বছর
দু’য়েক আগে একদিন কলকাতার রাফি আহমেদ কিদওয়াই রোড ধরে হাঁটছিলাম। কিদওয়াই
কে ছিলেন আমি জানতাম। তারপরও লেখার প্রয়োজনে মানুষ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা
করতে হয় বলেই হয়তো, হাঁটার সময় ওই রোডের বেশ কয়েকটি দোকান ও প্রতিষ্ঠানের
মালিক কিংবা ম্যানেজারের কাছে কিদওয়াই’র পরিচয় জানতে চেয়েছিলাম। সবাই
এমনভাবে তাকিয়েছেন যে, তাদের প্রতিষ্ঠানের ওপরে টাঙানো সাইনবোর্ডে যে রাফি
আহমেদ কিদওয়াই রোড লেখা রয়েছে, সেটাও তারা জানেন না। কিদওয়াই স্বাধীন
ভারতের প্রথম যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন এবং নেহরু মন্ত্রিসভায় মুসলমান বলতে এক
ছিলেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, আরেক তিনি। আজাদ সম্পর্কে না জানাটা দোষের
কিছু নয়; কিন্তু বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ যে রোডটিতে তারা বাস অথবা
ব্যবসা করছেন, সেটি যার নামাঙ্কিত, তাকে চেনেন না! রংপুরের কারমাইকেল
কলেজের অনেক ছাত্রই আমাকে বলতে পারেনি কারমাইকেল কে ছিলেন। আবার এমনও
দেখেছি, কারমাইকেল যে একজন মানুষের নাম, তা-ও জানে না এক ছাত্র। অথচ লর্ড
কারমাইকেল শুধু একজন মানুষই নন, ছিলেন ব্রিটিশ আমলে বাংলার গভর্নর।
রাজধানীর এক অভিজাত এলাকার একটি রাস্তার নাম মিন্টো রোড। এই লর্ড মিন্টো
একসময় অবিভক্ত ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন। একদিন এক রিকশাওয়ালাকে যখন
শুদ্ধ উচ্চারণে জিজ্ঞেস করলাম তিনি মিন্টো রোড যাবেন কিনা, তিনি জায়গাটা
চিনলেন না। যখন বললাম ‘মিন্টু রোড’, তিনি বললেন- উঠেন।
এই রিকশাওয়ালা হয়তো
জানেন কোনো এক মিন্টু ভাই বানিয়েছিল ওই রাস্তা! তো হাঁটতে হাঁটতে একটা
জায়গায় এসে দেখি শ’তিনেক নারী-পুরুষের ভিড়। সবার চেহারায় অপেক্ষমাণতা। কিছু
বুঝে ওঠার আগে ঘাড় ঘুরিয়ে একটি কলেজ দেখতে পাই। অতঃপর বুঝে ফেলি, সন্তান
অথবা নিকটাত্মীয় কাউকে পরীক্ষার হলে ঠেলে দিয়ে এরা শেষ ঘণ্টার অপেক্ষায়
রয়েছেন। কিন্তু কীসের পরীক্ষা! একজন জানালেন, ইন্ডিয়ান নৌবাহিনীতে লোক নেয়া
হবে, সেটারই নিয়োগ পরীক্ষা। এদিক-সেদিক চোখ ঘোরাতেই নজরে আসে পঞ্চাশের
কাছাকাছি বয়সের এক নারী ফুটপাতে সংবাদপত্র বিছিয়ে সেখানে বসেছেন এবং মাটির
খোরায় থাকা চায়ে লুচি ভিজিয়ে খাচ্ছেন। এই নারীর চেহারা-সুরতের বর্ণনা এভাবে
দেয়া যায়- আমাদের গার্মেন্ট বালিকারা ওই বয়সে পৌঁছালে যে রূপ ধারণ করবেন,
তেমন। আমি দাঁড়িয়ে থেকেই তার সঙ্গে কথা বলতে থাকি। তিনি এসেছেন সুদূর
মুর্শিদাবাদ থেকে, ছেলে পরীক্ষা দিচ্ছে। এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞেস করি-
