প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত মহান অর্জনগুলো
ভবিষ্যতে কেউ যেন নস্যাৎ করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান
জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাঙালি জাতির যখন যা কিছু অর্জন তা অনেক ত্যাগের
মধ্য দিয়ে, সংগ্রামের মধ্য দিয়েই অর্জন করতে হয়েছে। কাজেই সেই অর্জনকে
আমাদের ধরে রাখতে হবে।’ সোমবার সকালে একুশে পদক বিতরণ উপলক্ষে আয়োজিত
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণ দিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী
বলেন, আমরা এখন স্বাধীন দেশ। অর্থনৈতিকভাবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ
এখন একটি উন্নয়নের রোল মডেল। সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশ একটি মর্যাদার আসনে
অধিষ্ঠিত হয়েছে। এখন যে অপপ্রচার তারা (পাকিস্তানি গোষ্ঠী) করে যাচ্ছে, তা
কারও কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে গ্রহণ করতে
হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও এর স্বীকৃতির জন্য আমাদের প্রচার চালাতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমাদের দেশের কোনো কোনো রাজনৈতিক
দলের নেতা, আমি নাম ধরেই বলতে চাই- বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া কিছু দিন আগে
বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়নি। তার এ ধরনের বক্তব্যের
সঙ্গে পাকিস্তানের এ ধরনের অপপ্রচারের কোনো সূত্র আছে কিনা তা খুঁজে দেখতে
হবে। তারা উভয়েই একই সুরে কথা বলেছেন।
এ যেন শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানী
এবং শহীদদের অবমাননা করা ছাড়া আর কিছুই নয়।’ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি
মিলনায়তনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ২০১৭ সালের একুশে পদক
বিজয়ী ১৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে এই পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। ভাষা
আন্দোলন, শিল্পকলা (সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, ভাস্কর্য, নাটক ও নৃত্য),
সাংবাদিকতা, গবেষণা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সমাজসেবা, ভাষা ও
সাহিত্যে এ সম্মাননা দেয়া হয়। পুরস্কার হিসেবে সনদপত্র, স্বর্ণপদক এবং দুই
লাখ টাকার চেক বিজয়ীদের হাতে তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী
আসাদুজ্জামান নূরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি
মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. ইব্রাহিম হোসেন খান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব
মো. শফিউল আলম অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা,
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা, বিচারপতিরা, সংসদ সদস্যরা, কূটনৈতিক মিশনের
সদস্যরা, পদস্থ সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পদক বিজয়ীরা
হচ্ছেন- ভাষা আন্দোলনের জন্য অধ্যাপক ড. শরিফা খাতুন, সঙ্গীতে সুষমা দাস,
ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম, জুলহাস উদ্দিন আহমেদ ও রহমতউল্লাহ আল মাহমুদ সেলিম
ওরফে মাহমুদ সেলিম, চলচ্চিত্রে তানভীর মোকাম্মেল, নাটকে সারা যাকের,
গবেষণায় সৈয়দ আকরম হোসেন, শিক্ষায় প্রফেসর ইমেরিটাস আলমগীর মোহাম্মদ
সিরাজুদ্দীন, সাংবাদিকতায় আবুল মোমেন ও স্বদেশ রায়, সমাজসেবায় অধ্যাপক ডা.
