সিরাজগঞ্জের
শাহজাদপুরে ত্রাস, টেন্ডারবাজি ও দখলবাজির নাম হালিমুল হক মীরু। দুই ভাই
হাসিবুল হক মিন্টু ও হাবিবুল হক পিন্টুকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন তার ‘রাজত্ব’।
সবকিছু ‘নিয়ন্ত্রণে’ রাখতে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী- যার ‘সৈন্য’
সশস্ত্র সর্বহারা ক্যাডাররা। নানা অপকর্মের জন্য এর আগেও দু’বার দল তাকে
বহিষ্কার করেছিল। সর্বশেষ রোববার উপজেলা ও সোমবার জেলা আওয়ামী লীগ তাকে
বহিষ্কার করে। এর আগে কলেজ থেকে বহিষ্কার এবং চাকরিতেও বরখাস্ত হন মীরু।
শাহজাদপুরের মানুষ এতদিন মীরু ও তার বাহিনীর কাছে জিম্মি থাকলেও প্রাণভয়ে
বলতে পারত না কিছুই।
রোববার গ্রেফতারের পর এখন মুখে মুখে তার অপকর্মের
ফিরিস্তি। শাহজাদপুর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শফিকুজ্জামান শফি বলেন,
বাবার চাকরির সুবাদে মীরুর শৈশব ও স্কুলজীবন কাটে পাবনায়। এসএসসি পাসের পর
যোগ দেন তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ)
সিগন্যাল কোরে ওয়্যারলেস অপারেটর পদে। সেখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে
শৃংখলাপরিপন্থী আচরণ ও মারধর করে চাকরি থেকে পালিয়ে আসেন। গ্রেফতার এড়াতে
১৯৭৮ সালে চলে যান দাদার বাড়ি শাহজাদপুর পৌর সদরের নলুয়া চরে। মীরু ১৯৭৯
সালে স্থানীয় জাসদ ছাত্রলীগ নেতাদের হাত ধরে শাহজাদপুর কলেজে এইচএসসিতে
ভর্তি হন। এখান থেকেই শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবনও। জাসদ ছাত্রলীগের
প্রার্থী হয়ে ১৯৮১ সালে শাহজাদপুর কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভিপি পদে
নির্বাচিত হন। তবে এক ঘটনায় অধ্যক্ষকে অফিস কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখার
অপরাধে গভর্নিং বডি তাকে বহিষ্কার করে। বিএনপি উপজেলা কমিটির সিনিয়র
সহসভাপতি ও শাহজাদপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম বলেন, মীরু ১৯৯১
সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাসদ থেকে মশাল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে
শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। এরপর পৌর নির্বাচনে আমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে
২ বার ও শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিবুর রহমান স্বপনের কাছে
একবার শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। ১৯৯৫ সালে বিএনপিতে যোগ দেয়ার চেষ্টা করেন।
(তবে ভিন্ন সূত্র জানায়, বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু স্থানীয়
নেতাকর্মীরা তাকে গ্রহণ না করায় দল ছাড়তে বাধ্য হন।) ব্যর্থ হয়ে আওয়ামী
লীগে যোগ দেন। দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ১৯৯৬ ও ২০০৪ সালে দু’বার আওয়ামী
লীগ থেকে বহিষ্কার হন। দ্বিতীয়বারের পর থেকেই তিনি আরও উচ্ছৃংখল ও বেপরোয়া
হয়ে ওঠেন। তবে দলে ফিরে আসেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লতিফ বিশ্বাসের
বদন্যতায়। তার খাস লোক হিসেবে মীরু পেয়ে যান জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক
সম্পাদকের পদও। তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে না থাকা ও বেপরোয়া
