রাষ্ট্রায়ত্ত
ব্যাংকগুলোর প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেয়া
হচ্ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ জন্য চারটি সম্ভাব্য উপায় বের
করে অর্থমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিডিবিএল ছাড়া
অন্য সব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর
ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ, মূলধন সংরক্ষণের হারসহ অন্যান্য সূচক বিবেচনা করলে
আগামী দিনগুলোতে ঘাটতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে প্রতীয়মান হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি
অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রথম
প্রস্তাবে বলা হয়, সরাসরি নগদ মূলধন সরবরাহ বা শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে এই
ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে।
এজন্য বাজেট থেকে নগদ অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। তবে
চলতি বাজেটে ব্যাংক মূলধন পুনর্গঠন খাতে বরাদ্দ হচ্ছে ৪ হাজার কোটি টাকা।
এই অর্থ ব্যাংকগুলোর ১৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতির তুলনায় সামান্য।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়, ব্যাংকগুলো নিট মুনাফা অর্জনের পর তা বণ্টন না
করে বোনাস শেয়ার ইস্যু করতে পারে। এই পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি কাঙ্খিত। তবে
দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো এ ধারায় নেই। ফলে এটি
আপাতত বিবেচনার সুযোগ নেই। ব্যাংকগুলো মুনাফা বণ্টন না করে বোনাস শেয়ার
ইস্যুর মাধ্যমে ঘাটতি মেটাবে এটাই বেশি কাঙ্খিত। কিন্তু তারা দীর্ঘদিন এই
ধারায় নেই। তৃতীয় প্রস্তাবে বলা হয়, শ্রেণীকৃত ঋণের কারণে মূলধন ঘাটতি
হচ্ছে। শ্রেণীকৃত ঋণ কমিয়ে প্রভিশন ঘাটতি কমাতে পারে। এটি একটি কাঙ্খিত
পন্থা হলেও ব্যাংকগুলো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। শেষ প্রস্তাবে ঘাটতি
পূরণে বন্ড ইস্যু প্রসঙ্গে বলা হয়, এ মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ করা হলে আপাতত
সরকারের ওপর কোনো নগদ দায় বর্তাবে না। তবে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে ব্যাংকগুলো
সুদ-আসলে বন্ড ক্রেতাদের অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে এর দায় সরকারের ওপর
বর্তাবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ
যুগান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা ঠিক হচ্ছে না।
খেলাপি, মন্দ ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি বাড়ছে। পুরো ঋণ পরিচালনায় দুর্নীতি ও
অব্যবস্থাপনা ঢুকে গেছে। তিনি বলেন, মূলধন ঘাটতি পূরণ করা সমাধান নয়,
সমস্যার মূলে গিয়ে তা দূর করতে হবে। পাশাপাশি এসব ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের
বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো প্রস্তাবে
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান বলেন,
ব্যাংকগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে আছে। তা কম সুদে বিনিয়োগ করে
মুনাফা অর্জন করে মূলধন বাড়াতে ব্যাংকগুলো সক্ষম হচ্ছে না।
সেখানে আমানতের
চেয়ে দ্বিগুণ সুদে বন্ড বিক্রির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ বিনিয়োগ করে মুনাফা
কতটা অর্জন করতে পারবে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। জানা গেছে, এই
মুহূর্তে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ হচ্ছে ২ হাজার ৬০৬ কোটি
টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ২০০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১ হাজার ৫৩ কোটি
টাকা, বেসিক ব্যাংকের ২ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট
ব্যাংকের (বিডিবিএল) ৭৩৭ কোটি টাকা, কৃষি ব্যাংকের ৭ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা,
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ৭০৫ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট
ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ঘাটতি মূলধন
পূরণ করার পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ দেয়া ও আদায়সহ বিভিন্ন
আর্থিক সূচকের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এর দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপর
পড়বেই। অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়, ঘাটতি মূলধন পূরণে
বেসিক ও রূপালী ব্যাংক ইতিমধ্যে বন্ড ইস্যুর জন্য ব্যাংক ও আর্থিক
প্রতিষ্ঠানের কাছে আবেদন করেছে। এ জন্য যুক্তি হিসেবে বলা হয়, বড় অঙ্কের
মূলধন ঘাটতি থাকায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাংকের ব্যবসা করার
ক্ষেত্রে বড় রকমের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। তবে ইতিমধ্যে রূপালী
ব্যাংকের বন্ডের ইস্যুর ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত চাওয়া হয়েছে। আর
বেসিক ব্যাংকের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতামতসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা
গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে অর্থ বিভাগকে।

No comments:
Post a Comment