Wednesday, February 1, 2017

গণমাধ্যম হিসেবে এখনও সংবাদপত্রের ভূমিকাই প্রধান

রেডিও আবিষ্কৃত হওয়ার পর দেশে দেশে তা বাণিজ্যিকভাবে চালু হলে, এ মাধ্যমে সংবাদ ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দিনব্যাপী সম্প্রচার হতে থাকলে অনেকে মনে করেছিলেন, সংবাদপত্রের কদর কমে গেল। মানুষ রেডিওর মাধ্যমেই দিনের খবর দিনে পাচ্ছে। বেতারে বিনোদনের উপকরণও থাকছে। সুতরাং সংবাদপত্রের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমে যাবে। কিন্তু কমে তো গেলই না, বরং সংবাদপত্রের পাঠক বেড়েই চলল। টেলিভিশন চালু হওয়ার পরও দেখা দিল একই আশংকা। কিন্তু সে আশংকাও অমূলক প্রমাণিত হল। বর্তমানে অনলাইন সংবাদপত্রের ছড়াছড়ি। অনেক ধনী দেশের বড় বড় সংবাদপত্র তাদের প্রিন্ট এডিশন বন্ধ করে দিয়ে অনলাইনে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। ফলে সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আবারও দেখা দিয়েছে শংকা।
বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। দেশে দেশে সংবাদপত্র এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। সংবাদপত্র একটি পণ্য। তা প্রকাশ করতে পুঁজির প্রয়োজন। তাতে লাভ-লোকসানের প্রশ্ন রয়েছে। ভালো লাগলে মানুষ তা টাকা দিয়ে কেনে। ভালো না লাগলে কিনবে না। প্রকাশককে লোকসান দিতে হবে। একালে সংবাদপত্র অন্যান্য শিল্পের মতো একটি শিল্পও বটে। কোনো শিল্পের মালিক লোকসান দেয়ার জন্য পুঁজি বিনিয়োগ করেন না। সংবাদপত্র শিল্পের সঙ্গে অন্য পণ্যের শিল্পের পার্থক্য এখানে যে, সেসব ক্ষেত্রে মালিকের সামাজিক দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন আসে না। মানসম্মত পণ্য বাজারে ছেড়ে দিয়েই মালিকের দায়িত্ব শেষ। কিন্তু শুধু মানসম্মত অতি সুন্দর একটি পত্রিকা বাজারে ছেড়ে দিলেই সম্পাদক-প্রকাশকের দায়িত্ব শেষ হয় না। পাঠক বিচার করে দেখে ওই কাগজ জনগণ ও দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষা করছে। জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে গেলে কায়েমী স্বার্থের বিরাগভাজন হতে হয়। কখনও দেশ ও জনগণের শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। বিপদের ঝুঁকি নিতে হয়। ঝুঁকি সামাল দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন কঠিন বৈকি! এখন শুধু সরকার সংবাদপত্রের জন্য বড় বিপদ নয়। সরকার ও সংবাদপত্র সহ-অবস্থান করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কায়েমী স্বার্থ ও সমাজবিরোধীরাই বর্তমানে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদপত্রের জন্য বড় বিপদ। সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করতে গিয়ে এখন দেশে দেশে সাংবাদিকদের প্রাণ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশেও এ পর্যন্ত কম সাংবাদিক প্রাণ দেননি।
জেল-জুলুম তো আছেই। আদালত অবমাননা ও মানহানির মামলার হয়রানির শেষ নেই। সরকারের চেয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীই সাংবাদিকদের সঙ্গে বিরক্তিকর আচরণ করে বেশি। স্বাধীন সংবাদপত্রকেও রাষ্ট্রের সঙ্গে, সরকারের সঙ্গে অথবা অন্য কোনো শক্তিমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অল্প পরিমাণে হলেও আপস করতে হয়। শুধু সরকারের সঙ্গে নয়, ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গেও আপস করতে হয়। কর্পোরেট পুঁজির সঙ্গে ব্যবসার স্বার্থে আপস করতে হয়। সমাজের এলিটদের সঙ্গে একধরনের আপস না করে অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন। আপস শুধু সংবাদপত্রকে নয়, অন্যান্য প্রচারমাধ্যমকেও করতে হয়। আপস না করলে প্রচারমাধ্যম টিকে থাকতে পারে না। টিকেই যদি না থাকে তাহলে ভূমিকা রাখবে কীভাবে? যে সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যম যত বড় ও শক্তিশালী তাকে সরকার ও কর্পোরেট পুঁজির সঙ্গে তত সাবধানী সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। সংবাদপত্রের এখন আরেক নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িয়ে গেছে : বিকল্প