আপনার ছেলের চাকরি হবে তো? তিনি গরবিনী মায়ের অহংকার ফুটিয়ে বলেন, আমার
ছেলে খুব ব্রিলিয়ান্ট, হয়ে যাবে। পশ্চিম বাংলার অশিক্ষিতরাও শুনতে শুনতে
কিছু না কিছু হিন্দি ও ইংরেজি শিখে ফেলে। এই মা মোবাইল ব্যবহার করেন না,
সম্ভবত তা কেনার সামর্থ্যও নেই তার। আমি খেয়ালের বশে, আসলে খেয়ালও নয়, এক
দূরবর্তী চিন্তায় কলকাতায় যে ঠিকানায় তিনি উঠেছেন, টুকে রাখি। ছেলের নামটিও
মুখস্থ করি- রাহুল দাস। এরপর বিচ্ছেদ, তবে ভুলি না আমার পরবর্তী করণীয়।
বছরখানেক পর এক সাংবাদিকের মাধ্যমে জেনে যাই, রাহুল ইন্ডিয়ান নেভিতেই চাকরি
করছে। পাঠক হয়তো ভাবছেন, এই পণ্ডশ্রমের অর্থ কী? এর অর্থ আসলে ব্যাপক,
শুধু ভাব সম্প্রসারণ করতে পারা চাই। একজন সাংবাদিক হিসেবে ইন্ডিয়ান
সোসাইটিটা বুঝতে হলে এই আপাত পণ্ডশ্রম খানিকটা হলেও কাজে দেবে। আমার ছেলে
ব্রিলিয়ান্ট, হয়ে যাবে- এই আত্মবিশ্বাস ক’জন বাংলাদেশী মা ধারণ করেন? আর এ
তো নিছকই বিশ্বাস নয়, দেখা গেল বাস্তব বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করেনি।
হ্যাঁ, সন্তান যত মেধাবীই হোক, বাংলাদেশের কোনো মা-ই এই বিশ্বাস লালন করেন
না যে, সে যোগ্যতাবলেই কোনো সরকারি চাকরি পাবে। আর যদি ভুল করে এমন একটি
বিশ্বাসের জন্ম দেনও মনে, তাকে সইতে হবে বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা। সাদিয়ার
ক্ষেত্রে আমি যেমন হয়েছিলাম বেদনাহত।
ইউএন জব নিয়ে দেশের বাইরে চলে গেছে
সে। তার পড়াশোনা ও আন্ডারস্ট্যান্ডিং লেভেল জঘন্যরকম ভালো। এত ভালো যে,
ঈর্ষাকাতর হয়ে তাকে একটি বই প্রেজেন্ট করার সময় লিখেছিলাম- I am a feminist
but when I look at Sadia I become a male chavuinist- আমি নারীবাদী বটে,
তবে যখন সাদিয়ার দিকে তাকাই আমি উগ্র পুরুষবাদী হয়ে যাই। মেয়েরা বড় কথার
ছোট প্রতিক্রিয়া জানায়। সে লেখাটি পড়ে বলেছিল- Both are bad. তিন শব্দের এই
বাক্যটি দিয়ে একটি কলাম লেখা সম্ভব। তো চার বছর আগে সে যখন বিসিএস
দিচ্ছিল, আমি ধরেই নিয়েছিলাম কোয়ালিফাই তো করবেই, ফরেন সার্ভিসই পেয়ে যাবে
সে। কিন্তু কৃতকার্যদের তালিকায় তার নাম নেই। নিশ্চয়ই রিটেনে ভালো করেছে
বলেই তাকে ডাকা হয়েছিল ভাইভায়। সেখানে তাকে কী কী প্রশ্ন করা হয়েছিল? সব
প্রশ্নেরই উত্তর দেয়ার কথা তার। ঠিক আছে ধরে নিলাম, কোনো একটি প্রশ্নের
উত্তর দিতে পারেনি সে। তবে আমি নিশ্চিত, একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে না
পারলেও পরের প্রশ্নটির উত্তর সে পারবেই। বাজি ধরে বলা যায়, তাকে বাজিয়ে
দেখার চেষ্টা করা হয়নি। অথবা তাকে নেয়া হবে না বলেই হয়তো এমন প্রশ্ন করা
হয়েছে, যা দ্বারা সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিযোগীকেও আটকে দেয়া সম্ভব। বাংলাদেশের