মাহমুদ হাসান, ভাষা ও সাহিত্যে সুকুমার বড়ুয়া ও ওমর আলী এবং নৃত্যে শামীম
আরা নীপা। বিজয়ী সবাই প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন। মরণোত্তর
কবি ওমর আলীর পক্ষে তার ছেলে মো. রফি মনোয়ার আলী পদক গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী একুশে পদক বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, কথায় আছে, যে দেশে
গুণীর কদর নেই, সে দেশে গুণীর জন্ম হয় না। তার সরকার গুণীজনদের তাদের
প্রাপ্য সম্মান দেয়ার বিষয়ে আন্তরিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনে দেশের বুদ্ধিজীবী ও মেধাবীদের দায়িত্ব অর্পণ
করেছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার পরিকল্পনা কমিশনে তাই দেশসেরা
অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন-গবেষক, সমাজ-বিশ্লেষকদের সমাবেশ ঘটেছিল। বঙ্গবন্ধু
যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন, দেশের মেধাবী নাগরিকরাই তাদের দায়বদ্ধ ভাবনার
মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়তে পারেন। প্রধানমন্ত্রী ২৫ মার্চ গণহত্যা
দিবস করতে তার সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করবে উল্লেখ করেন এবং সাম্প্রতিককালে
একাত্তরের ২৫ মার্চ গণহত্যা নিয়ে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে পাকিস্তানের জনৈক
জুনায়েদ আহমেদের বই প্রকাশ এবং সেই বই বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠানোর
ধৃষ্টতার ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি লক্ষ করছি,
পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। তারা কিছু দিন আগে একটি পুস্তক বের
করে তাতে উল্লেখ করেছে- ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী যে গণহত্যা শুরু করেছিল
যাতে এ দেশীয় আলবদর, আল শামস, রাজাকাররা যোগ দিয়েছিল সেসব গণহত্যার ছবিতে
মিথ্যা ক্যাপশন এঁটে দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করে এসব হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানি
বাহিনী নয়, মুক্তিযোদ্ধারা করেছে বলে তারা তা প্রচারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, কারা
অভ্যন্তরে নিহত জাতীয় চার নেতাসহ অমর একুশে ফেব্রুয়ারি এবং একাত্তরের মহান
মুক্তিযোদ্ধা ও সম্ভ্রমহারা দুই লাখ মা-বোনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন,
‘একুশ মানে মাথা নত না করা, মর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা।’
মহান ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৪৮ সালে ৪
জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় সব গণ-আন্দোলনের পতাকাবাহী সংগঠন ছাত্রলীগ
প্রতিষ্ঠিত হয়। ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত এক সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর
রহমানের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস এবং আরও কয়েকটি
ছাত্র সংগঠন মিলে সর্বদলীয় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ ঘোষণা করে ধর্মঘট ডাকা হয়
এবং সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ জনগণকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্য
সমগ্র দেশব্যাপী প্রচারাভিযান শুরু করে। ধর্মঘট চলাকালে বঙ্গবন্ধুসহ অনেক
ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ
ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে মুসলিম লীগ সরকার ১৫ মার্চ বন্দিদের
মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু আবারও গ্রেফতার হন
উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই মাসের শেষে তিনি মুক্তি পান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির সেই বিয়োগান্তক ঘটনা রাতারাতি
আমাদের মনন, চিন্তা-চেতনায় একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেয়। ... আমরা যারা
পাকিস্তানি শাসনের মধ্যে বেড়ে উঠেছি, আমাদের কাছে একুশে ছিল এক অন্যরকম
শক্তি, প্রেরণা, উদ্দীপনার উৎস।’ প্রধানমন্ত্রী ২১ বছর পর পুনরায় আওয়ামী
লীগের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়া প্রসঙ্গে বলেন, ‘দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৯৬
সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় বাংলার মাটি ও মানুষের রাজনৈতিক দল
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঙালির একুশ এভাবে পরিণত হয়
সারা পৃথিবী মানুষের মাতৃভাষা দিবসে। দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার যথাযথ
ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার সুরক্ষা
বিধানে ভূমিকা রাখার দায়িত্বও এখন আমাদের ওপর অর্পিত। সেদিকে লক্ষ্য রেখে
আমরা পৃথিবীর সব ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে গবেষণা এবং সংরক্ষণ ও চর্চার
জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছি। প্রধানমন্ত্রী
বলেন, তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানকে নিয়ে এই ইন্সটিটিউট নির্মাণের
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও ২০০১ সাল পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত সরকার
আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচির মতো এরও নির্মাণ বন্ধ করে
দিয়েছিল।

No comments:
Post a Comment