জীবনযাপনের জন্য ২০১৫ সালে পৌর নির্বাচনে উপজেলা ও জেলা থেকে দলীয় মেয়র
প্রার্থী হিসেবে সাবেক ভিপি আবদুর রহিমের নাম প্রস্তাব করে আওয়ামী লীগ।
মীরু তা সহজভাবে নেননি। কেন্দ্রে তদবির করে মনোনয়ন নিয়ে আসেন। নির্বাচনী
প্রচারণায় তিনি পাবনার চর থেকে নিষিদ্ধ সংগঠনের বেশকিছু সশস্ত্র সন্ত্রাসী
ভাড়া করে অস্ত্র ও বোমার ঝঙ্কার তোলেন। সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে সাবেক মেয়র
নজরুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুর রহিমের নির্বাচনী
ক্যাম্প ভাংচুর এবং সমর্থকদের মারধর করেন। শাহজাদপুর উপজেলা ছাত্রলীগের
সভাপতি মাহবুব ওয়াহিদ কাজলও তার হামলার শিকার হন। ৮ নম্বর ওয়ার্ডের
কাউন্সিলর আল মাহমুদের বাড়িতে হামলা ও গুলি চালান। ভোট সন্ত্রাসের মাধ্যমেই
মেয়র নির্বাচিত হন মীরু। নেতাকর্মীর সঙ্গে সখ্য না রেখে সশস্ত্র
সন্ত্রাসীদের প্রহরায় চলাফেরা শুরু করেন। এমনকি পৌরসভা পরিচালনার ক্ষেত্রেও
কাউন্সিলর বা পৌর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো বিষয়ে আলোচনা করতেন না। মীরু ও
তার ভাই পিন্টু-মিন্টুর নির্দেশে চলত পুরো পৌরসভা। তাদের ভয়ে তটস্থ থাকতেন
অসহায় পৌর কাউন্সিলর ও পৌর কর্মকর্তারা।
একাধিক কাউন্সিলর বলেন, উপজেলা
আওয়ামী লীগের সভাপতি স্থানীয় এমপি হাসিবুর রহমান স্বপন ও সাধারণ সম্পাদক
উপজেলা চেয়ারম্যান আজাদ রহমান গ্রুপকে মাইনাস করে সম্পূর্ণ স্বৈরাচারী
কায়দা চালু করেন মীরু। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন,
প্রকৌশল বিভাগের জন্য কেনা একটি মোটরসাইকেল ৯ মাস ধরে ভাই পিন্টু তার
ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল হিসেবে ব্যবহার করতেন। পৌরসভার বার্ষিক উন্নয়ন
প্রকল্পের প্রথম পর্বের অর্থে ৩৫ লাখ টাকার সংস্কার কাজ গোপনে টেন্ডার করে
ফেয়ার ট্রেডার্স নাম দিয়ে মীরুর ভাই পিন্টু নামকাওয়াস্তে কাজ করে বিল
উত্তোলন করেন। স্থানীয়রা জানান, পিন্টুর ভয়ে প্রকৌশলী বিভাগের কেউ একদিনের
জন্যও এ কাজের সাইড তদারকি ও পরিদর্শন করতে পারেনি। পৌরসভার দায়িত্ব নেয়ার
পর মেয়র মীরু ইউজিপি প্রকল্পের সাড়ে ১১ কোটি টাকার কাজের টেন্ডারে নিন্ম
দরদাতা ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে ১৩ শতাংশ ঊর্ধ্ব দর দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ১০
শতাংশ কমিশন নেয়। এর পরিমাণ কোটি টাকারও বেশি। শহরের ৮ কিলোমিটার ড্রেন
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে
নির্মিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। এসব কর্মকাণ্ডে তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করার
সাহস পেত না। কেউ প্রতিবাদ করলে তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে পিটিয়ে হাত-পা
ভেঙে দেয়া হতো। অস্বাভাবিক হারে দোকান ও বাড়িঘরের পৌর ট্যাক্স নির্ধারণ
করলে শাহজাদপুরের ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নামে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন মেয়র ও
তার দুই ভাই। আন্দোলনকারীদের শায়েস্তা করতে আবারও পাবনা থেকে আনেন সর্বহারা
সন্ত্রাসীদের।
মীরুর মনিরামপুরের বাড়ির প্রতিবেশী হরিদাস সাহা ওরফে পচা
সাহা অভিযোগ করেছেন, ‘তিন মাস আগে মীরু আমার বাড়ির আড়াই শতক জায়গা জোর করে