যে কাউকেই এমন একটা প্রশ্ন করে অপ্রস্তুত করে দেয়া যায়- রুয়ান্ডার একটি
নদীতে এক ধরনের লাল শ্যাওলা থাকে, তার বোটানিক্যাল নাম কী? গ্রামাঞ্চলে
স্থূল চালাকি বোঝাতে একটি বাগধারা ব্যবহার করা হয়। না দিবার কাঁঠাল ভাদ্র
মাসে পাকে। দূর এলাকা থেকে কেউ একজন এসেছে এক গৃহস্থের গাছের কাঁঠাল নিতে।
গৃহস্থ বললেন, আমার কাঁঠাল তো এখনও পাকেনি। লোকটি বললেন- জ্যৈষ্ঠ মাস,
পাকেনি মানে? গৃহস্থের উত্তর- আমার কাঁঠাল ভাদ্র মাসে পাকে। না দিতে চাইলে
কত ফন্দিই না আঁটা যায়। ঘুষ ছাড়া চাকরি দেব না, তাই প্রথমে জিজ্ঞেস করব-
অমুক বইটির লেখক কে? সঠিক উত্তরের পরের প্রশ্ন হবে- বইটি কত সালে প্রকাশ
পেয়েছে? এরপর চলতেই থাকবে- প্রকাশক কে, কাকে উৎসর্গ করা হয়েছে? লেখকের জন্ম
কবে? তার ছেলেমেয়ে কয়টি? সেটাও পারলে একটা পেনসিল এগিয়ে দিয়ে বলা হবে-
ওনার একটা স্কেচ করো। বইটির বিষয়বস্তু নখদর্পণে থাকলই বা, প্রার্থী না আটকে
যাবে কোথায়? অথবা এমন কী ঘটেছে যে, ফাইনাল সিলেকশনে সাদিয়ার নাম ছিল, কোনো
এক অকৃতকার্য সেখানে প্রতিস্থাপিত হয়েছে? কী সেই কারণ?
২. আমি কস্মিনকালেও বলিনি, বলবও না, ভারত দুর্নীতিমুক্ত একটি দেশ অথবা সেখানকার সব যুবক-যুবতীই তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরি পেয়ে থাকে। বরং প্রকাশ ঝা পরিচালিত মুম্বাইয়ের ‘অপহরণ’ ছবিটি যারা দেখেছেন, তারা জেনে গেছেন নিয়োগ পরীক্ষায় টপ লিস্টে থাকার পরও পুলিশের একটি অফিসার পদে ঘুষের টাকা দিতে না পারায় বিহারের যুবক অজয় দেবগান কীভাবে ব্যর্থ হয়েছেন সেটি পেতে। কথাটা আসলে অন্যত্র। ছবিটি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে, অর্থাৎ রাষ্ট্র স্বীকার করে নিয়েছে চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি হচ্ছে। আমাদের রাষ্ট্র স্বীকারই করতে চায় না, এক্ষেত্রে দুর্নীতি-অনিয়ম বলে কিছু ঘটছে। দ্বিতীয় কথা, সিনেমা মানে তা নাটকীয়তা ও সমাজের খণ্ডচিত্র। স্বাভাবিক ও সম্পূর্ণ সমাজ নিয়ে সিনেমা হয় না, হলেও তা ব্যবসাসফল হয় না। যে জীবন সবাই জানে, তার আবার সিনেমা কী! অর্থাৎ ভারতে চাকরিতে নিয়োগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ধসে পড়েনি, কোথাও কোথাও দুর্নীতি হচ্ছে। বাংলাদেশে অন্তত নিন্মশ্রেণীর পদগুলোর স্বাভাবিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধ্বংসাবশেষটুকুও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এখানে সরকারি চাকরির নিয়োগে ঘুষ-দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে জীবনের সঙ্গে এমনই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে