১৪
ডিসেম্বর হাইকোর্ট আগুন লাগানোর ঘটনায় পুলিশ সদস্যরা জড়িত কিনা, সে
ব্যাপারে তদন্ত করতে গাইবান্ধার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে (সিজেএমকে)
নির্দেশ দেন। হাইকোর্টের নির্দেশে ৩০ জানুয়ারি সিজেএম মো. শহিদুল্লাহ
সাঁওতালপল্লীতে আগুন লাগানোর ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন দেন। মঙ্গলবার ওই
প্রতিবেদনের অংশবিশেষ হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়। উপস্থাপিত প্রতিবেদনে
দেখা গেছে, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গ্রুপ সাহেবগঞ্জ ইক্ষু
খামারের অফিসের ভেতর দিয়ে পশ্চিমদিকে চামগাড়ী বিলে সাঁওতালদের স্থাপনার
দিকে গুলি করতে করতে এগোতে থাকলে সাঁওতালরা তীর ছুড়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা
করেন। পুলিশের গুলির আওয়াজে আতংকগ্রস্ত হয়ে সাঁওতালরা স্থাপনা থেকে চলে
যাওয়ার পর আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। ওই সময় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা
পুলিশ,
র্যাব ও ডিবির পোশাক পরিহিত সদস্য এবং সাধারণ পোশাকধারী দু’জন
ব্যক্তির উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। ওই গ্রুপটির মধ্য থেকে পুলিশ লেখা
পোশাকধারী দু’জন, ডিবি লেখা পোশাকধারী একজন ও সাধারণ পোশাকধারী দু’জন (লাল ও
সাদা রঙের শার্ট পরিহিত) ব্যক্তিকে সক্রিয়ভাবে চামগাড়ী বিলে সাঁওতালদের
স্থাপনায় আগুন লাগাতে দেখা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনশৃংখলা
রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হেলমেট পরা থাকায় এবং ভিডিও ক্লিপটি অনেক দূর ও
পেছন থেকে সংগৃহীত হওয়ায় তাদের মুখমণ্ডল দেখা যায় না। তবে তাদের পোশাকে
পুলিশ, র্যাব ও ডিবি লেখা দেখা গেছে। যে কারণে অনুসন্ধানকালে গাইবান্ধার
পুলিশ সুপারের কাছ থেকে ঘটনাস্থলে কর্তব্যরত আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের
নামের তালিকা তলব করলেও তিনি নামের তালিকা সরবরাহ না করে তার কার্যালয়ের
একটি স্মারকপত্র পাঠান। এ পর্যায়ে রিটকারী সংগঠনের আইনজীবী এএম আমিনউদ্দিন
বলেন, পুলিশ সদস্যদের তালিকা না দেয়ায় বিচারিক তদন্ত কমিটির পক্ষে কে আগুন
দিয়েছে, তাকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ
বিচারক বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, এর আগে একটি প্রতিবেদনে ‘বাঙালি
দুষ্কৃতকারী’ শব্দ উল্লেখ করায় এ এসপিকে তলব করা হয়েছিল। সশরীরে হাজির হয়ে
এসপি ক্ষমা চেয়েছিল, আমরা তা মঞ্জুর করেছি। এরপরও সে বিচারিক তদন্ত কমিটিকে
তালিকা না দিয়ে অসহযোগিতা করেছে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, গণমাধ্যমের
প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ আগুন লাগানোর ঘটনা জানতে পেরেছি। এ ঘটনায় পুরো
পুলিশ বাহিনী কি দায়ী? নিশ্চয়ই নয়, বাহিনীর কয়েকজন সদস্য দায়ী। রাষ্ট্রপক্ষের
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, তালিকা যখন চাওয়া হয়
তখন এসপি চিঠি দিয়ে বলেছে পুলিশ নিজেরাই এ ঘটনার তদন্ত করছে। কিন্তু এখনও
ওই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়নি। আদালত বলেন, ওই প্রতিবেদন কি কখনও দাখিল
করা হবে? অ্যাডভোকেট এএম আমিনউদ্দিন বলেন, ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত পুলিশ
সদস্যদের পরিচালনার জন্য নিশ্চয়ই সিনিয়র অফিসাররা ছিলেন। তাদের দায়িত্ব ছিল
শান্তিশৃংখলা বজায় রাখা।
কিন্তু সেটি না করে কয়েকজন পুলিশ সদস্য ঘরবাড়িতে
আগুন দিয়েছে। এ আগুন দেয়ার সময় দায়িত্বরত সিনিয়র অফিসাররা কী ভূমিকা পালন
করেছেন? তারা কি তামশা দেখতে গিয়েছিলেন? উভয়পক্ষের শুনানি শেষে হাইকোর্ট
আগুন লাগানোর ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা
চার সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন আকারে আদালতকে অবহিত করতে পুলিশের আইজি ও
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজিকে নির্দেশ দিয়েছেন। গাইবান্ধার এসপিকে প্রত্যাহারের
আদেশে সাঁওতালরা সন্তুষ্ট : গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সাঁওতালপল্লীতে
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় হাইকোর্ট
গাইবান্ধার এসপি আশরাফুল ইসলাম এবং ওই স্থানে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ
সদস্যদের প্রত্যাহারের আদেশ দেয়ায় সাঁওতালরা আনন্দ প্রকাশ করেছেন। মঙ্গলবার
টেলিভিশন এবং অনলাইন পত্রিকায় ওই রায় প্রচার হলে গোবিন্দগঞ্জের সাপমারা
ইউনিয়নের সাঁওতালপল্লী জয়পুর ও মাদারপুরের বাসিন্দারা পরস্পরের কাছে তাদের
আনন্দ অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। মাদারপুরের বাসিন্দা স্থানীয় সাঁওতাল নেতা
রাফায়েল হাসদা বলেন, উচ্চ আদালতের এ আদেশে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। ৬ নভেম্বর
আমাদের সম্প্রদায়ের ওপর যে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে, আদালত তার সঠিক
মূল্যায়ন করে আদেশ দিয়েছেন। সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার কমিটির
সহসভাপতি ডা. ফিলিমন বাসকে বলেন, আমরা এখন পিবিআইয়ের রিপোর্টের প্রত্যাশায়
রয়েছি। তিনি বলেন, অভিযুক্তদের আইনের আওতায় এনে তাদের শাস্তির দাবির
পাশাপাশি নিহত ও আহত সাঁওতাল পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ পুনর্বাসন,
আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা, সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারে বাপ-দাদার জমিতে
পুনর্বাসনের দাবি রয়েছে আমাদের। অপরদিকে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি
রবীন্দ্র সরেন আদালতের আদেশে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ন্যায়বিচার পাব
বলে আশা করছি।

No comments:
Post a Comment