দখল করেন। তিনি দাঙ্গাবাজ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাইনি। ওই
জায়গার বর্তমান বাজার মূল্য ৩০ লাখ টাকা।’ শাহজাদপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা
কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার বিনয় পাল জানান, মীরু মুক্তিযোদ্ধা নন। কিন্তু
ভুয়া জন্মনিবন্ধন দেখিয়ে বয়স জালজালিয়াতি করে ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর
মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করেন। যার গেজেট নং ১৯৪৬। পরে বিষয়টি তৎকালীন
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও ভাতা বিতরণ কমিটির সভাপতির নজরে এলে মীরুর
ভাতা বন্ধ করে দেন। তিনি আরও বলেন, আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা বাছাই
করা হবে। জালজালিয়াতির কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। রূপপুর
গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আজাদ শাহনেওয়াজ ভুঁইয়া বলেন, সে কোথায় যুদ্ধ করেছে তা
আমরা জানি না। ১৯৭১ সালে তার বয়স ১৩ বছরের কম ছিল। মেয়র মীরুর এসব
অন্যায়ের সর্বশেষ প্রমাণ হল শাহজাদপুর কলেজ শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি বিজয়
মাহমুদ। বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে, পিন্টু ও বিজয়ের মধ্যে বিরোধের
সূত্রপাত হয় গত পৌর নির্বাচনের সময় থেকে। ওই নির্বাচনে বিজয়ের ভগ্নিপতি
আবদুর রহিম মেয়র মীরুর বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছিলেন। এই বিরোধ তুঙ্গে ওঠে
বিজয়দের বাড়ির সামনের রাস্তা মেরামত ও সংস্কার কাজ ফেলে রাখা নিয়ে। ওই
রাস্তার কাজটি পান মেয়রের ভাই পিন্টু ও মিন্টুর অনুগত ঠিকাদাররা। কাজ করা
হচ্ছিল নিম্নমানের। এর ওপর খোয়া বিছিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে প্রায় তিন মাস।
এতে
চলাচলে যেমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছিল, স্থানীয়দের তেমনি ধুলায় ঢেকে যায়
স্থানীয়দের বাড়িঘর। এর প্রতিবাদ করেন বিজয়। স্থানীয়দের নিয়ে গড়ে তোলেন
আন্দোলন। এরই জেরে বৃহস্পতিবার দুপুরে মেয়রের ছোট ভাই পিন্টু ক্যাডার
বাহিনী দিয়ে বিজয়কে ধরে এনে তার বাড়ির ভেতরের টর্চার সেলে আটকে রেখে মারধর
করে। হাত-পা ভেঙে ভ্যানে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। বর্তমানে বিজয় রাজধানীর পঙ্গু
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিজয়ের সমর্থক ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা এর
প্রতিবাদ জানাতে মিছিল নিয়ে মেয়রের বাড়িতে যান। মেয়র ও ও তার সশস্ত্র
সন্ত্রাসীরা এ সময় গুলি ছোড়ে। এর ছবি তুলতে গেলে দৈনিক সমকালের শাহজাদপুর
প্রতিনিধি আবদুল হাকিম শিমুলকে গুলি করে হত্যা করেন পৌর মেয়র হালিমুল হক
মীরু। আরও একজন গ্রেফতার : শাহজাদপুর থানার ওসি (তদন্ত) মনিরুল ইসলাম
জানান, শিমুল হত্যা মামলার আসামি শাহীন আলমকে পুলিশ বেলকুচি বাসস্ট্যান্ড
থেকে সোমবার সন্ধ্যায় গ্রেফতার করে। মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে
পাঠিয়ে দেয়। শাহীন শাহজাদপুর উপজেলার নলুয়া গ্রামের মোক্তার হোসেনের ছেলে ।
সে মেয়র মীরুর গাড়িচালক।

No comments:
Post a Comment