যে, তা নিয়ে সিনেমা বানালেও কেউ অতিরিক্ত কিছু দেখার আশায় তা দেখতে চাইবে না। আমাদের ভাগ্য ভালো, প্রাইভেট সেক্টরে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে আর তাই যুবক-যুবতীদের একটি অংশ করে খাচ্ছে। কর্মে ঢোকার জন্য এরা ঘুষ দেয়নি, প্রভাবশালীদের দিয়ে ফোনও করায়নি। না, এমপ্লয়ারের এই স্বচ্ছতার পেছনে মহৎ কোনো আদর্শ নেই।
২. আমি কস্মিনকালেও বলিনি, বলবও না, ভারত দুর্নীতিমুক্ত একটি দেশ অথবা সেখানকার সব যুবক-যুবতীই তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরি পেয়ে থাকে। বরং প্রকাশ ঝা পরিচালিত মুম্বাইয়ের ‘অপহরণ’ ছবিটি যারা দেখেছেন, তারা জেনে গেছেন নিয়োগ পরীক্ষায় টপ লিস্টে থাকার পরও পুলিশের একটি অফিসার পদে ঘুষের টাকা দিতে না পারায় বিহারের যুবক অজয় দেবগান কীভাবে ব্যর্থ হয়েছেন সেটি পেতে। কথাটা আসলে অন্যত্র। ছবিটি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে, অর্থাৎ রাষ্ট্র স্বীকার করে নিয়েছে চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি হচ্ছে। আমাদের রাষ্ট্র স্বীকারই করতে চায় না, এক্ষেত্রে দুর্নীতি-অনিয়ম বলে কিছু ঘটছে। দ্বিতীয় কথা, সিনেমা মানে তা নাটকীয়তা ও সমাজের খণ্ডচিত্র। স্বাভাবিক ও সম্পূর্ণ সমাজ নিয়ে সিনেমা হয় না, হলেও তা ব্যবসাসফল হয় না। যে জীবন সবাই জানে, তার আবার সিনেমা কী! অর্থাৎ ভারতে চাকরিতে নিয়োগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ধসে পড়েনি, কোথাও কোথাও দুর্নীতি হচ্ছে। বাংলাদেশে অন্তত নিন্মশ্রেণীর পদগুলোর স্বাভাবিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধ্বংসাবশেষটুকুও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এখানে সরকারি চাকরির নিয়োগে ঘুষ-দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে জীবনের সঙ্গে এমনই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে যে, তা নিয়ে সিনেমা বানালেও কেউ অতিরিক্ত কিছু দেখার আশায় তা দেখতে চাইবে না। আমাদের ভাগ্য ভালো, প্রাইভেট সেক্টরে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে আর তাই যুবক-যুবতীদের একটি অংশ করে খাচ্ছে। কর্মে ঢোকার জন্য এরা ঘুষ দেয়নি, প্রভাবশালীদের দিয়ে ফোনও করায়নি। না, এমপ্লয়ারের এই স্বচ্ছতার পেছনে মহৎ কোনো আদর্শ নেই।
এক্ষেত্রে এমপ্লয়ার
যিনি, তিনি একজন উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী। নিজের ক্ষতি নিজে ডেকে আনে, কোন্ সে
আহাম্মক? তিনি পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ নিতে যাবেন কেন, বরং এমন একজন যোগ্যকে
নিয়োগ দেবেন, যিনি তার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পাঁচ কোটি টাকা আয় করে দেবেন।
