গাইবান্ধা-১
(সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যায় দায়
স্বীকার করে জবানবন্দি দিলেও সচেতনভাবে অনেক তথ্য গোপন করেছেন কর্নেল (অব.)
আবদুল কাদের খান। এমনকি তিনি জবানবন্দিতে বিভ্রান্তিকর তথ্যও দিয়েছেন।
ঘটনার ছয় মাস আগে লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করেছেন বলে তিনি দাবি করেছেন।
তবে পুলিশের তদন্ত এবং তার সহযোগী তিন কিলারের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে অন্তত
এক বছর আগে তিনি লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। তার কাছে কীভাবে দুটি অবৈধ
অস্ত্র এসেছে এ বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। কিলারদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণের
বিষয়েও তিনি কিছু বলেননি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কাদের খান
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি হয়তো নিজেকে
বাঁচানোর জন্য তথ্য গোপন বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছেন। নিজেকে মানসিক
অসুস্থ দাবি করে তিনি ‘সুবিধা’ নেয়ার চেষ্টাও করছেন। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট
সূত্র জানায়, দুটি অবৈধ অস্ত্র কাদের খান কোথা থেকে এবং কিভাবে সংগ্রহ
করেছেন এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে মুখ খোলেননি। হত্যার পরিকল্পনা করার পর নাকি
আগে থেকেই তার কাছে দুটি অবৈধ অস্ত্র ছিল- এ বিষয়ে একাধিকবার তাকে
জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য দেননি। এ ক্ষেত্রে তিনি
কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে তা তদন্ত
করে দেখা হচ্ছে। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা জানান, কাদের খান বৈধ
অস্ত্রের লাইসেন্সধারী। বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্সধারী হওয়ার কারণে তাকে
চ্যালেঞ্জ করা সহজ ছিল না। এই সুযোগ হয়তো তিনি নিয়েছেন। এমন হতে পারে এমপি
থাকাকালীন তার কোনো সহযোগীর মাধ্যমে দুটি অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন। এখন
এ বিষয়ে মুখ খুললে তার অতীতের অনেক অপকর্মের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তাই
হয়তো তিনি এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না। গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
রবিউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কাদের খানের বাড়ি থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের
পর একটি মামলা হয়েছে। অবৈধ অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। এদিকে
কাদের খান অন্তত এক বছর আগে লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করেছেন বলে ১৬৪ ধারায়
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তিন কিলার রাশেদুল ইসলাম মেহেদী, শাহীন
মিয়া ও আনোয়ারুল ইসলাম রানা। পুলিশের তদন্তেও একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে।
তবে কাদের খান স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, ছয় মাস আগে লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা
করেন তিনি।
মামলার বিচার শুরু হলে ‘সুবিধা’ নিতে তিনি সচেতনভাবেই মিথ্যা
তথ্য দিয়েছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা। কাদের খানকে
জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, কাদের খান
ভাবতেই পারেননি তিনি ধরা পড়ে যাবেন। এখন তিনি নিজেকে মানসিক অসুস্থ দাবি
করে ‘সুবিধা’ নেয়ার চেষ্টা করছেন। তার দাবি, হতাশা থেকে অন্যকে হত্যার
(হোমিসাইডাল) প্রবণতা ও আত্মহত্যার (সুইসাইডাল) প্রবণতা কাজ করত। লিটনকে
হত্যা করে তিনি আবারও এমপি হলে হতাশা থেকে মুক্তিলাভ করবেন- এমন চিন্তা
থেকেই হত্যার মিশন বাস্তবায়ন করেছেন। এই দাবি করে তিনি এক ধরনের সহানুভূতি
লাভের চেষ্টা করছেন। তবে তিনি প্রতিহিংসা ও ক্ষমতার লোভে সুস্থ মস্তিষ্কে,
ঠাণ্ডা মাথায় এবং নিজের ইচ্ছায় লিটনকে হত্যা করেছেন। নিজেকে মানসিক অসুস্থ
দাবি করে তিনি পার পেতে পারবেন না। দু’জন নজরদারিতে : লিটন হত্যার ঘটনায়
কাদেরের সহযোগী শামসুজ্জোহা ও ভারতে পালিয়ে যাওয়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা
চন্দন কুমার রায়ের ভগ্নিপতি সুবল চন্দ্রকে নজরদারিতে রেখেছে পুলিশ। পুলিশ
জাহিদ ও সামাদ নামে আরও দু’জনকে খুঁজছে। প্রসঙ্গত, এমপি লিটন হত্যার ঘটনায়
কাদের খানকে ২১ ফেব্রুয়ারি বগুড়া থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন তাকে ১০
দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডের তৃতীয় দিন শনিবার তিনি ঘটনার দায়
স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। এর আগে এ ঘটনায় কিলিং মিশনে অংশ নেয়া
তিন যুবক মেহেদী, শাহীন ও রানা এবং কাদের খানের গাড়িচালক হান্নান আদালতে
জবানবন্দি দেন। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গার নিজ বাড়িতে
দুর্বৃত্তরা এমপি লিটনকে গুলি করে হত্যা করে।

No comments:
Post a Comment