যোগাযোগ নেটওয়ার্ক। প্রচলিত ধারার সংবাদপত্র সমাজের সব শ্রেণীর চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। মূলধারার সংবাদপত্র বিশাল দায়িত্ব পালন করলেও সমাজের সব সত্য প্রকাশ করতে পারে না। তথ্যপ্রযুক্তির অকল্পনীয় অগ্রগতি হওয়ায় এবং বহু মানুষের কাছে তা পৌঁছে যাওয়ায় বিকল্প যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বহু অপ্রিয় ও বিপজ্জনক সত্যকে প্রকাশ করে দিচ্ছে। তবে আমরা বলব, বিকল্প যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সংবাদপত্রের কোনো শত্রু নয়- সম্পূরক ব্যবস্থা হিসেবেই দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যে যে তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল, তার পেছনে সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল অতি সামান্য- বিকল্প যোগাযোগ নেটওয়ার্কের ভূমিকাই ছিল প্রধান। পুঁজিবাদী বিশ্বে ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’ শীর্ষক যে আন্দোলন হয়েছে, তার পেছনেও প্রথাগত সংবাদপত্র নয়,
বিকল্প যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বিস্ময়কর ভূমিকা রেখেছে। বরং কায়েমী স্বার্থের সহযোগী প্রধান কাগজগুলো ওই আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তাহলে কি একসময় সংবাদপত্রের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে? না, তা নিশ্চয়ই নয়। যখন রেডিও চালু হয়, মানুষ মনে করেছিল সংবাদপত্র ধীরে ধীরে গৌণ প্রচারমাধ্যম হয়ে যাবে। তা হয়নি। যখন টেলিভিশন দেশে দেশে সম্প্রচার শুরু করল, তখন ভাবা হয়েছিল সংবাদপত্রের দিন শেষ। তা হয়নি। বরং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সংবাদপত্র নতুনতর প্রযুক্তির সাহায্যে আরও বিকশিত হয়েছে। এখন প্রচারমাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশন সমান গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে। জনগণের এই তিনটিরই প্রয়োজন রয়েছে। সেটাই এ সময়ের দাবি। সুতরাং আমরা এ কথাও বলতে পারি, বিকল্প যোগাযোগ নেটওয়ার্ক- ফেসবুক, টুইটার, অনলাইন সংবাদপত্র ইত্যাদিও এ যুগেরই দাবি। সংবাদপত্রও থাকবে, সেগুলোও থাকবে।
২. কেউ যদি আমাকে গণতন্ত্র এবং বস্তুনিষ্ঠ ও শক্তিশালী সংবাদপত্রের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলে, আমি দ্বিতীয়টি বেছে নেব। যেখানে স্বাধীন ও শক্তিশালী সংবাদপত্র রয়েছে, সেখানে মানুষ তার পছন্দমতো একটি সরকার পদ্ধতি বেছে নিতে পারে। স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদপত্রহীন গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে বাংলাদেশের মানুষ দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম শুরু করার আগেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছে। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, যেখানে দেশের ও দেশের মানুষেরই স্বাধীনতা নেই, সেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দাবি কোনো অর্থ বহন করে কিনা? যে দেশে মানুষের স্বাধীনতা নেই, গণতন্ত্র নেই, সে দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকে কী করে? আর থাকলেই বা কতটুকু থাকবে? সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলে কেউ অন্যায়-অবিচারের প্রতিকার চাইতে পারে, তার আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্নের কথা প্রকাশ করতে পারে, স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করতে পারে এবং স্বাধীনতার জন্য যারা সংগ্রাম করছেন তাদের কর্মকাণ্ডের বিবরণ প্রকাশ করে জনমত গঠন করতে পারে। ফলে স্বাধীনতা অর্জনের পথটা সহজ হয়। সেজন্যই বাংলার রাজনৈতিক-সামাজিক নেতারা আগে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাটা আদায় করতে ঔপনিবেশিক সরকারের সঙ্গে দেন-দরবার করতেন। যে স্বাধীন দেশে সংবাদমাধ্যম স্বাধীন নয়, সে দেশের মানুষ স্বাধীন নয়। পৃথিবীর বহু স্বাধীন দেশের মানুষেরই এখন মুখে কাপড় বাঁধা এবং হাতে-পায়ে শেকল। কারণ তারা তাদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারে না। কর্তৃত্ববাদী সরকার সংবাদপত্রকে স্বাধীনতা দিতে নারাজ। যদিও বহু কর্তৃত্ববাদী সরকার জনগণের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু মানুষ শুধু প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার প্রাণী নয়। সে তার ভাত-কাপড়-বাসস্থান-চিকিৎসার বাইরেও আরও অনেক কিছু নিয়ে ভাবে। তার সেই স্বপ্নগুলোকে রাষ্ট্র মনে করতে পারে আপাতত অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে ভাববার এবং তার সেই ভাবনা প্রকাশের অধিকার হরণ করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের থাকা উচিত নয়। মানুষের স্বপ্নগুলোকে তুলে ধরার অর্থাৎ প্রকাশ করার অন্যতম প্রধান আধার বা পাত্র হল সংবাদপত্র। আধুনিক সংবাদপত্র শুধু সংবাদ প্রকাশের পত্র নয়। রাষ্ট্রের বাস্তবতা এবং জনগণের স্বপ্ন এ দুটি বিষয়ই তুলে ধরার কঠিন দায়িত্ব বর্তেছে সংবাদপত্রের ওপর। উদার গণতন্ত্র ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদপত্র যে দেশে আছে, সে দেশের মানুষ বিশেষ ভাগ্যবান। এমনকি মন্দ গণতন্ত্র যেখানে আছে, সেখানেও যদি স্বাধীন সংবাদপত্র থাকে তা মন্দের ভালো। ভালো এজন্য যে, জনগণ তাদের মতামতটা প্রকাশ করতে পারে। জনমতের চাপে অনেক সময় সরকার জনস্বার্থে কিছু কাজ করতে বাধ্য হয়। সামরিক বা অসামরিক স্বৈরশাসনের মধ্যে সংবাদপত্রের দায়িত্ব যেমন বেশি, ঝুঁকিও বেশি। জনস্বার্থে লেখালেখি করে যে কাগজ যত বেশি ঝুঁকি নেয়, সে কাগজের মূল্য তত বেশি। তবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিপদ থাকলে কোনো রকমে যোগ-বিয়োগ করে অস্তিত্ব রক্ষা করায় দোষ নেই। আধুনিক রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ সংবাদপত্র। কোনো কিছুর একটি স্তম্ভ দুর্বল থাকলে গোটা জিনিসটিই দুর্বল হয়ে পড়ে। সংবাদমাধ্যমকে সরকার দুর্বল করে রাখলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা রাষ্ট্রেরই। রাষ্ট্রের ক্ষতি মানে জনগণেরই ক্ষতি- সরকারের ক্ষতি নয়। কোনো সরকারের লাভ-ক্ষতিতে রাষ্ট্রের কিছু যায় আসে না। ঘটনার বিবরণ সংবলিত সংবাদ পরিবেশনই এখন আর খবরের কাগজের একমাত্র কাজ নয়। কোথায় কোন দুর্ঘটনায় বহু লোক হতাহত হল, কোথায় কে খুন হল, কার স্ত্রী কার সঙ্গে পালিয়ে গেল, কোন দেশে বন্যায় বা জলোচ্ছ্বাসে জনপদ বিধ্বস্ত হল, মন্ত্রীরা জনসভায় কী বললেন- এসব খবরে পাঠকের আগ্রহ আছে; কিন্তু আজকের সংবাদপত্রের কাছে পাঠকের দাবি আরও বেশি। রাজনীতি কেমন আছে এবং কেমন হওয়া উচিত, শিল্প-বাণিজ্য-কৃষি তথা অর্থনীতির অবস্থা কী, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী, কোথায় সরকারের দুর্বলতা- এসব বিষয়ে বিশ্লেষণ ও দিকনির্দেশনা পাঠক প্রত্যাশা করে সংবাদপত্রের কাছে। পাঠকের সেই প্রত্যাশা যে কাগজ যত বেশি পূরণ করে তার গ্রহণযোগ্যতা তত বেশি।
৩. পৃথিবীতে প্রথম যেসব দেশে সংবাদপত্র প্রকাশ ও বিকশিত হয়েছে বাংলাদেশ তাদের একটি। আড়াইশ’ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে বাংলা-ইংরেজি সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। আজ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্প খুবই অগ্রসর। আছেন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সাংবাদিক। সংবাদপত্রে পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। এ সবই সুখবর। তবে খারাপ সংবাদ হল এই যে, একশ্রেণীর কায়েমি স্বার্থবাদী সংবাদপত্র শিল্পকে অপব্যবহার করছে। তবে ভালোর সঙ্গে মন্দ সব সময়ই থাকে। মন্দকে মানুষই বর্জন করে। ভালোই টিকে থাকে। শান্তিপূর্ণ সমাজ, আইনের শাসন, টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি বিনির্মাণ এবং সমৃদ্ধ জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশে এখনও গণমাধ্যমের মধ্যে সংবাদপত্রের ভূমিকাই প্রধান। যুগান্তর ১৮ বছরে পড়ছে, যা তার সাংবাদিকসহ সব কর্মীর জন্য শুধু নয়, পাঠক-শুভানুধ্যায়ীদের জন্যও সুসংবাদ। এই শুভদিনে যুগান্তরের প্রতি রইল আমার আন্তরিক অভিনন্দন।
সৈয়দ আবুল মকসুদ : লেখক ও গবেষক

No comments:

Post a Comment