এটাকে বলে বিষয়বুদ্ধি। কর্পোরেট হাউসগুলোয় আমরা যে কঠোর শৃংখলা দেখতে পাই,
সেটাও এই বিষয়বুদ্ধিই। চাই অধিক মুনাফা আর তাই দরকার যোগ্য কর্মী। নিয়োগের
প্রশ্নে এ জগতে ঘুষের চল নেই তাই। তবে হ্যাঁ, মাথা ঘুষ না খেলে কী হবে,
প্রাইভেট সেক্টরে ঘাড় কখনও কখনও মাথাকে আড়াল করে পকেটস্থ করে বৈকি ঘুষ।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যক্তিটির অগোচরেই মধ্যস্তরের কেউ কেউ বাঁ
হাতে টাকা নিয়ে ডান হাতে সই করেন নিয়োগপত্র। আমরা বলছি সরকারি চাকরির কথা।
এটা এখন রাস্তা-ঘাট, নগর-বন্দর, হাট-বাজার সর্বত্রই চাউর হওয়া সংবাদ যে,
কেউ যদি এখন পুলিশের কনস্টেবল, প্রাইমারি শিক্ষক, পিয়ন-দারোয়ান, রেলকর্মী,
স্বাস্থ্যকর্মী ইত্যাদি ধরনের, এমনকি পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে নিয়োগ পেতে
চায়, তাহলে তাকে গুনতে হবে লাখ লাখ টাকা। বিশুদ্ধ বিজ্ঞান ছাড়া প্রতিটি
নিয়মেরই ব্যতিক্রম থাকে, এ ক্ষেত্রে নেই। যা আছে, তা হল টাকার পরিমাণের
এদিক-সেদিক। এমপি সাহেবকে কোনোভাবে বুঝিয়ে যদি তার হৃদয় গলানো যায়, তাহলে
পাঁচের পরিবর্তে তিনেই কাজ হয়ে যাবে। এমন ঘটাও বিচিত্র নয়- সরকারি দলের
ছাত্র সংগঠনের কর্মীর পাঁচ লাখের বিপরীতে বিরোধী দলের, সে যদি শিবির কর্মীও
হয় এবং সাত দিতে রাজি, চাকরিটা তারই হবে। হাইয়েস্ট বিডার বলে কথা! যারা
বলেন, চাকরি ক্ষেত্রে শুধুই দলীয়করণ হচ্ছে, মাঠের চিত্র সম্পর্কে তাদের
ধারণা নেই। দলের একজন কর্মী দেশলাইয়ের কাঠির ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা
দিল, অন্যদিকে অদলীয় কিংবা প্রতিপক্ষ দলের কেউ এক সেকেন্ডে কাঠিটি জ্বালিয়ে
দেখাল যে সেটা দেশলাইয়ের কাঠিই,
চাকরিটা তারই হবে। টাকার ব্যাগ হাতে নেই,
তুমি কোথাকার কে হে? তোমাকে না নিলে রাষ্ট্র কতটা বঞ্চিত হবে, সেটা পরের
হিসাব। নগদ নারায়ণ ছাড়ে কেউ? সবাই পিএসসির স্বচ্ছতার দাবি তোলেন। সংকটটা
যেখানে গভীর, সেদিকে তাদের দৃষ্টি নেই। ধরা যাক, এএসপি পদের সব ক’টিতেই
পিএসসি যথাযথভাবেই নিয়োগ দিল। এই পদের সংখ্যা কত? লাখ লাখ কনস্টেবল পদে
নিয়োগ দিচ্ছেন যারা, সেই এসপি ও এমপি সাহেব- পিএসসির হাত তো ততো লম্বা নয়
যে তাদের ছোঁবে। এলাকার কত লোক যে ফোন করে, স্যার টাকাটা যাতে মার না যায়,
আপনার হাত দিয়েই দিতে চাই, ছেলে বা মেয়ের চাকরিটা খুব দরকার। এই অসহায়ত্ব,
মানবতার এই লাঞ্ছনা, গরিবের এই কান্না- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি অবহিত
আছেন? স্থূপীকৃত টাকাগুলো কোথায় কোথায় ভাগ হয়, সেটাও নিশ্চয়ই তিনি জানেন
না। এ পর্যায়ে পাঠক হয়তো ভাবছেন, কলংক যা, তা নিচের দিকে, উপরের সব
সাফ-সুতরো। মানে উচ্চপদের সরকারি নিয়োগে তেমন কোনো অনিয়ম, অরাজকতা নেই।
কথাটা ঠিক না। আমার এক পরিচিত যুবকের তিনটা ফার্স্ট ক্লাস, একটা সেকেন্ড।
বেকারত্বের ধারাবাহিকতায় সে তার সবদিকেই ব্যয়বাহুল্য নির্মমভাবে ছেঁটে
ফেলেছে, পেটের ওপর কোপ পড়ার উপক্রম যখন, দরখাস্তের সঙ্গে এঁটে দেয়ার
ব্যাংক-ড্রাফটের টাকাটাও আর ধারে মেলে না, বাধ্য হয়ে একটা বায়িং হাউসে
পনেরো হাজার টাকার চাকরি নিয়েছে। আরেক যুবক বলেছে, আমার সার্টিফিকেটগুলো
যদি কেউ তিন লাখ টাকায় কিনত, সেই টাকা দিয়ে গ্রামে গিয়ে একটা পোলট্রি ফার্ম
দিতে পারতাম। এরও রেজাল্ট খারাপ না। আর কত বলব? এক বেকারকে তার প্রেমিকা
দেখতে চেয়েছিল এক্সিকিউটিভ, বছরের পর বছর দেখে চলেছে হাউস টিউটর। পালাবে না
তো কী! শিক্ষিত বেকারদের দুর্দশা অশিক্ষিত কর্মহীনদের চেয়ে প্রকট হতেই
হবে। এই বেকার সম্ভ্রমবোধে কাউকে কিছু বলে না।
মেয়েরাই লাজুক হয়; কিন্তু এই
বেকার প্রেমিকার সামনে সততই সলজ্জ। আবার বাজার দর কমে যাবে বলে স্মার্টও
থাকতে হয়। এদের সঙ্গে এক বিছানায় অন্তরঙ্গ হয়ে এক রাত কাটালে বোঝা যাবে
বেদনার কত রঙ। আমেরিকায় একটি Phrase খুব জনপ্রিয় হয়েছে ইদানীং- ‘Pass the
popcorn moments’- বেকারদের যন্ত্রণাবিদ্ধ দুঃস্বপ্নের ঘোর কবে কাটবে কেউ
জানে না। চাকরিটা তাহলে পাচ্ছে কারা? এক মন্ত্রী যেদিন ওই কথাটা বলেছিলেন,
সেদিনই তো স্পষ্ট হয়েছিল এই সরকারের মনস্তত্ত্ব। নির্দলীয় বেকাররা সেদিন
এটাও বুঝেছিল- আমাদের দিন গেছে ফুরিয়ে! সাংবাদিকদের একটা ঠ্যাকা এমন যে,
কোন্ মন্ত্রী কোন্ কথা কখন বলেছিলেন মনে রাখতে হয়। আমি এসব মনে-টনে রাখি
না। মন্ত্রী মহোদয় সম্ভবত বলেছিলেন- কমিউনিটি ক্লিনিকে দলীয় কর্মীদেরই
নিয়োগ দেয়া হবে, তারা অনেক ত্যাগ করেছে। ঠিকই তো, অন্যরা মলমূত্র ছাড়া আর
কী ত্যাগ করে! মন্ত্রী অবশ্য তার কথার লেজটা ধরিয়ে দেননি- শুধু দলীয় কর্মী
হলেই চলবে না, টাকাও লাগবে কিছু। তাতে দল ভারি, পকেটও ভারি। হাতে
মঙ্গলপ্রদীপ নেই অথচ গাইছি প্রজামঙ্গলের গান! মন্ত্রী-এমপিদের কথা বাদ,
আচ্ছা এই যে যোগ্যরা একটা সরকারি চাকরির আশায় শুকনো ঘামে শরীরের সঙ্গে
লেপ্টে থাকা জামায় রাস্তার এ মোড়-সে মোড় করছে, জাতির ভাগ্যোন্নয়নে সদামগ্ন
প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিটা তাদের প্রতি এত উদাসীন কেন! চাকরি পেতে হলে সত্যিই
কি দল করা লাগবে? অথবা লাগবে টাকা? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই উদাসীনতার
আপাতত কোনো ব্যাখ্যা নেই।
লেখক: সাংবাদিক
mahbubkamal08@yahoo.com
লেখক: সাংবাদিক
mahbubkamal08@yahoo.com

No comments:
Post a Comment